মেঘে ঢাকা তারা

মেঘে ঢাকা তারা

শক্তিপদ রাজগুরু

মেঘে ঢাকা তারা

Books Pointer Iconশক্তিপদ রাজগুরু
Books Pointer Iconnovel

Change color

মাধববাবু তক্তপোশে বসে বেশ ছোটখাটো লেকচার দিয়ে চলেছেন; তক্তপোশে, মেঝেতে এদিক-ওদিক বসে কয়েকজন ছেলে। স্কুল ফাইনাল দিতে চলেছে তারা।

—তাহলে বুঝতে পারলে, এই পরীক্ষাই জীবনের প্রথম বৃহত্তর জগতে প্রবেশের পথ। কি রে পরশা?

পরেশ মাথা চুলকোচ্ছে।


—আজ্ঞে ইংরাজিটারেই ভয়!


মাধববাবু আশ্বাস দেন—ভয় কি রে! টেস্টে তো ভালো নম্বর ছিল। আমার হাতে ফার্স্ট পেপারে পঞ্চাশ পেয়েছিস! কইরে তামাকটা!


একজন ছেলে ফুঁ-দিয়ে কলকেটা তুলে দেয় হুঁকোতে বসিয়ে। দুবার টান দিয়ে একটু ধাতস্থ হন মাধববাবু।


—হ্যাঁ, বলছিলাম দেশের কথা। নৌকায় করে মাদারিপুর সদরে যেতাম, পথে আঠারোবাঁকির ধারে গঞ্জের হাট থেকে উঠত তরমুজ, ফুটি।


ও হ্যাঁ!…


হঠাৎ কি মনে পড়তেই উঠে পড়েন।


—একটু বসো তোমরা, আসছি! ওগো—


ছিটে বেড়ার ঘরের ফংবঙে দরজাটা দিয়ে হাঁকতে হাঁকতে ভিতরে ঢুকেই রান্নাঘরের দাওয়ায় স্ত্রীকে দেখে চমক ভাঙে মাধব মাস্টারের।


—কই, হল তোমাদের?


কাদম্বিনী যেন আকাশ থেকে পড়ে—কী হবে?


মাধববাবু আমতা আমতা করেন।


—মানে ওরা চলে যাচ্ছে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে, এতকাল প্রতি বৎসরই যাবার আগে ওদের তো কিছু জলযোগ করতে বলি, তাই এবারও—


কাদম্বিনী অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে।


এতকাল আর আজকাল!


এই দুটোর মধ্যে যে একটা আকাশ-জমিন পার্থক্য গড়ে উঠেছে, এত চেষ্টা করেও ওই খেয়ালি আপন-ভোলা লোকটিকে তারা তা বোঝাতে পারেনি।


সেদিন ছিল নিজের দেশ, নিজের কিছু জমিজারাত, একটু আশ্রয় ছিল। সাতপুরুষের গ্রামে একটু মান-সম্মান পরিচিতিও না থাকা ছিল না। আজ সব কোন দিকে হারিয়ে বানেভাসা খড়কুটোর মতো ভাসতে ভাসতে এসে ঠেকেছে এই অচেনা অজানা ঠাঁই-এ, সামান্য ওই স্কুলমাস্টারির চাকরিতে ভরসা করে, তা ওই আপনভোলা লোকটিকে বোঝাতে পারে না কাদম্বিনী। একার রোজগার আর ওই এতগুলি পোষ্য। অভাব আর অনটনের নগ্নছায়া এ সংসারের সর্বত্র।


মাধববাবু স্ত্রীর দিকে চেয়ে শিউরে ওঠেন।


—মানে তাড়াহুড়োয় তোমাকে বলতে বোধহয় ভুলে গেছি!


কাদম্বিনীর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। অসময়ে এত ঝামেলা! শুধু মেহন্নতই নয় বেশ কিছু খরচাও। বেশ চড়াস্বরেই জবাব দেয় কাদম্বিনী।


—কেতাত্ব করেছো! এখন পাই কোথা?


—এতদিনের রীতি উলটে যাবে? মানে যা হয় কিছু মিষ্টিমুখ—


নীতা বাবার অবস্থা দেখে এগিয়ে আসে, মাকে সামলাবার চেষ্টা করে।


—আঃ, কী করছো মা! বছরের একটা দিন বই তো নয়?


মাধববাবু সাহস পান—দেখ দিকি মা!


নীতাই দায়িত্ব নেয়—তুমি বাইরের ঘরে গল্প করো বাবা। আমি দেখছি।


মাধববাবু নীতাকে দেখে ভরসা পান।


—বেশ, বেশ! সত্যি আমারই ভুল হয়ে গেছে। মনেই ছিল না যে তোদের ও কথাটা জানানো দরকার। তা বসুক ওরা একটু, ইংরাজিটাই আলোচনা করি। কাজ হবে ওদের, তুই এদিকে জোগাড় কর।


মাধববাবু চলে যেতেই কাদম্বিনী মেয়ের দিকে মুখ তুলে চাইল, বজ্রের দীপ্তি ভরা সেই চাহনি, যেকোন মুহূর্তেই বর্ষণ শুরু হবে। নীতা মাকে চেনে, চুপ করে কি ভাবছে। প্রশ্ন করে কাদম্বিনী।


—কী করা হবে জোগাড়ের? খুব তো বলা হল!


—তুমি উনুনে আঁচ দিয়ে দাও।


নীতা এগিয়ে গেল দরজার কাছে—এই পরেশ?


পরেশ পাশের ঘর থেকে বের হয়ে আসে, নীতা তার হাতে কয়েকটা টাকা তুলে দিয়ে বলে—দু’সের ময়দা, পোয়াদেড় ঘি, আর চিনি একসের নিয়ে আয়।


পরেশ কিছু বলবার চেষ্টা করে, নীতা ধমক দিয়ে ওঠে।


—যাও। বের হয়ে গেল সে।


কাদম্বিনী গজগজ করে উনুনে আগুন দিতে থাকে।


—এক দিনের সংসার খরচা। গেল তো!


—যাক মা। আমার টাকা থেকে দিলাম।


—তাও তো সংসারেই থাকত। এসব নবাবী আমার ভাল লাগে না নীতা। গজগজ করে আপন মনে কাদম্বিনী।


—ছাত্রদের নেমতন্ন! যত্তোসব-


.


ও ঘর থেকে হাসির শব্দ শোনা যায়। নীতাও উৎকর্ণ হয়ে শুনছে, মাধববাবু গল্প ফেঁদেছেন। বেশ উৎসাহভরে


—সনৎ ছিল সেবার ফার্স্ট বয়, ফ্রি তো পাবেই, স্কলারশিপও নেবে। পাশের গাঁ মদনপুর স্কুল থেকে ওকে বলল ফ্রিশিপ দোব, বোর্ডিং ফ্রি দোব। ওকে লুফে নেবার জন্য কত ঝুলোঝুলি। সনৎ গেল না শুধু আমার ইংরাজি পড়ানো দেখে।


একটু দম নিয়ে আবার শুরু করেন।


—পীরগঞ্জ স্কুলকে জেলাস্কুলও ভয় করত, বুঝলি। সেবার ইনস্পেক্টার এসে কি বেকুব খুব কড়াকড়ি পরীক্ষা করেছেন ক্লাসে গিয়ে। তারপর নিজেই ঠাণ্ডা। স্রেফ ‘ইনভার্টেড কমা’র হরফে ওই সনৎ ঠাণ্ডা করেছিল তাকে। ও ছিল জুয়েল।


নীতার ময়দা মাখা যেন বন্ধ হয়ে যায়। বিকালের ম্লান আলো পড়েছে ঝিঙেলতার ফুলে, কোথায় পাখি ডাকছে। শনশন হাওয়া হাঁকে নারকেলগাছের মাথায়, মনটা কেমন কোন সুদূরে উধাও হয়ে যায় দূর আকাশে মেঘের ভেলায়। হঠাৎ বাবার ডাকে চমক ভাঙে।


—হল রে?


—হচ্ছে বাবা।


ময়দার লেচিগুলো বেলতে থাকে নীতা। লুচি ভাজছে কাদম্বিনী। মুখের মেঘ তখনও কাটেনি। বলে ওঠে—


—কিছু সরিয়ে রাখ নীতা, গীতা মন্টু আছে। যা ধরে দিবি ওই ধুন্দুর দলের সামনে, সব যাবে। রাতে আজ রান্না হবে না। বুঝলি?


তবু যাহোক একটু সাশ্রয় করতে চায় না! নীতা মায়ের দিকে চেয়ে থাকে। উনুনের একঝলক আভা পড়েছে মায়ের শীর্ণ গালে। এককালে সুন্দরী ছিল। আজ সংসারের কঠিন চাপে, অভাব আর হতাশার তাড়নায় মায়ের দেহমন সব বদলে গেছে। একটা কাঠিন্য ফুটে উঠেছে, জীবনসংগ্রামে বিপর্যস্ত একটি নারীর ছবি—জীবন্ত ছবি।


বাইরের ঘরে হাসির শব্দ উঠেছে। মাধব মাস্টার হাসছেন, অট্টহাসি। জীবনকে তুচ্ছ করে তোলার প্রচেষ্টা ফুটে উঠেছে ওই হাসির ছন্দে—শব্দে।


ঘরছাড়া দেশছাড়া হয়ে পর-মাটিতে উঠে এসেছে তারা। চারিদিকে শুধু অভাব আর অনটন, তারই সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ যেন শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে উঠেছে কাদম্বিনী।


হাড়মাস ভাজা-ভাজা হয়ে গেছে। ওই হাসির শব্দ শুনে গা জ্বলে ওঠে। নীতার দিকে চেয়ে থাকে, নীতার চোখেও ওই হাসির সংক্রমণ।


—বাবা যেন কি!


—ওর নিয়ে ও আছে। নইলে হাসি আসে? মরণ! মেয়ের দিকে চাইল কাদম্বিনী।


হঠাৎ মায়ের কঠিন দৃষ্টির সামনে কি যেন দুর্বলতা ধরা পড়ে যেতেই অপ্রস্তুত হয় নীতা, মাথা নিচু করে ময়দা বেলতে থাকে।


ওরা খাওয়ার পর চলে গেছে।


মা মেয়ের এই মতদ্বৈততার মাঝে চটির শব্দ তুলে ঢোকেন মাধববাবু। ছোট ছেলে মন্টু একটা পিঁড়ির ওপর বসে লুচি খাচ্ছে। ছোট ছেলের দিকে চেয়ে মাধববাবু বলে ওঠেন,—


—তোর আর ওদিন আসবে না মন্টু। এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উঠতেই যা মাড়ন পাড়ন চলেছে, ফাইনালে যাবার ধকল তাতে সইবে না।


মন্টু যখন তখন কথা বলা নিরাপদ মনে করে না। চুপ করে খেয়ে যায়। মাধববাবু স্ত্রীর দিকে না চেয়েই বলে ওঠেন নীতাকে।


—ওরা খুব খুশি, বুঝলি নীতা। এ ব্যাচে দু’চারটে ভাল ছেলে আছে। তবে তেমন কিছু নয়।


কাদম্বিনী ঝাঁঝিয়ে ওঠে—ওরা বি. এ. এম. এ. পাশ করলে চারটে হাত গজাবে?


—করুক না, তোমার মেয়েও বি. এ. পাশ করবে বড়বউ। কি বল নীতা? ওর যা বুদ্ধিশুদ্ধি। এত ছেলে-মেয়ে দেখলাম ওর মত ক্বচিৎ নজরে পড়েছে। অনার্স নিয়ে পাশ করে যাবে ও।


মাধববাবু হুঁকো টানতে থাকেন; জুতকরে পিঁড়ি টেনে বসে।


কাদম্বিনী স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছে; সদ্য অপব্যয়ের দুঃখ তখনও সামলাতে পারেনি। তার উপর আবার সেই পুরনো ঘায়ে আঘাত করেছেন মাধববাবু। পীরগঞ্জের প্রাচুর্যের দিনগুলো তখনও মনে রয়েছে স্মৃতির মতো।


ওই আপনভোলা লোকটিকে নিয়ে পদে পদে কি নাকাল না হতে হয়েছে তাকে। স্বামীকে দেখেছে দিনরাত ডুবে রয়েছে মোটা মোটা বইয়ের মধ্যে, না হয় স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে গল্প-গুজবে। যে সময় অন্য মাস্টাররা টিউশানি করেছে একটার পর আর একটা, সেই সময় তিনি নিজে পড়ে পড়ে সময় নষ্ট করেছেন। না-হয় গরিব ছেলেদেরকে বিনা মাইনেতে পড়িয়েছেন। পীরগঞ্জে তাই করেছেন আজও তেমনিই চলেছে। এর আর হের ফের হয় নি।


কাদম্বিনী বাধা দিয়েছে—কি হবে ঘরের খেয়ে বরে মোষ তাড়িয়ে। টাকাকড়ি দেয় কিছু ওরা? বিনি মাইনেতে কেন পড়াবে?


—দেবে কোত্থেকে? কিন্তু সারা জীবনে ওরা মাধব মাস্টারকে ভুলবে না বড়বউ! —ছাই! তাতে কার কি এল গেল?


নিজের কথা কোন দিনই ভাবেননি। অন্য জগতের চিন্তায় মশগুল। সংসারের দিকে ফিরেও চাননি। দেশের ছেলেকে মানুষ করতেই দিন গেছে। নিজের ছেলেদের পর্যন্ত মানুষ করতে পারেননি। বড় ছেলে শঙ্কর বার কয়েক ম্যাট্রিক দিয়ে ফেল করার পর হাল ছেড়ে দিয়েছে। মন্টু পড়ছে, তবে সেদিকে বিশেষ মন নেই তার। তাকেও খরচার খাতাতেই লিখে রেখেছেন তিনি।


বলেন—গাধা পিটিয়ে ঘোড়া হয় না বড়বউ।


পড়েছেন এইবার নীতাকে নিয়ে। মেয়েকে পাশ করাবেন। নিজেই আবার রীতিমতো পড়ছেন মেয়েকে পড়াবার জন্য। বই আর পড়াশোনা আর ছাত্রদের গল্প, এই নিয়েই জীবন কেটেছে, দিন কাটছে এখনও


কিন্তু সংসারের সেই দৈন্য কোনো দিনই ঘোচেনি। উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। একটা কালো ছায়া ঘিরে আসছে এই ছোট্ট বাড়িটাতে।


সেদিনও সংসারের টাকা থেকে কয়েক টাকা সরিয়ে পুরনো বই একরাশ কিনে এনেছেন ফুটপাথ থেকে। ছেলেমেয়েদের ভাতের উপর তরকারি দিতে পারেনি, পরনের পোশাকও জোটেনি। এই তো এতদিনের বিদ্যাসাধনার মুরোদ।


আজ আবার মেয়েকে নিজের পথে নিয়ে যাবার জন্য স্বপ্ন দেখেন মাধববাবু। কাদম্বিনী সহ্য করতে পারে না। এত দিনের সঞ্চিত জ্বালা ফেটে পড়ে দুর্বার প্রতিরোধে নীতাকে পড়াবার কথায় কাদম্বিনী বলে ওঠে।


—হ্যাঁ, তা আবার নয়। এত লেখাপড়া শিখে নিজে তো দু’হাত বের করে খাচ্ছো, ভাতের ওপর তরকারি জোটে না, দুটো পয়সার মুখ দেখলাম না জীবনে। মেয়েকেও আবার সেইপথে নিয়ে যাবার শখ।


মাধববাবু নীতার দিকে আশ্বাস ভরে তাকালেন, মেয়েকে ভরসা-স্থল বলে মনে হয়। কিন্তু নীতা নেই, কি আনতে রান্নাঘরের ওদিকে গেছে।


মাধববাবু স্ত্রীর সামনে অসহায়। বাইরের সেই আনন্দমুখর লোকটি স্ত্রীর দিকে তাকালেন—তবে? সমস্যা সমাধানের পথ তাঁর সামনে নেই।


কাদম্বিনী বলে ওঠে—ও মেয়েকে বিয়ে-থা দেবার চেষ্টা করো। পড়িয়ে কাজ নেই। ঢের হয়েছে।


—বিয়ে? সে-যে অনেক টাকার ব্যাপার!


মন্টু বাবার সামনে বেশিক্ষণ থাকতে চায় না। কোনো রকমে গো-গ্রাসে গিলে উঠে পড়ে। নীতাও এরকম প্রসঙ্গ উঠবে মনে করেই সরে গেছে। মাকে চেনে সে। ওর কণ্ঠে শুধু অভাবের জ্বালাই ফুটে ওঠে।


মাধববাবু বলেন—তা ছাড়া ওই কালো মেয়েকে কে বিয়ে করবে বলো? তাও বিনা পণে?


ঢুকতে গিয়ে নীতা দরজার কাছে থমকে দাঁড়াল। তার রূপ নেই, সারা দেহ ঘিরে যৌবনের ব্যর্থ গুঞ্জন, সেই কথাটাই পুরুষের কাছ থেকে শুনে চমকে ওঠে নীতা। সব আলো যেন নিভে আসে। সরে গেল ওদিকে।


মাধববাবু ভাবছেন


লেখাপড়া শেখানোর ব্যাপারে খরচ যা আছে তা কিস্তিবন্দি, নীতা নিজেই তা রোজগার করে নেয় টুউশানি থেকে। মাধববাবু বলে-কয়ে স্কুলে গার্লস সেকশনে একটা চাকরির ব্যবস্থাও করেছেন তাতে সংসারের সুরাহা হবে, নীতাও পড়াশোনা চালাতে পারবে।


কিন্ত বিয়ে? তার মতো বিত্তহীন দরিদ্রের ওই কুশ্রী মেয়ের জন্য কোনো রাজপুত

**********