শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা (অনুবাদ : দুর্গাদাস লাহিড়ী)

শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা (অনুবাদ ...

দুর্গাদাস লাহিড়ী

শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা (অনুবাদ : দুর্গাদাস লাহিড়ী)

Books Pointer Iconদুর্গাদাস লাহিড়ী
Books Pointer Iconreligious

Posted byবইয়েের খনি15-Jul-2025

Change color

শুক্ল যজুর্বেদ সংহিতা – পূজনীয় পণ্ডিত স্বর্গীয় দুর্গাদাস লাহিড়ী কৃত গ্রন্থ অবলম্বনে সম্পূর্ণ গ্রন্থটির সম্পাদনা ও নবরূপদাতা শ্রীদিলীপ মুখোপাধ্যায় (পৌরাণিকোত্তম) – অক্ষয় লাইব্রেরি – কলকাতা।

(সংস্কৃত অংশটুকু সম্পূর্ণ ‘প্রুফরীড’ করা হয়নি।)


যজুর্বেদ-সংহিতা


[শুক্লযজুর্বেদ — তৈত্তিরীয়-সংহিতা]


ভাষ্যানুক্রমণিকার বঙ্গানুবাদ


সর্বপ্রকার পুরুষার্থসিদ্ধির নিমিত্ত বৃহস্পতি প্রমুখ দেবতাবৃন্দ প্রারম্ভে যে দেবতাকে বন্দনা করিয়া কৃতকৃতার্থ হয়েন, সেই গজাননকে আমি নমস্কার করি।


বেদসমূহ যাঁহার নিশ্বস-স্বরূপ, যিনি বেদ-সমূহ হইতে অখিল জগৎকে নিৰ্মাণ করিয়াছেন, আমি সেই বিদ্যাতীর্থ মহেশ্বরকে বন্দনা করিতেছি।


সেই মহেশ্বরের করুণাপ্রভাবে, তাঁহার স্বরূপ ধারণে অর্থাৎ মহেশ্বরতুল্য প্রভাবশালী হইয়া, মহীপতি বুক্ক, বেদার্থপ্রকাশের নিমিত্ত মাধবাচাৰ্য্যকে (সায়ণাচাৰ্য্যকে) আদেশ করেন।


পূৰ্ব্ব-মীমাংসা, উত্তর-মীমাংসা প্রভৃতি অতি যত্নপূৰ্ব্বক ব্যাখ্যা করিয়া, কৃপালু মাধবাচাৰ্য্য বেদার্থ-প্রকাশে বিনিযুক্ত হইয়াছিলেন।


ব্রাহ্মণ, কল্পসূত্র, মীমাংসাদ্বয় এবং ব্যাকৃতি প্রভৃতি উদাহরণাদি সহকারে ব্যাখ্যা করিয়া তৎসাহায্যে তিনি বেদসমূহের অর্থ স্পষ্টীকৃত করিয়াছিলেন।


যদি বল-বেদ কি? তাহার লক্ষণই বা কি? তাহার বিষয় সম্বন্ধ প্রয়োজন অধিকারীই বা কে? তাহার প্রমাণই বা কিরূপে সিদ্ধ হয় এতৎসমুদায়ের অসদ্ভাবহেতু বেদ ব্যাখ্যানযোগ্য হইতে পারে না। এতদ্বিষয়ে প্রমাণ; যথা-ইষ্ট-প্রাপ্তির এবং অনিষ্ট-পরিহারের অলৌকিক উপায়-পরম্পরা যে গ্রন্থের দ্বারা সম্যক্ বিজ্ঞাপিত হয়, তাহাই বেদ। অলৌকিক পদে প্রত্যক্ষ ও অনুমান উভয়বিধ প্রমাণ অপেক্ষিত হয়। পরিদৃশ্যমান্ কচন্দনবনিতা প্রভৃতি হইতে যে ইষ্ট-প্রাপ্তি এবং ওষধ-সেবনাদি দ্বারা যে অনিষ্ট-পরিহার, তাহা অনুমানসাপেক্ষ। এইরূপ ভবিষ্য জন্মগত সুখাদি ভোগও অনুমানগম্য। কিন্তু তাহাও বলিতে পার না। কারণ, জ্যোতিষ্টোমাদি ইষ্টপ্রাপ্তি-হেতু এবং কলঞ্জভক্ষণাদি-বর্জন অনিষ্ট পরিহারমূলক–বেদের প্রমাণ ভিন্ন সহস্র সহস্র অনুমানের দ্বারাও তার্কিক শিরোমণিও তাহা সিদ্ধান্ত করিতে সমর্থ নহেন। এইজন্য বেদ অলৌকিক উপায়বোধক; কিন্তু তাহা লক্ষণের অতিব্যাপ্তি নহে। এইজন্য উক্ত হইয়াছে–প্রত্যক্ষের এবং অনুমানের দ্বারা যাহার উপায় বা কারণ পরম্পরা বোধগম্য হয় না, বেদের দ্বারা তাহা জানিতে পারা যায় বলিয়াই বেদের বেদত্ব সুসিদ্ধ।


সেই উপায়-পরম্পরা নির্ধারণই বেদের বিষয়ীভূত। বিষয়বোধজ্ঞানই বেদের প্রয়োজন। আর সেই জ্ঞানার্থীই অধিকারী সহিত তৎসমূদায়ের উপকাৰ্য্যোপকারকভাব সম্ভব। যদি বল,–এরূপ হইলে স্ত্রী শূদ্র সহিত সকলেই অধিকারী হইয়া পড়ে। কারণ, অনিষ্ট না হইয়া সকলেরই যাহাতে ইষ্ট সাধিত হয়–সকলেরই তাহাই কামনা। কিন্তু তাহা হইতে পারে না। কারণ, স্ত্রী ও শূদ্রের উপায়বোধসামর্থ্য থাকিলেও হেত্বন্তরের দ্বারা তাহাদের বেদাধিকার নিষিদ্ধ হইয়াছে। উপনীত ব্যক্তিরই অধ্যয়নে অধিকারের বিষয় সপ্রমাণ হয়; কিন্তু স্ত্রী-শূদ্রাদি অনুপনীত বলিয়া বেদাধ্যয়ন তাহাদের পক্ষে অনিষ্টজনক বলিয়াই উক্ত হইয়াছে। সুতরাং কিরূপে তাহাদের বেদজ্ঞান তাহাদের পক্ষে অনিষ্টজনক বলিয়াই উক্ত হইয়াছে। সুতরাং কিরূপে তাহাদের বেদজ্ঞান আয়ত্ৰীকৃত করা সম্ভবপর! পুরাণাদিতেও এতৎসম্বন্ধে প্রমাণ বিদ্যমান। অতএব উক্ত হয়–স্ত্রী, শূদ্র এবং দ্বিজবন্ধু ইহাদের বেদে অধিকার নাই। বেদ ইহাদের শ্রুতিগোচর হওয়াও উচিত নহে। মুনিগণ কৃপাপূর্বক এই বিধান নির্দেশ করিয়াছেন।


এই হেতু উপনীত ত্রিবর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যেরই বেদের সহিত সম্বন্ধ। বোধকত্ব-হেতু তাহার প্রামাণ্য স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু পৌরুষের বাক্যেরও বোধকত্ব প্রতিপাদিত হয়। সৎপুরুষগত ভ্রান্তিমূলত্ব সম্ভাবনায় তৎপরিহার-কল্পে মূল প্রমাণের আবশ্যকতা উপলব্ধি হইয়া থাকে। কিন্তু বেদ সম্বন্ধে তাহা হয় না। কারণ বেদ নিত্য। বক্তৃদোষাশঙ্কার অনুদয় হেতুও বেদের নিত্যত্ব সিদ্ধ। এতৎসম্বন্ধে সূত্র-গ্রন্থে জৈমিনী বলিয়াছেন,-বাদরায়ণকে অপেক্ষা না করিলেও বেদ যে প্রামাণ্য, তাহাতে সন্দেহ নাই। (জৈ.সূ.অ.১পা.১অ.৪সূ.৫)। যদি বল-ব্রহ্মকাৰ্য্য-শ্রবণ হেতু অর্থাৎ দৈবকাৰ্যনিম্পাদক বলিয়া, কালিদাসাদি বাক্যের ন্যায় বেদ পৌরুষেয়;–যেহেতু শ্রুতিতে ঋচঃ সামানি জঞ্জিরে, ছন্দাংসি জঞ্জিরে তস্মাদজুস্তম্মদজায়ত প্রভৃতি বাক্য শ্রুতিতে পরিদৃষ্ট হয়। এই জন্য ভগবন বাদরায়ণ তাঁহার ব্রহ্মসূত্রে শাস্ত্রযোনিত্বাৎ (ব্র.সূ. ১-১-৩) প্রভৃতি সূত্রে ব্রহ্মকেই বেদকারণ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু তাহাও বলিতে পার না। কারণ, তিস্মৃতির নিত্যত্ব স্বতঃসিদ্ধ। শ্রুতিতে বাচা বিরূপনিত্যায়াঃ; এবং স্মৃতিতে অনাদিনিধনা নিত্যা বাগুৎস্পৃষ্টা স্বয়ংভুবা প্রভৃতি বাক্য পরিদৃষ্ট হয়। বাদরায়ণও দেবতাদিকরণে সূত্র করিয়াছেন,-অতএব চ নিত্যত্ব (ব্র.সূ. ১-৩-২৯)। এই সকল বাক্যে পরস্পর বিরোধ উপস্থিত হয়। কিন্তু তাহাও বলিতে পার না। কারণ ব্যবহারিত্ব-হেতু নিত্যত্ব সিদ্ধ। সৃষ্টির পর হইতে সংহারের পূর্ব পর্যন্ত ব্যবহার কাল। তাহাতে বেদের উৎপত্তি এবং বিনাশ পরিদৃষ্ট হয় না। কাল এবং আকাশাদি যেমন নিত্য, বেদও সেইরূপ ব্যবহারকালে, কালিদাসদিবাক্যবৎ পুরুষ-বিরচিত নহে বলিয়া নিত্য। আদি সৃষ্টিকালে, কাল এবং আকাশাদির ন্যায় বেদও ব্রহ্মাসকাশ হইতে উৎপন্ন হইয়াছিল। অতএব বিষয়বেধ বিবক্ষিত হইলেও পরস্পর-বিরোধ সিদ্ধ নহে। ব্রহ্ম-দোষহীন নির্দোষ। বেদ তাঁহারই মুখনিঃসৃত অতএব বক্তৃদোষেরও কোনও সম্ভাবনা নাই। অতএব বেদ স্বতঃসিদ্ধ স্বতঃপ্রমাণ্য এবং ব্রহ্মবস্থিত। সুতরাং লক্ষণ ও প্রমাণ এবং বিষয় প্রয়োজন সম্বন্ধ ও অধিকারী প্রভৃতি সুসিদ্ধ হওয়ায়, বেদের প্রামাণ্য সুস্থিত হইল। অতএব বেদ যে ব্যাখ্যানযোগ্য, তদ্বিষয়ে অনুমাত্র সংশয় নাই। উক্ত বিষয়াদি সুসিদ্ধ হইল বলিয়া বেদাধ্যয়ন বিধি। কার–স্বাধ্যায়োহধ্যেতব্যঃ এইরূপ বিধি রহিয়াছে। কিন্তু যদি বল–পাঠমাত্র অধ্যয়ন-বাচ্য; তদ্বারা অর্থাববোধ বিহিত হয় বলিয়া বেদের ব্যাখ্যা করা অপ্রশস্ত। কিন্তু বিধিবোধপৰ্য্যবসায়িত্ব হেতু তাহাও বলিতে পারা যায় না। ভট্টমতানুসারিগণ কর্তৃক এতদ্বিষয় বহুত্র সপ্রমাণ হইয়াছে। এতদ্বিষয়ে শাস্ত্রোক্তি; যথা–অধীত বিষয়ে সম্যক জ্ঞান না জন্মিলে তাহা কেবল শব্দমাত্ৰে পৰ্য্যবসিত হয়। তাহা বিনাগ্নিতে শুষ্ককাষ্ঠ প্রজ্বালিত করিবার প্রচেষ্টার ন্যায়। তাহাতে যেমন কেহই সমর্থ হয় না; জ্ঞানহীন অধ্যয়নেও সেইরূপ কোনও ফলোদয় হয় না। ভারহীন শকট যেমন বৃথা; বেদ অধ্যয়ন করিয়া তাহার অর্থজ্ঞান না হওয়াও তদ্রূপ। আর যিনি বেদার্থে অভিজ্ঞ, তাহার অধ্যয়ন সফল, তিনি সৰ্ব্বমঙ্গল প্রাপ্ত হন। বেদ-জ্ঞানের দ্বারা পাপ বিধৌত হইলে মোক্ষ প্রাপ্ত হওয়া যায়। নিষ্কারণ-ধর্ম ষড়ঙ্গ বেদ অধ্যয়ন করা এবং তৎসম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা ব্রাহ্মণের কৰ্ত্তব্য। তাহা না হইলে জ্ঞানকে পৃথক রাখিয়া বেদ অধ্যয়ন করা পাঠমাত্ৰে পৰ্য্যবসিত হয়। শঙ্করদর্শনের অনুসারিগণ বেদকে অস্তু নাম ইত্যাদি রূপে বর্ণন করেন। কিন্তু যজ্ঞের বিধি-সমূহের অনুসারী যে অনুষ্ঠান, তদন্যথায় সিদ্ধ হয় না। তাই বেদার্থজ্ঞা না জন্মিলে তদনুষ্ঠান বিধেয় নহে। কিন্তু পূর্বোক্ত বিধিবল-হেতু উচ্চারণ-মাত্র স্বতন্ত্র কোন বিষয় সূচিত হয়। তাই অনুষ্ঠানজ্ঞানের স্বতন্ত্র পৃথক ফলের বিষয় শ্রুত হইয়াছে; যথা,–যাহার অনুষ্ঠানজ্ঞান জন্মিয়াছে, তিনি সকল পাপ হইতে বিমুক্ত হন; এমন কি, অস্বমেধ দ্বারা যজ্ঞ করিলে ব্রহ্মহত্যা পাতকও নষ্ট হয়। সুতরাং যদি বলিতে চাও–অল্প-প্রয়াসসাধ্য অনুষ্ঠানের দ্বারা যদি তাহা সিদ্ধ হয়, তাহা হইলে কি বহু আয়সসাধ্য অনুষ্ঠানে তাহা ব্যর্থ হইবে! কিন্তু তাহাও বলিতে পার না। কারণ, মানস ও বাঁচিক ভেদে ভরণীয় ব্রহ্মহত্যার তারতম্য প্রখ্যাপিত হয়। ব্রহ্মহত্যা বহুবিধা। মনের দ্বারা সঙ্কল্পিত, বাক্যের দ্বারা অনুজ্ঞাত, অপরের দ্বারা কৃত, স্বয়ংকৃত, পুনঃপুনঃ কৃত-ইত্যাদি তারতম্যে ব্যবস্থারও তারতম্য আছে। স্বর্গ যেমন বহুবিধ, তেমনি ব্রহ্মহত্যাপাতক হইতে নিম্মুক্তিলাভ বহুরূপে কল্পিত। স্বর্গকাম ব্যক্তি অগ্নিহোত্র যজ্ঞের অনুষ্ঠান করিবে, স্বর্গকাম ব্যক্তি দশপূর্ণমাস যাগসমূরে অনুষ্ঠান করিবে, স্বর্গকাম ব্যক্তি জ্যোতিষ্ঠোম যজ্ঞ সম্পন্ন করিবে–ইত্যাদি বাক্যে উচ্চাচ্চ কৰ্ম্মের দ্বারা একবিধ ফল প্রাপ্তি অসম্ভব বলিয়া স্বর্গের বহুবিধত্ব সূচিত হয়। অপচি, কৰ্ম্মানুষ্ঠানকালে যে বেদন বা জ্ঞান হয়, সেই কর্মের ফল অতিশয়িতরূপে উপজিত হইয়া থাকেন। উভৌ কুরুতে যশ্চৈতদ্দেবং বেদশ্চন বেদ ইত্যাদি বাক্য বেদাভিজ্ঞ এবং বেদে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পৰ্য্যায়ক্রমে বলিয়া থাকেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যথার্থজ্ঞানে যাহা অনুষ্ঠিত হয়, তাহাই অধিকতর বীৰ্য্যসম্পন্ন হইয়া থাকে। মনীষিগণের ইহাই অভিমত। প্রশ্ন করিতে পার–অঙ্গ উপস্থি প্রভৃতি ইহার বিষয়ীভূত হইতে পারে না কি? উত্তরে বলিব-না, তাহা হইতে পারে না। কারণ-ন্যায়ের সমানত্বই তাহার হেতু। পূর্বোক্ত বাক্যাদির অর্থোপলব্ধি বিষয়ে উদ্বলক লিঙ্গাদিও বিষয়ীভূত বলিয়া মনে করিতে হইবে। প্রজাপতি প্রথমে সোমযাগ অগ্নিহোত্র পৌর্ণমাস অমাবস্য প্রভৃতি নামক পরস্পর উচ্চাবচ্চ যজ্ঞাদি সৃষ্টি করেন। তারপর সোম্যগ ও অগ্নিহোত্রাদি শ্রেষ্ঠতর অগ্নিষ্ঠোম, উকথ্য, অতিরাত্র প্রভৃতি ক্রমানুসারে পরস্পর উচ্চাচ্চ যাগসমূহের সৃষ্টি করিয়া প্রথম-সৃষ্ট অগ্নিহোত্রাদি যাগে অভিমান-বিশেষের দ্বারা উভয় ১ বর্গকে তুলিত করিয়া ব্যবস্থিত করিয়াছিলেন। এই বৃত্তান্ত যিনি অবগত আছেন, তিনি তাঁহার অনুষ্ঠিত অগ্নিহোত্রাদি যজ্ঞে অগ্নিষ্ঠোমাদি যজ্ঞের ফল প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। তৎসম্বন্ধে ব্রাহ্মণে সূত্রিত হইয়াছে; যথা–প্রজাপতি অগ্নিহোত্র, অগ্নিষ্ঠোম, পৌর্ণমাস, উকথ্য-অমাবস্য, অতিরাত্র প্রভৃতি যজ্ঞসমূহকে সৃষ্টি করিয়াছিলেন। যেমন অগ্নিহোত্র, সেইরূপ অগ্নিষ্ঠোম; যেমন পৌৰ্ণমাসী, সেইরূপ উকথ্য; অমাবস্যা যেরূপ, অতিরাত্র সেই প্রকার বিদ্বজ্জন অগ্নিহোত্র-যাগে অগ্নিষ্ঠোমের ফল অধিগত করিতে পারেন এবং অপরকেও সেইরূপ ফল প্রদানে সমর্থ হয়েন। এইরূপ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি অমাবস্যার অনুষ্ঠান অতিরাত্রের ফল স্বয়ং প্রাপ্ত হন এবং অপরকে সে যজ্ঞের অংশভাগী করিয়া থাকেন ইত্যাদি। এইরূপ বেদনার বা ফলসিদ্ধ-জ্ঞানের স্বতন্ত্র ফল সৰ্ব্বত্র প্রদর্শিত হইয়াছে। সেই ফলসিদ্ধত্ব-হেতু লিঙ্গত্ব সিদ্ধ; অপিচ তত্তদ্বিধিসমপে য এবং বেদ ইত্যাদি বচন-সমূহের বিজ্ঞান হইতে ফল শ্রুত হয়। সে সকল যদি অর্থবাদ হয়–এরূপ আশঙ্কাও হইতে পারে। এস্থলে নাম কল্পনা করিয়া লইলে, বিধেয়ার্থের প্রশংসাপরত্ব-হেতু অর্থাৎ যথার্থ অর্থের শ্রেষ্ঠত্ব নিবন্ধন, অজ্ঞানজনিত ঐ সকল বচনের অন্যার্থ-প্রকাশ অপরাধজনক বলিয়া স্বীকৃত হয়। সেইজন্য যাহা পর শব্দ তাহাই শব্দার্থ এই ন্যায়ে স্বার্থে প্রামাণ্য স্বীকৃত হইতে পারে না। কিন্তু তাহাও বলিতে পারা যায় না। কারণ, তাহাতে প্রমাণান্তর বাধিত হয়। দ্বিঃ সংবৎসরস্য সস্যঃ পচ্যতে অর্থাৎ দুই বৎসরের শস্য নষ্ট হইতেছে প্রভৃতি বাক্যের যে অর্থবাদ, তাহাতে বাধার অভাব না হইলেও অনুবাদত্ব হেতু স্বার্থে প্রামাণ্য স্বীকার করা যায় না। বেদনফল যে বচন-সমূহ, তাহাও অনুবাদক নহে। অর্থবোধেও তাহাতে কোনও বিঘ্ন ঘটে না। অতএব অর্থবাদত্ব বিদ্যমান থাকিলেও প্রকৃত পক্ষে স্বার্থে প্রামাণ্য সিদ্ধ হয়। নচেৎ, মন্ত্ৰার্থবাদাদি হইতে দেবতাদির বিগ্রহাদিমত্ব সিদ্ধ হইতে পারে না। এতৎসম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে, বিরোধ-ক্ষেত্রে গুণবাদ, আর নিশ্চিত-পক্ষে অনুবাদ সিদ্ধ। ভূতার্থবাদ এবং তাহা হইতে অর্থবাদ–এই ত্রিবিধ মত স্বীকৃত হয়।


বহুভাবে বিদ্যমান-হেতু এবং বেদনমাত্র হইতে অপূৰ্ব্ব মত বেদনজন্য বেদের ব্যাখ্যা অবশ্য কৰ্ত্তব্য। ইষ্টপ্রাপ্তি এবং অনিষ্ট-পরিহারোপায়–বেদের যে বিষয়-পরম্পরা সামান্যতঃ নির্দিষ্ট হইয়াছে, তৎসমুদায় এক্ষণে সৃষ্টীকৃত হইতেছে। বেদসমূহ কাণ্ডদ্বয়াত্মক। পূৰ্ব্ব কাণ্ডের প্রতিপাদ্য– নিত্য, নৈমিত্তিক, জন্য ও নিষিদ্ধ এই চতুর্বিধ কৰ্ম্ম। দৃষ্টান্ত যথা, নিয়ত

**********