নাট বল্টু

নাট বল্টু

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

নাট বল্টু

Books Pointer Iconমুহম্মদ জাফর ইকবাল
Books Pointer Iconjuvenile literature

Change color

১. বল্টু নামের বৈজ্ঞানিক

বল্টু বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়েছিল। চোখ দুটো বন্ধ, মুখটা অল্প খোলা। নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে তার ছোট বুকটা ওপরে উঠছে আর নিচে নামছে। মাথায় পাখির বাসার মতো রুক্ষ চুল, কপালের ওপর একগোছা নেমে এসেছে। রিতু কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে বল্টুর মুখটা একনজর দেখে রাজুকে ডাকল, বলল, “রাজু, দেখে যাও।”

রাজু টেবিলে একটা মোটা বইয়ের ওপর ঝুঁকে বসেছিল, মুখ তুলে বলল, “কী দেখে যাব?”

“তোমার ছেলের মুখটা একবার দেখে যাও।”

রাজু মোটা বইটা টেবিলে উপুড় করে রেখে উঠে এসে রিতুর পাশে দাঁড়াল, ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী দেখব?”

“মুখটা কত নিষ্পাপ, দেখেছ?”


রাজু মাথা নাড়ল, বলল “ছোট বাচ্চারা যখন ঘুমায় তখন তাদের মুখ সব সময় এ রকম নিষ্পাপ হয়।”


রিতু মুখটা শক্ত করে বলল, “এই মুখ দেখে কেউ বলতে পারবে, আজকে দুপুরবেলা সে ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল?”


“বলা কঠিন।”


“কেউ কি বলতে পারবে যে সে ফ্রিজের ভেতর একটা ইঁদুরের বাচ্চা ছেড়ে দিয়েছিল?”


রাজু মাথা নাড়ল; বলল, “উঁহু।”


“কেউ বলতে পারবে, নতুন সিডি প্লেয়ারটাতে একটা গান শোনার আগেই সে সেটা টুকরা টুকরা করে ফেলেছে?”


রাজু তখন তার ছেলের পক্ষে একটু সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করল, বলল, “ঠিক টুকরা টুকরা না …”


রিতু ঝটকা মেরে রাজুকে থামিয়ে দিয়ে আঙুল দিয়ে তাকে দেখিয়ে বলল, “সব তোমার জন্যে।”


রাজু অবাক হয়ে বলল, “আমার জন্যে! আমি কী করেছি?”


“তুমি বল্টুকে লাই দিয়ে দিয়ে এ রকম করেছ।”


“আমি মোটেও লাই দেই নাই। তোমার ছেলে জন্ম থেকে এ রকম। সত্যি কথা বলতে কি, জন্মের আগে থেকে এ রকম …”


রিতু ভুরু কুঁচকে বলল, “মানে?”


“মনে নাই, যখন তোমার পেটের ভেতর ছিল তখন সে কী রকম ঢুসঢাস মারত? ডাক্তার বলল, চৌদ্দ তারিখ ডেট, সে দুই সপ্তাহ আগেই হাজির! সবাই মাথাটা নিচে দিয়ে বের হয়, সে ঠিক করল ঠ্যাং দুটো আগে বের করবে–কী ঝামেলা …”


রিতু মুখ শক্ত করে বলল, “সব তোমার জন্যে। তোমার ক্রোমোজম। তোমার জিনস …”


“আমাকে দোষ দিচ্ছ কেন? আমি কি সবগুলো ক্রোমোজম দিয়েছি? তেইশটা আমার, তেইশটা তোমার। মনে হয়, তোমার জিনস থেকে পেয়েছে।”


“মোটেই না।” রিতু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ করে থেমে গেল। বল্টুর পকেটের দিকে তাকিয়ে তার চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল, কাঁপা গলায় বলল, “বল্টুর পকেটে কী?”


“কী?”


“কী যেন একটা নড়ছে। ইয়া মাবুদ …”


রাজু ঝুঁকে পড়ে বল্টুর পকেটে হাত দিল। পিছলে তেলতেলে কী একটা জিনিস হাত গলে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল সে কোনোভাবে টেনে সেটাকে বের করে আনল–মোটামুটি নাদুসনুদুস একটা কোলা ব্যাঙ। রিতু একটা চিৎকার দিতে গিয়ে থেমে গেল। কোনোমতে বলল, “ফেলল, ছুঁড়ে ফেলো, ছুঁড়ে ফেলো এক্ষুণি।”


রাজু ইতস্তত করে বলল, “ছুঁড়ে ফেলব? সকালে উঠে যদি খুঁজে না পায়, আবার না কিছু একটা ঝামেলা করে!”


রিতু আর নিজেকে সামলাতে পারল না, চিৎকার করে বলল, “ছুঁড়ে ফেলো বলছি। ছুঁড়ে ফেলো!”


রাজু জানালার কাছে গিয়ে ব্যাঙটাকে বাইরে ছুঁড়ে দেয়, ব্যাঙটা ঘুরতে ঘুরতে থপ করে গিয়ে নিচে কোথাও পড়ল।


রিতু নাক-মুখ কুঁচুকে একবার বল্টুর দিকে, আরেকবার রাজুর দিকে তাকাল, তারপর মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, “সবার সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চা হয়, আর আমার কপাল এ রকম কেন! আমার এ রকম একটা পাগলা বাচ্চা হলো কেন?”


রিতুকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে রাজু বলল, “তোমার বাচ্চা মোটেও পাগলা না। তোমার বাচ্চা একটু ছটফটে, কৌতূহল একটু বেশি–তোমার বাচ্চা …”


রিতু ঝাটকা মেরে বলল, “মাত্র আট বছর বয়সে ব্যাঙ নিয়ে ঘুমায়। যখন আঠারো বছর বয়স হবে তখন কী নিয়ে ঘুমাবে? মহিষ?”


রাজু বলল, “আ-হা-হা, মহিষ নিয়ে কেন ঘুমাবে! দেখবে, একটু বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”


রিতু মাথা ঝাঁকিয়ে দুই হাতের বুড়ো আঙুল তুলে বলল, “কাঁচকলা ঠিক হবে।”


রিতুর গলার স্বরে বলু একটু নড়েচড়ে উঠে বিড়বিড় করে পাশ ফিরে শেীয়।


ঠিক এই সময় বল্টু একটা স্বপ্ন দেখছিল। সারা দিন সে নানা কাজকর্মে ব্যস্ত থাকে, রাতে ঘুমানোর সময় সে সেসব নিয়ে স্বপ্ন দেখে। আজকে সারা দিন সে একটা ব্যাঙ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তাই তার স্বপ্নটা ছিল ব্যাঙ নিয়ে। সে দেখল, হাতে একটা বড় কোলা ব্যাঙ নিয়ে আইনস্টাইনের সাথে কথা বলছে। আইনস্টাইন তাকে জিজ্ঞেস করছেন, “বল্টু, তোমার হাতে এটা কী?”


বল্টু বলল, “একটা ব্যাঙ, আংকেল।”


বল্টু ভেবেছিল, আইনস্টাইন তাকে জিজ্ঞেস করবেন, কেন সে হাতে একটা ব্যাঙ ধরে রেখেছে–কিন্তু সেটা জিজ্ঞেস করলেন না, মাথা নেড়ে নেড়ে বললেন, “গুড। ভেরি গুড।”


“মশারি আমার ভালো লাগে না। সেই জন্যে ঠিক করেছি ব্যাঙটাকে বিছানার ওপর ছেড়ে দেব। রাতে মশা ধরে ধরে খাবে, আমার আর মশারি লাগবে না।”


বল্টুর কথা শুনে আইনস্টাইন খুব খুশি হয়ে মাথা নেড়ে বললেন, “ভেরি গুড আইডিয়া। ফার্স্ট ক্লাস।”


ঠিক এই সময় বল্টু দেখল, তার আম্মু একটা হাতপাখা উল্টো করে ধরে তার দিকে ছুটে আসছে, নিশানা মোটেও ভালো নয়! বল্টু তখন আইনস্টাইনের পিছনে লুকিয়ে বলল, “আংকেল, আপনি আম্মুকে একটু বুঝিয়ে বলেন না, প্লিজ! প্লিজ!”


আইনস্টাইন আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠিক হয়ে যাবে! সব ঠিক হয়ে যাবে।”


আম্মু পাখার উঁটিটা ওপরে তুলে বলল, “কাঁচকলা ঠিক হবে।”


এ রকম সময়ে স্বপ্নটা কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেল। আইনস্টাইনের জায়গায় কোথা থেকে একটা বিশাল যন্ত্র হাজির হলো। সেটা ঝিকঝিক করে শব্দ করে নড়তে থাকে। ব্যাঙটা পুরোপুরি মানুষের গলায় কথা বলতে থাকে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে, আর আম্মু একটা দুধের গ্লাস নিয়ে তার পিছু পিছু ছুটতে থাকে। সব মিলিয়ে একেবারে উল্টাপাল্টা ব্যাপার। স্বপ্ন দেখার সময় কিন্তু কোনো কিছুকেই উল্টাপাল্টা মনে হয় না, সবকিছুকেই মনে হয় সত্যি। বল্টুর মনে হলো, তার আম্মু তাকে ধরে ফেলে যন্ত্রের হাতে তুলে দিয়েছে। যন্ত্রটা তাকে আঁকাচ্ছে, নাড়াচ্ছে, ওপরে-নিচে করছে, পানিতে চুবিয়ে চুবিয়ে তুলছে–সব মিলিয়ে খুবই জটিল অবস্থা!


বল্টু যখন স্বপ্নে এসব ওলট-পালট বিষয় দেখছে, তখন রিতু তাকে ভিজে টাওয়েল দিয়ে ধুয়েমুছে জামাকাপড় খুলে পরিষ্কার করার চেষ্টা করছিল! ব্যাঙ পকেটে নিয়ে বল্টু ঘুমিয়ে পড়বে, সেটা রিতুর জন্য মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।


যে জিনিসটা রিতু আর রাজু জানে না, বল্টুও জানে না, সেটা হচ্ছে যে বল্টুর বয়স মাত্র আট হলে কী হবে, সে একেবারে খাঁটি সায়েন্টিস্ট। ব্যাপারটা এক দিনে হয় নি, ধীরে ধীরে হয়েছে। এর জন্য দায়ী রিতু আর রাজু। দুজনই, যদিও তারা কেউ সেটা জানে না।


ছোট বাচ্চা যখন একটু বড় হয় তখনই তারা প্রশ্ন করা শুরু করে, বেশির ভাগ বাবা-মা দু-একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তার পরও যদি বাচ্চা কোনো প্রশ্ন করে তখন তারা তাদের একটা রাম-ধমক দেয়–দুয়েকটা রাম-ধমক খেয়ে বাচ্চা প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। রিতু আর রাজু কখনোই সেটা করে নি, বল্টু যা প্রশ্ন করেছে তারা তার উত্তর দিয়েছে।


যখন ছোট ছিল তখন প্রশ্ন আর উত্তরগুলো ছিল এ রকম :


বল্টু : (দেয়ালে একটা টিকটিকি দেখিয়ে) আব্বু।


রাজু : কী, বাবা?


বল্টু : ওইটা কী?


রাজু : ওইটা হচ্ছে টিকটিকি।


বল্টু : কেন আব্বু?


রাজু : এটা তো টিকটিক করে ডাকে, সেই জন্যে এটার নাম টিকটিকি।


বল্টু : কেন এটা টিকটিক করে ডাকে?


রাজু : তা না হলে কেমন করে ডাকবে? হাম্বা করে তো ডাকতে পারে, কারণ গরু ডাকে হাম্বা করে। ম্যা ম্যা করে ডাকতে পারে না কারণ ছাগল ডাকে ম্যা ম্যা করে। ঘেউঘেউ করেও ডাকতে পারে না, কারণ কুকুর। ডাকে ঘেউঘেউ করে। মিউমিউ করেও ডাকতে পারে না, কারণ বিড়াল ডাকে মিউমিউ করে। তাই এটা ডাকে টিকটিক করে।


বল্টু : (আনন্দে হাততালি দিয়ে গরু কেমন করে ডাকে, আব্বু?


রাজু : (গরুর ডাকের অনুকরণ করে) হাম্বা …


বল্টু : ছাগল কেমন করে ডাকে, আব্বু?


রাজু : ম্যা … ম্যা …


বল্টু : কুকুর কেমন করে ডাকে, আব্বু?


রাজু : ঘেউঘেউ ঘেউঘেউ …


বল্টু তখন পৃথিবীর যত প্রাণীর নাম জানে সবগুলোর নাম একটা একটা করে বলতে থাকে। রাজুকেও তার ডাক শোনাতে হয়। প্রশ্ন করার ব্যাপারে বল্টুর কোনো ক্লান্তি নেই আর তার উত্তর দিতেও রাজু কিংবা রিতুর ধৈর্যের কোনো সীমা নেই।


বল্টু যখন আরেকটু বড় হলো তখন তার প্রশ্নগুলো হলো এ রকম :


বল্টু : (আবার সেই টিকটিকি দেখিয়ে) আম্মু, টিকটিকি দেওয়াল থেকে পড়ে যায় না কেন?


রিতু : টিকটিকির পাগুলো খুব স্পেশাল। বইয়ের পাতার মতন ভাঁজ ভাঁজ থাকে, চাপ দিয়ে দেওয়ালে আটকে ফেলতে পারে!



বল্টু : আমাদের পা এরকম হলো না কেন? তাহলে তো আমরাও দেওয়ালে ঝুলে থাকতে পারতাম!


রিতু : টিকটিকির পোকা ধরে খাওয়ার জন্যে দেওয়ালে ঝুলে থাকতে হয়, তোর কি পোকা খাওয়ার দরকার আছে? তোকে ডাইনিং টেবিলে ভাত দেই না?


বল্টু : কিন্তু দেওয়ালে ঝুলে থাকার একটা মজা আছে না!


রিতু : মানুষের মাথায় আছে বুদ্ধি, তারা যদি দেওয়ালে ঝুলে থাকতে চায় সেটা করবে বুদ্ধি দিয়ে। সাপ ব্যাঙ টিকটিকি ওদের তো আর মানুষের মতো বুদ্ধি নাই, তাই ওদের শরীরে ব্যবস্থা করে দেওয়া থাকে!


কথাটা মনে হয় বল্টু খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিল। বুদ্ধি খাঁটিয়ে দেওয়ালে আটকে থাকার জন্য সে সেদিন দুপুরবেলায় ড্রইংরুমের ছবির একটা ফ্রেম ধরে ঝুলে থাকার চেষ্টা করল। ফ্রেম খুলে পড়ে কাঁচ ভেঙে একটা রক্তারক্তি অবস্থা। এটা ছিল বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম করতে গিয়ে তার প্রথম অঘটন।


বল্টু যখন আরেকটু বড় হলো তখন তার প্রশ্নগুলো হলো এ রকম :


বল্টু : (তার হাতে টিকটিকির খসে যাওয়া একটা লেজ) আব্লু, আব্বু, দেখো, দেখো।


রাজু : কী দেখব? বল্টু; এই দেখো টিকটিকির লেজ। লেজটা নড়ছে!


রাজু : টিকটিকির লেজটা তুই কোথায় পেলি?


বল্টু : একটা শার্ট গুটি পাকিয়ে দেওয়ালে টিকটিকির ওপরে ছুঁড়ে দিয়েছি, সেটা যখন নিচে পড়েছে তখন সেটাকে ধরতে গিয়েছি, লেজটা খসে গেছে!


রাজু : কাজটা কি ঠিক হলো? তোর যদি একটা লেজ থাকত, সেটা যদি কেউ খসিয়ে ফেলত তাহলে তোর কি ভালো লাগত?


বল্টু : আমি তো ইচ্ছা করে খসাই নাই! একটু দেখতে গিয়েছিলাম আর লেজটা খসে গেল! কেন খসে গেল, আব্বু?


রাজু : এই যে খসে যাওয়া লেজ নিয়ে তুই এত ব্যস্ত হয়ে আছিস, আর সেই ফাঁকে টিকটিকি তার জান নিয়ে পালিয়ে গেছে, সেটাই হচ্ছে কারণ। শত্রুকে ব্যস্ত রাখার জন্যে টিকটিকি তার লেজ খসিয়ে চলে যায়!


বল্টু : কিন্তু আব্বু, টিকটিকিটাই তো নাই–এই এখন লেজটা নাড়াচ্ছে


রাজু : নিজে নিজেই নড়ছে। লেজের ভেতরে ব্যবস্থা করে দেওয়া আছে!


বল্টুদের বাসায় অনেক টিকটিকি, রাজু আর রিতু আবিষ্কার করল, কদিনের ভেতরেই কোনো টিকটিকির পিছনে কোনো লেজ নেই। বল্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে একটা ছোট কৌটার ভেতর থেকে টিকটিকির খসে যাওয়া লেজগুলো উদ্ধার করা হয়েছিল।


কিছুদিনের ভেতরেই টিকটিকিগুলোর লেজ গজাতে শুরু করল, তখন বল্টুর প্রশ্নগুলো হলো এ রকম :


**********