গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প

গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প

Books Pointer Iconসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
Books Pointer Iconshort story

Change color


ওরা আসে নিশুতি রাতে। প্রতি অমাবস্যায়।


তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিক শুনশান অদৃশ্যা মনে হয় এখানে কেউ বেঁচে নেই, কোনো বাড়িঘর নেই। বাতাসে গাছের ডগাগুলো কাঁপে, বাঁশবনে একটা বাঁশের সঙ্গে আর একটা বাঁশের ঘষা লেগে শব্দ হয় কর-র-র কর, কর-র-র কর! লিচু গাছে ঝাঁক বেঁধে বসে বাদুড়, দু’একটা প্যাঁচা খ্যারখেরে গলায় ডাকে, পাঁচলা মোড়ের বড় অশথ গাছটায় একটা তক্ষক ঠিক সাতবার তকখোতকখো করে ঐ তক্ষকটা নাকি সাড়ে তিনশো বছর ধরে বেঁচে আছে।


সেই সময় ওরা আসে। ঝুমঝুম ঝুমঝুম শব্দের সঙ্গে লণ্ঠনের আলোয় কাঁপতে থাকে কয়েকটা ছায়া।



তখন শোনা যায় খকর খক করে কোনো পুরোনো রুগীর কাশির শব্দ, দু’একটা শিশু তেড়ে কেঁদে ওঠো তখন বোঝা যায়, এই অন্ধকার-ঢাকা নিস্তব্ধ ভূমিতেও মানুষের জীবন বহমান।


দু’একটা জানলা খুলে যায়। দাওয়ায় এসে দাঁড়ায় কয়েকটি ছায়ামূর্তিা আলো ও ঝুমঝুম শব্দ কাছে এগিয়ে আসে তারা পাঁচলা মোড়ের অশথতলায় থামো।


মোট এগারোজন উঠতি বয়েসের ছেলে। তাদের সঙ্গে দুটি লণ্ঠনা দু’জনের হাতে দুটি বর্শা, চারজনের পায়ে ঘুঙুর বাঁধা। লণ্ঠন দুটো মাটিতে রেখে তারা প্রথমে শীত কাটাবার জন্য হাতে হাত ঘষে, শরীরের যেখানে সেখানে ধপাধপ করে চাপড়ে মশা মারে। তারপর তারা সকলে মিলে বিকট মোটা গলায় একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে


হে রে রে রে রে রে রে

জাগো রে, গ্রামবাসিগণ জাগো রে।


পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ এই চারদিকে ফিরে ফিরে তারা চারবার হুঙ্কার দেয় একরকম তারপর অন্যরা গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়ালে তার মধ্যিখানে এসে ঘুঙুর পরা চারজন পা ঝুমঝুমোয়া সবাই তালে তালে হাততালি দেয়। হঠাৎ শুরু হয়ে যায় গান



ভূত কিনিতে এয়েছি ভাই ভূত কিনিতে এয়েছি

ভূতের তেলে ওষুধ হবে স্বপ্ন আদেশ পেয়েছি।

বিপিন খুড়োর নতুন কলে

তুলসীপাতা গঙ্গাজলে

ভূতের কেঠো হাড়ের গুঁড়ো মিশায়ে রস খেয়েছি

ভূত কিনিতে এয়েছি ভাই ভূত কিনিতে এয়েছি।


তাদের সেই তারস্বরে গান ও ঘুঙুরের শব্দে অশথগাছের কয়েকটি কাক হঠাৎ ঘুম ভেঙে কা কা-কা করে ওঠো দু’তিনটে শেয়াল ছুটে পালায়। কাছেই কোনো বাড়ির দাওয়ায় তামাক টানার মটমট শব্দ শোনা যায়।


ওরা আবার গায়

ভূতের নাতি ভূতের পুতি বুড়ো হাবড়া ছোঁড়াছুঁড়ি

যেমন তেমন ভূত পেলে ভাই হবে না আর ছাড়াছাড়ি।

মামদো ভূত বা ব্রহ্মদৈত্যি

দেখাও যদি তিন সত্যি

দশটি করে টাকা পাবে হাতে হাতে দোকানদারি

সেই টাকায় খাও মণ্ডা মিঠাই করে সবে কাড়াকাড়ি।

ভূত জিনিতে, ও ভাই ভূত জিনিতে

ভূত কিনিতে, ও ভাই ভূত কিনিতে

ভূত জিনিতে এয়েছি ভাই ভূত কিনিতে এয়েছি

ভূতের তেলে ওষুধ হবে স্বপ্ন আদেশ পেয়েছি।

দশ টাকা! দশটাকা! দশ টাকা!

এক এক ভূত দশটাকা! হাতে হাতে গরমাগরম। দশটাকা।



গান শেষ করার পরও নাচ থামতে চায় না। বিশেষত বেঁটে নিতাইয়ের। সে নাচতে ভালোবাসে। সুরেন্দ্র তার দিকে একটা বিড়ি এগিয়ে দিয়ে বলে, নে, খা। তখন নিতাই থামে। সুরেন্দ্রর বুকখানা লোহার দরজার মতন। মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, হাতে একটা বর্শা। তার চোখে মুখে বেশ একটা তৃপ্ত ভাবা গানখানি সেই বেঁধেছে কিন্তু নিজে গাইতে পারে না। অন্যরা যখন গায়, তখন সে হাততালি দেয় চোখ বুজে।


আর একটা বর্শা বিনোদের হাতে সে বর্শাটিকে পতাকা দণ্ডের মতন সামনে ঝুঁকিয়ে ধরে আছে। সেই বর্শার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটি জন্তু জন্তুটা একবার ছটফট করতেই বিনোদ বলে, আরে শালা, এখনো তেজ যায়নি।


বর্শাটা ঘুরিয়ে সে জন্তুটাকে একবার মাটিতে আছড়ায়। ঝনঝন করে শব্দ ওঠে।


সকলে বিড়ি ধরিয়ে একটু বিশ্রাম নেয়। এর পরের গান হবে মালো পাড়ায় বটগাছের নীচে।


সুরেন্দ্র রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে হাঁক মারে, ও পবন ঠাউদ্দা, জেগে আছো নাকি?


যে বাড়ির দাওয়া থেকে তামাক টানার মটমট শব্দ আসছে, সেখান থেকে উত্তর আসে আছি রে! আয়, আয় ইদিকে!



পবনের বয়েস চার কুড়ি, পাঁচ কুড়ি তা সে নিজেই জানে না। শরীরটা বেঁকে গেছে। সব ক’খানা হাড় পরিষ্কার গোনা যায়। তার পাঁচ ছেলের মধ্যে তিনজন মারা গেছে, দুটি নাতিও গত হয়েছে কিন্তু পবনের আর যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।


সবাই এসে ঐ দাওয়ায় বসে লণ্ঠন দুটো নামিয়ে রাখে পাশে যে যে নেচেছিল, এই শীতের মধ্যেও তাদের গায়ে চকচক করে ঘাম।


নিতাই জিজ্ঞেস করে, জলের কলসীটা কোথায়, ঠাকুদ্দার বাইরে আছে নাকি?


পবনের ছোট ছেলে নিবারণও উঠে এসেছে চোখ মুছতে মুছতে সে এক ঘটি জল নিয়ে আসো নিতাই আলগোছে টাগরা ভিজিয়ে প্রায় অর্ধেকটা জল শেষ করে দেয়। নিবারণের ছেলেমেয়ে দুটো দরজার পাশ থেকে কুতকুত করে চেয়ে দেখো


পবন একবার কোটা পাশে নামিয়ে রাখতেই বিনোদ সেটা তুলে নিয়ে টান মারে। তারপরই মুখবিকৃতি করে বলে, এ রাম রাম! এটা কি ঠাউদ্দা? একি তামাক?


পবন ফোকলা দাঁতে ফ্যাকফ্যাক করে হাসে খুব মজা পেয়েছে সে।



নিতাইয়ের পাশে বসা ঘনাই বললো, কেন, কি হয়েছে? দেখি তো?


ঘনাইও হুঁকোতে টান মারে, সঙ্গে সঙ্গে ওয়াক থু থু করে ওঠে।


পবন হাসতে হাসতে বলে, তোরা পারবি না। একেলে ছেলে তো আমার সহ্য হয়।


—এ তো তামাক নয়, এটা কী খাচ্ছো তুমি?


—তামাক পাবো কোথায়? তামাকের দাম কত জানিস? আমার ছেলে আমাকে তামাক কিনে দেবে? একটা পয়সা ঠেকায় না!


—তবে কল্কেতে তুমি কী ভরেছো?


—অনেক কালের তামাক টানা অভ্যেস, না মলে যাবে না তামাক পাই না, তাই শুকনো আমপাতা আর একটুখানি গোবর দিয়ে মশলা তৈরি করেছি। আমার তো বেশ লাগে।


—অ্যাঁ! থুঃ! অভক্তি!



তামাকের বদলে দুজনকে গোবর খাইয়ে খুব হাসতে থাকে পবন।


নিবারণ তার বাপের উদ্দেশে বলে, মরণকালে বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে একেবারে!


নিতাই আর ঘনাই কয়েকটা চোখাচোখা গালাগাল দেয়া নিবারণের ছেলেমেয়ে দুটি দরজার পাশ থেকে হিহি করে হাসে।


পবন অন্যদের মন্তব্য অগ্রাহ্য করে। কিন্তু ছেলের উদ্দেশে বলে, মরার খোঁটা দিচ্ছিস কেন রে? আয়ু যখন ফুরোবে, তখন মরবে।! তার আগে কথা কী?


নিবারণ বললো, ফের যদি তোমাকে গোবর নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করতে দেখি—


সুরেন্দ্র মাঝখানে বাধা দিয়ে বললো, আহা থাক। এই নাও ঠাউদ্দা, একটা বিড়ি খাবা নাকি?


পবন বিড়িটা খপ করে তুলে নিয়ে বললো, বেঁচে থাক, বাবা। ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লাভ হোক। আর একটা বিড়ি দিবি? কাল সকালে খাবো।



সুরেন্দ্র জিজ্ঞেস করলো, ঠাউদ্দা, ভূত-টুতের সন্ধান পেলে না একটাও? তুমি তো জানতে অনেক?


পবন বললো, জানতাম তো দেখিছিও কতা নিজের চোখে দেখিছি। বাড়ির কাছে, এই পাঁচলা অশথতলায় পেত্নী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিছি। একবার পড়েছিলাম মেছোভূতের পাল্লায়। হিজলমারির বিল থেকে মাছ ধরে নে আসছি। অমনি সেই শালা ভূত আমার পেছু নেছে। দু’কদম যাই আর সে বলে, মাঁছ দে না—ও বন, মাঁছ পেঁ নাঁ—তারপর দেখি একটা না তিনডে ভূত, শেষমেষ আমি মাছ ফেলে-ফালে দে দৌড়–


—তা একটা ভূত ধরে দিতে পারলে না?


—এখন তো আর দেখি না তোদের দেখলি বোধ হয় ভয় পায়। এই তো পরশুদিন সন্ধ্যেবেলা আমি এই দাওয়ায় বসে বসে হুঁকো টানছি, দেখি কি, গোয়ালঘরের পাশ দিয়ে লাল বেনারসী শাড়ি পরা এক বউ পিদিম হাতে নিয়ে পুকুরঘাটের দিকে যাচ্ছে। পষ্ট দেখলাম আমি ডাকলাম, ও মা, তুমি কে? কোথায় যাও? তা কোনো সাড়াও দেয় না।


—সে তুমি নিবারণকা’র বউকে দেখেছো।



—হা আমার পোড়া কপাল! আমার ছেলের বউ বেনারসী শাড়ি পাবে কোথায় রে ছোঁড়া! তার একখানাও জ্যান্ত শাড়ি আছে কিনা সন্দেহা এ দেখলাম এক সোন্দর বউমানুষ, গা-ভর্তি গয়না


—দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরলে না কেন?


—আমার কি পায়ে সে জোর আছে? নেবারণও তখন বাড়িতে ছেলে না—আমি তারে দুবার। ডাকতে না ডাকতেই চোখের সামনে অদিরিশ্য হয়ে গেল। হ্যাঁরে সুরেন, সত্যিই ভূত ধরলে তুই দশ টাকা দিবি?


—নিশ্চয়ই দেবো। পকেটে টাকা নিয়ে ঘুরছি। নগদানগদি দাম পাবে।


পবন তার ঘোলাটে চোখ মেলে নিজের ছেলের দিকে তাকায় লোভগলায় ঝামটা দিয়ে বলে, একটু বনবাদাড়ে ঘুরলেও তো পারিস নগদা নগদি দশ টাকা এই বাজারে কে দেয়? দশখানা তাগড়াই মানকচুরও দশ টাকা দাম ওঠে না। হাত খালি, বসেই তো আছিস।


নিবারণ বললে, তুমি চুপ করো। ভূত আবার ধরা যায় নাকি? আমি কোনোদিন ভূত দ্যাখলামই না এখন পর্যন্ত!



পবন বিড়বিড় করে বললো, চোখ থাকলেই দেখা যায়। এ গেরামে মোট সতেরোডা সতেরো রকমের ভূত আছে, আমি নিজের চক্ষে দেখিছি। এক-একটা দশটাকা, কম কথা?


বিনোদের বর্শার সঙ্গে বাঁধা প্রাণীটা আবার নড়ে-চড়ে উঠলো।


নিবারণ চমকে উঠে বললো, ওটা কি?


বিনোদ বললো, ওটা একটা শ্যাজা। ওলাইচণ্ডীতলার সামনে রাস্তার ওপর দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল, বর্শা দিয়ে গিঁথে ফেললাম। কড়া জান শালার, এখনো মরে নি।


নিবারণের ছেলেমেয়ে দুটি এবার দরজার কাছে দৌড়ে দৌড়ে এলো শজারুটাকে দেখতে বড় বড় কাঁটাগুলো ফুলিয়ে মাটির ওপরে থুবু হয়ে বসে আছে শজারুটা মেয়েটির পরনে একটা ইজের ছেলেটি একেবারে ন্যাংটা। নিবারণ ওদের তাড়া দেয়, যা ঘরে যা, যা! মেয়েটির বয়েস তেরো। সে দুহাত আড়াআড়ি করে রেখেছে বুকের ওপরে এক পলক শজারুটাকে দেখে নিয়ে সে ভেতরে চলে গেল। ছেলেটি নড়লো না।



নিবারণ জিজ্ঞেস করলো, কী করবি এটাকে নিয়ে?


বিনোদ বললো, কেটে মাংস খাবো।


–জ্যান্ত রাখতে পারলে বিককিরি করতে পারতি, ভালো দাম পেতি।


–জ্যান্ত শ্যাজা ধরা কি সোজা কথা? কলাগাছের খোল থাকলে হতো তা তখন পাই কোথায়? শালা এখনও নড়াচড়া করছে, কিন্তু বেশীক্ষণ আর বাঁচবে না। পেটটা এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছি।


–শালারা আমার ওঠোনের কচুগাছের তলা খুঁড়ে খেয়ে যায়। কখন আসে, টেরও পাই না। এক একদিন শেষরাতে ঝমঝম শব্দ শুনি, উঠে এসে আর দেখি না।


—ভূত ধরার ঠেঙে শ্যাজা ধরা সোজা, তাও পারিস না?


পবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। শজারুর মাংসের ভারি চমৎকার স্বাদা লাল লাল মাংস, কত নরম, আর তেলে ভরা। ইস, কতকাল সে মাংসই খায় নি এখান থেকে বিনোদের বাড়ি প্রায় ক্রোশখানেক দূরে। কাল দুপুরবেলা যদি হেঁটে হেঁটে যাওয়া যায়, গিয়ে বলবে, অ বিনোদ, একটু মাংস চাখতে এলাম তাহলে কি আর দেবে না একটু?


কথায় কথায় বেশ সময় গেল। সুরেন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে বললো, চলো এবার যাওয়া যাক। ঠাউদ্দা, তুমি কাছাকাছি বাড়ির সব লোকেদের ডেকে বলল, ভূত খুঁজে দেখুক, এক এক ভূত দশ টাকা ধরতেও হবে না, দেখিয়ে দিলে আমরাই ধরে নেবো, কিন্তু একেবারে চোখের সামনে স্পষ্ট দেখিয়ে দিতে হবে।


—ভূত কিনে তুই কী করবি রে? সত্যিই ভূতের তেল হয়?


সুরেন্দ্র মুচকি হেসে বললো, দেখই না কী হয়। কত লোকের কত রোগ সারিয়ে দেবো।


—তোর জন্য আমার ভয় হয় রে। শেষে তুই-ও ভূতের হাতে মারা যাবি। ওনাদের রাগ তো জানিস না, কোনোদিন বাগে পেলে তোর ঘাড়টা মটকে দেবো।


সুরেন্দ্র হা-হা করে হাসে। কিছুদিন আগে হলেও সে সদর্পে অনেক কথা বলতো। বুক চাপড়ে জানিয়ে দিত, কোনো ভূতের বাপের সাধ্য নাই তার ধারে কাছে আসে। কিন্তু এখন আর সে ওসব কিছু বলে না। ফাদার পেরেরা তাকে নিষেধ করে দিয়েছেন। কথায় শুধু কথা বাড়ে।


পবন আবার বললো, তোর বাপকেও ভূতে ঘাড় মটক

**********