
আহা টুনটুনি উহু ছোটাচ্চু
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
আহা টুনটুনি উহু ছোটাচ্চু
| মুহম্মদ জাফর ইকবাল | |
| juvenile literature |
Posted byশ্রী কর্মকার28-Jun-2025
Change color
উৎসর্গ
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের যারা আমাদের অনুরোধে অনশন ভাঙতে রাজি হয়েছিল।
ভূমিকা
আমাকে দেখে একটা দশ এগারো বছরের মেয়ে ছুটে এসেছে, কাছে এসে বলল, “স্যার আপনাকে একটা কথা বলি?”
আমি বললাম, “আমি বলব তুমি আমাকে কী বলবে?”
সে অবাক হয়ে বলল, “আপনি জানেন আমি কী বলব?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। আমি জানি। তুমি আমাকে আরেকটা টুনটুনি আর ছোটাচ্চুর বই লিখতে বলবে।”
মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, “আপনি কেমন করে বুঝতে পারলেন?”
সেজন্য আমার আরও একটা টুনটুনি আর ছোটাচ্চুর বই লিখতে হয়েছে!
টুথ পেস্ট শেষ হবার পর টিপে টিপে যেভাবে আরো একটু পেস্ট বের করে ফেলা যায়, ঠিক সেভাবে আরো একটা টুনটুনির বই বের করা হয়েছে!
কিন্তু আর কতদিন?
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
৩০.০১.২০২২
মার্ডার কেস
নানি (কিংবা দাদি) তার ছোট সোফায় বসে টেলিভিশন দেখছেন। ঝুমু খালা তার পায়ের কাছে বসে একই রকম উৎসাহে এই সিরিয়ালটি দেখছে। অত্যন্ত নাটকীয় একটা দৃশ্যের পর বাসন ধোয়ার সাবানের বিজ্ঞাপন বিরতি, তখন ঝুমু খালা মাথা নেড়ে নানি (কিংবা দাদি) কে বলল, “বুঝলেন খালা, এই বউরে বিশ্বাস করা যাবে না।”
সিরিয়ালটিতে এইমাত্র বাড়ির ছোট ছেলে বিয়ে করে নৃতন বউ ঘরে এনেছে, তাকে কেন বিশ্বাস করা যাবে না নানি বুঝতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, “কেন? আমার তো মেয়েটাকে ভালোই মনে হচ্ছে।”
ঝুমু খালা প্রায় আর্তনাদ করে বলল, “না, খালা না। দেখছেন না বউয়ের বিলাইয়ের মতো চোখ? বিলাইয়ের মতো চোখ মানেই উপরে মধু ভেতরে বিষ!”
বাচ্চারা ছবি আঁকার একটা খেলা আবিষ্কার করেছে, কাগজটা অনেকগুলো ভাজ করে একেকজন একেক ভঁজে তার ইচ্ছামতো একটা জন্তুর ছবি আঁকে। অন্যরা সেটা দেখতে পারে না, তাই ছবি আঁকা শেষ হওয়ার পর কাগজটা খুলে সেই বিদঘুঁটে জন্তুর ছবি দেখে সবাই হাসিতে গড়িয়ে পড়ে। টুনি তার সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে করতে নানি আর ঝুমু খালার কথা শুনছিল। সে ঝুমু খালার ব্যাখ্যাটাতে আপত্তি করে বলল, “ঝুমু খালা, মানুষের চোখ কখনো বিড়ালের চোখের মতো হতে পারবে না মানুষের পিউপিল গোল, বিড়ালের লম্বা।”
ঝুমু খালা ঝংকার দিয়ে বলল, “ফালাও তোমার গোল আর লম্বা। তুমি আমারে বিলাই শিখাবা! তুমি জীবনে বিলাই চোখা কয়টা দেখছ?”
টুনি আর আলোচনায় গেল না, বিড়াল চোখা মানে কী সেটাই সে জানে না! ঠিক এই সময় টুম্পা এসে বলল, “ছোটাচ্চু, তোমার একজন গেস্ট এসেছে।”
ছোটাচ্চু তার কেনে আঙুল দিয়ে প্রবল বেগে কান চুলকাচ্ছিল বলে টুম্পার কথা শুনতে পায় নাই। বলল, “এ্যা, কে এসেছে?”
“গেস্ট। তোমার কাছে একজন গেস্ট এসেছে।”
শান্ত জিজ্ঞেস করল, “মহল না মহিলা?”
ছোটাচ্চু চেয়ার থেকে নেমে ভুরু কুঁচকে শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল, “কী বললি? মহল না মহিলা? মহল আবার কী রকম বাংলা?”
শান্ত গম্ভীর মুখে বলল, “বাংলা ভাষায় অনেক সমস্যা। মহল শব্দটা থাকা উচিত ছিল। শব্দটা ডিকশনারিতে ঢুকাতে হবে। আস্তে আস্তে ভাষাটাকে ঠিক করতে হবে।”
ছোটাচ্চু ঘর থেকে বের হতে হতে বলল, “সেই দায়িত্বটা তোকে দেওয়া হয়েছে? কে দিয়েছে?”
ছোটাচ্চু প্রশ্নটার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করল না, তার গেস্টের সাথে দেখা করার জন্য বের হয়ে গেল। শান্ত গলা উঁচিয়ে বলল, “দায়িত্ব দিতে হয় না। দায়িত্ব নিজের থেকে নিতে হয়!”
শান্তর কথা শুনে সবাই হি হি করে হাসতে থাকে। শান্ত বাংলা ভাষা ঠিক করার দায়িত্ব নিয়েছে শুনে হাসাহাসি করা যেতেই পারে। শান্ত মুখ গম্ভীর করে টুম্পাকে জিজ্ঞেস করল, “টুম্পা, তুই এখনো বলিসনি কে এসেছে, মহল না মহিলা?”
প্রমি হাসি গোপন করে বলল, “টুম্পা তুই ইচ্ছা করলে অন্যভাবেও উত্তর দিতে পারিস।”
টুম্পা বলল, “কীভাবে?”
“বলতে পারিস গেস্ট কি পুরুষ নাকি পুরিষা।”
আরেকজন বলল, “কিংবা লোক নাকি লুকিয়া।”
আরেকজন বলল, “কিংবা ছেলে নাকি ছেলিয়া।”
মুনিয়া তার কিনকিনে গলায় বলল, “কিংবা গরল নাকি গরিলা।”
মুনিয়ার কথা শুনে সবাই হেসে গড়াগড়ি খেতে থাকে। চিৎকার করে বলতে থাকে, “গরিলা-গরিলা-”
শান্ত রেগে দাঁত কটমট করে বলল, “বাসায় গরিলা আসবে কেমন করে? বেকুবের মতো কথা বলিস না।”
ঝুমু খালা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তোমাগো যন্ত্রণায় শান্তিমতো একদিন টেলিভিশন পর্যন্ত দেখতে পারি না। খালি চিল্লাপাল্লা চিল্লাপাল্লা।”
তারপর নানির (কিংবা দাদির) দিকে তাকিয়ে বলল, “খালা, গেস্টের জন্য একটু চা নাশতা দিয়া আসি।”
টুম্পা মাথা নেড়ে বলল, “দরকার নাই ঝম খালা। মহিলার খুবই আলুথালু চেহারা। মনে হয় না চা নাশতা খাবে।”
সবাই চোখ বড় বড় করে তাকালো, বলল, “আলুথালু?”
তারপর একসাথে সবাই ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বাইরের ঘরের জানালার নিচে বসে তারা উঁকি দিয়ে আলুথালু মহিলাকে দেখবে। ঝুমু খালা পর্যন্ত পেছনে পেছনে আলুথালু মহিলাকে দেখতে গেল।
বাইরের ঘরের জানালার নিচে বসে উঁকি দিয়ে সবাই দেখল যে মহিলার সত্যিই খুবই আলুথালু চেহারা এবং শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শোনা গেল মহিলা বলছে, “আপনি কেমন করে আমাকে শান্ত হতে বলছেন? কেউ যদি আপনার সন্তানকে হত্যা করত আপনি কি শান্ত থাকতে পারতেন? মিঠুন আমার সন্তান না?”
জানালার নিচে বসে থাকা সবাই চমকে উঠল। শুধু শান্ত তার সবগুলো দাঁত বের করে আনন্দে হাতে কিল দিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ইয়েস, মার্ডার কেস।”
সবাই শুনল ছোটাচ্চু বলছে, “আপনি কি আমাকে ঠিক করে বলবেন, ঠিক কী হয়েছিল? মানে মিঠুন কে, ঠিক কীভাবে–”
আলুথালু মহিলা বলল, “আগে আপনি কথা দেন এই কেসটা আপনি নিবেন?”
ছোটাচ্চু মাথা চুলকে বলল, “একটু ডিটেলস না জানলে-”
“আপনাকে আমি সব বলব। কিন্তু আগে আমাকে কথা দেন–প্লিজ-মিঠুনের আত্মা শান্তি পাবে”
ছোটাচ্চু বলল, “আপনি যেভাবে বলছেন তাতে তো মনে হচ্ছে এটা পুলিশ কেস হওয়ার কথা–”
“পুলিশ?”
আলুথালু মহিলা মুখে একটা বিচিত্র হাসির ভঙ্গি করে বলল, “আপনি কি ভাবেন পুলিশ এই কেস নিতে আসবে? যেখানে আমার নিজের বাসার মানুষজন এটাকে শুরুত্ব দেয় না সেখানে পুলিশ গুরুত্ব দেবে?”
ছোটাচ্চু মাথা চুলকে বলল, “একটা মার্ডার কেসকে গুরুত্ব দেয় না ঠিক বুঝতে পারলাম না–”
ছোটাচ্চুকে থামিয়ে দিয়ে আলুথালু মহিলা গলা উঁচিয়ে বলল, “আপনিও আমার কথা বিশ্বাস করছেন না?”
ছোটাচ্চু বলল, “না-না-না আমি মোটেও আপনাকে অবিশ্বাস করছি না। শুধু বলছি যে এটা খুবই অস্বাভাবিক লাগছে যে–”
আলুথালু মহিলা আবার ছোটাচ্চুকে থামাল, বলল, “আপনি এই পৃথিবীর কোনো খোঁজখবর রাখেন না। মানুষের হৃদয় এখন পাষাণ-কারো জন্য এখন কোনো মায়া নাই।”
ছোটাচ্চু বলল, “তারপরেও—”
মহিলা আবার ছোটাচ্চুকে থামাল, বলল, “আপনি আমার বাসায় আসেন। নিজের চোখে সবকিছু দেখেন, তারপর বের করে দেন কে মিঠুনকে মার্ডার করেছে। আর কেউ পারবে না। আপনি পারবেন। শুধু আপনি–”
ছোটাচ্চু কেমন যেন ফ্যাকাশে মুখে তার মাথা চুলকাতে থাকে। তাকে দেখে মনে হয় খুব বিপদে পড়ে গেছে।
টুম্পার কথা সত্যি, চা নাশতা দেওয়ার পরও আলুথালু মহিলা সেগুলো ছুঁয়ে দেখল না। ছোটাচ্চু অনেক আপত্তি করার পরও একটা মোটা টাকার বান্ডিল টেবিলের ওপর রেখে আঁচল দিয়ে চোখ মুখ ঢেকে কাঁদো কাঁদো হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার আগে ছোটাচ্চুর কাছ থেকে কথা আদায় করে নিয়ে গেল যে ছোটাচ্চু পরেরদিন বিকেলেই তার বাসায় গিয়ে মিঠুন মার্ডার কেসের তদন্ত শুরু করে দেবে।
আলুথালু মহিলা চলে যাবার পর ছোটাচ্চু তার গাল চুলকাতে চুলকাতে নিজের ঘরে যাচ্ছিল, সব বাচ্চারা সারি বেঁধে তার পেছনে পেছনে গেল। শান্ত তার সবগুলো দাঁত বের করে আনন্দে হাসতে হাসতে বলল, “ছোটাচ্চু, এতদিন পর তুমি সত্যিকারের ডিটেকটিভ হয়েছ। তুমি শেষ পর্যন্ত একটা মার্ডার কেস পেয়েছ।”
প্রমি বলল, “একটা মার্ডার হয়েছে আর তুই খাটাসের মতো আনন্দে দাঁত বের করে হাসছিস?”
টুম্পা জিজ্ঞেস করল, “খাটাস দাঁত বের করে হাসে?”
মুনিয়া বলল, “খাটাস কী?”
শাহানা বলল, “শান্তর মতো মানুষকে বলে খাটাস।”
শান্ত বলল, “ভালো হবে না কিন্তু।”
তারপর ছোটাচ্চুর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, “ছোটাচ্চু, টাকার বান্ডিলটা দিবে?”
ছোটাচ্চু বলল, “কেন?”
“তোমাকে গুনে দেই।”
“তোকে কেন গুনে দিতে হবে? আমি গুনতে পারি না?”
“তোমাকে একটু সাহায্য করি।”
প্রমি বলল, “ছোটাচ্চু ভুলেও শান্তর হাতে টাকা দিবে না।”
টুনি তখন একটু এগিয়ে এসে বলল, “ছোটাচ্চু—”
“উঁ।”
“তুমি কালকে যাবে তো?”
শান্ত বলল, “যাবে না কেন? একশবার যাবে। এই প্রথম একটা মার্ডার কেস পাওয়া গেছে যেতে তো হবেই।”
টুনি শান্তর কথাকে বিশেষ গুরুত্ব দিল না, ছোটাচ্চুকে আবার জিজ্ঞেস করল, “যাবে?”
ছোটাচ্চু মাথা চুলকালো, বলল, “জোর করে টাকার বান্ডিলটা দিয়ে একটু ঝামেলায় ফেলে দিল। আমি কেসটা নিতে চাচ্ছিলাম না।”
শান্ত গলা উঁচিয়ে বলল, “কেন নিবে না? একশবার নিবে। এটা হচ্ছে অ্যাডভান্স। মার্ডারারকে ধরার পর বাকি পেমেন্ট। তাই না ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চু শান্তর কথার উত্তর দিল না, তখন শান্ত আবার জিজ্ঞেস করল, “কত দিয়েছে ছোটাচ্চু? নোটগুলো পাঁচশ টাকার নাকি হাজার টাকার?”
ছোটাচ্চু ভুরু কুঁচকে বলল, “তোর এত খবরের দরকার কী?”
“না, মানে, কম দিল কিনা জানতে চাইছিলাম।”
টুনি বলল, “তুমি কখন যাবে ছোটাচ্চু?”
ছোটাচ্চু বলল, “কেন? তুই যেতে চাস?”
টুনি বলল, “না—মানে–”
তখন শান্ত এসে টুনিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে গলার স্বর খুবই গম্ভীর করে বলল, “ছোটাচ্চু, তোমার সাথে আমার কথা আছে।”
“কী কথা?”
“সিরিয়াস কথা।”
ছোটাচ্চু বলল, “শুনি তোর সিরিয়াস কথা।”
“যখনই তোমার কোনো ডিটেকটিভ কেস আসে তখনই তুমি সব সময় টুনিকে নিয়ে যাও। সে তোমার সাথে থাকে।”
টুম্পা বলল, “টুনি আপুকেই তো নিবে? টুনি আপুই তো সব কেস সলভ করে। টুনি আপুকে না নিলে কাকে নিবে? তোমাকে?”
শান্তকে ডিটেকটিভ কাজে নেওয়ার ব্যাপারটা এতই অবাস্তব যে মুনিয়া সেটা চিন্তা করে খিক খিক করে হেসে ফেলল।
শান্ত মুনিয়ার হাসিটা না শোনার ভান করে তার মুখ আরও গম্ভীর করে বলল, “একশবার আমাকে।”
এবারে শুধু মুনিয়া না অন্যরাও একটু হাসল। প্রমি বলল, “তুই ছোটাচ্চুর কেস সলভ করবি?”
শান্ত বলল, “হ্যাঁ। আমি সলভ করব। তোমরা কী মনে করো? আমি পারব না?”
প্রমি বলল, “না–মানে ইয়ে–”
শান্ত বলল, “আমাকে কখনো সুযোগ দেওয়া হয় নাই। কিছু হলেই টুনি টুনি টুনি–এখানে যে শান্ত বলেও একজন মানুষ আছে তার মাথাতেও যে বুদ্ধি আছে সেইটা তোমাদের কারও চোখে পড়ে না?”
টুম্পা বলল, “তার মানে এখন থেকে টুনি আপুর বদলে তুমি ছোটাচ্চুর অ্যাসিস্ট্যান্ট?”
শান্ত বলল, “না। আমি কারো অ্যাসিস্ট্যান্ট না। আমি সব সময় নিজের জন্য কাজ করি।”