আমার মেয়েবেলা

আমার মেয়েবেলা

তসলিমা নাসরিন

আমার মেয়েবেলা

Books Pointer Iconতসলিমা নাসরিন
Books Pointer Iconshort story

Posted byমৌ বর্মণ28-Jun-2025

Change color

আমার মেয়েবেলা (১৯৯৯) : তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীমূলক রচনার প্রথম খণ্ড আমার মেয়েবেলা ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। এই আত্মজীবনীতে তসলিমা নাসরিন তাঁর জন্ম অর্থাৎ ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করেছেন। তসলিমা নাসরিন এই বইটি উনার মা বেগম ঈদুল ওয়ারাকে উৎসর্গ করেন।


ক.


যুদ্ধ বাঁধছে। এ পাড়ায় গুঞ্জন, ও পাড়ায় গুঞ্জন। লোক জট পাকাচ্ছে উঠোনে, মাঠে, গলির মোড়ে। কারও চোখ কপালে, কারও নাকের তলায়, হাঁ করা মুখের ভেতর, কারও গালে, কানে, মাথায়। চোখ সবার খোলা। চোখের সামনে দৌড়োচ্ছে লোক, দৌড়োচ্ছে আলোয়, অন্ধকারে। কাচ্চা বাচ্চা বোঁচকা বুচকি কাঁখে নিয়ে, ঘাড়ে নিয়ে, দৌড়োচ্ছে। পালাচ্ছে। পালাচ্ছে শহর থেকে গ্রামে। ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে ফুলপুর, ধোবাউড়া, নান্দাইল। দালানকোঠা, দোকানপাট, ইস্কুলঘর, অমরাবতী নাট্যমন্দির ছেড়ে নদীর ওপারে, ধানক্ষেতে, ধুধু মাঠে, অরণ্যে। ঘর থেকে যারা দু’পা নড়তে চায় না, হৈ হৈ পড়ে গেল তাদের মধ্যেও, বোঁচকা বাঁধ। শকুনেরা ঠোঁটে করে গন্ধ আনছে মরা মাংসের। গুলির শব্দ ভেসে আসছে কবুতরের অস্থির ডানায় করে। মানুষ পালাচ্ছে পায়ে হেঁটে, রেলগাড়িতে, নৌকোয়। ঘরের মত পড়ে থাকে ঘর, উঠোনে গাছগাছালি, জলচৌকি, দা বটি, কালো বেড়াল।


দুটো তিন চাকার মেশিন চালানো গাড়ি এসে থামে আমাদের বাড়ির দরজায়, সন্ধেয়। ওতে চড়ে আমরাও রওনা দিই পাঁচরুখি বাজারের দক্ষিণে মাদারিনগর গ্রামে। শহর ছেড়ে যেই না ফেরি করে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে শম্ভুগঞ্জে পৌঁছই, কোমরে গামছা বাঁধা, ঝোপ থেকে ঝাঁপিয়ে রাস্তায় নেমে ছ’জন যুবক আমাদের নাকের সামনে দাঁড়ায়। দু’হাতে মা’কে আঁকড়ে বিস্ফারিত চোখে দেখি ছ’টি বন্দুক, ছ’টি কাঁধে। অনুমান করি এরই নাম যুদ্ধ, আচমকা পথ আটকে মানুষ মেরে ফেলা। ছ’জনের একজন, নাকের নিচে চিকন কালো মোচ, বলে, গলা ঢুকিয়ে তিন চাকার খোলা দরজায়, শহর খালি কইরা যান কই! সব চইলা গেলে আমরা কারে লইয়া যুদ্ধ করুম! বাড়ি ফিইরা যান। মা বোরখার ঘোমটা তুলে, এক ছটাক রোষের ওপর দু’ছটাক আকুতি মিশিয়ে বলেন, এ কি কন! সামনের গাড়ি তো চইলা গেল। আমার ছেলেরা ওই গাড়িতে। আমাদের যাইতে দেন।


মন গলে না মোচঅলার। কাঁধের বন্দুক মাটিতে ঠুকে চেঁচায়, এক ইঞ্চিও সামনে নড়ব না চাক্কা। পিছাও।


গাড়িকে পিছিয়ে ফেরিতে উঠিয়ে বিড়ি ধরিয়ে গন্ধ ছড়িয়ে কাঁচাপাকা চালক বলে, এরা বাঙালি, আমগোরই লোক, এরা তো আর পাঞ্জাবি না, ডরের কিছু নাই। বুক ধুকপুক করে যেন ছ’টি বন্দুক থেকে ছ’জোড়া গুলি এসে রেগেছে বুকে। দু’পাশে ঠেসে বসা কালো বোরখায় ঢাকা দু’জনের সুরা পড়ার বিড়বিড় আর তিন চাকার ঘড়ঘড় শব্দ শুনতে শুনতে পার হতে থাকি জুবলি ঘাট, গোলপুকুর পাড়। আর কোনও শব্দ নেই, কেবল আমাদের ধুকপুক, বিড়বিড়, ঘড়ঘড়। রাতের কম্বল মুড়ে আলো নিবিয়ে ঘুমিয়ে গেছে পুরো শহর।


সে রাতেই তিন চাকার গাড়িকে বাবা আবার পাঠিয়ে দিলেন পুবের বদলে পশ্চিমে, মাদারিনগরের বদলে বেগুনবাড়ি। গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে পড়ে ইয়াসমিন, ছটকু। মা ঝিমোন, জেগে থাকেন আমার সঙ্গে নানি আর নানির হাতে শক্ত করে ধরা নীল প্লাস্টিকের ঝুড়ি।


ঝুড়ির ভিতরে কি গো নানি?


নানি ঠাণ্ডা গলায় বলেন, চিঁড়ামুড়ি, গুড়।


বেগুনবাড়ি গ্রামে কলাগাছ ঢাকা যে বাড়িটির কাছে আমাদের বিড়িখোর চালক গাড়ি থামায়, সেটি রুনু খালার শ্বশুর বাড়ি।


পিলপিল করে মানুষ বেরিয়ে উঠোনে কুপি উঁচু করে আমাদের দেখে।


শহর থেইকা ইষ্টি আইছে।


কুয়া থেইকা পানি তুলো।


ভাত রান্দো।


পান সাজো।


বিছনা পাতো।


পাঙ্খা কর।


পাতা বিছানায় আড়াআড়ি করে শুই শহরের ইষ্টিরা। ঘুমে কাদা ছটকুর ঠাং আমার ঠ্যাংএর ওপর, ঠ্যাং সরালে পেটে গুঁতো খাই ইয়াসমিনের হাঁটুর। চিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে মিনমিন করি, কোলবালিশ ছাড়া ঘুমাইতে পারি না।


ঘামাচি ওঠা গায়ে পাখার বাতাস করতে করতে মা তাঁর ছিঁদকাঁদুনে মেয়ের ঢং শুনে গলা চেপে ধমকান, কোলবালিশ লাগব না, এমনি ঘুমা।


ধমক খেয়ে চিঁড়ে চ্যাপ্টা চুপ হয়। চৌকির এক কিনারে গুটিসুটি শুয়ে আছেন নানি, কালো পাড় শাড়িতে ঢাকা তাঁর মুখ মাথা, প্লাস্টিকের ঝুড়ি, চিঁড়ামুড়ি গুড়। চৌকাঠে টিমটিম জ্বলে কুপি, কুপির আলোয় টিনের বেড়ায় পাঁচ হাত পাঁচ পা ছড়িয়ে ভূত নাচে আর হুসহুস ডাকে। দেখে দু’হাঁটুর ভেতর মুখ ডুবিয়ে বলি মা ও মা, আমার ডর করে মা।


কোনও সাড়া নেই মা’র, ঘুমিয়ে ছটকুর মত কাদা।


ও নানি, নানি গো।


নানিও রা করেন না।


ভূতের বিদ্যেয় আমার হাতেখড়ি শরাফ মামার কাছে। এক রাতে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরে তিনি বলেছিলেন, পুস্কুনির পাড়ে দেখলাম শাদা কাপড় পরা একটা পেত্নী খাড়োয়া রইছে, আমার দিকে চাইয়া পেত্নী একটা বিজলি দিল, আর আমি লেঙ্গুর ফালাইয়া দৌড়।


শরাফ মামা ঠিরঠির কেঁপে লেপের তলায় ঢুকে যান, আমিও। শামুকের মত শুয়ে থাকি সারারাত।


পরদিনও এরকম ঘটনা নিয়ে ফেরেন মামা। বাঁশঝাড়ের তল দিয়ে হেঁটে আসছেন, কোথাও কেউ নেই, কিন্তু মামদো ভূতের গলা শুনলেন–কিরেঁ শরাঁফ যাঁস কঁই? এঁকটু থাঁম। উর্ধ্বশাসে দৌড়ে এসে ঠাণ্ডা পানিতে সেই কনকনে শীতের রাতে গোসল করেন। বাড়িতে শরাফ মামার খাতির বেড়ে যায়। আমি, ফেলুমামা, টুটুমামা তাঁকে ঘিরে বসে থাকি অর্ধেক রাত অবদি। হাত-পাখায় তাঁকে বাতাস করেন পারুল মামি। নানি গরম ভাতের সঙ্গে শিংমাছের ঝোল বেড়ে আনেন ভূত দেখা ছেলের জন্য, পাতের কিনারে নুন। কানা মামুর বড়শিতে ইয়া বড় বড় মাছ উঠত। আস্তা মাছ লইয়া কুনওদিনও বাড়ি ফিরতে পারে নাই মামু। এক রাইতে দেখে পিছন পিছন এক বিলাই আইতাছে। মামুর কান্ধের উপরে মাছ। মামু হাঁটে বাড়ির পথে, হঠাৎ হালকা হালকা লাগে কান্ধের মাছ। ফিইরা দেখে মাছের অর্ধেকটা নাই, আর বিলাইটাও হাওয়া। আসলে তো বিলাই না, ওইটা ছিল মাউছ্যা ভূত, বিলাইয়ের রূপ ধইরা মাছ খাইতে আইছিল।


শরাফ মামা খেতে খেতে কানা মামুর কিচ্ছা বলেন।


ওসবের পর থেকে আমার রোমকূপের তলায় তলায় ঢুকে গেছে ভয়। বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়, রাতে কেন, দিনের বেলায়ও একা তার ছায়া মাড়াই না। সন্ধে হলেই ঘরে সেঁধিয়ে যাই, গু মুত পেটে চেপে। বেশি বেগ পেলে বড় কাউকে হারিকেন হাতে আগে আগে হাঁটতে হয়, পেছনে আমি ডানে বামে চোখ কান সজাগ রেখে পড়ি কি মরি দৌড়ে সেরে আসি ঝামেলা।


নানিবাড়ি ছেড়ে আমলাপাড়ার বাড়িতে যখন উঠি, আমার বয়স সাড়ে সাত কী আট। বাড়িটির নাম বাবা এক এক করে জিজ্ঞেস করেন তাঁর দুই ছেলেকে, কী হলে ভাল হয়, দাদা বলেন অবকাশ, ছোটদা ব্লু হেভেন। যদিও জানতে চাওয়া হয়নি, আমি আগ বাড়িয়ে বলেছিলাম, আমার পছন্দ রজনীগন্ধা। দাদার বলা নামটিই শ্বেত পাথরে খোদাই করে কালো ফটকের দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হয়। বাড়িটি বিশাল, নকশা কাটা থাম, দরজা। ঘরের সিলিংএ তাকালে মনে হয় আকাশ দেখছি, আকাশে সবুজ কড়িকাঠ সাজানো, কাঠের ওপর আড়াআড়ি লোহার পাত, যেন রেললাইন, পুঁ ঝিকঝিক শব্দ তুলে রেলগাড়ি ছুটবে বলে। বেলগাছের তল থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদে, পেঁচানো সিঁড়ি, ছাদের নকশা কাটা রেলিং ধরে দাঁড়ালে পুরো পাড়া চোখের সামনে। মাঠের কিনার ঘেঁসে নারকেল আর সুপুরি গাছের সারি। উঠোন জুড়ে আম জাম কাঁঠাল পেয়ারা বেল আতা জলপাই ডালিম। খুশিতে আমার দুই দাদা, আমি আর ইয়াসমিন বাড়িময় গোল্লাছুট খেলি। দু’মাইল দূরে পড়ে থাকে এঁদো গলির ভেতর খলসে মাছে ভরা পুকুর, তার পাড়ে নানির চৌচালা ঘর, পড়ে থাকে কড়ইতলায় আঙুলের গর্ত করে মার্বেল খেলা, ছাই মাখা ত্যানায় চিমনি মুছে হারিকেন জ্বালানো, পড়ে থাকে মামাদের সঙ্গে শীতল পাটিতে বসে সন্ধে হলে দুলে দুলে আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে পড়া, পড়ে থাকে ভোরের খেঁজুর রস, ভাপা পিঠে। ও বাড়ি থেকে আর কিছু সঙ্গে না আসুক, ভূতের রোমকাঁটা ভয় ঠিকই এসেছে, এই যুদ্ধের কালে বেগুনবাড়ি অবদিও সে আমার পেছন ছাড়েনি। শরাফ মামা বলতেন–রাত শেষ হইলেই ভূত পেত্নীরা নিজের দেশে ফিইরা যায়।


সকালে ঘুম ভাঙলে দেখি পাঁচ পা অলা ভূত নেই ঘরে, টিনের ফুটকি ফুঁড়ে রোদ ঢুকে ঘর তাতাচ্ছে। উঠোনে পিঁড়ি পেতে বসে গল্প করছেন মা, নানি, রুনুখালার শাশুড়ি। শহর ছেড়ে আমার কোথাও যাওয়া হয়নি এর আগে, কেবল একবার রেলের চাকার তালে ঝিক্কির ঝিক্কির মৈমনসিং ঢাকা যাইতে কত্তদিন বলতে বলতে ঢাকা পৌঁছেছিলাম, দিগন্ত ছোঁয়া লালমাটিয়ার মাঠের কাছে বড়মামার বাড়িতে। ইচ্ছে করে খোলা আকাশ জুড়ে ঘুড়ির মত উড়ে উড়ে মেঘবালিকাদের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলি। দাওয়ায় বসে কয়লার গুঁড়োয় দাঁত মাজতে মাজতে ভাবি যুদ্ধ ব্যাপারটি মন্দ নয়, ইস্কুল বন্ধ দিয়ে দিল আচমকা, বাড়ির ছাদে বসে অবিরাম পুতুল খেলে কাটাচ্ছিলাম, কেবল উড়োজাহাজের শব্দ শুনলেই দৌড়ে নামতে হত নিচে, কানে তুলো গুঁজে মা আমাদের পাঠিয়ে দিতেন খাটের তলায় আর বিড়বিড় করে সুরা পড়তেন। পরে লম্বা একখানা গর্ত খোঁড়া হয়েছিল মাঠে, বোমা পড়ার শব্দ হলে বাড়ির সবাই যেন ওতে ঢুকে পড়ি। হাসপাতালে বোমা পড়ার পর শহর আর নিরাপদ নয় বলে বাবা আমাদের গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন দু’গাড়ি ভরে, এক গাড়ি দাদা, ছোটদা, শরাফ মামা, ফেলু মামা, টুটুমামাকে নিয়ে চলে গেল মাদারিনগর, আরেকগাড়ি এল বেগুনবাড়ি, নিজে রয়ে গেলেন শহরের বাড়িতে, অবস্থা আঁচ করে তিনিও, দরজায় তালা ঝুলিয়ে, এরকমই কথা যে, বাড়ি ছাড়বেন। কুয়োর জলে কুলকুচো করে বুক ভরে শ্বাস নিই, বাতাসে লেবুপাতার গন্ধ। এখন আর বাবার রক্তচোখ নেই, উঠতে বসতে ধমক নেই, যখন তখন চড় চাপড় নেই, এর চেয়ে আনন্দ আর কী পেতে পারি জীবনে, আমি হাওয়ার সঙ্গে নাচব আজ গ্রামের রাস্তায়। গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসি বনের ছায়। মুঠি বাড়ালেই. সীম আর সীম, নাড়ার আগুনে পোড়ায়ে পোড়ায়ে খাব আর যত গেঁয়ো চাষীদের বিলাব নিমন্ত্রণে, আহা!


ছটকু, চল দোকানে যাই। তেঁতুল কিনা আনি।


ছটকুকে প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ও বাঁশের কঞ্চির মত খাড়া হয়ে যায়। তেঁতুল খাওয়ার লোভে জিভে আমার জল গড়াচ্ছে। উঠোন আড়াল করা কলাগাছের বেড়ায়, তার তল দিয়ে বেরিয়ে, ক্ষেতের আল বেয়ে, সামনে আমি পেছনে ছটকু, বড় রাস্তার দিকে যাচ্ছি, কাকতাড়ুয়ার মত সামনে দাঁড়ায় হাসু। তাগড়া ছেলের পরনে মালকোঁচা লুঙ্গি, হাতে বনবন ঘুরছে মরা ডাল।


ছটকু যাইতে পারব, তুমি না। তুমি মেয়ে মানুষ। মেয়ে মানুষের দোকানে যাইতে নাই।


কেন যাইতে নাই? আমি ত সবসময় যাই!


ঠোঁট উল্টে অগ্রাহ্য করতে চাই গেঁয়ো ছেলে হাসুকে।


শহরের দোকানে যাও, এইটা শহর না। গেরাম। গেরামে মেয়ে মানুষেরা ঘরে থাহে। বাইরে বাইরয় না।


বলে কাকতাড়ুয়া আমার দিকে পা পা করে হাঁটে, ওর চোখের গর্ত থেকে মুখ বাড়াচ্ছে দুটো ছাই রঙা ইঁদুর। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা গ্রামের কথা বইয়ে পড়েছি, বড় সাধ ছিল গ্রামে আসার, আর এসে কিনা ধানের শীষের সঙ্গে নাচা হল না, যাওয়া হল না যেদিকে দু’চোখ যায়, বন বাদাড়ে, হাওড়ে বিলে, কোথাও হারিয়ে গিয়ে গিয়ে শোনা হল না কোনও রাখাল ছেলের বাঁশি, বরং সকাল হওয়া মাত্রই দেখতে হল ইঁদুর, তাও চোখে, সে বাড়ির লোকেরই, যে বাড়িতে অতিথি আমি! গলায় এক থোকা কষ্ট জমে আমার। পেছনে সরতে সরতে মা’র একেবারে গা ঘেঁসে থামি, উঠোনে। মা’র পরনে মলিন এক শাড়ি। এলো চুল ঢেকে রেখেছেন ঘোমটায়। মা’র আঁচলের কোণা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে কষ্ট-কণ্ঠে বলি–আমারে দোকানে যাইতে দেয় না।


মা সাড়া দেন না। দু’হাতে তাঁর চিবুকখানা নিজের দিকে ফিরিয়ে বলি ওই হাসু আমারে তেঁতুল কিনতে যাইতে দেয় না।


মা চিবুক ছাড়িয়ে ধমকে ওঠেন–তেঁতুল খাইতে হইব না, শইলের রক্ত পানি হইয়া যায় চুক্কা খাইলে।


মা’র চিরকালই তেঁতুলের বিরুদ্ধে এই এক অভিযোগ। মা যেন দেখতে না পান, ছাদের সিঁড়িতে বসে, তেঁতুলের গুলি নুনে ডলে, বুড়ো আঙুলে অল্প অল্প তুলে জিভে ট্টা ট্টা শব্দ করে খেতাম। জিভ শাদা করে, দাঁত টক করে, রক্ত পানি করে তবে আমার তেঁতুল ফুরোতো। হাত পা কোথাও কাটলে ভয় পেতাম, এই বুঝি ধরা পড়ে যাব, রক্তের বদলে যখন পানি বেরোবে। কিন্তু না, যখনই কাটে, কাচে বা শামুকে, গোলাপের কাঁটায় বা উঠোনের ভাঙা ইটে পড়ে, রক্তই বেরোয়। র

**********