
সুখের কাছে
বুদ্ধদেব গুহ
১
চাঁদের আলোয় দু’পাশের এবড়োখেবড়ো রুক্ষ প্রান্তর, দূরের ধুঁয়ো ধুঁয়ো পাহাড়, কাছের জঙ্গল সমস্ত মিলিয়ে একটা রাত্রিকালীন অপরিচিতিজনিত গা—ছম—ছম অস্বস্তির সৃষ্টি করেছে।
মহুয়ার ঘুম পেয়ে গেছে। সেই সকালে কলকাতা থেকে বেরুনোর পর তিনশো মাইলেরও বেশি গাড়িতে এসেছে ওরা।
দিনে বেশ গরম ছিল। মার্চের শেষ। ক’টার সময় যে পৌঁছোবে সে কুমারই জানে। মনে মনে কুমারের উপর বিরক্ত হয়ে উঠেছে মহুয়া।
বহুক্ষণ হয়ে গেছে—কোনো লোকালয়, জনমানব চোখে পড়েনি। রাস্তাটাও কাঁচা। কোথায় চলেছে ওরা কিছুই বোঝার উপায় নেই এখন।
একটু আগেই দুটো শেয়ালকে দেখেছে রাস্তা পেরুতে। জানালার নামানো কাচ দিয়ে হাওয়ার সঙ্গে এক এক ঝলক মিষ্টি গন্ধ আসছে। কীসের গন্ধ মহুয়া জানে না। জানতে ইচ্ছা করছে।
সামনেই একটা হেয়ারপিন বেন্ড। কুমার গাড়ি চালাচ্ছিল। কুমারের পাশে সান্যাল সাহেব। পিছনের সিটে মহুয়া। মহুয়ার পাশে টুকিটাকি—জলের বোতল, সন্দেশের বাক্স, ডালমুট এই—ই সব।
মোড়টা ঘুরেই, গাড়িটা হঠাৎ প্রচণ্ড আওয়াজ করে বন্ধ হয়ে গেল। অনেকক্ষণ থেকেই ইঞ্জিনটা ধাক্কা দিচ্ছিল—কিন্তু এ শব্দটা বনেটের নীচ থেকে এল না। মনে হল, গাড়ির চেসিসের নীচ থেকে এল। বন্ধ হতে হতেও, গতিতে ছিল বলেই অনেকটা এগিয়ে যাবার পর গাড়িটা থামল।
কুমার স্টিয়ারিং বাঁদিকে কাটিয়ে একটা গাছের নীচে রাস্তার পাশে দাঁড় করাল গাড়িটাকে।
মহুয়া উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠল, কী হল? সাংঘাতিক কিছু নিশ্চয়ই!
সান্যাল সাহেব পাইপ মুখে ভুরু তুলে কুমারের দিকে তাকালেন।
কথা বললেন না কোনো।
কুমারের প্রোফাইল দেখা যাচ্ছিল পেছন থেকে। একটা উঁচু কলারের কালো—সাদা খোপ—খোপ টেরিকটের জামার আড়ালে বৃষ্টিতে ভেজা কাকের মতো রোগা গ্রীবা, একমাথা হিপিদের মতো চুল—ছ’ইঞ্চি সাইড—বার্ন—তীক্ষ্ন নাক।
কুমার কথা না বলে, দরজা খুলে নেমে, বনেট তুলে, টর্চ জ্বেলে এটা—ওটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল।
সান্যাল সাহেবও নামলেন।
সামনে বনেটটা তুলে দেওয়াতে এখন কাচটা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেল। সামনে আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।
মহুয়া পথের দু’দিকে তাকাল।
এতক্ষণ গাড়ি চলছিল বলে গাড়ির আওয়াজে, গতির মত্ততায় এবং গন্তব্য পৌঁছোনোর একাগ্রতায় শুধু সামনের দিকেই চেয়ে বসেছিল ও। গাড়ির চলার শব্দে নিজেদের মধ্যের টুকিটাকি কথার মধ্যেই ডুবে ছিল। বাইরে যে একটা চন্দ্রালোকিত এবং অত্যন্ত সুখপ্রদ রাত জেগে ছিল, সেই রাতের কোনো অস্তিত্বই ছিল না ওর কাছে।
গাড়িটা থেমে যাওয়াতে এবং হেডলাইট নিবিয়ে দেওয়ার পর চাঁদের আলোয় এই জংলি পাহাড়ি পরিবেশের আসল রূপ স্পষ্ট হল।
কতরকম রাত—চরা পাখি চমকে চমকে আবছায়া প্রান্তরে ডেকে ফিরছে। আলতোভাবে ঝিঁঝির আওয়াজ ভেসে আসছে দূর থেকে। আরও কতরকম ফিসফিসানি উঠছে হাওয়ায় হাওয়ায়। শুকনো পাতা গড়িয়ে যাচ্ছে পাথরের বুকে—একটা অপার্থিব সড়—সড় শব্দ উঠছে। আরও কতরকম শব্দ ও গন্ধ। মহুয়া অবাক হয়ে বাইরে চেয়ে রইল।
কুমার তার বাবার সহকর্মী। একই সাহেবি কোম্পানিতে কাজ করেন দুজনে। মহুয়া নিজেও একটা সাহেবি কোম্পানির রিসেপশনিস্ট। কলকাতায় তাদের ফ্ল্যাটে কুমার এসেছে, ও—ও গেছে কুমারের ফ্ল্যাটে বাবার সঙ্গে। ও যেখানে—যেখানে গেছে সেইসব জায়গায়—এ—পার্টিতে ও পার্টিতে, ক্লাবে গেট—টুগেদারে কুমারের সঙ্গে দেখা হয়েছে।
কুমারের সঙ্গে আলাপ সান্যাল সাহেব অথবা মহুয়ার কারোই বেশিদিনের নয়। বলতে গেলে কুমারের পীড়াপীড়িতেই দোলের আগে সান্যাল সাহেবরা দিনকয়েকের ছুটি নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন—পালামৌর বনজঙ্গল দেখতে।
এ—এ—ই—আই থেকে ইটিনিরারি নেওয়ার কথা বাবা তুলেছিলেন কিন্তু কুমার বলেছিল যে, এসব অঞ্চল তার হাতের রেখার মতো মুখস্থ। কিন্তু কী করে যে ওরা এতখানি পথ সুন্দর মসৃণ পাকা রাস্তায় আসার পর হঠাৎ এমন কাঁচা রাস্তায় এসে পড়ল মহুয়া বুঝতে পারছে না। ওর মন বলছে, ওরা নিশ্চয়ই রাস্তা ভুল করেছে। রাস্তা যে ভুল করেছে এ—বিষয়ে মহুয়ার কোনোই সন্দেহ নেই। কারণ কুমার বেশ কিছুক্ষণ হল মোটেই কথাবার্তা বলছে না। অথচ সারা রাস্তা কথার ফুলঝুরি ফোটাতে ফোটাতে আসছে ও।
এই সাহেবি কোম্পানিতে ঢোকার আগে কুমার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে ছিল। সেখানকার অভিজ্ঞতা, মুসৌরী পাহাড়ে তাদের ট্রেনিং সেন্টারে পোলো খেলার কথা, ইত্যাদি—ইত্যাদি নানারকম গল্প। সত্যি কথা বলতে কি, ওর এই বকবকানি শুনতে শুনতে মহুয়া এই দশ—বারো ঘণ্টায় বেশ বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে উঠেছে। হয়তো সান্যাল সাহেবও হয়েছেন। কারণ তিনিও বেশ অনেকক্ষণ হল কোনো কথাই বলছেন না।
মহুয়ার ভেবে আশ্চর্য লাগছে যে, শহরে কারও সঙ্গে বহু বছরের আলাপ থাকলেও তার সম্বন্ধে বা তাকে যতখানি না জানা যায়, তার সঙ্গে বাইরে বেরোলে তাকে আট—দশ ঘণ্টার মধ্যেই অনেক বেশি জানা হয়ে যায়।
সান্যাল সাহেব একবার মহুয়ার জানলার কাছে এলেন।
বললেন, কী রে মৌ, ভয় করছে নাকি?
মহুয়ার একটু গা ছমছম করলেও বলল, না বাবা! ভয়ের কী? তারপর বলল, কিন্তু গাড়ি কি ঠিক হল?
সান্যাল সাহেব পাইপ ভরতে—ভরতে বললেন, চেষ্টা করছে কুমার।
মহুয়া বলল, গাড়ি খারাপ হওয়ার কথা ছেড়ে দাও। কিন্তু আমরা কি ঠিক রাস্তায় এসেছি?
সান্যাল সাহেব চারদিকের লোকালয়শূন্য রাতের চন্দ্রালোকিত বনপ্রান্তরের দিকে চেয়ে বললেন, বোধহয় না।
ক’টা বেজেছে বাবা?
‘সাতটা।’
মহুয়া আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে এল। কুমার ওর বাইরে আসার শব্দ শুনে এগিয়ে এল। এসেই স্মাগলড বিলিতি সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, সরি! আ—অ্যাম রিয়্যালি সরি।
মহুয়া সোজাসুজি বলল, কী ব্যাপার? আমরা কোথায় এসেছি? বেতলা থেকে কত দূরে? গাড়ির কী করবেন কিছু কি ভেবেছেন?
কুমার বলল, উই হ্যাভ বিন ডিসকাসিং বাউট দ্যাট। কিছু একটা করব নিশ্চয়ই। প্লিজ, ডোন্ট গেট আপসেট। এভরিথিং উইল বি ওল রাইট।
মহুয়া কথা না বলে দূরের পাহাড়ের দিকে চেয়ে রইল। ওর ভয় করতে লাগল খুব। সন্ধের আগে আগে যেখানে ওরা চা খেয়েছিল, ভুলে গেছে জায়গাটার নাম—সেখানে শুনেছিল যে, গতরাতে নাকি আঠারোটি রাইফেল নিয়ে গয়া জেলা থেকে ডাকাতরা এসে এই রাস্তাতেই ডাকাতি করে গেছে। অবশ্য এই রাস্তাই সেই রাস্তা কিনা একমাত্র কুমারই তা বলতে পারে। এও বলেছিল যে, মেয়েদের নিয়ে রাতে এসব পথে যাওয়া ঠিক নয়।
আসলে এই মুহূর্তে ভয়ের চেয়েও বেশি রাগ হচ্ছে মহুয়ার। কুমারের প্রকৃত স্বরূপ এত তাড়াতাড়ি মহুয়া না বুঝলেই ভালো হত। মানুষটাকে বড় কৃত্রিম বলে মনে হয়েছে মহুয়ার এরই মধ্যে। বাঙালিদের সঙ্গেও সবসময় দাঁত টিপে টেঁশো—ইংরিজি বলে কী যে আনন্দ পায়, কী যে এরা প্রমাণিত করতে চায়, তা মহুয়া বোঝে না। এ বোধহয় একরকম হীনমন্যতা। মনে হয়, সঠিক জানে না মহুয়া।
সান্যাল সাহেব মুখে একবারও না বললেও মহুয়ার বুঝতে ভুল হয়নি যে, এইবারে বেড়াতে আসার আসল কারণ মহুয়া আর কুমারকে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ দেওয়া। মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে সান্যাল সাহেব স্বাভাবিক কারণেই উদ্বিগ্ন। বছর পাঁচেকের মধ্যেই রিটায়ার করবেন উনি।
ছেলে হিসেবে কুমার ভালো। পাত্র হিসেবেও ভালো। সত্যি কথা বলতে কি, আজ ভোরে মহুয়া যখন ওদের হিন্দুস্থান রোডের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বসন্তের মিষ্টি হিমেল আমেজ—ভরা সকালে একটা অফ—হোয়াইটের মধ্যে কালো কাজ করা ছাপা শাড়ি পরে কুমারের গাড়িতে ওঠে, তখন ওর ভারী ভালো লাগছিল। ও ভেবেছিল যে কুমারকে ও কিছুদিন হল জেনেছে; সেই সপ্রতিভ, যোগ্য ছেলেটিকে তার আরও অনেক বেশি ভালো লাগবে এবং তার সঙ্গে ঘর করতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে ওর বেশি দেরি হবে না।
কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে ওর খারাপ লাগতে শুরু করবে ও তা বুঝতে পারেনি।
ডাকাতির ভয়ের কথাটা সান্যাল সাহেব এবং কুমারের মনেও এসেছিল। কিন্তু মহুয়া ভয় পাবে বলে তা নিয়ে আর আলোচনা করবেন না ওঁরা।
বনেটটা বন্ধ করে দিতেই ফুটফুটে চাঁদের আলোয় দেখা গেল সামনেই একটা পাহাড় এবং পথটা সেই পাহাড়ের মধ্যে মিশে গেছে ঘুরে ঘুরে।
কুমার ঐদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকাতে সান্যাল সাহেব বললেন, কী দেখছ?
না। মানে দিস ওয়াজ নট সাপোজড টু বি হিয়ার, কুমার বলল।
হায়াট ডু উ্য মিন? রাগত গলায় সান্যাল সাহেব শুধোলেন কুমারকে। বললেন, ভৌতিক ব্যাপার নাকি? এতক্ষণও পাহাড়টা নিশ্চয়ই ছিল। যখন আলো জ্বলছিল ও টর্চ জ্বালিয়েছিলে তখন কাছটাই নজরে আসছিল। দূরে আমরা কেউই তাকাইনি।
কুমার বলল, তা নয়। পথের এই ল্যাপে কোনো পাহাড় থাকার কথাই ছিল না।
সান্যাল সাহেব রাগ চেপে, ধরা গলায় বললেন, রাস্তা ভুল করলে রাস্তায় আনচার্টেড পাহাড় নদী অনেক কিছুই পড়বে। যে—রাস্তায় তোমার আসার কথা, সে—রাস্তা নিশ্চয়ই কোথাও ফেলে এসেছ।
তারপর একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর হয়ে বললেন, গাড়িটাও গেল বন্ধ হয়ে। তোমাকে এতবার করে বললাম রামবিলাসকে নিই, আমার গাড়ি নিয়ে আসি—তা তুমি জেদ ধরলে যে তোমার গাড়িতেই যেতে হবে—গাড়ি নিজে না চালালে রাফিং হয় না। এখন করো রাফিং।
মহুয়া ব্যাপারটাকে লঘু করার জন্যে মধ্যে পড়ে হেসে বলল, কুমার, আপনি তো গাড়ির সবকিছু বোঝেন বলেছিলেন, বলুন তো দেখি কী হয়েছে?
কুমার ঠোঁট থেকে সিগারেটটা নামিয়ে বলল, বুঝতে পারছি না। এখন হোয়াট টু ডু?
কুমার কিন্তু তখনও সপ্রতিভ। পুরো ব্যাপারটা যে তার জন্যেই ঘটেছে সে—কথা সে তখন স্বীকার করলেও, পুরোপুরি মেনে নিতে রাজি নয়।
সে বলল, আসুন গাড়িতে বসে ভাবা যাক কী করা যায়!
সান্যাল সাহেব দরজা খুলেই সামনের সিটে বসলেন। তাঁকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। পায়ের কাছে রাখা ছোট্ট ব্যাগ থেকে হুইস্কির বোতল বের করে ওয়াটার বটল থেকে গেলাসে জল ঢেলে মেশালেন। তারপর চুমুক দিলেন।
কুমারকে বললেন, খাবে নাকি?
কুমার নিস্পৃহ গলায় বলল, আ—স্মল ওয়ান।
বলেই আবার বলল, কাছাকাছি নিশ্চয়ই গ্রাম—টাম থাকবে। আপনারা বসুন। আমি একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে আসি।
সান্যাল সাহেব বললেন, তা কী হয়? এই জংলি জায়গায়, অচেনা অজানা পরিবেশ—একা যাবে কেন?
কুমার বলল, এইরকম জায়গা বলেই তো বলছি। মহুয়াকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে এমন জায়গায় কি ঘুরে বেড়ানো সেফ? তারপর ডাকাতির কথা তো শুনলেন।
সান্যাল সাহেবের গলার স্বরে কেমন এক শুষ্ক বিরক্তি ও রাগ ঝরে পড়ল। বললেন, কী করা উচিত তুমিই বলো—কী করাটা সেফ?
ইতিমধ্যে পিছন থেকে একটি আগন্তুক জীবের শব্দ শোনা গেল। অসমান প্রস্তরাকীর্ণ লাল ধূলি—ধূসরিত পথে জিপের উঁচু হেডলাইটের আলোটা লাফাতে লাফাতে এগিয়ে আসছিল।
হঠাৎ কুমার বলল, মহুয়া, তুমি নীচু করে বসে পড়ো। তোমাকে যেন দেখা না যায়।
মহুয়া বলল, আপনারা থাকতে আমার ভয় কী?
কুমারের গলায় ভয়। বলল, যা বলছি করো। তর্ক করো না। লিসন টু মি।
মহুয়া ভয় এবং বিরক্তিসূচক একটা সংক্ষিপ্ত চ—কারান্ত শব্দ করে সিটের নীচে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে পড়ল।
সান্যাল সাহেব পাইপ কড়মড় করে বললেন, বন্দুকটা আনার কথা বললাম; তাও আনতে দিলে না তুমি। তুমি,……………রিয়্যালি……….।
জিপটা যত কাছে আসছিল ততই যেন গতি কমে আসছিল—এবং মহুয়ার গলার কাছে কী একটা অননুভূত অনুভূতি দলা পাকিয়ে উঠছিল। ওর প্যারিসে—থাকা মায়ের কথা মনে পড়ল ওর—আরও অনেক কথা। হঠাৎ।
কুমার তাড়াতাড়ি জানালার কাচটা তুলে দিল। এক