
ভয়ংকর প্রতিশোধ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কালো চশমা পরা লোকটি দাঁড়িয়েছিলেন হাজরা রোডের মোড়ে৷ অনেকেই রোদ্দুরের সময় নানা-রকম রঙের সানগ্লাস পরে তাই দীপু প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি৷ তারপর লোকটির হাতে একটা সাদা রঙের লম্বা লাঠি দেখে দীপু বুঝতে পারল যে লোকটি অন্ধ৷
দীপু বাবার কাছে শুনেছিল যে সারা পৃথিবীতেই অন্ধ লোকেরা রাস্তায় বেরুবার সময় হাতে ওই রকম ঠিক সাদা রঙের একটা লাঠি রাখে৷ তাতে অন্য লোকদের চিনবার সুবিধে হয়৷ অনেক সময় অন্য লোকেরা রাস্তা দিয়ে অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে একজন অন্ধ লোককেই ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠে, চোখ নেই নাকি? দেখে শুনে হাঁটতে পারো না?
বিকেল পাঁচটা, এই সময় হাজরা রোডে দারুণ ভিড়৷ অনবরত গাড়ি যাচ্ছে আসছে৷ দীপুর মনে হল অন্ধ লোকটি রাস্তা পার হতে পারছেন না বলেই দাঁড়িয়ে আছেন৷
সে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি রাস্তার ওপারে যাবেন? আমি আপনার হাত ধরে নিয়ে যেতে পারি৷
লোকটি খুব বুড়োও নয়, যুবকও নয়৷ মুখে দাড়ি আছে৷ সেই দাড়ি আর মাথার চুল সামান্য কাঁচা-পাকা৷ লোকটি বোধহয় অন্য কিছু ভাবছিলেন, দীপুর কথা শুনে চমকে উঠলেন৷
দীপু লোকটির হাত ধরে বলল, চলুন আমি আপনাকে ওপারে পৌঁছে দিচ্ছি৷
লোকটিকে নিয়ে দীপু রাস্তায় নেমে পড়ল৷ একটা হাত উঁচু করে রইল যাতে গাড়িগুলি তাদের দেখে থেমে যায়৷ সত্যিই অনেক গাড়ি হর্ন দিতে দিতে ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষতে লাগল৷
রাস্তার ওপারে এসে দীপু বলল, এবার আপনি কোন দিকে যাবেন? ডান দিকে না বাঁ দিকে? আমি কি আর একটু এগিয়ে দেবো আপনাকে?
লোকটি এবার জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোন দিকে থাকো ভাই? রাস্তার এপারে না ওপারে?
দীপু বলল, রাস্তার ওপারে৷ আমি বাড়ির জন্য একটা পাঁউরুটি কিনতে এসেছিলাম৷
লোকটি বললেন, তাহলে তুমি এপারে এলে—কেন ভাই?
দীপু বলল, বাঃ এইটুকু এলে কী হয়েছে! আপনি রাস্তা পার হতে পারছিলেন না, সেইজন্য!
লোকটি বললেন, তাহলে এসেছই যখন, তখন তোমাকে আর একটু আসতে হবে৷ তুমি আমার বাড়িতে পৌঁছে দাও৷
দীপু একটু কিন্তু কিন্তু করতে লাগল৷ মা তাকে বলেছিলেন মোড়ের দোকান থেকে পাঁউরুটি কিনে আনতে৷ বেশিক্ষণ তো লাগবার কথা নয়৷ দীপুর ফিরতে দেরি হলে মা চিন্তা করবেন৷
কিন্তু একজন লোক যদি বলে বাড়িতে পৌঁছে দিতে, তাহলে না বলা উচিত না৷ তাছাড়া দীপুর এখন তেরো বছর বয়েস হয়ে গেছে, সে তো আর রাস্তা হারিয়ে ফেলবে না৷ সে এদিককার সব রাস্তাই চেনে!
অন্ধ লোকটি বললেন, এই যে, কাছেই হাজরা পার্ক, এটা তুমি কোনাকুনি পার হয়ে চলো, তারপর দেখবে একটা গলি, সেই গলি দিয়ে খানিকটা গিয়ে বাঁ দিকে একটা হলদে রঙের তিনতলা বাড়ি, সেই বাড়িতে আমি থাকি৷ তুমি আমায় সেখানে নিয়ে যেতে পারবে?
দীপু বলল, চলুন৷
অন্ধ লোকটির হাত ধরে দীপু পার্কটা পার হতে লাগল৷ তারপর সেই গলির মধ্যে খানিকটা গিয়ে হলদে তিনতলা বাড়িটা পেয়ে গেল সহজেই৷
সে-বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দীপু বলল, এবার আমি যাই?
লোকটি বললেন, না না, এখন যাবে কি৷ আমাকে একদম ঘরে পৌঁছে দাও৷ ভেতরে ঢুকে দেখবে একটা উঠোন, তার ডান পাশে সিঁড়ি৷ আমরা কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠব না৷ তুমি আমাকে সিঁড়ির পেছন দিকটায় নিয়ে চলো৷
বাড়িটা তিনতলা হলেও মনে হয় যেন ফাঁকা৷ কোনো লোকজনের সাড়াশব্দ নেই৷ এতবড় বাড়িতে কি আর কোনো লোক থাকে না? দীপুর একটু অবাক লাগল৷
সিঁড়ির পেছনে বেশ খানিকটা পরিষ্কার জায়গায় বাড়ির যতসব ভাঙা জিনিসপত্র থাকে৷
অন্ধ লোকটি এবার দীপুর হাত ছেড়ে দিয়ে সেখানে বসে পড়লেন৷ তারপর জামার পকেট থেকে বার করলেন একটা চাবি৷ মাটির মধ্যে একটা ছোট্ট গর্ততে লোকটি সেই চাবি ঢুকিয়ে দিয়ে ঘোরাতেই কট শব্দ হল৷
দীপু আরও অবাক হয়ে গেল৷ কোনো তালা নেই, শুধু মাটির গর্ততে চাবি ঢোকাবার ব্যাপারটা বুঝল না৷ তা ছাড়া লোকটি অন্ধ হলেও চাবিটা একবারেই সেই গর্তের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন কী করে?
মিষ্টির দোকানের আলমারিগুলোর পাল্লা যেমন ঠেললেই একদিকে সরে যায়, লোকটি এবার মাটিতে চাপ দিতেই সেরকম একটা পাল্লা একদিকে সরে গেল৷ দীপু দেখল নীচের দিকে একটা অন্ধকার গর্ত৷
লোকটি নিজেই একবার দীপুর হাত ধরে বললেন, এসো৷
দীপু জিজ্ঞেস করল, আমি কোথায় যাবো?
লোকটি বললেন, এসোই না৷ তুমি ভয় পাচ্ছ নাকি?
ভয় পাওয়ার কথা শুনলেই দীপুর সাহস বেড়ে যায়৷
একজন অন্ধ লোকের সঙ্গে অন্ধকারে নামতে সে ভয় পাবে কেন?
ভেতরে পা দিয়ে দেখল, একটা কাঠের সিঁড়ি আছে৷ তবে সিঁড়িটা বেশ সরু৷ দুজনে পাশাপাশি নামা যায় না৷ অন্ধকারে কিছু দেখাও যায় না৷
লোকটি বললেন, ঠিক গুনে গুনে ছত্রিশটা সিঁড়ির ধাপ নেমেই থামবে৷ তখন সামনে একটা দরজা দেখতে পাবে৷
লোকটি আগে নিজে নিজেই বেশ টপাটপ নেমে যেতে লাগলেন; নামতে নামতে দীপুকে বললেন, দেখো, যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে যেও না৷
দীপু ভাবল, বাঃ, বেশ মজা তো৷ অন্ধ লোকটি তরতরিয়ে নেমে যাচ্ছেন, আর সে হোঁচট খাবে! অবশ্য অন্ধ লোকটির নিশ্চয়ই বারবার ওঠানামা করতে করতে বেশ অভ্যেস হয়ে গেছে!
ছত্রিশটা ধাপ নামার পর দীপু থামল৷ একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ কিছু দেখা যায় না৷
অন্ধ লোকটি সামনের দেওয়ালে হাত দিয়ে সুইচ টিপতেই ঝলমলে আলো জ্বলে উঠল!
দীপু দেখল, পাশাপাশি দুখানা তালা বন্ধ ঘর আর একটা ছোট্ট বারন্দা৷ কলকাতার কোনো বাড়িতে যে এরকম মাটির নীচে ঘর থাকে, দীপু জানত না৷ তার ধারণা ছিল যে আগেকার সব দুর্গতেই শুধু মাটি নীচে সুড়ঙ্গ থাকত৷
লোকটি আবার পকেট থেকে একটা চাবি বার করে একটা ঘরের তালা খুলে ফেললেন৷ এবারের তালায় চাবি পরাতে তাঁর একটুও দেরি হল না৷
ঘরটার মধ্যে একটা খাটে বিছানা পাতা, একটা চেয়ার-টেবিল, আর মেঝেতে বেশ কয়েকটা খাঁচা৷ সেই খাঁচাগুলোর মধ্যে একটা করে খরগোশ রয়েছে!
ঘরে ঢুকে লোকটি একটি টেবিল ল্যাম্প জ্বালাতেই তার থেকে খুব গাঢ় নীল রঙের আলো জ্বলে উঠল৷
লোকটি দীপুকে বললেন, বসো৷
দীপু বলল, আপনি এখানে থাকেন? এই মাটির নীচে?
হ্যাঁ, ওপরের আলো আমার ঠিক সহ্য হয় না৷
আচ্ছা আপনি তো পৌঁছে গেছেন, এবার আমি বাড়ি যাই?
না, না, এক্ষুনি বাড়ি যাবে কি? তোমার নামটা এখনো জানা হল না৷
দীপু নিজের নাম জানাল৷ লোকটি বললেন, তাঁর নাম পিনাকপাণি৷ এরকম অদ্ভুত নাম দীপু আগে কখনো শোনেনি৷
হাতের সাদা লাঠিটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে রেখে লোকটি চোখ থেকে কালো চশমাটা খুলে ফেললেন৷
লোকটির দু’চোখে দুটি ময়দার ডেলা লাগানো, অথবা কাচ জোড়ার জন্য যে পুটিং লাগায় তাও হতে পারে৷
হাত দিয়ে সেই ডেলা দুটো টেনে খুলে ফেলে লোকটি দীপুর দিকে চেয়ে হাসলেন৷
লোকটি অন্ধ নয়৷
দীপু একটু শিউরে উঠল৷ অন্ধ নয়, তবু ইচ্ছে করে অন্ধ সেজে থাকে, তাহলে লোকটা কে? ডিটেকটিভরা অনেক সময় ছদ্মবেশ নেয়৷ লোকটা তাই? কিংবা চোর বা গুন্ডাও হতে পারে৷
লোকটি বললেন, ভাবছ তো আমি চোর, গুন্ডা কিংবা ডিটেকটিভ কিনা? আমি ওসব কিছুই নয়৷ আমি সাধারণত এ জায়গা ছেড়ে বাইরে যাই না৷ তবু মাঝে মাঝে দু-একবার যেতেই হয়৷ খোলা হাওয়া ও নিশ্বাস নেওয়াও তো দরকার৷ তখন অন্ধ সেজে না থাকলে আমার খুব অসুবিধে হয়৷
দীপু ভাবল, এ আবার কী কথা? চোখ থাকতে কেউ কি অন্ধ সেজে থাকে? অন্ধ হলেই তো বেশি অসুবিধে৷
লোকটি বললেন, এই নীল আলো ছাড়া অন্য কোনো আলো আমার সহ্য হয় না৷ তা ছাড়া আরও গন্ডগোল হয়৷ আমার চোখ নিয়ে মহা মুশকিল৷ তোমার হাতে ওটা কী? খরগোশ?
দীপুর হাতে একটা হাফ পাউন্ড পাঁউরুটি ছিল৷ অমনি সেটা জ্যান্ত হয়ে একটা খরগোশ হয়ে গেল৷
দীপু চমকে সেটা ছেড়ে দিতেই খরগোশটা মাটিতে পড়ে লাফাতে লাগল৷
দীপু খুব চমকে গেলেও সামলে নিল তাড়াতাড়ি৷ এ ব্যাপারটায় সে ভয় পায়নি৷ লোকটি তাহলে ম্যাজিশিয়ান৷ ম্যাজিশিয়ানরা ওরকম পারে৷ জাদুকর ম্যানড্রেকের ছবিতে দীপু এরকম দেখেছে৷
লোকটি গম্ভীর গলায় বললেন, আমি ম্যানড্রেকের মতন ম্যাজিক দেখাই না৷ আমি পিনাকপাণি!
দীপু এবার সত্যিই একটু ভয় পেয়ে গেল৷ লোকটি মনের কথা বুঝতে পারে৷ দীপু মনে মনে যা ভাবছে, লোকটি তক্ষুনি সেটা বলে দিচ্ছে৷
পিনাকপাণি বললেন, আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আমার চোখে একটা অসুখ হয়৷ চোখে ভীষণ ব্যথা করত৷ অনেক ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম৷ ওষুধ লাগিয়েছি, কোনো ফল হয়নি৷ তখন আমার নাম ছিল বিজনকুমার বসু৷
তখন আপনার অন্য নাম ছিল?
হ্যাঁ৷ তখন আমি জামসেদপুরে থাকতাম, স্টিল প্ল্যান্টে কাজ করতাম৷ চোখে কোনো সময় আগুনের ঝাপটা লেগেছিল কিংবা অন্য কিছু হয়েছিল জানি না৷ সেই থেকে চোখে খুব ব্যথা৷ তারপর একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে চোখ মেলবার পর দেখলাম, আমার একটুও ব্যথা নেই! আর আমার মাথার মধ্যে কে যেন বলল, তুমি বিজনকুমার বসু নও, তুমি পিনাকপাণি!
কে বলল একথা?
তা তো জানি না৷ আমার মাথার মধ্যে কেউ যেন ফিসফিস করে উঠল৷ আমি তো প্রথমে খুব অবাক৷ কিন্তু মাথার মধ্যে অনবরত ওই কথাটা শুনতে পেলাম৷ তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম কে পিনাকপাণি৷ তার কোনো উত্তর পেলাম না তখন৷
দীপু মাটির দিকে তাকিয়ে দেখল, তার হাতের পাঁউরুটিটা তখনও খরগোশ হয়ে লাফাচ্ছে৷ দীপুর কাছে আর পয়সা নেই৷ মা তাকে পাঁউরুটি কিনে আনতে বলেছিলেন৷ পাঁউরুটির বদলে খরগোশ নিয়ে গেলে কি মা খুশি হবেন?
পিনাকপাণি অমনি দীপুর মনের কথা বুঝে নিয়ে বললেন, তোমার কোনো চিন্তা নেই, তুমি পাঁউরুটি নিয়েই বাড়িতে ফিরবে৷
দীপু একটু কেঁপে উঠল৷ কেউ এমনভাবে মনের কথা বুঝে ফেললে দারুণ অস্বস্তি হয়৷
পিনাকপাণি আবার বললেন, তোমাকে এসব কথা বলছি কেন জানো? আমি তো এতদিন রাস্তা দিয়ে ঘুরি অন্ধ সেজে, কিন্তু এর আগে কেউ একজনও আমায় রাস্তা পার করে দিতে চায়নি৷ কলকাতা শহরের মানুষের মনে মায়া নেই৷ তুমিই প্রথম দিলে৷ অবশ্য আমার কোনো দরকার হয় না৷ আমি কিচ্ছু না দেখেও হাঁটতে পারি৷ একদিন একটা গাড়ি আমায় চাপা দিয়েছিল, কিন্তু আমি মরিনি৷
দীপু বলল, আমাকে এবার বাড়ি যেতেই হবে৷ নইলে মা ভীষণ চিন্তা করবেন৷
পিনাকপাণি বললেন, তুমি ভাবছ আমি ভূত, তাই না? গাড়ি চাপা পড়ার পর মরে ভূত হয়ে গেছি? সত্যি আমি মরিনি৷ তুমি আমার হাতে চিমটি কেটে দেখো!
পিনাকপাণি নিজের একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন দীপুর কোলের কাছে৷ সত্যিই মানুষের মতন হাত৷ তাছাড়া দীপু তো ওঁর হাত ধরেই রাস্তা দিয়ে এনেছে৷
পিনাকপাণি বললেন, আমি ইচ্ছে না করলে তো তুমি এ ঘর থেকে যেতে পারবে না৷ সেই জন্য চুপটি করে বসে আমার কথা শোনো! হ্যাঁ, সেই জামসেদপুরের কথা বলছিলাম৷ সেখানে আমার বউ ছেলে মেয়ে সব ছিল৷ আমার চোখ ভালো হয়ে যাবার পর আনন্দে সেই কথাটা সবাইকে বলতে গেলাম৷ কিন্তু আমার মুখ দিয়ে একটাও কথা বেরুল না, শুধু গোঁ গোঁ শব্দ হতে লাগল৷ তখন সবাই ভাবল, আমি পাগল হয়ে গেছি৷
দীপু আবার চোখ গোলগোল করতেই পিনাকপাণি বললেন, আমি কিন্তু সত্যিই পাগল হইনি৷ সে ব্যাপারে তোমার ভয়ের কিছু নেই৷ তবে একথা ঠিক, আমি এক জীবনে দু’জন মানুষ হয়ে গেছি৷ আগে ছিলাম বিজনকুমার বসু, এখন পিনাকপাণি৷ জামসেদপুরে আমার বাড়ির লোক আমাকে জোর করে পাগলা গারদে দেবার চেষ্টা করতেই আমি বাড়ি থেকে পালালাম৷