
তিল থেকে তাল
শক্তিপদ রাজগুরু
১
ছোটলাইনের ট্রেনটা ঢিকিয়ে গড়িয়ে চলেছে, ভোরবেলায় কাক-কোকিল ডাকার মুখে বীরপুর জংশন থেকে বড় লাইনের ট্রেনের ঝড়তি-পড়তি যাত্রীদের কুড়িয়ে সদর শহর বীরপুর থেকে বের হয় ট্রেনটা এই লাইনের শেষ ইস্টিশান লাউগঞ্জের দিকে। প্রায় তিরিশ মাইলের যাত্রাপথ, আর পথে দু-দশটা ইস্টিশান আছে, আর কারণ-অকারণে রাঢ়ের ধু-ধু মাঠের বুকে একটা টিনের চালার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে।
কিছু যাত্রী—আনাজপত্রওয়ালা ফড়ে—কিছু গ্রাম থেকে আসা আণ্ডা-বাচ্চা নিয়ে জবুথবু বুড়োবুড়ি ওঠে। চেকার গিরিশবাবুর শ্যেনদৃষ্টি তাদের উপর নিবদ্ধ থাকে।
এই মাঝ মাঠের ইস্টিশানগুলোকে ওদের ভাষায় বলা হয় হল্ট। এদের টিকিট কাটে খোঁজ নিয়ে গিরিশচন্দ্র, অবশ্য পয়সাটাই নেয়-তেমন যাত্রী দেখলে টিকিট দেয়, নাহলে দেয় না।
এ নিয়ে গিরিশবাবুর বদনামও আছে। এই লাইনে ওই ঘুণধরা বুড়ো গিরিশ পুরনো লোক।
টিং টিং-এ প্যান্ট পরে, মাথায় টিকিতে একটা শুকনো ফুল বাঁধা। কালো কোট দীর্ঘদিনের ব্যবহার রোদে-জলে ঘামে-বিবর্ণ হয়ে নিজস্ব একটা বর্ণ আর গন্ধ নিয়ে গিরিশবাবুর শ্রীঅঙ্গে বিরাজ করছে।
গিরিশবাবু বলে—কোম্পানি মাইনে দেয় কত বাবা? আর বাজার? সে তো লাফিয়ে উঠছে— —তাহলে বলো সমতা রেখে চলতে গেলে কি করণীয় হে যশোদা?
….গার্ড যশোদা আর চেকার গিরিশ দু’জনের অবশ্য কিছু বখরার ব্যাপার আছে। ড্রাইভার যদুপতি গজগজ করে।—
ভাগ না দিলে হল্ট ইস্টিশানে দাঁড়াইয়ে আবার সিটি বাজাই গাড়ি ছেড়ে দিব হে! প্যাসেঞ্জার উঠল না উঠল আমার কাঁচকলাটি হে মামু!
গিরিশ চেকারকে এই লাইনে সবাই এই মামা নামেই ডাকে। কোন্ সুবাদে যে ওই ডাক তা কেউ জানে না। গিরিশ তাতেই চটে কাঠ। তবু যদুপতিকে চটাতে সাহস নেই তার। লোকটা কাঠগোঁয়ার আর তেমনি মাতাল!
লাউগঞ্জ পৌঁছে দিনের বেলাতেই মদ গিলবে ওই মতিয়ার ঝুপড়িতে বসে আর খোঁজখবর করলে ইঞ্জিনের কয়লার গাদায়—না হয় জলের ট্যাঙ্কের নীচে দু-একটা চোলাইয়ের দড়িবাঁধা বোতলও বের হবে।
যদুপতিকে দুটো টাকা দিয়ে গিরিশ বলে—নে বাবা।
যদুপতি টাকা দুটো তেলকালি-মাখা প্যান্টের পকেটে গুঁজে নারকেল পাতা বাঁধা স্টিম হুইসেলটায় টান দিতে আধমরা ইঞ্জিনটা ক্ষীণ আর্তনাদ করে কঁকিয়ে ওঠে।
গিরিশ বলে—এরপর করজোড়া হল্টে বিয়ের বরযাত্রী উঠবে, লগনসার বাজার, একটু টাইম রেখো যদু।
…যদুপতি গজরায়—বিয়ের বরযাত্রী, ভাগ দিতে হবে মামা, নাহলে বরকে ফেলেই বরযাত্রী নে চলে যাব—বুঝবা মজা।
গড়িয়ে গড়িয়ে মাঠ—রাঢ় অঞ্চলের তাবৎ যাত্রী কুড়িয়ে ফার্স্ট লোকাল যখন ইন্ করছে লাউগঞ্জ ইস্টিশানে তখন বেলা হয়ে গেছে।
সামনে নদী, খরার সময় বালিখাতে ঝিরঝিরে জল বয়, নদীর ধারে অর্জুন, বাঁশবন—শুকনো অশ্বত্থগাছের ছায়ারেখা উঁচু পগারে সারবন্দি তালগাছ-এর প্রহরা। লাল ডাঙার ওদিকে লাউগঞ্জ ইস্টিশানের সিগন্যালটা কেঁপে কেঁপে ঘাড় কাত করে নামছে, অর্থাৎ ফার্স্ট লোক্যালকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।
পয়েন্টের মুখে এসে যদুপতি ইঞ্জিন থেকে আধখানা দেহ বের করে সামনে মতিয়াকে দেখে হাত নাড়ে।
—আগিয়া মতিয়া।
মতিয়ার টানটান গতর, টানা চোখ—ডাগর পুরুষ দেহ। আর ওর অনাবৃত নিটোল মাংসল হাত দুটো ‘যদুলালের মনে গোলাবি আমেজ আনে’ ওদিকে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে পয়েন্টম্যান বুধুয়া।
দাঁড়াবার সাধ্য তার নেই, টলমল করছে। সকালেই সে মতিয়ার চোলাই-এর নতুন পরখ করেছে বোধহয়। রোজই করে।
আসলে লাউগঞ্জ বীরপুর লাইট রেলওয়ের খাতায় বুধুয়ার নামটাই লেখা আছে পয়েন্টম্যান হিসেবে।
কিন্তু সজ্ঞান অবস্থায় বুধুয়াকে প্রায়ই পাওয়া যায় না। সেবার ফার্স্ট লোক্যাল-এর পয়েন্ট দিয়ে ট্রেনখানাকে বীরপুরের দিকে না পাঠিয়ে সোজা গুপি মিত্তিরের ধানকলের সাইডিং-এ দিয়ে দিয়েছিল আর গদাধর ড্রাইভারও চোখ-বুজে সেই ট্রেনখানাকে সিধে নিয়ে গিয়ে ধানকলের পেছনের বাফারেই ভিড়িয়ে দিয়েছিল আর কি?
মহা কেলেঙ্কারি!
কোনরকমে ইস্টিশান মাস্টার ভজগোবিন্দবাবুই বাঁচিয়ে দিয়েছিল ওদের। অবশ্য তারপর থেকে গদাইকে দিয়েছে ওই সান্টিং ইঞ্জিন চালাতে এখানে আর বুধুয়ার চাকরিটা রয়ে গেছে ওই মতিয়ার জন্যই।
এখানের গ্রামসভার মাতব্বর-ধানকল মালিক গুপি মিত্তির মতিয়াকে একটু নেক-নজরে দেখে। তাই মতিয়ার স্বামী বুধুয়াকে সেবারের মতো মাফ করা হলো। তবে এখন মতিয়াই পয়েন্ট দেয় বেশির ভাগ সময়। …ইঞ্জিনটার স্পিড কমিয়েছে যদুপতি। মতিয়া এসে উঠেছে ইঞ্জিনে। যদুপতি বলে—এবার তোকে ইঞ্জিন চালানোও শিখিয়ে দেব মতিয়া। মতিয়া গা-গতর নেড়ে বলে—গদাই ভি বোলে। ছোড় উ গাড়ি চালানোর বাত। বহুত ঝামেলা—আগুন কা সাথ লড়াই।
যদুপতি লুব্ধ-দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে—তা সত্যি। ইঞ্জিনের তাতে তোর সোনার অঙ্গ পুড়ে কালি হয়ে যাবেক মাইরি।
মতিয়া হাসে—তাই নাকি রে! খুব যে ভাবনা তোর?
যদুপতি বলে—হবে না! তু কত সোন্দর মাইরি।
—হ্যাঁ!
মতিয়া খিলখিল করে হাসছে, হাসছে নয় যেন যদুপতির সামনে ইঞ্জিনের বয়লারের মুখটা কেউ খুলেছে—আর ঝলকাচ্ছে আগুনের ফুলকি-উত্তাপ। এ আগুন ওর সারামনে জ্বালা ধরায়।
ট্রেনটা এসে লাউগঞ্জ প্ল্যাটফর্মে থামল।
ভজগোবিন্দ দেখছে মোতিয়াকে, ইঞ্জিন থেকে নামছে সে।
.
ভজগোবিন্দ চট্টরাজ লাউগঞ্জ ইস্টিশানের স্টেশনমাস্টার, সহকারী মদনবাবু ওদিকে আপ লোকালের বুকিং নিয়ে ব্যস্ত।
রাঢ়-এর বিস্তীর্ণ এলাকার একমাত্র যাতায়াতের পথ এই রেলগাড়ি। মাঝে কয়েকটা নদী, বিল পড়ে। কুয়ে ময়ূরাক্ষী দ্বারকা—অজয়-এর বাড়তি জল ঠেলেঠুলে এই অঞ্চলের চারিদিকে ঢুকে পড়ে। নিকাশি ব্যবস্থা তেমন নেই, ফলে অনেক জলা-বিল গড়ে উঠেছে, আর আছে মাঠগড়ানি জলের প্রবহমান ছোট-বড় কাঁদর।
ফলে সদর শহর বীরপুরের সঙ্গে যাতায়াতের পাকা রাস্তা তেমন কিছু নেই। একটা খোয়া-ঢালা সড়কের মতো আছে, কিন্তু নদীনালা বিলের জন্য সে রাস্তা পাকা হয়নি। গাড়িও চলে না।
যদিও প্রতিবার ভোটের সময় এ নিয়ে অনেক আসর গরম করা লেকচার হয়, শোভাযাত্রাও বের হয়, আবার ভোট ফুরিয়ে গেলেই সব ঠাণ্ডা। ফলে এই ছোট লাইনই এ অঞ্চলের একমাত্র যোগাযোগের পথ। লাউগঞ্জের চারিপাশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে আসে বজরাবন্দি তরি-তরকারি, দুধ-ছানা আর এদিকের মাঠে হয় প্রচুর ধান-গম। সে-সবও ওয়াগনবন্দি হয়ে চালান যায়, মালপত্রও আসে ট্রেনে এ এলাকার অন্য সবকিছুই। ফলে লাউগঞ্জ ইস্টিশানের নামডাক আছে।
ভজগোবিন্দ তাড়া দেয়—ওহে যদুপতি, আধঘন্টা লেট হয়েছে, এদিকের লোকাল ছাড়ব এখুনি।
মালপত্র উঠছে, গার্ড যশোদা গুনছে বাজরা, ছানার টিনগুলো, সেই হিসেবে বুকিং ছাড়াও বাড়তি হিসাব একটা থাকে মালবাবুদের, মহাজনদের কাছ থেকে সেটা আদায় হয় অলিখিত নিয়মেই। আর সেই টাকাটার হারাহারি ভাগ পায় গার্ডসাহেবও।
গিরিশ দেখে মাত্র।
তার আমদানি ওই রোডসাইড থেকে।
যশোদাবাবু বলে—ছাড়ছি ভজগোবিন্দবাবু, মালপত্র গুনতি করে নিই আগে।
গাড়ি ছাড়বার সময় পার হয়ে গেছে। যাত্রীদের অনেকেই তাড়া দেয়। ও মাস্টারমশাই।
ভজগোবিন্দ খুঁজছে বুধুয়া, পোর্টার রতনকে। টাক ঘামছে তার।
চিৎকার করে—ওহে মদন। মাল বুকিং বন্ধ করো। বলে দাও পরের গাড়িতে মাল যাবে। এখন নো এস্পেস। গাড়ি ছাড়তে হবে।
মালপত্র আর বুকিং-এর বাকি নেই।
বুধুয়া রতনকে দেখা যাচ্ছে না। ড্রাইভার যদুপতিও নেই। তাই ওদের খুঁজছে সে। যাত্রীদের সামনে ওইসব হাঁক-ডাক করে কোনোরকম কোর্ট বজায় রাখে মাত্র।
স্টেশনের শেডের একপাশে রতিকান্তের চায়ের স্টল। রেল কোম্পানির কাছে লাইসেন্স নিয়েই স্টল করেছে সে। লাউগঞ্জের অনেকেই আসে চা-খেতে খবরের কাগজ পড়তে। সেটা অবশ্য বৈকালের দিকে।
এখন যাত্রীদের ভিড়ই বেশি—ফড়ে-মহাজনরাও চা-বিস্কুট সিঙাড়া রসগোল্লা খায়। ট্রেনের দেরি হলেই রতিকান্তের লাভ, তবু খদ্দের কিছু পাবে। সে আর দোকানের ছেলেটা বদন এন্তার চা-সিঙাড়া বেচে চলছে।
এ ট্রেন চলে গেলে দু’তিন ঘন্টা মাছি উড়বে, বিক্রিও হবে না, দুপুরের দিকে কে আর চা খাবে। ফলে রতিকান্ত খুশি।
ভজগোবিন্দ চরকির মতো এদিক ওদিকে ঘুরছে। বটতলা-কৃষ্ণচূড়া-আমগাছের নীচে, কোথাও ড্রাইভার যদুপতির পাত্তা নেই।
চায়ের দোকানের বদনই সুধায়!—কাকে গোরুখোঁজা করে খুঁজছ গো মাস্টারবাবু?
—যদুপতিকে দেখেছিস? কোথায় যে যায়? ভজগোবিন্দ বলে।
বদনা খবরটা দেয়।
—ওদের দেখলাম উদিকে, প্যাজি আর আলুর চপ দে এলাম, ওই বটতলায় রইছে গো।
—তাই নাকি! উঃ হাড়মাস জ্বালিয়ে দিলে!
ভজগোবিন্দ দৌড়ালো ওই বুধুয়ার আস্তানার দিকে।
রতিকান্ত দেখেছে ব্যাপারটা। বদনই যদুপতির সন্ধান দিয়েছে ভজগোবিন্দবাবুকে। এবার হাতে-নাতে ধরে টেনে এনে যদুপতিকে ইঞ্জিনে তুলে গাড়ি ছাড়বে। তারও বিক্রি বন্ধ। এখনও গণ্ডা দশেক সিঙাড়া আছে—চপও রয়েছে কিছু। সব পড়ে পড়ে বাসি হবে। গাড়ি চলে না গেলে আর কিছু সময় পেত, সেগুলো উঠে যেত। কিন্তু বদনার জন্যই তা হলো না।
গর্জে ওঠে রতিকান্ত—অ্যাই বদনা, তোকে দালালি করতে কে বলেছে রে? যে যেখানে থাকে থাকুক—তোর কী? মারব এক থাপ্পড়!
থাপ্পড়ের ভয়ে বদনা একটু ঘাবড়ে গিয়ে চিঁচিঁ করে।
–শুধুলে—
—থাম! ধমকে ওঠে রতিকান্ত। বলে—যা বাকি সিঙাড়া কনসেশন করে ঝেড়ে দে গে। চার আনায় তিনটের দর।
ইস্টিশানের আশপাশে বেশ কিছুটা জায়গা ফাঁকাই পড়ে আছে। ঝোপঝাড়—আগাছার জঙ্গল। এদিকে ভজগোবিন্দ আর ছোটবাবুর কোয়ার্টার, আর ওপাশে ওই গাছগাছালির ধারে বুধন পয়েন্টম্যান যতীন—শান্টিং ড্রাইভার গদাধর, ফায়ারম্যান মটরের এক ধারের বাসা। তবু বুধন ওই একটা ঘর নিয়েই খুশি হয়নি। আশপাশের জায়গায় কয়েকটা ঝুপড়ি তুলেছে, গোরু বাছুর আছে—আর নাকি অন্য কারবারও তার আছে।
সামনে একটা বটগাছের নীচেটায় বুধুয়ার বউ মতিয়া সাফসুতরো করে নিকিয়ে রাখে।
ওখানেই বসেছে, এদের সাময়িক আড্ডা। ড্রাইভার যদুপতি—বুধয়া—যতীনও আছে, সামনে শালপাতায় আলুর চপ-সিঙাড়া মুড়ি আর বোতলের সঙ্গে গেলাসটাও ওদের হাতে হাতে ঘুরছে। মতিয়া গোরুদুটোকে খড়-জাব দিতে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে ধমকায় বুধুয়াকে।
—আউর গিলবি না, অ্যাই? ডিউটি দিতে হবে না অ্যাঁ!
বুধুয়া তখন মৌজ হয়ে গল্প জুড়েছে।
হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে ভজগোবিন্দকে আসতে দেখে তাকাল বুধুয়া। ভজগোবিন্দকে দেখে যতীন হাতের বোতলটা পিছন দিকে রাখবার চেষ্টা করে বলে ওঠে—মাস্টারবাবু!
ভজগোবিন্দ চটে ওঠে। বেশ কড়াস্বরেই বলে।
—অ্যাই যদুপতি, ওদিকে গাড়ি আর কত লেট করবে?
চলো—
যদুপতি বলে—যাচ্ছি বড়বাবু! ইঞ্জিনে জল-কয়লা না দিলে গাড়ি চলে না। প্যাটে কিছু না পড়লে দেহটাও চলবে কেনে বলুন?
ভজগোবিন্দ এতবড় যুক্তিপূর্ণ কৈফিয়তে খুশি হতে পারে না। বলে সে,
—মদ গিলে গাড়ি চালাবে, শেষকালে কি হতে কি হবে! আর তোদেরও বলি বুধুয়া, চাকরি করবি না এই সব বাঁদরামি করবি? অ্যাই—চল—গাড়ি ছাড়তে হবে!
যদুপতি কোনো রকমে উঠে দাঁড়াল। বাকি দ্রব্যটা বোতলের মুখে ছিপিটা এঁটে রাখতে হবে, শালপাতা থেকে এক খাবলা আলুর-চপ নিয়ে চিবোতে চিবোতে চললো যদুপতি!
বু