সামবেদ সংহিতা (বঙ্গানুবাদ  দুর্গাদাস লাহিড়ী)

সামবেদ সংহিতা (বঙ্গানুবাদ দুর...

দুর্গাদাস লাহিড়ী

সামবেদ সংহিতা (বঙ্গানুবাদ দুর্গাদাস লাহিড়ী)

Books Pointer Iconদুর্গাদাস লাহিড়ী
Books Pointer Iconreligious

Change color

সামবেদ-সংহিতা (দুর্গাদাস লাহিড়ী) – এক খণ্ডে সম্পূর্ণ

মূল-গেয়গান, বঙ্গানুবাদ, টীপ্পনী ও মর্মাথ সহ মূল ব্যাখ্যাতা পূজনীয় স্বর্গীয় দুর্গাদাস লাহিড়ী

সায়নাচার্যকৃত সামবেদভাষ্যানুক্রমণিকা সহ সমগ্র গ্রন্থটির সম্পাদনা ও নবরূপদাতা স্রী দিলীপ মুখোপাধ্যায় (পৌরাণিকোত্তম)

অক্ষয় লাইব্রেরি – কলকাতা


প্রারম্ভিকা


০১.


বেদ অপৌরুষেয়, অর্থাৎ কোন মানুষের দ্বারা এটি রচিত নয়। এটি ভগবানের বাণী। বেদেই উল্লেখিত আছে–দেবত্তং ব্রহ্ম গায়ত। এই দেবত্তং পদের অর্থ–দেবতানুগ্রহাল্লব্ধং অর্থাৎ দেবতার অনুগ্রহে বা ভগবান্ থেকে প্রাপ্ত। আবার অন্যত্র বলা হয়েছে–হে দেব! পশুচারণকারীর মতো আমরা, আপনার স্তুতিরূপ বাণীগুলি আপনাকে সমর্পণ করছি। (ভাব এই যে, পশুপালক যেমন পশুর স্বত্বাধিকারীর নিকট হতে গৃহীত পালনীয় পশুগুলিকে সায়ংকালে সেই পশুস্বামীকেই আবার প্রত্যর্পণ করে, সেইরকম হে ভগবন, আপনার নিকট হতে লাভ করে এই সব স্তুতিরূপা বাণীকে আপনাকেই অর্পণ করছি)…। আরও, বেদেই বলা হয়েছে–হে ভগবন! আপনিই আমাদের স্তোত্রমন্ত্র প্রদান করে– সত্যবাকযুক্ত করে–আপনিই সেই স্তোত্রমন্ত্র বা সত্যবাক গ্রহণ করেন। আপনিই মন্ত্রের দাতা, আপনিই মন্ত্রের গ্রহীতা। বলা হয়েছে–বিশ্বেষাং ব্ৰহ্মণা জনিতা ইৎ অসি–অর্থাৎ আপনিই সকল মন্ত্রের জনয়িতা হন। –ইত্যাদি।


তবে দৃষ্টিভেদে বিরুদ্ধ ভাবও প্রদর্শন করা যায়। বেদ থেকেই পরস্পর-বিরোধী দুই মতের প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। বেদ-মন্ত্রেরই ব্যাখ্যান্তরে প্রমাণ করা যায়, –বেদ অপৌরুষেয়; আবার বেদমন্ত্রেই প্রত্যক্ষীভূত হয়–বেদ পৌরুষেয়। কিন্তু আমরা বেদকে যে চক্ষে দেখেছি, তা পুনঃপুনঃ খ্যাপন করেছি। আমাদের মন্ত্ৰার্থই তার প্রমাণ।


প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য–বেদ যে মানুষের রচিত, তা প্রমাণের জন্য পণ্ডিতগণ এ পর্যন্ত বহু গবেষণা প্রকাশ করেছেন। এ পক্ষে ন্যূনাধিক পঞ্চাশটি মন্ত্র প্রমাণস্বরূপ উদ্ধৃত করা হয়। কিন্তু আমাদের মন্ত্রার্থের মধ্যেই আমরা প্রমাণ করেছি, সেগুলির কোনও মন্ত্রেই বেদরচয়িতা ঋষির সম্বন্ধ সপ্রমাণ হয় না।


সুতরাং এ-কথাই স্বীকার্য যে, যাঁরা বেদমন্ত্রগুলির ধারক, অর্থাৎ বেদমন্ত্রের সঙ্গে যে-সব ঋষির নাম উল্লেখিত, তারা সেগুলির দ্রষ্টা, স্রষ্টা নন।


.


০২.


পুরাকালে বেদ একটিই ছিল। ব্রহ্মদত্ত বিপুলায়তন বেদশাস্ত্র কোন ব্যক্তি, এমনকি গোষ্ঠীর পক্ষে মুখস্থ রাখা অত্যন্ত কঠিন ছিল। অথচ সেই আদিমতম কালে, যখন লেখার আবিষ্কারই হয়নি, তখন বিশালায়তন বেদশাস্ত্র মুখস্থ রাখা ছাড়া উপায়ান্তরও ছিল না। (সকলেই জানেন, শ্রবণের দ্বারা অবিকল স্মৃতিগত রাখা হতো বলেই বেদের আর একটি নাম শ্রুতি)। ঋষিদের মধ্যে যাঁর যেমন রুচি ও ক্ষমতা, সেই অনুসারেই নির্দিষ্টসংখ্যক মন্ত্র কণ্ঠস্থ রাখতেন। সুতরাং একত্রে সমগ্র বেদের স্বরূপ সম্পর্কে সম্যক প্রতীতি লাভের কোন উপায় ছিল না। কালক্রমে পদ্মযোনি ব্রহ্মার নির্দেশে শ্ৰীমন্মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন নানা স্তরে নানা ঋষির মধ্যে প্রচলিত বেদমন্ত্রগুলিকে একত্রে সংগৃহীত করেন এবং সেগুলিকে চারভাগে বিভক্ত করে এক একটি শিষ্য বা শিষ্যগোষ্ঠীকে এক একটি বিভাগ প্রদান করেন। (কৃষ্ণদ্বৈপায়ন সেই থেকে বেদব্যাস নামে খ্যাত হন)। সমগ্র বেদের এই চারটি বিভাগীয় রূপ যথাক্রমে ঋক্, সাম, যজুঃ ও অথর্ব নামে অভিহিত হয়। বেদব্যাস তার শিষ্য পৈলকে স্তুতিমূলক মন্ত্রগুলি প্রদান করেন, অর্থাৎ ঋষিবর পৈলের গোষ্ঠীভুক্ত ঋষিবর্গ বংশপরম্পরায় ঋগ্বেদের অন্তর্ভুক্ত মন্ত্রগুলির ধারকরূপে পরিগণিত হন। গীতিরূপ মন্ত্রগুলি লাভ করেন জৈমিনি। এগুলিই সামবেদ সংহিতার অন্তর্ভুক্ত। গীতেষু সামাখ্যা অর্থাৎ যজ্ঞে যে সব মন্ত্র গান করবার জন্য নির্বাচিত ছিল, সেগুলিই সামসংহিতায় বিধৃত। (ব্যাসদেব তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে ও সুমন্তুকে যথাক্রমে যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ প্রদান করেন)।


সামবেদের মন্ত্রগুলি প্রায় সম্পূর্ণতঃই ঋগ্বেদের বা ঋমন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত; অর্থাৎ সামবেদের মোট মন্ত্রের মধ্যে ৭৫টি বাদে অবশিষ্ট সব মন্ত্রগুলিই ঋগ্বেদ থেকে সংকলিত। সুতরাংবলা যায়, ঋগ্বেদের বক্তব্য মোটামুটিভাবে সামবেদেও পাওয়া যায়, অথবা বিপরীতভাবে সামবেদের বক্তব্য ঋগ্বেদের মধ্যেও বিস্তৃত।


প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, বেদকে বিশেষ ক্ষেত্রে ত্রয়ী আখ্যা দেওয়া হয়। আসলে, বৈদিক যজ্ঞে ঋক্‌ সাম-যজুঃ-রই প্রচলন ও প্রয়োজনীয়তা থাকায়, অর্থাৎ যজ্ঞীয় প্রয়োজনের বিচারে, অথর্ববেদকে বাদ রাখা হয়েছে। অনেকে যে বলেন, –অথর্ববেদ অর্বাচীন কালে রচিত, তা ভ্রান্তিমূলক। যেমন, সর্বাপেক্ষা অধিকসংখ্যায় অনুষ্ঠিতব্য সোময়াগে অথর্ববেদীয় ব্রাহ্মণদের প্রবেশই নিষিদ্ধ ছিল। (কারণ মারণ-উচাটন-বশীকরণ ইত্যাদি মানুষের স্বার্থকেন্দ্রিক অশুভ ক্রিয়াগুলি অথর্ববেদীয়গণের কর্ম বলে সর্বশুভঙ্কর যজ্ঞগুলিতে তারা অবাঞ্ছিত ছিলেন)। যজ্ঞে যে চাররকম প্রধান ঋত্বিকের প্রয়োজন–তাদের নাম–অধ্বর্যু, হোতা, উদ্গাতা ও ব্রহ্মা। অধ্বর্যু বা যজুর্বেদ-বিৎ ঋত্বিককে যজমান সর্বাগ্রে বরণ করেন। তিনি শুরু থেকে শেষপর্যন্ত যজ্ঞের সমগ্র আয়োজনের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। সকল যজ্ঞের হোমকর্তা বা হোতা হলেন ঋগ্বেদজ্ঞ পুরোহিত, যিনি অধ্বর্যুর দ্বারা অগ্নিতে আহুতি প্রদানের পর ঋমন্ত্রে দেবতাদের আহ্বান করেন। উদগাতা বা সামবেদজ্ঞ। ঋত্বিক উথ-মন্ত্রে (অর্থাৎ সামগানে) যজ্ঞক্ষেত্র মুখরিত করে তোলেন। ব্রহ্মা বা উপদেষ্টা নামধারী (তিনটি বেদেই অভিজ্ঞ) ঋত্বিক যজ্ঞক্ষেত্রে উপস্থিত থেকে যথাযথ নির্দেশ দান করেন। ঋত্বিকবর্গের এই প্রতিটি বিভাগেও তাদের সহকারীরূপে অপরাপর ঋত্বিক অংশ গ্রহণ করেন। যেমন, অধ্বষুগণে–অধ্বর্যুর সহকারী প্রতিপ্রস্থাতা, নেষ্টা ও উন্নেতা; হোতৃগণে–হোতার সহকারী প্রশাস্তা, অচ্ছাবাক ও গ্রাবস্তোতা; উদগাতৃগণে–উদ্গাতার সহকারী প্রস্তোতা, প্রতিহর্তা ও সুব্রহ্মণ্য; এবং ব্রহ্মগণে–ব্রহ্মার সহকারী ব্রাহ্মণাচ্ছংসী, অগ্নীধ্র ও পোতা। [সায়নাচাৰ্যকৃত সামবেদভাষ্যানুক্রমণিকা দ্রষ্টব্য]। এই তালিকায় অথর্ববেদজ্ঞের কোন স্থান নেই।


তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, বেশ বহুকাল ধরে (অথর্ববেদসহ) চারটি বেদই সেগুলির যথাযথ ধারকবৃন্দের মধ্যে, অর্থাৎ তথাকথিত শিষ্য-প্রশিষ্য পরম্পরায় নানা শাখায় বা সংস্করণে বিভক্ত হয়েছিল। কোন্ বেদটি কত শাখায় বিভক্ত হয়েছিল, সে সম্পর্কে নানা মতভেদ আছে। কূর্মপুরাণে সামবেদের সহস্র শাখা, উক্ত হয়েছে। বিদেশী গবেষকগণের মতে সামবেদের এই শাখা-সংখ্যা চব্বিশ। ডঃ রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মতে, সামবেদের কৌথুম, জৈমিনিয় ও রাণায়ণীয় শাখা যথাক্রমে গুজরাটে, কর্ণাটে ও.মহারাষ্ট্রে প্রচলিত। পূজ্যপাদ লাহিড়ী মহাশয় কৌধুমী, রাণায়ণ, শাট্যমুগ্র, কপোল, মহাকপোল, লাঙ্গালিক ও শার্দুলীয় নামে সামবেদের সাতটি শাখার উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে বঙ্গে কৌধুমী সংস্করণটিই প্রচলিত।


বেদ-সম্পর্কিত এক ইতিহাসকার বলেছেন–ব্যাসদেব জৈমিনিকে যে সামবেদ পাঠ করান, তিনি (অর্থাৎ জৈমিনি) তা তাঁর পুত্র সুমন্তু এবং পৌত্র সুত্বাকে দান করেন। এই পিতা-পুত্র সামবেদের দুটি শাখার উদ্ভাবক। সুত্বার পুত্র সুকর্মা সামবেদকে সহস্র ভাগে ভাগ করেন। সুকর্মার শিষ্যদ্বয় হিরণ্যনাভ (=কৌশল্য) ও পৌষপিঞ্জি এই সহস্র শাখাই অধ্যয়ন করেন। উত্তর দিক থেকে আগত পাঁচশত শিষ্য গুরুবর হিরণ্যনাভের কাছে সামবেদ পাঠ করে উদীচ্য সামগ নামে পরিচিতি লাভ করেন। পূর্বদিক থেকে আগত অবশিষ্ট শিষ্যেরা প্রাচ্য সামগ নামে অভিহিত হন। পৌষপিঞ্জির চারজন শিষ্য-লোগাক্ষি, কৌধুমী, কাক্ষীবান্ ও লাঙ্গলি। এঁরা আবার আপন আপন। অংশ বিভাজিত করে আরও কতকগুলি শাখা সৃষ্টি করেন। হিরণ্যনাভের কৃতি নামধারী এক শিষ্য আবার তাঁর শিষ্যদের মধ্যে নিজের অংশভূত সামগুলিকে চব্বিশভাগে বিভক্ত করে দান করেন। পরে আরও শাখার সৃষ্টি হয়। (আমরা সামবেদের কৌথুমী শাখাকে অনুসরণ করেছি)।


কতকগুলি ঋক্‌ নিয়ে গঠিত এক একটি সূক্ত। অনেকগুলি সূক্তের সমন্বয়ে এক একটি মণ্ডল গঠিত। এমন দশটি মণ্ডলে গঠিত সমগ্র ঋগ্বেদ-সংহিতা। (অবশ্য সূক্ত ও ঋকগুলির বিন্যাসের সহজতম পদ্ধতিতে সমগ্র ঋগ্বেদকে মোট আটটি অষ্টকেও বিভক্ত করা হয়েছে। প্রতি অষ্টকে আবার বর্গ হিসাবেও বিভাজন আছে। যেমন প্রথম অষ্টকে মোট সূক্তের সংখ্যা ১২১, বর্গ সংখ্যা ২৬৫ এবং মোট ঋকের সংখ্যা ১৩৭০, ইত্যাদি)। তেমনই সামবেদে দশটি (বা অনেক স্থলে দশের অধিক) মন্ত্র নিয়ে গঠিত হয়েছে এক একটি দশতি। এমন কতকগুলি দশতি নিয়ে বিগঠিত হয়েছে পূর্ব আর্চিক বা ছন্দ আর্চিক এবং উত্তর আর্চিক। এই দুটির মধ্যবর্তী আর্চিকের নাম মহানাম্নী আর্চিক এবং তাতে একটিমাত্রই দশতি।


.


০৩.


বেদমন্ত্রের পর্যায়বিভাগ প্রসঙ্গে যে-কথা বলা যায়, তা ঋগ্বেদ ও সামবেদ প্রসঙ্গে সমভাবেই প্রযোজ্য। পূজ্যপাদ দুর্গাদাস লাহিড়ী মহাশয় এই বেদমন্ত্রসমূহকে তিনরকম পর্যায়ে বিভক্ত। করেছেন। কতকগুলি মন্ত্র (১) ভগবৎ-মহিমা-জ্ঞাপক (নিত্যসত্য-তত্ত্বমূলক); কতকগুলি (২) প্রার্থনামূলক (ভগবানের নিকট প্রার্থনা-পরিজ্ঞাপক)। আর কতকগুলি মন্ত্র–(৩) আত্ম-উদ্বোধনা মূলক (ভগবৎ-কার্যে আত্মনিয়োগ-সঙ্কল্পসূচক)। সব বেদমন্ত্রই এই তিনটি পর্যায়ের মধ্যে পড়ে– এটাই তাঁর অভিমত। আমাদের মন্ত্রার্থে এই অভিমতই মান্য করা হয়েছে।


নিঘন্টু-নিরুক্ত* মতে–ঋক্ বা মন্ত্র ত্রিবিধা–পরোক্ষকৃতা, প্রত্যক্ষকৃতা ও আধ্যাত্মিকা। বলা হয়েছে–প্রথম পুরুষের বিভক্তি প্রভৃতি যে ঋকে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তা-ই পরোক্ষকৃতা হয়। যেমন, –ইন্দ্রো দিব ইন্দ্র ঈশে পৃথিব্যা ইন্দ্রো অপামিন্দ্র ইৎ পর্বতানাম। ইন্দ্রো বৃধামিন্দ্র ইন্মেধিরাণামিন্দ্রঃ ক্ষেমে যোগে হব্য ইন্দ্র৷৷ প্রচলিত বঙ্গানুবাদ–কি স্বর্গ, কি পৃথিবী, কি জল, কি পর্বত, সকলেরই উপর ইন্দ্রের আধিপত্য আছে। প্রবল ব্যক্তি ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের উপর ইন্দ্রের আধিপত্য। কি নূতন বস্তু লাভ করবার সময়, কিলব্ধ বস্তু রক্ষা করবার কালে, সকল অবসরেই ইন্দ্রের নিকট প্রার্থনা করতে হয়। এই মন্ত্রে কর্তা ও ক্রিয়াপদ প্রথম পুরুষে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে সাধারণভাবে ইন্দ্রদেবের মাহাত্ম্য কীর্তিত আছে। নিঘন্ট-নিরুক্তের মতে এইরকম মন্ত্রকে পরোক্ষকৃতা মন্ত্র বলে। এমন পর্যায়ের মন্ত্রকে (পূজ্যপাদ লাহিড়ী মহাশয়ের মতানুসারে) আমরা ভগবৎ-মহিমাজ্ঞাপক নিত্যসত্য-প্রখ্যাপক মন্ত্র বলেই পূর্বাপর নির্দেশ করেছি। পরোক্ষকৃতা মন্ত্রের উদাহরণে আরও কয়েকশ্রেণীর মন্ত্র নিরুক্তে উদ্ধৃত হয়েছে। তা থেকে বোঝা যায়, দেবতা যেখানে প্রত্যক্ষীভূতা নন, অর্থাৎ দেবতার উদ্দেশে যেখানে মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে বা কাউকেও মন্ত্র উচ্চারণ করতে বলা হচ্ছে, তা-ই পরোক্ষকৃতা মন্ত্র। এই গ্রন্থে এমন বহু মন্ত্র লক্ষণীয়। — প্রত্যক্ষকৃতা মন্ত্র সেগুলি-যেগুলিতে ভগবানকে প্রত্যক্ষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। এ পক্ষে যেখানে মধ্যম পুরুষের বিভক্তি প্রভৃতি প্রযুক্ত, তা-ই প্রত্যক্ষকৃতা মন্ত্র। যথা;–ত্বমিন্দ্র বলাদধি সহসো জাত ওজসঃ। ত্বং বৃষং বৃষেদসি৷ প্রচলিত বঙ্গানুবাদ–হে ইন্দ্র! তুমি বলবীর্য ও তেজঃ হতে জন্মগ্রহণ করেছ, অর্থাৎ ঐগুলিই তোমার উপাদান। হে বর্ধনকারী! তুমিই অভিলাষ-পূরণ; কা। এখানে ভগবান্ যেন প্রত্যক্ষীভূত। এখানে যেন সাক্ষাৎ-সম্বন্ধে তাঁকে সম্বোধন করা হয়েছে। নিরুক্ত-মতে এইরকম মন্ত্রগুলি প্রত্যক্ষকৃতা মন্ত্রের পর্যায়ভুক্ত। আমরা এইরকম মন্ত্রকে প্রার্থনামূলক মন্ত্ৰ-পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করেছি। এই গ্রন্থে এমন বহু মন্ত্র আছে।


তৃতীয় শ্রেণীর যে মন্ত্রগুলিকে নিরুক্তকার আধ্যাত্মিক পর্যায়ের অন্তর্নিবিষ্ট করেছেন, সেগুলি প্রধানতঃ উত্তম পুরুষে প্রযুক্ত। যথা;অহং ভুবং বসুনঃ পূর্বস্পতিরহং ধনানি সং জয়ামি শশ্বতঃ। মাং হবন্তে পিতরং ন জান্তবোহহং দাশুষে বি ভজামি ভোজন৷ প্রচলিত বঙ্গানুবাদ (ইন্দ্রদেব বলছেন) আমি সম্পত্তিসমূহের প্রধান অধীশ্বর-হয়েছি। আমি চিরকালই সকল সম্পত্তি জয় করে নিই। প্রাণিগণ পিতার ন্যায় আমাকে ডেকে থাকে। যে দাতা, আমি ত

**********