
প্রথম প্রেম
নিমাই ভট্টাচার্য
প্রথম প্রেম
কখনো উত্তরে বাতাস, কখনো আবার দক্ষিণে বাতাস; কখনো গ্রীষ্মের দাহ, কখনো মাঘের হিম; কখনো পাতা ঝরে যায়, কখনো নতুন পাতার মহা সমারোহ। এক এক ঋতুতে এক এক রকম। কখনো পদ্মার চরে চাষীরা চাষ করে, শিশুরা খেলা করে; আবার বর্ষায় সেই পদ্মার বিভীষিকা ওদেরই রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।
মানুষের মনও ঠিক একই রকম। মানুষের মনেও জোয়ার-ভাটা খেলে। শত বাধা-বিপত্তির উজান ঠেলে এগিয়ে যায়; আবার কখনো অতীত স্মৃতির ভাটার টানে ভাসতে ভাসতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। আজ ছবির বোধহয় এমনই একটা দিন।
অফিসের কাজে শিশিরকে এত বেশি ট্যুর করতে হয় যে একলা থাকা ছবির কাছে নতুন নয়। প্রথম প্রথম সত্যি কষ্ট হতো। খুব কষ্ট হতো। কতদিন মনের দুঃখে চোখের জল ফেলেছে। কখনো কখনো রাগে-দুঃখে কাগজ-কলম নিয়ে মাকে চিঠি লিখতে বসত তোমরা তো সব সময় বলল, শিশিরের মত ছেলে হয় না কিন্তু আমি যে কি দুঃখে দিন কাটাই, তা তোমরা ভাবতে পারবে না। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুদিনও এখানে থাকে না। কোন কোন সময় পাঁচ-সাত দিনও বাইরে থাকে। দিনরাত্তির বোবা হয়ে থাকি। যে বুড়ী আমার ঘর সংসারের সব কাজ করে, তার সঙ্গে আর কত গল্প করা যায়? দু একটি বাঙালী পরিবারের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়েছে ঠিকই কিন্তু তাদের তো সংসার আছে। আমার স্বামী হরদম বাইরে যান বলে তো তারা সব কাজকর্ম ফেলে আমাকে সঙ্গ দিতে পারে না।
আরো কত কি লিখত! কখনো আবার লিখত–আমাকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেবার জন্য তোমরা যে কেন পাগল হয়ে উঠেছিলে, তা ভেবে পাই না। আমি আরো কিছুদিন লেখাপড়া করলে বা গান শিখলে কী তোমাদের কোন ক্ষতি হতো? বাবার ধারণা ছিল, বিয়ের পর আমি আবার পড়াশুনা করতে পারব কিন্তু কটা মেয়ে বিয়ের পর লেখাপড়া করার সুযোগ পায়? আর এই দিল্লী শহরে যে গান শিখব, তারও কোন উপায় নেই। কত গল্প-উপন্যাস পড়া যায়? এখানে রেডিওতে কালে-ভদ্রে বাংলা গান হয়। সুতরাং রেডিওর গান শুনে যে কিছু সময় কাটাব, তারও কোন উপায় নেই।
সবশেষে ও লিখত, এক কথায় আমি চিড়িয়াখানার এক বন্দিনীয় জীবন কাটাচ্ছি!
এসব অবশ্য বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা। এখন শিশিরের বিরুদ্ধে তার কোন অভিযোগ নেই। স্বামী এখনো টুরে যায়। আগে মীরাট, ডেরাডুন, এলাহাবাদ, লক্ষ্মী বা জয়পুর, উদয়পুর যেতে হতো। এখন কখনো বোম্বে, কখনো মাদ্রাজ বা কলকাতা। বছরে দুএকবার বিদেশেও একলা একলা থাকতে হয়। একলা একলা মানে অবশ্য ছেলেমেয়ে কাছে থাকলেও স্বামীর সান্নিধ্য লাভ না করা। তবে ছেলেমেয়েকেই বা কতক্ষণ কাছে পায়! ওরা দুজনেই সাতসকালে স্কুলে যায়। বেলা গড়িয়ে পড়ার পর ফিরে আসে। বিকেলে একটু খেলাধুলা, সন্ধের পর পড়াশুনা। নটা বাজতে না বাজতেই ঘুমে ঢুলে পড়ে। ছবির বকুনির জোরে আরো কিছু সময় বইপত্তর নিয়ে পড়ে থাকে কিন্তু সে যাই হোক, সাড়ে নটা-দশটার মধ্যেই দুজনে বিছানায়। এখন অবশ্য ওরা দুজনেই বেড়াতে গেছে। ছেলের স্কুল থেকে ওদের ক্লাসের সবাইকে মানালী নিয়ে গেছে। মেয়েকে ভাশুর কলকাতা নিয়ে গেছেন। আর শিশির এক সেমিনারের জন্য ওটি গেছে।
ছেলেমেয়ে স্কুলে বা শিশির দিল্লীর বাইরে গেলে এখন ছবি সেই পুরনো দিনের মত নিঃসঙ্গতার জ্বালা বোধ করে না। দিল্লীতে এখন ওর কত বন্ধু। সীতা ওর বাবার হার্ট-অ্যাটাক হবার খবর পেয়েই কলকাতা চলে গেছে। তা নয়ত এইরকম সকাল সাড়ে নটা-দশটার সময়ই ও প্রায় প্রত্যেক দিন নাচতে নাচতে এসে হাজির হয়েই বলবে, সারাদিনের মধ্যে সকালবেলার এই দুএক ঘণ্টাই শুধু আমার নিজের। এই সময়টা যে আমার কি ভাল লাগে!
ছবি ওকে খুব ভাল করে চেনে। তাই ওর কথা শুনে ও শুধু হাসে। ছায়াদি এই পাড়াতেই থাকেন কিন্তু ছবির মত ঘনিষ্ঠ নয় বলেই সেদিন সীতার কথা শুনেই বলেন, এই দুএক ঘণ্টা সময় ছাড়া আর কোন সময়ই তোমার ভাল লাগে না?
সীতা বলে, ভাল লাগে না মানে এই সময়টুকুর মালিক আমি নিজে। এখন আমি হাসতে পারি, কাঁদতে পারি, নাচতে পারি। ও একটু থেমে ছবির দিকে তাকিয়ে একটু মুখ টিপে হেসে বলে, ইচ্ছে করলে এখন আমি প্রেমও করতে পারি কিন্তু স্বামী জানতেও পারবে না, ধরতেও পারবে না। তাই এই সময়টা..
ছায়াদি ওর কথার মর্ম উপলব্ধি করতে পারেন না বলেই আবার বলেন, অন্য সময় কি তুমি ক্রীতদাসী যে তোমাকে স্বামীর কথামত উঠতে-বসতে হবে?
-হ্যাঁ, ছায়াদি, অন্য সময় সত্যি ক্রীতদাসী।
তার মানে?
সীতা এবার কাজের ফিরিস্তি দেয়, সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠাকুর দেবতার নাম করি আর নাই করি চায়ের কাপ নিয়ে স্বামী দেবতার নিদ্রাভঙ্গের সাধনা করতেই হবে।
ওর কথায় ওরা দুজনেই হাসেন।
–তারপর স্বামী ও পুত্ররা যতক্ষণ না বেরুচ্ছে ততক্ষণ তাদের তদবির-তদারক ভজন-পূজন করতে হবে। ছেলেরা স্কুল থেকে ফিরে এলে, তাদের খাওয়া-দাওয়া থেকে এটা চাই, সেটা চাই-এর ঝামেলা ভোগ করো।
এবার সীতা একবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে, ডিরেক্টর জেনারেল ম্যানেজারের কাছে পানি খেয়ে স্বামী যখন বাড়ি ফিরবেন, তখন তাকে বিশ্বজয়ী আলেকজাণ্ডারের মত সংবর্ধনা জানাবার দায়িত্বও এই সীতাদেবীর।
ওর কথা শুনে ছায়াদি সত্যি মজা পান। তাই বলেন, তারপর?
সীতা হেসে বলে, আরো শুনতে চাও?
-হ্যাঁ, শুনতে চাই।
ও বলে যায়, শরদিন্দু বাঁড়ুজ্যের গল্প শোনার মত মন দিয়ে স্বামীর কাছে তার অফিসের গল্প শুনতে হবে। দরকার হলে বলতে হবে, এই চোপড়া আর বোস–দুটো লোকই হারামজাদা এবং বারো আনা কাজ তো তোমাকেই করতে হয় কিন্তু তবু কেন যে জি এম বা ডিরেক্টররা তোমার মুখের দিকে তাকান না, তা ভেবেই পাই না।
এবার ছায়াদি হাসতে হাসতে বলেন, মিঃ সেন খেয়ে-দেয়ে শুতে যাওয়া পর্যন্ত বুঝি তোমাকে ডিউটি দিতে হয়?
এবার সীতা মুখ টিপে না, একটু জোরেই হাসে। বলে, শুয়ে পড়ার পর প্রায়ই উনি আবিষ্কার করেন, আমার চাইতে সুন্দরী মেয়ে নাকি ভূ-ভারতে উনি দেখেননি। ব্যস! যেদিনই ঐ প্রশংসা শুনি, সেদিনই আমার সর্বনাশ!
ওর কথা শুনে শুধু ছবি না, ছায়াদিও হাসি চাপতে পারেন না।
সীতা কিন্তু ঐটুকু বলেই থামে না। বলে যায়, শুনি স্বামীদেরই সারাদিন অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয় কিন্তু অত পরিশ্রম করার পরও যে ওরা মাঝ রাত্তিরে কি করে সার্কাস দেখায়, তা ভেবে পাই না!
এবার ছায়াদি ওকে সমর্থন না জানিয়ে পারেন না। হাসতে হাসতে বলেন, ঠিক বলেছ সীতা।
যাই হোক, এই সীতা থাকলে ছবির সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যায়, তা ও নিজেই টের পায় না। গতকাল রেখা ফোন করে বলেছিল, কাল-পরশুর মধ্যে আসব। ছবির দুই বন্ধু দিল্লীতে আছে। শ্ৰীলার স্বামী হিন্দু কলেজের লেকচারার। ওরা মডেল টাউনে থাকে। অত দূরে থাকে বলে শ্রীলা বিশেষ আসতে পারে না কিন্তু রেখা আসে এবং এলেই সারাদিন কাটিয়ে যায়। আজ এতক্ষণ যখন এলো না, মনে হয়, কালই আসবে। তাই ছবি কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করার পর নিজের আলমারিটা ঠিকমত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গোছগাছ করতে বসল।
এই বাড়িতে, এই সংসারে কত কি আছে! খাট-বিছানা সোফা গার্ডেন চেয়ার থেকে শুরু করে রেডিও-টি ভি-মিউজিক সিস্টেম। কত ভাল ভাল ছবি ও বই আছে। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ছবি সবকিছুই ব্যবহার করে, উপভোগ করে কিন্তু ঐ সবকিছুর সঙ্গেই যেন ওর প্রাণের টান নেই। ওগুলো সবার কিন্তু এই আলমারিটা শুধু ওর নিজের। একান্তই নিজের।
বিয়ের পর ছবি যখন দিল্লীতে প্রথম সংসার করতে আসে, তখন ওদের একটা আলমারিতেই স্বামী স্ত্রীর জামাকাপড় বা টাকা-পয়সা থাকত। চাকরিতে শিশিরের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ওর জামাকাপড়ের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে। তখন একদিন ছবি একটু অভিমান করেই বলে, তোমার জামাকাপড়ের ঠেলায় এ আলমারিতে আর আমার জামাকাপড় রাখা অসম্ভব। এতদিন বলার পরও যখন আমাকে একটা আলমারি কিনে দিলে না, তখন না হয় আমাকে মা-দিদিমার আমলের একটা স্টীলের ট্রাঙ্কই কিনে দাও কিন্তু এভাবে আর চলে না।
শিশির হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে দুহাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বলল, পর পর তিন দিন আদর করলেই তোমাকে আলমারি কিনে দেব।
ছবি গম্ভীর হয়ে বলে, যে তিনশ দিন আদর খেয়েছ সে হিসেবটা বুঝি এখন মনে পড়ছে না?
শিশির ওর মু