কৃষ্ণা কাবেরী

কৃষ্ণা কাবেরী

নীহাররঞ্জন গুপ্ত

কৃষ্ণা কাবেরী

Books Pointer Iconনীহাররঞ্জন গুপ্ত
Books Pointer Icondetective

Posted byবেলা 27-May-2025

Change color

১. ইস্পাতের তৈরী ছোরাটা

ইস্পাতের তৈরী ছোরাটা।

ছোরার ফলাটা ক্রমে সরু হয়ে অগ্রভাগটা তীক্ষ্ণ, অত্যন্ত ধারালো; ছোরার বাঁটটা সুদৃশ্য কারুকার্যখচিত চন্দনকাঠের তৈরী! সুমিগ্ধ পাতলা একটা চন্দনের গন্ধ ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে!


দুটি চেয়ারে মুখোমুখি বসে সি. আই. ডি-র ইন্সপেক্টার মজিবুর রহমান ও কিরীটী রায়। সামনেই একটা ছোট শ্বেতপাথরের টেবিলের উপরে অয়েল পেপারের উপরে রক্ষিত ছোরাটা।


কিরীটী প্রশ্ন করে, তারপর?


তারপর সকালে ভৃত্য মধুই নরেন মল্লিকের শয়নকক্ষে ঢুকে প্রথম দেখতে পায়, নরেন মল্লিকের অসাড় প্রাণহীন দেহটা ডেক-চেয়ারটার ঠিক সামনেই, মেঝের কার্পেটের উপরে চিৎ হয়ে পড়ে আছে এবং বাম দিককার বুকে ঐ ছোরাটা সমূলে বিদ্ধ হয়ে আছে। গায়ে তখনও তার স্লিপিং গাউনটা পরা! The dagger pierced through and through the heart!



হুঁ! যে-ই নরেন মল্লিককে ছোরা দিয়ে হত্যা করে থাকুক আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে লোকটা হাতে প্রচুর শক্তি রাখে! আচ্ছা স্লিপিং গাউনটা তখনও নরেন মল্লিকের গায়েই ছিল বলছিলেন ইনসপেক্টার, ঘরের শয্যাটা পরীক্ষা করা হয়েছিল কি?


হাঁ। আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি শয্যাটা, রাত্রে ব্যবহৃত হয় নি। এমন কি প্রতি রাত্রে নাকি শয়নের পূর্বে নরেন মল্লিকের এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল পান করা অভ্যাস ছিল, মধুর সে রাত্রে রাখা শিয়রের সামনে ত্রিপয়ের উপরে রক্ষিত জলভর্তি গ্লাসটা পর্যন্ত ঠিক তেমনই ছিল। রাত্রি দশটায় নিজে সে গ্লাসটা জলভর্তি করে রেখে এসেছিল। ময়না তদন্তের রিপোর্টেও তাহলে মৃত্যুর কারণ ছুরিকাঘাতই—


অন্য কোন নিদর্শনই পাওয়া যায় নি?


না।


কিরীটী সম্মুখের টেবিলের ওপরে রক্ষিত অয়েল পেপারের উপর থেকে ছোরাটা তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে। ইস্পাতের তৈরী মজবুত ছোরা। ওজনেও মন্দ হবে না। অগ্রভাগটা ধারালো ও তীক্ষ্ণ।



হঠাৎ মজিবুর রহমান বলে, কিন্তু আশ্চর্য কি জানেন মিঃ রায়, ছোরার বাঁটে কোন আঙ্গুলের ছাপই পাওয়া যায় নি।


কিরীটী তখনও ছোরাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল, মৃদু কণ্ঠে বলে, স্বাভাবিক।


স্বাভাবিক!–বিস্মিত রহমান কিরীটীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে।


হ্যাঁ, তা বই কি! প্রথমতঃ ছোরার বাঁটে কোন আঙ্গুলের ছাপ পাওয়া গেলে সর্বাগ্রে নিশ্চয়ই সে কথা আপনি আমাকে বলতেন। দ্বিতীয়তঃ অমন কৌশলের সঙ্গে যে খুন করতে পারে, ছোরার বাঁটে সে তার আঙ্গুলের ছাপ রেখে যাবে এমন ভাবাই তো অন্যায়! আর এসব ক্ষেত্রে by chance আঙ্গুলের কোন ছাপ পাওয়া গেলেও সেটা হত্যাকারীর কখনো হয় না, বরং যে নিহত হয় অনেক সময় তারই আঙ্গুলের ছাপ বা হাতের ছাপ পাওয়া যায়। কিন্তু সে কথা যাক। মৃতের কক্ষে হত্যার সূত্র বা প্রমাণ হিসেবে তার বক্ষে বিদ্ধ এই ছোরাখানি ছাড়া আর কিছুই তাহলে পাওয়া যায় নি বা নজরে পড়ে নি আপনাদের? যেমন ধরুন, কোন struggleয়ের চিহ্ন বা—


না। So far সবই পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখা হয়েছে, but nothing more could be detected.



হুঁ।


এর পর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে থাকে।


হঠাৎ আবার কিরীটীই ডাকে, মিঃ রহমান?


বলুন?


সেই ঘরটা, মানে পার্ক সার্কাসে মৃত নরেন মল্লিকের বাড়িতে যে কক্ষে তাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়, সেই ঘরটা কি এখনো আপনাদের disposalয়েই আছে?


হাঁ নিশ্চয়ই! তদন্ত এখনো চলছে, করোনার্স কোর্টে বিচার এখনও শেষ হয় নি। নরেন মল্লিক নিহত হয়েছে গত ২৭শে পৌষ সোমবার—আর আজ বৃহস্পতিবার, মাত্র তিন দিন আগে।


বেশ। তাহলে আজ এখুনি যদি আপনার অসুবিধা না হয় চলুন না, আর একটিবার সেই ঘরটা দুজনে ভাল করে দেখে আসা যাক। আর সেই সঙ্গে বাড়ির লোকদেরও দু-চারটে কথা জিজ্ঞাসা করে আসা যাবে।



বেশ তো! আপত্তি কি, চলুন!


তবে আর দেরি নয়—শুভস্য শীঘ্র—চলুন ওঠা যাক।


ইন্সপেক্টার মিঃ রহমানের গাড়িতে চেপেই কিরীটী ও রহমান সাহেব রওনা হলো পার্ক সার্কাসে নরেন মল্লিকের বাড়ির দিকে অতঃপর। এবং গাড়িতে বসেই একটা সিগারে অগ্নিসংযোগ করে ধূমপান করতে করতে হঠাৎ এক সময় কিরীটী আবার প্রশ্ন করে, আচ্ছা রহমান সাহেব, আপনি বলছিলেন নরেন মল্লিক বহুদিন বর্মা মুন্নকে ব্যবসা করেছেন। এবং মাত্র এক বৎসর আগে যদি তিনি হঠাৎ ব্যবসা গুটিয়ে দিয়ে এসে থাকেন, কেন এলেন? আর শুধু তাই নয়, এক বৎসরের মধ্যেই খুনও হলেন নৃশংস ভাবে। কিন্তু কেন, কেন


আপনার কথাটা ঠিক আমি বুঝতে পারছি না মিঃ রায়!


মানে, বলছিলাম তার অর্থাৎ মল্লিকের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে একটা details পেলে আমাদের তদন্তের সুবিধা হতো না কি?-অনেক সময় দেখা গিয়েছে এ সব ঘটনার পিছনে থাকে অনেক ব্যক্তিগত ব্যাপার জড়িত হয়ে।



সৌভাগ্যক্রমে খুনের পরের দিন সকালে তদন্তের সময়ই নরেন মল্লিকের এক পুরাতন বন্ধু, অ্যাড়ভোকেট সমীর রায় এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনিই বলেছিলেন, নরেন মল্লিক তার বহুকালের বন্ধু এবং নরেন মল্লিক হঠাৎ চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে এসে তারই বাড়িতে নাকি সর্বপ্রথম ওঠেন।


.


এক দিন সকালে ঠিক আজ থেকে এক বছর আগে।


সমীর রায় সকালে তার বাইরের ঘরে বসে ঐ দিনকার সংবাদপত্রটার ওপরে চোখ বুলোচ্ছে, বাইরে গেটের সামনে একটা গাড়ি থামবার শব্দ শোনা গেল। সমীর একটু কৌতূহলী হয়েই জানালার সামনে উঠে এসে দাঁড়াল। বাড়ির গেটের সামনে একটা মালবোঝাই ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে, ট্যাক্সির সামনে নরেন মল্লিক ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলছে।


নরেন! এ সময়ে হঠাৎ! কোন চিঠিপত্র না দিয়ে!


একটু পরেই নরেন এসে কক্ষে প্রবেশ করল।



নরেন তুই! হঠাৎ–


হঠাৎই। বর্মার ব্যবসা গুটিয়ে দিয়ে এলাম।


গুটিয়ে দিয়ে এলি? হঠাৎ


চলে এলাম আর ভাল লাগল না। কিন্তু তার আগে তোর চারককে বল, আমার চাকর মধু ট্যাক্সিতে আছে, মালপত্রগুলো নামিয়ে আপাতত কোথাও গুছিয়ে রাখবার জন্য হাত দিতে।


তা না হয় বলছি—কিন্তু—


ব্যস্ত হোস নে। সব বোলবো–


সমীর ভৃত্যকে ডেকে ট্যাক্সি থেকে সব মালপত্র নামিয়ে নিচের ভিজিটার্স রুমে আপাতত গুছিয়ে রেখে দিতে আদেশ দিল।


নরেন মল্লিকের চেহারাটা সত্যই দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। বাঙালীর মধ্যে সচরাচর এমন চমৎকার সুগঠিত, উঁচু, লম্বা, সুশ্রী দৈহিক গঠন বড় একটা দেখা যায় না। নরেন মল্লিকের বয়েস বর্তমানে উনপঞ্চাশ এবং বয়সের অনুপাতে দেহের কোথাও এতটুকু ভাঙনও ধরে নি। সমস্ত দেহ জুড়ে এখনো যৌবন যেন স্থির হয়ে আছে।



কেবল কপালের দুপাশের চুলে সামান্য পাক ধরেছে। গায়ের বর্ণ উজ্জ্বল গৌর। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। চঞ্চল, ক্রীড়াশীল ও কৌতুকপ্রিয় স্বভাব। নরেন মল্লিককে দেখলেই মনে হয়, সত্যিই যেন সে বেঁচে আছে। এবং পৃথিবীতে বাঁচবার সমস্ত রহস্যটুকুই যেন ওর করায়ত্ত।


.


দ্বিপ্রহরে আহারাদির পর নরেন ও সমীর মুখোমুখি বসে দুই বন্ধুতে সকালের কথারই জের চালাচ্ছিল। আজ রবিবার, আদালতও বন্ধ। ছুটি।


নরেন বলছিল, মোদ্দা কথা বন্ধু, I want to live the rest of my life, যদিও শাস্ত্রে বলেছে পঞ্চাশের পরেই বনং ব্রজেৎ, আমি স্বীকার করি না সে কথা। আমার ideal পুরুষ হচ্ছে বিখ্যাত ডাক্তার ও বৈজ্ঞানিক ভরেনহ। অর্থ না থাকলে বাঁচা যায় না। এতকাল সেই অর্থের ধান্ধায় ঘুরেছি, সময় পাই নি জীবনের দিকে তাকাবার, আজ অর্থ আমার করায়ত্ত, এবারে eat, drink and be merry! এবারে বাঁচতে চাই! So–



So? হাস্যোফুল ভাবে সমীর বন্ধুর দিকে তাকায়।


So একটা বাড়ি ও একটা গাড়ি সর্বাগ্রে প্রয়োজন; তারপর শুরু করবো আমার জীবন।


বাড়ি আর গাড়ি?


হাঁ। বর্তমান দুনিয়ায় বাড়ি, গাড়ি ও ব্যাঙ্ক-ব্যালান্সই আধুনিক কালে বাঁচবার প্রচেষ্টায় প্রথম তিনটি সোপান; শেষটি আমি সঙ্গে করেই এনেছি এবার, প্রথম দুটি তুমি সংগ্রহ করে দাও, শুরু করি আমি আমার জীবনের নতুন অধ্যায়।


বেশ!


বেশ নয়—একটি মুহূর্তও আর নষ্ট করবার মত হাতে নেই বন্ধু! জীবনের অনেকটা সময় চলে গিয়েছে অতএব আর অপেক্ষা নয়—বাড়ি তৈরী করবার ধৈর্য বা সময় আমার নেই। ৬০।৭০ হাজারের মধ্যে একটা বাড়ি ক্রয় করতে চাই আমি—আর a nice-looking carFord fluid-drive, ওলডমবিল বা স্টুডিবেকার—নিদেনপক্ষে হাম্বার বা রোভার-১২।



বেশ নয়—একটি মুহূর্তও আর নষ্ট করবার মত সময় হাতে নেই বন্ধু। জীবনের অনেকটা সময় একটা গাড়ি!


তারপর একটু থেমে বলে, দাঁড়াও, পার্ক সার্কাস অঞ্চলে একটা চমৎকার নব্যকেতার বাড়ি আমার এক ক্লায়েন্টের ডিসপোজালেই আছে, বাড়িটা ভালই—দোতলা, উপরে নীচে খান আষ্টেক ঘর, সামনে লন, পের্টিকো, পিছনেও ছোটখাটো একটা বাগান, গ্যারাজ, গেটের পাশে দারোয়ানদের থাকবার ঘর।


চমৎকার! দাম?


সেলামী নিয়ে বোধহয় হাজার ষাটেক পড়বে—মানে যার বাড়ি তিনি একটু বেকায়দায় পড়েই বাড়িটা বিক্রী করে দিতে চান, নইলে ও বাড়ি ধরে রাখলে হাজার আশি পর্যন্ত—


ডোন্ট ওরি, এখুনি ফোন কর কিন্তু ঐ সেলামীর কথা কি বলছিলে?


থাকতে মগের দেশে, অধুনা কলকাতার সংবাদ তো রাখ না! বাড়ির problem বর্তমানে এ শহরে যা হয়েছে! ঐ সেলামী হচ্ছে বাড়ি ভাড়া ও ক্রয়ের প্রথম সোপান। তা সেলামীও বলতে পার—আক্কেল সেলামীও বলতে পার কারণ প্রয়োজনটা যখন ক্রেতা বা ভাড়াপ্রার্থীর–



ঠিক আছে, ফোন কর।


বাড়ি দেখে নরেনের পছন্দ হয়ে গেল। সত্যি চমৎকার বাড়িটা। পরের দিনই বায়না করা হলো। এবং নির্দিষ্ট দিনে নতুন বাড়ি ও ফ্লুইড় ড্রাইভ একটা ফোর্ড গাড়ি কিনে নরেন মল্লিক গৃহপ্রবেশ করল। বাড়ির ফটকে নেমপ্লেট বসলো : শ্রীনরেন মল্লিক।


গেটের দারোয়ান বহাল হলো, খোট্টাই রামখেল সিং। আরো দুজন চাকর এলো, হরি আর যদু, পনের বছরের পুরাতন ভৃত্য মধু তো রইলই। ড্রাইভার নন্দুয়া এলো, পাচক উৎকলবাসী শ্রীমান জগন্নাথ। দামী দামী সাজসজ্জায় বাড়িঘরদোর ভরে উঠলো।


নিরহঙ্কার, সদালাপী স্বভাবের দরুন শীঘ্রই পাড়ায়, অভিজাত মহলে নরেন মল্লিকের নামটা এ-কান ও-কান হতে হতে দশ কানে ছড়িয়ে গেল। লম্বাচওড়া সুশ্রী চেহারা এখনো বিবাহাদি করে নি। বয়স যদিচ পঞ্চাশের কোঠায় চলেছে, এখনো অটুট স্বাস্থ্য ও যৌবনের প্রাচুর্যে ঢল ঢল, তার উপরে কাল্পনিক ব্যাঙ্ক-ব্যালান্সের গুজব, বাড়ি, গাড়ি এবং সর্বোপরি মিষ্টি সদালাপী অমায়িক ব্যবহার।


কলকাতার আধুনিক অভিজাত মহলে শীঘ্রই মুখে মুখে নরেন মল্লিক প্রসিদ্ধ হয়ে গেল। জাগিয়ে তুললো একটা রীতিমত সাড়া। অনেক অবিবাহিতা মেয়েদের মায়েরা নরেন মল্লিকের গৃহে প্রায়ই আনাগোনা করতে শুরু করলেন। আর এক শ্রেণীর মেয়ের মায়েরা আছেন, যাঁরা অল্পবয়সী ছেলে—জীবনে এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, সেই সব পাত্রের চাইতে মধ্যবয়সী প্রতিষ্ঠিত ও অর্থবান পাত্রদের ঢের বেশী পছন্দ করেন, তাঁরাও অনেকে সেজেগুজে মেয়েদের নিয়ে নিয়মিত হাজিরা দিতে শুরু করলেন মল্লিক পারলারে।



আজ পার্টি, কাল উৎসব—একটা না একটা লেগেই থাকত নরেন মল্লিকের গৃহে; মোট কথা নরেন মল্লিক যা চেয়েছিল তা দিনেই হাতের মুঠোয় এসে গেল। ঐ সঙ্গে এলো প্রতিষ্ঠা।


আত্মীয়স্বজন বলতে গৃহে নরেন মল্লিকের এক ভাগ্নে, নাম সুবিমল এবং বয়স তার ৩০৩২য়ের মধ্যে। সুবিমলও বিবাহাদি করে নি, বি. এ. পাস। ইনসিওরেন্সের মাহিনা করা দালাল। দেখতে সুশ্রী না হলেও মোটামুটি শরীরে একটা আলগা শ্ৰী আছে। বলিষ

**********