সূর্য তুমি সাথী

সূর্য তুমি সাথী

আহমদ ছফা

সূর্য তুমি সাথী

Books Pointer Iconআহমদ ছফা
Books Pointer Iconnovel

Posted byকমলা কান্ত10-Jul-2025

Change color

উৎসর্গ

ড: মফিজুদ্দীন আলী মুহাম্মদ চৌধুরী

শ্ৰদ্ধাস্পদেষু


বৈশাখের শেষ। আধা বছর জুড়ে বিশাল নীলাকাশে সূর্যের রূপোলী আক্রোশ সহস্র শিখায় শ্যামল পৃথিবীতে আগুন ঢেলেছে। অগ্রহায়ণের শেষাশেষি একদিন আসমানের চার কোণে জমাট বাঁধা কালো মেঘ কালো গাইয়ের ওলানের বরণ ধরেছিলো। বজ্রেরা চীৎকার করে ফেটে পড়েছিলো। মেঘের বুক চিরে চিরে বিজুলীর শাণিত ছুরি ঝিকঝিকিয়ে জেগেছিলো। লোকজন আতঙ্কে ফরিয়াদ করেছিলো অগ্রহায়ণ মাস পাকা সোনারঙ ধান ঘরে আসার মৌসুম। এমনি সময়ে যদি বৃষ্টি নামে। কথায় বলেঃ


‘যদি বিষ্টি আগনত

মানুষ যায় মাগনত’

(অগ্রহায়ণে যদি বৃষ্টি হয় মানুষ ভিক্ষে করতে বেরোয়।)


লোকজনের ভাগ্য ভালো। আসমানের আল্লাহর উদ্দেশে শোকর গুজার করেছিলো। অগ্রহায়ণে বিষ্টি হয় নি। পৌষে না। মাঘে না। ফাঙ্গুন-চৈত্র গেলো। বৈশাখও যাই যাই; আর কয়দিনই বা বাকী। এরি মধ্যে আকাশ একবারও করুণায় সজল হয়ে ওঠেনি। গনগনে সুর্যের হতাশনে রবিশস্যের ক্ষেত জ্বলে গেলো। ঢোড়া সাপের মতো তরমুজ লতার লক্লকে প্রসারিত ডগা মিইয়ে এলো। খরায় গাছের পাতারা তামাটে রঙ ধারণ করলো। আসমানের বিশাল ভয়ঙ্কর শুভ্র শিখার কুণ্ড লক্ষ লক্ষ আগুনে রসনার তাপে পলকে পলকে ধরিত্রীর রূপরস শুষে নিচ্ছে; গোলাকার প্রসারিত খোলের তলায় গলানো রূপোর মতো শিখারা ঝিলিমিলি খেলা করে। ডাইনে-বাঁয়ে-সামনে-পিছে যতদূর যায় চোখ–আগুন, আগুনের হলুদ শিখা। মাঠে আগুন, গাছে আগুন ফসলে আগুন, প্রকৃতির শিখাহীন নীরব প্রদাহের মতো মানুষের অন্তরে উদরেও আগুন, আগুনের কণা। সহস্র শ্রাবণের অক্লান্ত বর্ষণের ঝিকিমিকি বহ্নিমান, অনিভন্ত।


আগুনের জোয়ার ফোলা সাগর সাঁতরে যেনো এলো হাসিম। তার বুকে-পেটে, চোখে-মুখে আগুন। ধুকে ধুকে বন্যা পুকুরের বটতলায় এসে কাঁধের লাকড়ির ভারখানা নামালো। বটগাছ যেখানে শীতল ছায়া মেলে দিয়েছে, সেখানেই ছায়ার কোলে আধা সেদ্ধ শরীরখানা এলিয়ে দিলো। মাটির ভাপে শুকিয়ে যাওয়া ঘাসের ওপর বাদবাকী শরীরখানা রেখে চোখ বুজে রইলো। কিছু ভাবতে পারে না হাসিম। ভাবনার সূত্র জ্বলে গেছে। বন পেরিয়ে বিলে নামার পর থেকে এ বটগাছ স্নেহময়ী জননীর মতো ছায়াভরা হাতছানি ডেকে ডেকে পাক্কা চার মাইল পথ গরম তাজা বালুর ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে এসেছে তাকে। চোখ বুজে থাকতে পারে না। আগুনে পোড়া অর্ধগ্ধ শরীরের চেতনায় কি এক অনুভূতি জেগে উঠতে চায়। সূর্যের ধারালো নখর বুকের ভেতর যেখানে কজে, সেখানে তপ্ত গরম ছ্যাকা দিয়েছে।


লুঙ্গিটা বদলে গামছাখানা কোমরের গিঠ খুলে পরে নিলো। তারপর তালগাছের পিছল ঘাটের ওপর বসে দু’হাত পানিতে ডুবিয়ে আঁজলা ভরে এক আঁজলা পানি তুলে নিলো। ফেলে দিলো। পুকুরের পানিতেও আগুন। এক পা, দুপা করে ধীরে ধীরে গলা পানিতে নেমে এলো। ঝুপ করে একটা ডুব দিলো, আরেকটা ডুব দিলো। ধুলোয় ধুসরিত গা ডলতে ডলতে অনেকগুলো ডুব দিলো। পানির ওপরে কালো মাথা জাগিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। হাসিমের দেহের উত্তাপ শীতল পানি শুষে নিচ্ছে। লোমকূপের গোড়ায় কাঁপছে স্নিগ্ধ শীতল অনুভূতি। তার প্রাণ, অনুভূতি ফিরে এলো দেহে। কেমন শান্ত, নিবিড়, মেহঘন ছোঁয়া।


একটা কক্সবাজারের বাস হর্ণ বাজিয়ে দক্ষিণে ছুট দিলো। দু’টো রিক্সা আঁকাবাঁকা রোডের ওপর ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে চলছে। ধীর মন্থর গতি। টুং টাং ঘন্টাধ্বনি বাতাসে ভেসে চলে যায় অনেক দূর। আকাশের বুকে তীক্ষ্ণ তেরছা একটা রেখা টেনে একটা পাখি উড়াল দিলো। সূর্যের আলো বাদামী রঙের পাখনায় চিকচিক করে ঝলসে ওঠে। একটা চিল দিকচক্ৰবালে চক্রাকারে ক্কর খেলছে। পানির সমতলে পড়ছে ছায়া। রোদজ্বালা দুপুরের তপ্ত নির্জনতাকে ফালি ফালি করে কেটে চিহি স্বর বেজে উঠছে। চোখ-জ্বলা রোদে চিলের মর্মন্তুদ চিহি ডাক বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়… আলোড়নের মতো ছড়িয়ে পড়ে।


গা ধোয়া সেরে পুকুর থেকে উঠে আসে। গামছা বদলে আবার লুঙ্গি পরে নিলো। চিপে চিপে ঝেড়ে ফেললো সমস্ত পানি। তারপর গামছাখানা মাথায় মেলে গিয়ে বসে বটগাছতলায়। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। বাতাসের তোড়ে ছোটো ছোটো প্রশাখাগুলো দুলে উঠে। নির্জনতার ভেতর থেকে শরশর শব্দ আসে। বটগাছ যুগ যুগান্তরের উত্থান-পতনের সাক্ষী। হাতির গুঁড়ের মতো বিরাট বিরাট ঝুড়িগুলো তৃষ্ণার টানে মাটিতে নেমে এসেছে। ডালপালা পত্র-পল্লবে আকাশখানা কিছুদূর অদৃশ্য করে ফেলেছে। মৃত্তিকার অন্তরের সংগোপন রসে পাতাগুলো সবুজ, সরস। হাওয়ার ঘায়ে কেঁপে কেঁপে ওঠা প্রাণময় প্রসারিত ছায়ার মধ্যে মৃত্তিকার সংগোপন মমতাকেই মেলে ধরেছে।


একটু ভালো লাগছে হাসিমের। সারা শরীরে টলছে ঘুম ঘুম ঝিমানি। পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঘোরাফেরা করে চোখ। ওই হোথা মগডালে বাসা বেঁধেছে দুটো কাক। কোকিল একটা ডাকছে কু…কু। পাতার ফাঁকে অস্বাভাবিক জ্যোতির্ময় কালো দু’চোখ দেখা যায়। কতো কালো আর কণ্ঠস্বর কি মধুর! অন্তরের ভেতরটা পর্যন্ত ঠান্ডা করে দেয়। সবচে’ নীচের ডালটার দিকে চোখ পড়তে চমকে ওঠে।


এখনো যেন দাঁড়িয়ে আছে মানুষটা। পরনে শতচ্ছিন্ন হাঁটু ধুতি। গায়ে বুক চেরা ফতুয়া। সারা শরীরখানা গাব রাঙানো জালের উজ্জ্বল তুলিতে ছাপানো। কালীনাগের মতো চকচকে কালো। সাপের ফণার মতো পেশীগুলো। অভ্যন্তরে লুকিয়ে আছে শক্তি যে শক্তি দিয়ে পাহাড় পাথর চুরমার করা যায়। দাঁড়িয়ে আছে স্থির নিস্পন্দ, নিষ্পলক। চোখজোড়া দুরূহ জিজ্ঞাসায় বিষণ্ণ। তেলীপাড়ার তেজেন। চিনতে এতোটুকু কষ্ট হয়নি হাসিমের। দাঁড়িয়ে আছে মাটি থেকে একহাত ওপরে। ঘরের গাইয়ের শক্ত পাকানো নতুন দড়িখানা গলায় কষে লেগেছে। কিছু দূর কেটে গেছে। দড়িতে ক’ফোঁটা রক্ত। হাসিমই তো পয়লা দেখেছিলো। সে যাচ্ছিলো পাহাড়ে। ভোর রাত। মোরগ বাগ দেয়নি। পৌষালী কুয়াশার জমাট আস্তরণের ভেতরেই দেখেছিলো। চিনেছিলো তেলীপাড়ার তেজেনদার না হলে শিশুকাঠের মতো অমন সবল শরীর আর কার? তাই ডাক দিয়েছিলোঃ


“তেজেনদা, এত রাতিয়া কিল্লাই বাইর অইয়স যে”। (তেজেনদা, এতো রাতে কেন বেরিয়েছো?)


তেজেনদা কোনো জবাব দেয়নি বার বার ডাকার পরও। কাছে এসে গায়ে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো হাসিমঃ


“কি তেজেনদা রাগ অইয়স যে না কথা ন কস ক্যা?” (কি তেজেনদা, রাগ করছো, কথা বলছো না কেন?)


গাছের ডালে ঝুলন্ত শরীর তেজেনের দুলেদুলে জবাব দিয়েছিলো। হা, সে রাগ করেছে, সমগ্র পৃথিবীর ওপর তার রাগ। সমস্ত মানুষের ওপর অভিমান। তাই সে কথা বলবে না; কোনো দিন কথা বলবে না। সকাল হলে পরে হাসিম ঝুলেপড়া জিহা, রক্তের স্বাক্ষর আঁকা রঞ্জু আর তেজেনদার দু’চোখে সে একটি উদ্ধত জিজ্ঞাসাই দেখেছিলো, আরো সকলে দেখেছিলো। কেউ কোন কথা বলে নি। কেবল ছতুর বাপ তসবীহ্ টিপতে টিপতে মন্তব্য করেছিলো।


“আত্নহত্যা মহাপাপ। কাফের এনে তো যাইত দোযখ। একই কথা। ফি নারে জাহান্নামে হালেদিনা।” (কাফের এমনিতেও নরকে যেতো, একই কথা, তার জাহান্নাম নরকে স্থান)


কোনো হিন্দু মরলে তাকে জাহান্নামের আগুনে জ্বালাবার অনুরোধ করাটাই বিধি। অভাব, দুঃখ, নির্যাতন, উপবাস থেকে মুক্তি পাবার আশায় শীতজর্জর পৌষের এক কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে গাছের ডালের সঙ্গে এক মাথা, দড়ির আরেক মাথা নিজের গলায় পরিয়ে ধাক্কা দিয়ে মইটা ফেলে ঝুপ করে ঝুলে ছিলো মুক্তির আশায়। হাসিমের এখনো চোখের সামনে ভাসে তেজেনদার চিরতরে নির্বাক হয়ে যাওয়া চোখের সে প্রশ্নিল দৃষ্টি।


বুকের সমস্ত বেদনা মথির করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। হায়রে! আল্লাহ, এতো অত্যাচার তোর রাজ্যে। হাতির মতো বলবান তেলীপাড়ার তেজেনদাকেও গলায় দড়ি দিয়ে মুক্তি খুঁজতে হলো। শ্বাস নিতে পারে না হাসিম। বুকের ভেতর তেজেনদার সে জিজ্ঞাসা যেন সূচীমুখ কোনো তীক্ষ্ণতম যন্ত্রণার মতো বাজে। সে নড়েচড়ে বসে।


বেলা পড়ে এসেছে। সূর্য হেলেছে পশ্চিমে। পেটের ক্ষুধাটাও চাড়া দিয়ে উঠেছে। সেই কবে সাত সকালে দু’টো পানি ভাত খেয়ে বেরিয়েছে। আজকাল একভার লাকড়ির জন্যও বাঁশমুরায় (জঙ্গলে) না গিয়ে উপায় নেই। শালার কন্ট্রাকটারেরা ধারে কাছে কিছু রাখেনি। এ পাহাড়, সে পাহাড় কতো পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। একেকটাতে উঠতে বুকের লহু গেছে পানি হয়ে। যাওয়া আসায় বারো মাইলের কম পথ তো তাকে হাঁটতে হয়নি। অন্যদিন কলাপাতায় ‘মোচা বেধে ভাত নিয়ে যায়। গতকাল বাজার থেকে চাল, তরকারী কিছু আনতে পারেনি বলে ভাতও নিতে পারেনি। পেটের ক্ষুধাটা যতোই চাড়া দিচ্ছে, ততই তার উঠতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ঘরের কথা মনে হতেই ওঠবার শক্তি আপনা থেকে হারিয়ে ফেলে। পা দুটো মাটির মতো হয়ে মাটির সঙ্গে লেপ্টে থাকে।


ঝম্‌ ঝম্ শব্দ করে রেলের গাড়িখানি বরগুইনীর লোহার পুলের ওপর দিয়ে চলে গেলো। পড়ন্ত সূর্যের আলোতে চিকচিক্ জ্বলে। হাসিমের মনে চিন্তা… একমুঠো ভাতের চিন্তা। পোড়া চোখ ধায় রূপের দিকে, কিন্তু…।


বিল কোণাকোণি পথে বানা্যা পুকুরের পাড়ে উঠে এলো অধরবাবু। পেছনে ছেলেটা। ছেলেটার হাতে মাছ রাখার ডুলা। অধরবাবুর হাতে জাল। জালের পাক খুলে এদিকে সেদিকে কয়েকটা খেপ দিলো। একটা মাছও আসেনি। তারপর অগ্নিকোণ বরাবর জালটা সড়ত করে আমগাছে নিবিড় ছায়া যেখানে ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানেই ছুঁড়ে মারলো। জাল মাটিতে লাগার সঙ্গে সঙ্গেই ওপর দিকে ঠেলে লাফ দিলো চওড়া বালিশের মতো একটা মস্ত রুই। লাল মুখ লাল পাখনা দেখা গেছে পরিষ্কার। সাদা আঁশগুলো রূপোর টাকার মতোন ঝিলমিল করে জ্বলে উঠলো। ছিঁড়ে যেতে পারেনি। রেশম সুতোর জাল, খেপের তলায় যক্ষ পড়লেও বেঁধে রাখে। লুঙ্গিটা মালকোঁচা দিয়ে গলা জলে নেমে এলো অধরবাবু। ডুব দিয়ে জালটাকে মাছের শরীরের সঙ্গে আচ্ছা করে জড়িয়ে কোমর জলে আসে। মাছের হেঁচকা টানে অধরবাবুর লিকলিকে শরীর বার বার বাঁকা হয়ে যাচ্ছে ধনুকের মতো। শেষ পর্যন্ত মাছ জড়ানো জাল একেবারে পারের সমতলে এনে রাখলো। বিরাট রুইটা শুকনো ডাঙার ওপর দাপাদাপি লাফালাফি করছে। পুচ্ছ তাড়না আর বাতাসে খাবি টানছে। অধরবাবুর মুখে বিজয়ীর হাসি। নিজের জালে ধরা মাছ কিনা, দেখতেও সুখ।


হাসিম ধড়ফড়ানো রুইটার কছেল্লা দেখে পায়ে পায়ে একেবারে অগ্নিকোণে চলে এলো। ইঃ বাবা, কতো বড়ো রুই! লেজ পাখনা লাল হয়ে গেছে। কতো বছরের পুরানো কে জানে। বড়ো চালাক মাছ। পানি কমে গেছে, তাই ধরা পড়লো। মাছটার পুচ্ছ তাড়না তার স্মৃতিতে তেজেনদাকে ডেকে আনে। হয়ত তেজেনদাও ঝুলে পড়ে এমনি করে ধড়ফড় করছিলো। হঠাৎ মনে হয় এই মাছটি তেজেনদা, আর তার ভাগ্য যেন একসুত্রে বাঁধা পড়ে গেছে। আরো কতো ভাবনার উদয় হয় মনে। আকারহীন অবয়ভহীন সব ভাবনা।


হাসিমের দিকে চোখ পড়াতে অধরবাবুর হাসি-হাসি মুখখানা গম্ভীর হয়ে যায়। কপালে স্পষ্ট ঘৃণার কুঞ্চিত রেখা জাগে। থু করে একদলা থুথু হাসিমের পানে ছুঁড়ে দেয়। তারপর জালের সংগে মাছটা জড়িয়ে চোখের কোণে তাকে বিদ্ধ করে বিলে নেমে হাঁক দিলোঃ


“আয়, গণেশ্যা চলি আয়।” (আয়, গণেশ চলে আয়।)


এতোক্ষণে হাসিমের চেতনা হয়। ছোটলোকের চাইতেও ছোটলোক সে। অধরবাবু মুখের ওপর থুথু ছুঁড়ে দিলো? একটা চাপা নিঃশ্বাস হাওয়ার শরীরে বিধে গেলো। ভাগ্য বিরূপ না হলে সেও এ পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরতে পারতো। বাপের ওপর তীব্র আক্রোশ জাগে। কি দরকার ছিল মুসলমান হওয়ার। অবশ্য শেষ বয়সে বুড়ো বলতো, ধন সম্পদ কিছুর লোভে নয়, শুধু বেহেস্তের খাতিরে আমি মুসলমান হয়েছি। কিন্তু তার কণ্ঠস্বরটা বড়ো শুষ্ক; বড়ো করুণ শোনাতো। নিজের গলার স্বরে নিজেই চমকে উঠতো। নিজেকে যেমন পরকেও তেমনি লোকটা ফাঁকি দিয়েছে। হৃদয়ের সঙ্গে চিরটা জীবন কেবল মিথ্যা কথাই কয়ে গেলো। কোন বেহেস্তের মায়া! তা কি হাসিমের অজানা? কাজী সাহেবের মেয়েকে কি একটিবার পেয়েছিলো? তামাম জীবন এ পরিবারের দাসীর সঙ্গে ঘর করে মরতে হলো।


বাপের মৃত্যু-পাণ্ডুর বিবর্ণ-শ্লান মুখচ্ছবিটা মনে পরতেই মনটা তার নরম হয়ে এলো। অলিগলি করুণার রসে আর্দ্র হয়ে আসে। বাপের সীমাহীন বেদনা তার চেতনায় সঞ্চারিত হলো। বেলা পড়ে এলো লাকড়ির ভারটা আবার কাঁধে ফেলে বিলের মাঝ দিয়ে পায়ে পায়ে সৃষ্ট দূরের চিকন রেখা পথটা বেয়ে ঝিমে ঝিমে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। মাটির তাপ

**********