
ওগো টুনটুনি কীগো ছোটাচ্চু
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
ওগো টুনটুনি কীগো ছোটাচ্চু
| মুহম্মদ জাফর ইকবাল | |
| juvenile literature |
Posted byমিতা সাহা28-Jun-2025
Change color
নাসরীন সুলতানা মিতু ও মেহেদী হক।
আমার খুবই প্রিয় একটি জুটি
টুনি-ফারিহা স্টিং অপারেশান
প্রতিদিনের মত আজকেও সবাই তাদের কাজকর্ম শেষ করে দাদির (কিংবা নানির) ঘরে একত্র হয়েছে। দাদি তার সোফায় বসে একই সাথে একটা বই পড়ছেন এবং টিভি দেখছেন। দাদির পায়ের কাছে বসে ঝুমু খালাও টিভি দেখছে। টিভিতে একটা বাংলা সিরিয়াল দেখাচ্ছে, এই মুহূর্তে নায়িকা ছয়তলা বিল্ডিংয়ের ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে, যেকোনো মুহূর্তে সে ঝাঁপ দিবে, সেজন্য ঝুমু খালা খুবই উত্তেজিত টেলিভিশনে নায়িকার দিকে তাকিয়ে তাকে নানারকম সান্ত্বনার কথা বলে যাচ্ছে, লাভ হবে কি না বোঝা যাচ্ছে না।
ঘরের মেঝেতে বাচ্চারা গোল হয়ে বসে আছে। সাধারণত তাদের চিৎকার চেঁচামেচির যন্ত্রণায় দাদি এবং ঝুমু খালার টেলিভিশন দেখতে খুবই সমস্যা হয় এবং একটু পরে পরে বাচ্চাদের শান্ত করার জন্য হয় ঝুমু খালা, না হয় দাদিকে নানারকম হুমকিধামকি দিতে হয়। তবে আজকে বাচ্চারা কোনোরকম চেঁচামেচি করছে না, কারণ তারা গভীর মনোযোগ দিয়ে তান্ত্রিক সাধনা করছে। ঠিক মাঝখানে শান্ত চোখ বন্ধ করে পদ্মাসনে বসে আছে, তার মাথার উপর একটা টকটকে লাল জবাফুল। সামনে জেলির একটা খালি বোতলে একটা টিকটিকির লেজ। টুম্পার হাতে একটা মোটা লাল রঙের বই, বইয়ের নাম ‘খাঁটি তান্ত্রিক সাধনা’। টুম্পা সেই বই দেখে দেখে একটা জটিল মন্ত্র শান্তর কানে ফিসফিস করে বলছে এবং শান্ত সেই মন্ত্রটি উচ্চারণ করছে। খাঁটি তান্ত্রিক সাধনা বইয়ে লেখা আছে—এই মন্ত্রটি তিনবার উচ্চারণ করা হলে একজন অদৃশ্য হয়ে যাবে। মন্ত্র যথেষ্ট লম্বা, এর মাঝে দুইবার উচ্চারণ করা হয়েছে, তৃতীয়বার শেষ হওয়ার পথে, শান্ত সত্যি সত্যি অদৃশ্য হয়ে যায় কি না সেটা দেখার জন্য সবাই খুবই কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছে।
টেলিভিশনে একটা বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু করার পর ঝুমু খালা দাদির সাথে বাংলা সিরিয়ালে নায়িকার আত্মহত্যা করে ফেলার আশঙ্কার পুরো ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা করল, নায়িকাকে কীভাবে এই কঠিন অবস্থা থেকে রক্ষা করা যায় সেটি নিয়ে দুজনে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। তখন হঠাৎ করে বাচ্চাদের তান্ত্রিক সাধনার দৃশ্যটি ঝুমু খালার চোখে পড়ল। ঝুমু খালা জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কী কর?”
একজন চাপা গলায় বলল, “চুপ ঝুমু খালা। কথা বল না এখন।”
ঝুমু খালা গলা আরেকটু উঁচিয়ে বলল, “কেন? কথা বললে কী হবে?”
“আমরা তান্ত্রিক সাধনা করছি। তান্ত্রিক সাধনার মাঝখানে কথা বলতে হয় না।”
ঝুমু খালা গলা আরো উঁচিয়ে বলল, “কীসের সাধনা!”
“শান্ত ভাইয়া মন্ত্র পড়ে অদৃশ্য হয়ে যাবার চেষ্টা করছে।”
ঝুমু খালা খুবই বিরক্ত হয়ে বলল, “তোমরা পোলাপাইন এইরকম বিপদের কাম কেন কর?”
একজন বলল, “বিপদের কাম? কেন এইটা বিপদের কাম?”
ঝুমু খালা গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল, “এইসব তন্ত্রমন্ত্র—খুবই ডেঞ্জারাস। উল্টাপাল্টাভাবে বললে বিপদ হতে পারে।”
ঝুমু খালার কথা শুনে তান্ত্রিক সাধনা বন্ধ করে সবাই তার কথা শোনার জন্য এগিয়ে এল। জিজ্ঞেস করল, “কী বিপদ?”
“ভূতপ্রেত জিন-পরী চলে আসে, ঘরে ঘুরঘুর করে যেতে চায় না। পোলাপান ভয় পায়।”
“সত্যি?”
“সত্যি নাতো মিথ্যা নাকি! আর অদৃশ্য হবার মন্ত্র খুবই কড়া মন্ত্র। উল্টাপাল্টা হলে বিপদ আছে।”
“কী বিপদ?”
“আমাদের গ্রামের একজন চেষ্টা করেছিল, পুরা কাম করে নাই। শরীরের অর্ধেক অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। অন্য অর্ধেক ঠিক আছে। খুবই আজব অবস্থা।”
“তারপর কী হল?”
“কী আর হবে। সংসারে অশান্তি। বউ তারে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেল। বউরে কী দোষ দেওয়া যায়? অর্ধেক দেখা যায় বলে মানুষটারে সবাই ডাকে আধা মিয়া আর বউরে ডাকে আধা মিয়ার বউ।”
ঝুমু খালার কাছ থেকে আধা মিয়া এবং আধা মিয়ার বউয়ের কাহিনি আরেকটু শোনার ইচ্ছা ছিল কিন্তু বিজ্ঞাপন শেষ হয়ে আবার সিরিয়াল শুরু হয়ে গেল বলে ঝুমু খালা টেলিভিশনে ফিরে গেল।
কয়েকবার চেষ্টা করেও অদৃশ্য হতে না পেরে শান্ত একটু হতাশ হয়ে গেল। টুম্পা তখন বইটা ঘেঁটে এক কলসি সোনার মোহর আনার মন্ত্রটা খুঁজে বের করল। সবাই মিলে যখন সেই মন্ত্র উচ্চারণ করছে, তখন হঠাৎ করে ছোটাচ্চু এসে হাজির। ছোটাচ্চু ঘরে ঢুকল হাসতে হাসতে। একজন মানুষ সাধারণত একা একা হাসে না। যখন কেউ একা একা হাসে, সবাই তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। তাই বাচ্চারা সবাই ছোটাচ্চুর দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল।
টুম্পা জিজ্ঞেস করল, “ছোটাচ্চু তুমি হাসছ কেন?”
ছোটাচ্চু একটা খালি চেয়ারে বসতে বসতে বলল, “যা একটা হাসির ঘটনা ঘটেছে সেটা বলার মত না।”
কথা শেষ করে ছোটাচ্চু আবার দুলে দুলে হাসতে থাকে।
“কী হাসির ঘটনা?”
“না, এইটা বলা যাবে না।” বলে ছোটাচ্চু আবার হাসতে লাগল। এবারে আরও কয়েকজন ছোটাচ্চুকে ঘিরে ধরল, বলল, “কেন বলা যাবে না? বললে কী হবে?”
ছোটাচ্চু কোনোভাবে হাসি একটু থামিয়ে বলল, “আমি মানুষটাকে কথা দিয়েছি কাউকে বলব না।”
“কেন কাউকে বলবে না?”
ছোটাচ্চু উত্তর না দিয়ে আবার হা হা করে হাসতে শুরু করে। শান্ত মুখ গম্ভীর করে বলল, “আমার কী মনে হয় জান ছোটাচ্চু?”
“কী মনে হয়?”
“আমার মনে হয় ঘটনাটা মোটেও হাসির না। খুবই ফালতু ঘটনা। তুমি জোর করে হাসির ভান করছ।”
ছোটাচ্চু এবার হাসি বন্ধ করে মুখ শক্ত করে তাকাল, বলল, “আমি জোর করে কেন হাসির ভান করব?”
“তোমার মাথার ঠিক নাই ছোটাচ্চু—তুমি অনেক উল্টাপাল্টা কাজ কর, আমরা সহ্য করি। এইটা সেরকম কিছু।”
ছোটাচ্চু এবারে রেগে গেল, বলল, “তুই কী বলতে চাইছিস?”
“আমি বলতে চাইছি যে আমরা যেন ঘটনাটা শুনতে আগ্রহ দেখাই, সেইজন্য তুমি জোর করে হাসার চেষ্টা করছ। তোমার হাসি দেখলেই বোঝা যায় এইটা ভুয়া হাসি।”
যারা একটু বেশি ছোট তারা হাত উপরে তুলে বলল, “ভুয়া! ভুয়া!”
ছোটাচ্চু আরও রেগে গেল, বলল, “ভুয়া হাসি? ভুয়া?”
“হ্যাঁ। কারণ তুমি যখন সত্যি সত্যি হাস তখন তোমার চোখ ছোট ছোট হয়ে যায়। তোমার নাকের গর্ত বড় হয়ে যায়। এখন তোমার চোখ ছোট হয় নাই, নাকের গর্তও বড় হয় নাই।”
ছোটরা মাথা নাড়ল, বলল, “হয় নাই। হয় নাই।”
ছোটাচ্চু তখন বলল, “ঠিক আছে আমি ঘটনাটা বলছি, তোরা আমাকে বল ঘটনাটা হাস্যকর কি না।”
সবাই আনন্দে চিৎকার করল, শুধু টুনি বলল, ‘ছোটাচ্চু তোমার ঘটনাটা বলা ঠিক হবে না।”
বাচ্চারা টুনির দিকে রাগ হয়ে তাকাল, “কেন? কেন বলা ঠিক হবে না।”
“ছোটাচ্চু কথা দিয়েছে ঘটনাটা কাউকে বলবে না। কথা দিলে কথা রাখতে হয়।”
“ছোটাচ্চু তো অন্যদেরকে বলছে না। ছোটাচ্চু বলছে আমাদের। আমরা তো ছোটাচ্চুর টিম।”
সবাই জোরে জোরে মাথা নাড়ল। বলল, “হ্যাঁ। টিম, টিম। নিজের টিমকে তো বলতেই হবে। আমাদেরকে না বললে আমরা আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির অফিস দখল করে ফেলব।”
এবারে সবাই আরো জোরে জোরে মাথা নাড়ল, এক দুইজন শ্লোগানও দিল। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল ছোটাচ্চু ঘটনাটা বলবে, তবে যে মানুষটাকে দিয়ে ঘটনা ঘটেছে সেই মানুষটার নাম কিংবা পরিচয় বলবে না, সেটা গোপন থাকবে। তারপর ছোটাচ্চু যে ঘটনাটা বলল সেটা এরকম :
ছোটাচ্চু তার অফিসে বসে কাজ করছে, তখন আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির রিসেপশনিস্ট নীলিমা ছোটাচ্চুর অফিসে মাথা ঢুকিয়ে বলল, “স্যার—” ছোটাচ্চু বলল, “তোমাকে কতবার বলেছি আমাকে স্যার ডাকবে না।”
“ও আচ্ছা—মনে থাকে না। শাহরিয়ার ভাই—”
“বল।”
“একজন আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন, বলছেন খুবই গোপনীয়। শুধুমাত্র আপনার সাথে কথা বলবেন।”
“ঠিক আছে নিয়ে এসো।”
“আমি ভদ্রলোকের নাম ঠিকানাও জানি না, উনি আমাদের ফরম পর্যন্ত ফিলআপ করতে রাজি না। সবকিছু গোপন।”
ছোটাচ্চু মাথা নাড়ল, বলল, “হুম! ইন্টারেস্টিং।”
“একটা মাফলার দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছেন, মাথায় ক্যাপ যেন চেহারা দেখা না যায়।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং। পাঠিয়ে দাও।”
“ঠিক আছে।” নীলিমা তখন এই রহস্যময় গোপন মানুষটিকে পাঠানোর জন্য চলে গেল।
একটু পরেই মানুষটি ছোটাচ্চুর অফিসে এল। ছোটাচ্চুর সামনে চেয়ারে বসে সে খুব সাবধানে ইতিউতি তাকায়।
ছোটাচ্চু বলল, “আপনাকে আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”
মানুষটি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে চাপা গলায় বলল, “ব্যাপারটি খুবই গোপন।”
“বুঝতে পারছি।”
“আপনি ছাড়া কেউ যেন না জানে।”
ছোটাচ্চু বলল, “দেখেন, আমার এটা ডিটেকটিভ এজেন্সি। এখানে সব কাজ আমি করি না। আমার টিম কাজ করে। কাজেই আমি ছাড়া আর কেউ জানবে না হলে আমরা আপনার কেস নিতে পারব বলে মনে হয় না।”
লোকটা তার টুপি খুলে মাথা চুলকালো। তারপর বলল, “দেখেন, ব্যাপারটা খুবই লজ্জার। সেইজন্য আমি চাই না আর কেউ জানুক।”
“অনেকেই আমাদের কাছে তাদের কেস নিয়ে আসেন যেটা তার জন্য কিংবা তার পরিবারের জন্য লজ্জার—আমরা সেটা গোপন রাখি।”
“ধরেন, আমার একটা মান সম্মান আছে, আমার ঘটনাটি জানাজানি হলে বেইজ্জতির চূড়ান্ত হবে। আমি কারো সামনে মুখ দেখাতে পারব না। আমার বিজনেসের বারোটা বেজে যাবে।”
“আমাদের সাইড থেকে আমরা কাউকে জানাব না।”
“সেইজন্য মনে করেন পুলিশের কাছে যাই নাই। আপনার কাছে এসেছি।”
“এরকম অনেকেই আমার কাছে আসে। এখন কী হয়েছে আপনি সেটা বলেন।”
“মনে করেন আমার নাম এক্স।”
ছোটাচ্চু বলল, “উহু উহুঁ এভাবে হবে না। আপনি যদি আমাদের সাহায্য নিতে চান তাহলে আপনার নাম পরিচয় দিতে হবে। এক্স ওয়াই দিয়ে হবে না। মুখে বলতে না চাইলে আপনার বিজনেস কার্ড দিতে হবে। সেখানে টেলিফোন নাম্বার ঠিকানা ই-মেইল থাকতে হবে। আপনার টুপি খুলে মাফলার সরিয়ে চেহারা দেখাতে হবে।”
“চেহারাও দেখাতে হবে?”
“হ্যাঁ। দুই জায়গায় লজ্জা করলে হয় না। একটা হচ্ছে ডাক্তার অন্যটা হচ্ছে ডিটেকটিভ। এই দুইজনের কাছে সবকিছু খুলে বলতে হয়।”
মানুষটা কিছুক্ষণ চিন্তা করল, তারপর বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে।”
তারপর মানুষটা তার টুপি খুলল, মুখের উপর থেকে মাফলার সরালো। মাথায় টাক এবং একটু বোকা বোকা চেহারা। তবে মানুষের চেহারা বোকা বোকা হলেই মানুষটা বোকা হয় সেটি সত্যি না, পৃথিবীর সবচেয়ে ধুরন্ধর মানুষদের চেহারা শুধু যে বোকা বোকা হয় তা না, তারা চাইলে বোকা বোকা করেও রাখতে পারে।
মানুষটা গলা পরিষ্কার করে বলল, “আমি একটা বিজনেস গ্রুপের মালিক, আমার নানারকম ব্যবসা আছে। গার্মেন্টস, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ছোটখাটো ইন্ডাস্ট্রি। রিয়েল এস্টেট। এই লাইনে থাকতে হলে মাথা ব্যবহার করতে হয়। আমার মাথা যথেষ্ট ভালো। আমি চাইলে যেকোনো মানুষকে কিনে তাকে বেচে ফেলতে পারি।”
ছোটাচ্চু মাথা নাড়ল, বলল, “আশা করছি মানুষ কেনাবেচার কথাটা একটা কথার কথা, আসলে আপনি এই কাজ করেন না।”
“না। করি না। কিন্তু বুদ্ধির কাজ করি। অথচ অথচ—” মানুষটা থেমে গিয়ে ফোঁস করে বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“অথচ কী?”
“আমার মুখে উচ্চারণ করতে লজ্জা লাগছে, আমি আপনাকে দেখাই।”
মানুষটা তখন তার ব্যাগের ভেতর থেকে