
পাখসাট
বুদ্ধদেব গুহ
কুসুমের বয়স যখন তার মেয়ে সল্লির বর্তমান বয়েসের সমান ছিল, তখন সল্লিও ছিল কুসুমের একমাত্র মেয়ে। আজকের জলপিপির-ই মতন বয়সি।
চার বছরের জলপিপি। খুব পাকা-পাকা কথা বলে। মাথাভরতি কোঁকড়া চুল। গ্ল্যাক্সো বেবির প্রাইজ পেয়েছিল। একা বাড়িতে শেষবসন্তর দুপুরে বসে এইসব ভাবছিলেন কুসুম।
তাঁর পঁয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে একবার-ই আলোড়ন উঠেছিল। একজন এসেছিলেন।
অবিবাহিত পুরুষকে কি পরপুরুষ বলে? কে জানে! অত ভালো বাংলা জানেন না উনি। একজন-ই এসেছিল বটে কিন্তু সেই সম্পর্কের মাধুর্যের মধ্যে যে, গভীর এবং তীব্র দুঃখ মেশানো ছিল তা আজও কুসুম ভুলতে পারেনি। সেই মানুষটিকে একদিন দুঃখ দিয়ে এবং নিজেও দুঃখ পেয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি তাঁর জীবন থেকে। সেই অপরাধবোধে আজও তিনি ক্লিষ্ট। কুসুম জানেন যে, প্রেমের আনন্দ থাকে শুধু স্বল্পক্ষণ, প্রেমের বেদনা থাকে সমস্ত জীবন।
তাঁদের প্রজন্মের মানুষেরা, বিশেষ করে মেয়েরা, বড়ো গোঁড়া ছিলেন। তাঁর মেয়ে সল্লিদের প্রজন্ম অনেক অন্যরকম। অসতী না হয়েও যে, সুস্থভাবে স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষদের সঙ্গে অবাধে মেশা যায়– তা ওদের দেখে বোঝেন এবং নিজেদের ঘেরাটোপের মধ্যের দানা-খাওয়া ময়নার জীবনের কথা ভেবে একধরনের দুঃখবোধও করেন। কিন্তু যে-দিন গিয়েছে তা তো আর ফিরবে না।
সেই মানুষটি তাঁর স্বামী শিরীষের বন্ধুস্থানীয়ই ছিলেন। তিনি শিরীষের-ই মতন অধ্যাপনাই করতেন। মাঝ-জীবনে বহরমপুর কলেজে, ওদের দুজনেরই অধ্যাপক জীবনের এক অধ্যায়ে একে অন্যের কাছাকাছি এসেছিলেন। আজ অবধি, কুসুমের জীবনে সেই প্রসাদ ঘোষ একাই। একমাত্র প্রসাদ।
অকৃতদার প্রসাদও শিরীষের-ই মতন এখন অবসর নিয়েছেন কলকাতার একটি কলেজ থেকে। শিরীষের কাছে শুনেছিলন কুসুম যে, বিহারের কোডারমা শহরের কাছে ঝুমরিতিলাইয়াতে প্রসাদ জমি কিনে রেখেছিলেন প্রথম যৌবনেই। সস্তার সময় ছিল। দু-বিঘা জমি। জলের দামে। তাতে তখন থেকেই অনেক গাছগাছালিও লাগিয়েছিলেন তিনি। গাছপালা-ফুল-পাখি, খুব-ই ভালোবাসতেন মানুষটি। হয়তো নারীও। জমির চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া ছিল এবং জমি কেনার পরে পরেই সমবয়েসি একটি কাহার ছেলেকে কেয়ারটেকার রেখেছিলেন জমি এবং বাগানের। তার বাড়ি ছিল ডোমচাঁচে। কোডারমার কাছেই। তখন মাটির তৈরি এক-কামরার ঘর ছিল। শুধু একটিই। গোবর-লেপা। এখনও নাকি সেই কাহার-ই তাঁর জমি-বাড়ি এবং তাঁর নিজেরও দেখভাল করে। সেই খিদমদগারেরও চুল পেকে গেছে।
রিটায়ার করার পরে ছোট্ট পাকাবাড়ি করেছে প্রসাদ দু-কামরার, সেই ফুল-ফলন্ত জমির ওপরে। শুনেছেন কুসুম। শিরীষের কাছে লেখা প্রসাদের চিঠিতেও জেনেছেন। বসার ও খাওয়ার ঘর অবশ্য আলাদা। মানে শোয়ার-ঘর দু-টির একপাশে। চারদিকে বারান্দা। আর বাড়ির সেই কেয়ারটেকারের জন্যেও হাতার-ই অন্যপ্রান্তে বাড়ি করে দিয়েছেন। তার ছেলেকে লেখাপড়াও শিখিয়েছেন প্রসাদ। তখনকার দিনের অনেক অধ্যাপকেরাই অধ্যাপনাকে জীবনের ব্রত হিসেবে দেখতেন, নিছক-ই একটি ‘জীবিকা হিসেবে নয়।
কেয়ারটেকার-এর ছেলে লেখাপড়ার পাঠ শেষ করে এখন হাজারিবাগের স্টেট ব্যাঙ্কে ভালো কাজ করে। তপশিলিদের জন্যে সংরক্ষিত আসনে সহজেই কাজ পেয়ে গেছে। বিয়েও দিয়েছেন কেয়ারটেকার-এর ছেলের। তার একটি দামাল ছেলে আছে নাকি, বছর চারেকের। কুসুমের নিজের ছেলে ছিল না বলেই, একটি নাতির শখ ছিল খুব-ই। যাক, নাতনি নিয়েও তিনি অখুশি নন।
প্রসাদ সংসার করেননি বটে, কিন্তু সেই কেয়ারটেকার সময়েই করেছিল।
সেই সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্বও প্রসাদ-ই নিয়েছেন।
তাই ফুল-ফলের সঙ্গে পরজাত ছেলে-বউ এবং নাতিও ফুটেছে সেই লালমাটির জমিতে সবুজ গাছগাছালির মধ্যে। প্রসাদের কোনো দুঃখ নেই। বলেন, কুসুমের স্বামী শিরীষ।
কিছু মানুষ এই সংসারে চিরদিন-ই থাকেন, সব বয়েসি, যাঁদের নিজেদের নিজস্ব দায় কিছু না থাকলেও, অন্য দায়-দায়িত্ব তাঁদের চুম্বকের মতন-ই আকর্ষণ করে।
শিরীষ, প্রসাদের সেই ঝুমরি-তিলাইয়াতেই বেড়াতে গিয়েছিলেন এবারে। একা। বহুদিনের এবং পৌনঃপুনিক নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। কুসুমকে অনেকবার বলা সত্ত্বেও কুসুম যাননি।
দুপুরবেলায় অবসরে শুয়ে শুয়ে কুসুম এইসব কথাই ভাবছিলেন। সল্লির কথা, বাজ-এর কথা, জলপিপির কথা। তাঁর পর্ণমোচী জীবনের কথা। শুধু তাঁর জীবন-ই কেন, হয়তো প্রত্যেক মানুষের জীবন-ই পর্ণমোচী। তবে শীতার্ত গাছের পাতা ঝরালেও পরের বসন্তে আবার নতুন, কচি-কলাপাতা-রঙা চিকন পাতাতে নবীকৃত হয়। শুধু পর্ণমোচী মানুষের-ই নবীকরণ হয় না কোনো। ভাবলে মন খারাপ লাগে।
ঠিক এমন-ই সময়ে ডোর-বেলটা বাজল, তাঁর তন্দ্রা ভাঙিয়ে দিয়ে।
কে এল এই অসময়ে কে জানে!
কুসুম উঠে বাইরের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতর থেকে বললেন, কে?
আমি। আমি। আর কে আসবে, তোমার কাছে এই রোদে-তাতা গরমের দুপুরে? তোমার একমাত্র স্বামী ছাড়া?
বিরক্তির সঙ্গে ঠাট্টা মিশিয়ে বললেন শিরীষ।
দরজা খুলতে খুলতে কুসুম ভাবলেন, কে যে, কার কাছে আসে, কখন আসে, আর কেন আসে, তা কি কেউ বলতে পারে! স্ত্রী বলেই, পুরোনো বলেই, এমন হেলা করতে নেই। যে কেউই যখন তখন এসে পড়তে পারে একজনের জীবনে। এসে পড়ার আগে-পর্যন্ত বোঝা যায় না।
কুসুম দরজা খোলার পরে, ওভারনাইটারটি নিয়ে ভেতরে ঢুকেই শিরীষ বললেন, ট্রেন পাঁচ ঘণ্টা লেট ছিল। বুঝলে!
খাবে কিছু?
না, না, চা খাব শুধু এককাপ। খবর তো দেওয়া ছিল না তোমাকে, তাই হাওড়া স্টেশনের রেস্তরাঁতেই খেয়ে নিয়েছি ভাত আর মাংস।
পাঁঠার মাংস? আবারও খেলে! তোমার কোলেস্টেরলটা-না বেড়েছে! পূর্ণিমা-অমাবস্যাঁতে হাঁটুর আর কোমরের বাতে ‘কোঁ কোঁ করেও শিক্ষা হয় না?
পাঁঠার মাংস ছাড়া অন্য কোনো মাংস খাবার যোগ্যতা নিয়ে তো আসিনি। নারী-মাংস বা বুদ্ধিমানের মাংস আর পাচ্ছি কই? পাঁঠার মাংস মাঝে-মধ্যে খেলে কিছু হবে না।
কুসুম তাঁর কামুক-চড়াই স্বামীর কথার উত্তর না দিয়ে, উঠে চা করতে গেলেন।
জামা-কাপড় ছেড়ে চা খাওয়ার পরে শিরীষ শুধু প্রসাদ আর ঝুমরি-তিলাইয়ার গল্পই করে চলেছেন। কত যে গল্প! তার আর শুরু-শেষ নেই।
উঃ! সত্যি কুসুম। কী আদর-যত্নটাই না করল প্রসাদটা!
তারপর বললেন, জানো, ওর বাড়িতে ওর পরলোকগতা মা ও বাবার দু-টি বড়োফোটো আছে। সবচেয়ে মজার কথা এই যে, আর একটিমাত্র আছে ফোটো।
কার?
কার বলো তো?
ঢং! আমি কী করে বলব?
আমাদের তিনজনের।
আমাদের মানে?
ধ্বকধ্বক করে উঠেছিল কুসুমের বুক।
শিরীষ বললেন, মধ্যিখানে তুমি আর দু-পাশে আমি আর প্রসাদ। মনে নেই? সেই একবার, বেড়াতে গেছিলাম আমরা একসঙ্গে। তখন সল্লি বছর চারেকের হবে। আরে সেই দার্জিলিং-এ গো! বাতাসিয়া লুপ-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা আর দার্জিলিং হিমালয়ান রেইলওয়েজের টয়-ট্রেনটা চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে লুপটিকে বেড় দিচ্ছে সাপের মতন। আশ্চর্য! সেই ছবিটিতে কিন্তু সল্লি নেই। শুধু আমরা তিনজন। কতদিনের কথা।
তারপরেই বললেন, আচ্ছা সল্লি নেই কেন? ওকেও তো নিয়ে গেছিলাম।
ছবিটা কে তুলেছিল, মনে আছে তোমার?
কুসুম শিরীষের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
না। কে?
দার্জিলিং-এর নেপালি ট্যাক্সি-ড্রাইভার। তার নাম ছিল গুরুং। নইলে তুলত কে? আমরা তিনজনেই তো ফোটোতে আছি।
ঠিক। কিন্তু এতবছর আগের কথা, তোমার ট্যাক্সি-ড্রাইভারের নামও মনে আছে? আশ্চর্য তো!
কুসুম না-বলে বললেন, আছে। মনে যা-থাকার, তা ঠিক-ই মনে থাকে। সময় কোনো ব্যাপার নয়।
তারপর মুখে বললেন, সল্লিকে যে, শিখামাসিমার কাছে রেখে গেছিলাম লুইস জুবিলি স্যানাটোরিয়ামে। ভুলে গেলে? তাই সল্লি নেই ছবিতে।
আমার কিছু মনে থাকে না।
শিরীষ বলেছিলেন।
তারপর স্বগতোক্তির মতন বলেছিলেন, ভাবলেও ভালো লাগে যে, আমাদের ছবিও বড়ো করে বাঁধিয়ে কেউ অত যত্ন করে রেখেছে। সত্যি!
তারপর-ই উজ্জ্বল মুখে বলেছিলেন, প্রসাদটা কিন্তু ট্যাক্সি-ভাড়া বাবদ আমাদের একপয়সাও দার্জিলিং-এ খরচ করতে দেয়নি। সে-কথা কিন্তু মনে আছে আমার আজও।
কুসুম বলেছিলেন, আমার মনে আছে, আমি একটা হলুদ-জমি কালো-পাড়ের মুরশিদাবাদি সিল্ক-এর শাড়ি পরেছিলাম। আর কালো ব্লাউজ। সিল্কের-ই। আমার ওই একটিমাত্রই ছিল তখন সিল্ক-শাড়ি। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশান তো তখনও অধ্যাপকদের আজকের মতন, এমন বড়োলোক করে দেয়নি। আমাদের বিয়ের সময়ে তোমাদের বহরমপুর কলেজের প্রিন্সিপালসাহেব ওই শাড়িটি দিয়েছিলেন। ভারি ভালো, ভোলা-ভালা মানুষ ছিলেন। ভদ্রলোক। শাড়ি-ব্লাউজের ওপরে হলুদ-কালো চেক-চেক একটা মলিদা। পাশের বাড়ির বড়োলোক এবং বড়োমনের রিনি-বউদি ধার দিয়েছিলেন।
তাই? তা ব্ল্যাক অ্যাণ্ড হোয়াইট ফোটো তো। শাড়ির রং বোঝা যায় না। দেখলাম তো, শুধু সাদা-কালোই শুধু।
তারপর-ই বললেন শিরীষ, সত্যি! তোমরা মেয়েরা কিছু মনেও রাখতে পারো ডিটেইলস এ। কবেকার কথা!
বলেই, বলেছিলেন, আশ্চর্য! ওর চলে-যাওয়া, বাবা-মায়ের ছবির পাশেই আমাদের তিন জনের ছবি একসঙ্গে কেন বাঁধিয়ে রেখেছে বলো তো প্রসাদটা? আমাদের যাওয়ার সময় হয়েছে বলেই কি?
বলেই হাসলেন শিরীষ।
কুসুম বিষণ্ণ হাসি হেসে বললেন, কী করে বলব? জীবনে সহকর্মীর এই স্ত্রী ছাড়া আর কোনো মেয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াবার সুযোগ হয়নি হয়তো তোমার বন্ধুর। তখনকার দিনের আমরা তো ওইরকম-ই ছিলাম। আমাদের দিন তো আজকের মতন ছিল না।
তারপরেই বললেন, মানুষটি বড়ো ভীতু ছিলেন। পুরুষমানুষ ভীতু হলে ভালো লাগে না। অন্তত আমার কোনোদিনও ভালো লাগেনি।
তা তোমাকে নিয়ে পালিয়ে গেলে কি প্রসাদ বীরপুরুষ বলে গণ্য হত? কে জানে! হত হয়তো।
তা কী করে বলব! নিয়ে পালালে তবেই না বুঝতাম। খুব রোমান্টিক আর অ্যাডভেঞ্চারাস হত ব্যাপারটা। কত মানুষের বুক ফেটে যেত ঈর্ষায়, কত নারী-পুরুষ, যা-নয়-তা করে গালমন্দ করত আমাকে আর তোমার বন্ধুকে। আর তাতে আমাদের সুখ-ই বাড়ত। এই পানাপুকুরের জীবনে একটা তোলপাড় হত। মাছরাঙারা চিৎকার করত, ডাহুক ডেকে উঠত, জল ছিটকে উঠে রোদের কণাতে হিরের ফুল হয়ে যেত। আহা! বেশ হত কিন্তু।
বলেছিলেন, উদাস গলাতে কুসুম। শিরীষ বললেন, এইজন্যেই বলে, ‘স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম দেবা ন জানন্তি, কুতো মনুষ্যাঃ’।
একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, জানো, আমার না…
কী? কী তোমার?
আমার একটা জিনিস খুব অবাক লেগেছিল। মানে, লাগছে এখনও।
কী? তা বলবে তো।
আমি প্রসাদের ঝুমরি-তিলাইয়ার বাড়ির এত প্রশংসা করছিলাম, ওর আদর-যত্নর, অথচ ও কিন্তু একবারও বলল না, তোমাকে একবার সেখানে নিয়ে যেতে।
একবারও বলল না?
কুসুম জিজ্ঞেস করলেন।
তারপর বললেন, নাইবা বলল, তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই।
সত্যি! শুধু সেই বাঁধানো ফোটোটার দিকে চেয়ে, মিষ্টি মিষ্টি হাসত শুধু। মাঝে মাঝে বলত, যে-দিনগুলো চলে যায় সেগুলোই সবচেয়ে সুন্দর দিন। বুঝেছিস, শিরীষ? একদিন বিকেলে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, কুসুম কি এখনও তেমন-ই সুন্দরী ও প্রাণোচ্ছল আছে? দেখিনি প্রায় পঁচিশ বছর। তাইনা?
হয়তো বেশিই হবে।
শিরীষ বলেছিলেন।
ফোটোটা সত্যি হয়ে রয়েছে। বর্তমান হয়ে জীবন্ত।
প্রসাদ বলেছিল।
শিরীষ স্বগতোক্তির মতন বললেন, জানো, কুসুম…তারপর একদিন, মানে, এক শেষ বিকেলে…
কী?