
মহাভারতের প্রতিনায়ক
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
কথামুখ
আমাদের দেশই বোধহয় একমাত্র দেশ, যে-দেশের শাস্ত্র নিরঙ্কুশ ধর্মের কথা বলে না, বরঞ্চ মানুষের প্রবৃত্তি বুঝে সমানুপাতিক ধর্মের উপদেশ দেয়। যে মনু-মহারাজকে এ-দেশের অর্বাচীন পণ্ডিতেরা নিরবচ্ছিন্ন গালি দেন, তাঁরা জানবেন, মনুই কিন্তু এ-দেশের পুরাতন রাজনীতি-শাস্ত্রের প্রণেতা এবং সে-রাজশাস্ত্রের নীতি-নৈতিকতা এখনও এত সময়োপযোগী যে, তা বুঝে ফেললে এটাই প্রথম মনে আসবে যে, আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রশাসন এখনও প্রাচীন রাজতন্ত্রের ইতরবিশেষ প্রতিরূপমাত্র। সবার আগে এটাই মনে রাখুন যে, এই মনুই কী অসম্ভব বাস্তব দৃষ্টিতে এ-কথা বলেছিলেন যে, দ্যাখো— মাংস খাওয়াতেও দোষ নেই, মদ খাওয়াতেও দোষ নেই, এমনকী স্ত্রী-পুরুষের মৈথুনেও নয়। কেননা এগুলোই মানুষের প্রবৃত্তি, তবে কিনা এসব থেকে নিবৃত্ত হওয়াটাই সবচেয়ে ভাল।
আমি এই ধরনের একটা আক্রোশ থেকে যে এই পুস্তকের ভূমিকা লিখতে বসলাম, তার কারণ আমাদের শাস্ত্র এবং সাহিত্য মানুষকে বড় বাস্তবদৃষ্টিতে দেখেছে। আমার সেদিন বড় ভাল লেগেছিল, যেদিন পুরাণশাস্ত্রের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন মৎস্যপুরাণে দেখলাম— ভগবান ব্রহ্মা নিজের আদলে কতগুলি মানসপুত্র সৃষ্টি করে একেবারে বোকা বনে গেলেন। তিনি দেখলেন— তাঁর ছেলেগুলির কোনও কামনা-বাসনা নেই, বিয়েসাদিতে মন নেই, তারা কেবলই তপস্যা করতে চায়। ব্রহ্মার সৃষ্টি-বাসনা মনে রেখে যদি বা তাঁরা সৃষ্টি করলেন, তাঁরা সব অমর্ত্য জীব, তাঁদের জরা নেই, মরণ নেই, কেমন যেন স্থাণু পদার্থের মতো। ব্রহ্মা শেষে রেগে গিয়ে বামদেবকে বললেন, তুমি ক্ষমা দাও বাপু! তোমাকে আর সৃষ্টি করতে হবে না— ব্রহ্মণা বিনিবারিতঃ। তিনি বললেন, এ কেমনধারা সৃষ্টিকর্ম হে তোমার! জরা নেই, মরণ নেই। এটা সৃষ্টি হচ্ছে? এরকম সৃষ্টি হলে চলবে না— নৈবংবিধা ভবেৎ সৃষ্টিৰ্জরামরণবর্জিতা।
আমরা ভগবান ব্রহ্মার ভবিষ্যৎ-দৃষ্টি দেখে অবাক হয়েছি। এমনিতে এটা শুনতে খুব ভালই লাগে— জরামরণহীন অমরত্ব। কিন্তু ভেবে দেখুন একবার— মানুষ-পশু-পাখি-গাছ— কেউ যদি বুড়ো না হত, কেউ যদি না মরত, তা হলে বেচারা ম্যালথাস-এর কথা ছেড়েই দিন, আমরাই হয়তো একদিন আমাদের পিতা-মাতাদের হত্যা করতুম। তবু এটা তো সাধারণ কথা। ব্রহ্মা বললেন, দ্যাখো বাপু! সৃষ্টিকার্যে শুধু নিরঙ্কুশ ভাল আর শুভটুকু থাকবে, এমনটি ভাবলে সৃষ্টির ভাবনাটাই মিথ্যে হয়ে যাবে। সৃষ্টির মধ্যে ভালও থাকতে হবে মন্দও থাকতে হবে, শুভকেও থাকতে হবে, অশুভকেও থাকতে হবে। ভাল-মন্দ মিশিয়ে যে সৃষ্টিকর্ম, সেটাই সবচেয়ে আনন্দের, নইলে শুধুই ভাল অথবা শুধুই মন্দ— দুটোই অনাসৃষ্টি। পুরাণগম্ভীর ভাষায়— যাহা শুভ এবং অশুভাত্মিকা সৃষ্টি, তাহাই প্রশস্ত— শুভাশুভাত্মিকা যা তু সৈব সৃষ্টিঃ প্রশস্যতে।
মৎস্য মহাপুরাণের এই অসাধারণ দৃষ্টিতে আমি ভাবতেও চাই এবং এটা ভাবাতেও চাই যে, পৃথিবীর আর কোনও দেশ কি এমন অমলিন বাস্তব দৃষ্টিতে এমন ভাল-মন্দের আঁধার-আলোয় এই সুন্দরী পৃথিবীকে দেখেছে? আমাদের শাস্ত্রকারেরা কখনও এমন অন্ধ দৃষ্টিতে ভাবেননি যে, এই জগতে সকলে পরম সাধু হয়ে থাকবে, সদা সত্য কথা বলবে এবং সমস্ত অন্যায় থেকে বিরত থাকবে। বাস্তবিক এরকম যদি একটা সমাজ হত, যেখানে সত্য, ন্যায়, ধর্ম এবং মহত্ত্ব সর্বদা বিরাজ করছে, তা হলে সেই সমাজের চেয়ে জরদ্গব স্থাণু সমাজ আর কিছু হত না। আমাদের পৌরাণিক পিতামহ তাই সোচ্চারে বলে দিয়েছেন— ভাল এবং মন্দ দুই-ই থাকতে হবে এই পৃথিবীতে। হয়তো এই কারণেই যুধিষ্ঠিরের মতো এক আদর্শ ধর্মরাজ সৃষ্টি করার সময়েও মহাকাব্যের কবি তাঁর মধ্যে পাশাখেলার নেশাটুকু ধরিয়ে দেন অথবা যুধিষ্ঠিরের ধর্মভাবনার অনন্ত প্রয়াসের মধ্যেও একবার মিথ্যাবাদিতার চান্দ্ৰকলঙ্ক লেপন করেন। সত্যি বলতে কী, মহাভারতের কবির কোনও প্রিটেনশনও নেই এ ব্যাপারে। গ্রন্থারম্ভেই তিনি ঘোষণা করে দেন— আমার এই গ্রন্থ ধর্মশাস্ত্রও বটে, আবার অর্থশাস্ত্রও বটে, আবার এটাকে কামশাস্ত্রও বলতে হবে—
অর্থশাস্ত্ৰমিদং প্রোক্তং ধর্মশাস্ত্ৰমিদং মহৎ।
কামশাস্ত্ৰমিদং প্রোক্তং ব্যাসেনামিতবুদ্ধিনা॥
লক্ষণীয়, ভারতবর্ষের চরম সাধন যে মোক্ষ-ভাবনা, তার সম্বন্ধে কোনও উচ্চারণই হল না প্রথমে। বরঞ্চ যা নিয়ে মানুষ থাকে, যার পিছনে মানুষ ছোটে প্রতিনিয়ত, সেই ধর্ম, অর্থ এবং কাম যে কোনও বিগর্হিত বস্তু নয়, বরঞ্চ এইগুলিই যে সাধারণ জীবনের ধর্ম, সেটা ঘোষণা করে দিয়ে অমিতবুদ্ধি ব্যাস বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি কোনও অলৌকিক কল্পকথা বলতে বসেননি। বরঞ্চ কামনা-বাসনা, রাজৈশ্বর্য-লাভের স্বাভাবিক আর্থিক তাড়না যে কতদূর যেতে পারে এবং তার প্রতিস্থানে ধর্ম অথবা নীতি-নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে গেলেও যে একটা বিরাট যুদ্ধের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, সেটা দেখানোই মহাভারতের ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য।
ঠিক এইরকম একটা দৃষ্টিতে দেখতে গেলে, অথবা ইংরেজিতে যাকে বলি ‘ফ্রেম অব রেফারেন্স’— অর্থাৎ ধর্মার্থকামের ঘোষিত অঙ্গীকারই মহাভারতের বিশিষ্টতা— এটা ধরে নিয়েই যদি মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র বিচার করি, তা হলে দেখব— যুধিষ্ঠির কিংবা বিদুর অথবা ধর্মশীলা গান্ধারী মহাভারতের চরম উদ্দেশ্য সাধন করলেও তাঁরাই মহাভারতের সর্বাঙ্গ তৈরি করেন না। এমনও বলতে পারি যে, এমন চরিত্র বেশি আরও বেশি থাকলে মহাভারত একটি বিশেষ ধার্মিক সম্প্রদায়ের পাঠ্যে পরিণত হত। মহাভারতের প্রথম থেকেই অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের যে তীব্র রাজ্যলোভ তৈরি হতে থাকে, এই ‘স্ট্রাকচারটা তৈরি করার জন্য প্রতিনায়ক-সংস্থায় যেমন দুর্যোধন-দুঃশাসন এবং কর্ণ-শকুনির মহাকাব্যিক মিশ্রণ ঘটতে থাকে, তেমনই নায়ক-সংস্থায় ভীমের মতো একটা উপাদান এবং অবশেষে কৃষ্ণের অন্তর্ভুক্তি মহাকাব্যের পানক-রসটাকে একেবারে জারিয়ে দেয়। ঘটনা হল, দুর্যোধন, কর্ণ অথবা শকুনির চরিত্র বিশ্লেষণ করলে কোনওভাবেই এঁদের খলনায়ক বলতে পারবেন না। কেননা দুর্যোধন অথবা কর্ণের দিক থেকেও কিছু নায়কোচিত প্রতিযুক্তি আছে, কিন্তু সেগুলি শুভ এবং মঙ্গলের পথ ধরে চলে না বলেই শেষ পর্যন্ত মহাকাব্যের আদি-মধ্যান্তঃস্থায়ী শুভৈষণার বিপরীতে স্থাপিত হয়। অন্যদিকে লোভ, মোহ, আকাঙ্ক্ষা এবং হিংসা এখানে জীবনের ধর্ম অতিক্রম করে না বলেই, এমনকী কোথাও কোথাও সেই আকাঙক্ষা এবং হিংসা ধর্মসম্মিত আকাঙ্ক্ষা এবং হিংসার অনুকৃতি বহন করে বলেই দুর্যোধন-কর্ণ-দুঃশাসনদের আমরা খলনায়ক বলতে পারি না। বরঞ্চ প্রতিনায়ক বলতে পারি অথবা প্রতিপক্ষ নায়ক বলতে পারি।
সম্পূর্ণ ব্যাপারটাকে ভারতীয় রসশাস্ত্রের দৃষ্টি থেকে আরও সূক্ষ্মভাবে দেখা যায় এবং তাতে প্রতিনায়কের শক্তি-গাম্ভীর্য এবং চরিত্র-মাহাত্ম্যও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতীয় মানুষ এবং শাস্ত্র-কাব্যে তাঁদের স্বভাব-ব্যবহার খেয়াল করে ভরত মুনি থেকে সাহিত্যদর্পণকার বিশ্বনাথ সকলেই চাররকম নায়কের কথা বলেছেন। সেই ভাগটা হল এইরকম— ধীরোদাত্ত, ধীরোদ্ধত, ধীরললিত এবং ধীরপ্রশান্ত। ‘ধীর’ শব্দটা সবরকম নায়কের সঙ্গেই যুক্ত, অর্থাৎ ধৈর্য, ধীরতা, ধারণ-ক্ষমতা এবং উদ্দেশ্য-সাধনে নিশ্চল যে স্বভাবটুকু, সেটা সব নায়কেরই ‘সামান্য’ গুণ। যে এদের মধ্যে ভেদ ঘটায়, সেটা হল— কোনও নায়ক উদাত্ত স্বভাবের, কেউ উদ্ধত, কেউ ললিত গুণসম্পন্ন আবার কেউ বা প্রশান্ত স্বভাবের। উদাত্ততা নিয়ে আমাদের খুব ভাবনা নেই। কেননা, ভারতবর্ষের মহাকাব্যে এমন অধিগুণসম্পন্ন নায়কের অভাব নেই, যিনি ক্ষমতা থাকতেও আত্মশ্লাঘা করেন না; তিনি এমনই এক মহাসত্ত্ব পুরুষ যাঁকে হর্ষ-শোক অভিভূত করতে পারে না। তাঁদের মান-গর্ব বাইরে প্রকাশ হয় না, অথচ অঙ্গীকার করলে সে কাজটা শেষ পর্যন্ত করবেনই। রসশাস্ত্রকারেরা এমন ধীরোদাত্ত নায়কের উদাহরণ দিতে গিয়ে রামচন্দ্র আর যুধিষ্ঠিরের কথা বলেছেন। আমরা এই দুই মহাসত্ত্ব নায়কের গুণ-বিশ্লেষণের মধ্যে যাব না। কিন্তু যতটুকু বলেছি, তা না বললে নয় এইজন্য যে, তাঁদের বিপরীত গুণসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সেইসব নায়কদের আমরা রসশাস্ত্র-সম্মতভাবেই অন্যতর নায়কবর্গের মধ্যেই স্থাপন করতে পারি এবং বিপরীত বলেই তাঁদের প্রতিনায়ক বা প্রতিপক্ষ নায়ক বলা যায় না। বরঞ্চ তাঁদের অন্য নায়ক বলা উচিত।
আসলে, প্রশ্ন ওঠে ধীরোদ্ধত নায়কদের নিয়ে। তাঁদের লক্ষণ করার সময় প্রথমেই বলা হয়েছে যে, তাঁরা নাকি অন্যকে প্রতারণা করার ব্যাপারে যথেষ্টই পটু। এমনিতে তাঁরা অত্যন্ত উগ্ৰস্বভাবের মানুষ, তাঁদের প্রকৃতিটাও খুব স্থির নয়। অহংকার, দর্প, আত্মশ্লাঘা করাটা ধীরোদ্ধত নায়কের অন্যতম গুণ— মায়াপরঃ প্রচণ্ডশ্চপলঃ অহংকার-দর্প-ভূয়িষ্ঠঃ আত্মশ্লাঘানিরতো ধীরোদ্ধতঃ! ধীরোদ্ধত নায়কের এরকম একটা রসশাস্ত্রীয় লক্ষণ শোনার পর রসশাস্ত্রীয় কাব্যসমালোচকদের মধ্যেই নানান প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত ধীরোদ্ধত নায়কের উদাহরণ হিসেবে যখন মধ্যম পাণ্ডব ভীমের নাম এল, তখন সমালোচকেরা বললেন, মহাভারতে আমরা ভীমকে যেমন দেখেছি, তাতে তিনি শত্রুদের সঙ্গে খুব কপট আচরণ করছেন অথবা তাঁদের সঙ্গে খুব প্রতারণা করছেন মায়াবী আচরণে, এমনটা আমাদের মনে হয়নি। বরঞ্চ উল্টোদিকে রামচন্দ্র যে ধরনের কপটতায় বালী-বধ করেছেন অথবা ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির যেভাবে অশ্বত্থামার মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ দিয়ে দ্রোণাচার্যের মৃত্যুর পথ পরিষ্কার করেছিলেন, তাতে তো তাঁদের ওপরেই প্রতারণার দায় আসে বেশি।
পণ্ডিতেরা এই প্রশ্ন তুলেও শেষ পর্যন্ত রসশাস্ত্রের মৌল লক্ষণ সমর্থন করে বলেছেন, ব্যাপারটা ওইভাবে ধরলে হবে না। ধীরোদ্ধত নায়কের লক্ষণে শত্রুকে প্রতারণা করার একটা বৈশিষ্ট্য থাকলেও তাঁর মূল লক্ষণ হল, তিনি অহংকারী, মানী এবং খানিকটা অবিনয়ী পুরুষ, ঠিক যেমন উলটোদিকে রাম-যুধিষ্ঠিরের কপটতার সাময়িক ছায়া পাওয়া গেলেও আসলে তাঁরা ধীর-গম্ভীর স্বভাবের উদাত্ত পুরুষ। এরপরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বলেছেন পণ্ডিতেরা। তাঁরা বলেছেন, প্রতারণা বা ছলের স্বভাব যতটুকুই থাকুক ধীরোদ্ধতের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রধান হচ্ছে তার গর্বোদ্ধত সাহংকার স্বভাবটাই। এবং এই দৃষ্টিতে দেখলে পরে একদিকে যেমন ভীমসেনের মতো মহাবীর অথচ উদ্ধত পুরুষের নায়কত্ব সিদ্ধ হয়, তেমনই মহাকাব্যের প্রতিনায়ক যাঁরা, যাঁদের মধ্যে এই ঔদ্ধত্য আত্মশ্লাঘা প্রকাশ পায় বেশি, তাঁদেরকে সরাসরি নায়ক না বললেও প্রতিনায়কেরও ধীরোদ্ধত স্বভাব প্রমাণসহ তো হয়ই, এমনকী তা সাধুজনের সমর্থনযোগ্যও হয়ে ওঠে।
এই আলোচনা থেকে এটা বোঝা যায় যে, প্রতিপক্ষ নায়কের মধ্যেও কাম্য নায়ক-স্বভাবগুলি সবই পূর্ণ পরিমাণে থাকতে পারে, কিন্তু পরিস্থিতি, পরিবেশ বিপরীত হওয়ার দরুন, বিশেষত ন্যায়, ধর্ম এবং সুনীতির বিপ্রতীপ ভূমিতে থাকার ফলেই অধিগুণসম্পন্ন প্রতিনায়কও মহাকাব্যিক নিন্দার বিষয় হয়ে ওঠেন। অন্তত দুর্যোধন-কর্ণের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। ওই যে একটু আগে ধীরোদ্ধত নায়কের রসশাস্ত্রীয় লক্ষণ বললাম, তা তো দুর্যোধনের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যায় এবং মিলে যায় বলেই চিন্তাশীল পণ্ডিতেরা প্রতিনায়কের লক্ষণ হিসেবেও ধীরোদ্ধত নায়কের বৈশিষ্ট্যগুলি মেনে নিয়েছেন। তার মানে আমরা বুঝতে পারি নায়কের সমান গুণ প্রতিনায়কের মধ্যেও থাকতে পারে। ভেবে দেখুন একবার রামায়ণের রাবণকে। তাঁর শৌর্য-বীর্য, সাহস, রণহুংকার, আত্মশ্লাঘা, দর্প, মান, বিরাটত্ব— এগুলি রামায়ণ মহাকাব্যের এমন এক সমুজ্জ্বল প্রতি-আঙ্গিক রচনা করেছে যার প্রতিতুলনায় মহানায়ক রামচন্দ্র তাঁর অলোক সামান্য ধীরোদাত্ত গুণগুলি নিয়েও কেমন এক স্নিগ্ধ নরচন্দ্রমা হয়ে ওঠেন। দুর্যোধনের প্রতিতুলনায় যেমন যুধিষ্ঠিরও।
ভাগ্যবশত পাণ্ডবভাইদের মধ্যে ভীমও ছিলেন এবং অবশ্যই অর্জুন। কিন্তু এঁদের সকলকে ম্লান দেয় দুর্যোধনের আগ্রাসী স্বভাব। কপট আচরণ অথবা মায়াবী আচরণ, যা নাকি ধীরোদ্ধত নায়কের অন্যতম বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে সেটা প্রতিপূরণ করে দেন শকুনিমামা এবং দুর্যোধনের হয়েই তিনি তা সুসম্পন্ন করায় এই দায়টা দুর্যোধনের ঘাড়েই পড়ে। কিন্তু কপট পাশাখেলার এই অংশটুকু বাদ দিলে আর সবটাই দুর্যোধনকে বিপ্রতীপভাবে উজ্জ্বল করে তোলে। যাঁরা কবিজনোচিত মহাকাব্যিক বেদনাবোধে মহাভারতের প্রতিপক্ষ নায়কদের চরিত্র বিচার করবেন, তাঁদের ভিতরে দুর্যোধন-কর্ণের জন্য একটা মায়াও তৈরি হবে প্রথম থেকে। এটা তো ঠিকই যে, জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও শুধু অন্ধত্বের কারণে পিতা রাজ্য পেলেন না বলে পরম্পরাক্রমে পুত্র দুর্যোধনও রাজত্ব পেলেন না— এই ক্ষোভই তাড়িত করেছে তাঁর অহংকার, দর্