স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি

স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি

ভগিনী নিবেদিতা

স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি

Books Pointer Iconভগিনী নিবেদিতা
Books Pointer Iconmotivational

Change color

প্রথম সংস্করণের নিবেদন


ভগিনী নিবেদিতার অমর গ্রন্থ ‘The Master as I saw Him’-এর স্বামী মাধবানন্দকৃত বঙ্গানুবাদ ‘আচার্য শ্রীবিবেকানন্দ (যেমনটি দেখিয়াছি) এই নামে উদ্বোধন-এর ১৩২২, আষাঢ় হইতে ১৩২৪, চৈত্র পর্যন্ত সংখ্যাগুলিতে ধারাবাহিকভাবে প্রথম প্রকাশিত হয়। নানা কারণে উহা এতদিন পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় নাই। বর্তমান গ্রন্থখানি সেই অনুবাদেরই ঈষৎ সংশোধিত পুনর্মুদ্রণ। কেবল ইহার নূতন নামকরণ হইল, ‘স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি’।

প্রকাশক


০০. পাশ্চাত্য পাঠক–পাঠিকাগণের প্রতি নিবেদন


বৌদ্ধধর্মের প্রচারযুগের অবসান হইবার পর হইতে ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে যেদিন স্বামী বিবেকানন্দ গৈরিকধারী সন্ন্যাসীর বেশে শিকাগো প্রদর্শনীর অন্তর্গত ধর্মমহাসভার মঞ্চে দণ্ডায়মান হন, সেদিন পর্যন্ত হিন্দুধর্ম নিজেকে প্রচারশীল ধর্ম বলিয়া ভাবে নাই। হিন্দুধর্মের শিক্ষকতা কার্যই যাহাদের নির্দিষ্ট বৃত্তি ছিল, সেই ব্রাহ্মণগণ ছিলেন নাগরিক ও গৃহস্থ এবং সেজন্য হিন্দুসমাজেরই এক অঙ্গস্বরূপ ছিলেন, ফলে সমুদ্রযাত্রার অধিকার হইতেও তাহারা বঞ্চিত ছিলেন। আর সিদ্ধপুরুষ বা অবতার পুরোহিত ও পণ্ডিতগণ অপেক্ষা যতটা উচ্চে অবস্থিত, হিন্দুধর্মের অন্তর্গত পরিব্রাজক সন্ন্যাসিগণের মধ্যে যাহারা উচ্চতম অধিকারী, প্রামাণ্য হিসাবে যদিও তাহাদের স্থান ব্রাহ্মণজাতি অপেক্ষা ঠিক ততটাই উচ্চে-তথাপি তাঁহারা স্বাধীনতার ঐ প্রকার ব্যবহারের কথা আদৌ ভাবিতে পারেন নাই। স্বামী বিবেকানন্দও নিজ বিশ্বস্ততাজ্ঞাপক কোন পরিচয়-পত্র লইয়া শিকাগোর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হন নাই। যেমন তিনি ভারতের এক গ্রাম হইতে অন্য গ্রামে ভ্রমণ করিতে পারিতেন, ঠিক তেমনভাবেই তাহার মাদ্রাজের জনকয়েক অনুরাগী ও শ্রদ্ধাবান শিষ্যের আগ্রহে প্রশান্ত মহাসাগরের অপর পারে আগমন করেন। আমেরিকাবাসিগণও স্বজাতিসুলভ আতিথ্য ও সরলতাগুণে তাহাকে সমাদরে গ্রহণপূর্বক বক্তৃতা দিবার সুযোগ দেন। যেমন বৌদ্ধপ্রচারকগণের ক্ষেত্রে, তেমন তাহার ক্ষেত্রেও এক মহাপুরুষের শক্তিই তাহাকে জোর করিয়া বিদেশে প্রেরণ করে—যে মহাপুরুষের চরণপ্রান্তে বহু বৎসর বাস করিয়া তিনি তাহার জীবনের সঙ্গিস্বরূপ হইয়াছিলেন। তথাপি পাশ্চাত্যদেশে তিনি কোন বিশেষ আচার্যের কথা বলেন নাই, কোন এক সীমাবদ্ধ সম্প্রদায়ের মত ঘোষণা করেন নাই। “হিন্দুগণের ধর্ম সম্বন্ধীয় ধারণাবলী”—ইহাই ছিল তাহার শিকাগো বক্তৃতার বিষয়; এবং ইহার পরেও, যে সকল তত্ত্ব বহু অংশে বিভক্ত সনাতন হিন্দুধর্মের সাধারণ সম্পত্তি এবং বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক, কেবল সেইগুলিই তাহার বক্তৃতায় স্থান পাইত। সুতরাং ইতিহাসে এই প্রথম একজন অতি উচ্চদরের মনীষাসম্পন্ন হিন্দু, অন্য সকল বিষয় পরিহারপূর্বক হিন্দুধর্মকেই বিশ্লেষণ ও উহার বিশ্লিষ্ট-অংশগুলির সাধারণ ধর্ম আবিষ্কার করিতে যত্নপর হন।


স্বামীজী ১৮৯৫ খ্রীস্টাব্দের আগস্ট মাস পর্যন্ত আমেরিকায় অবস্থান করেন এবং তারপর প্রথমবার ইউরোপে আগমন করেন। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ইংলণ্ডে উপনীত হন এবং প্রায় একমাস পরে লণ্ডনে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন।


প্রথম পরিচ্ছেদ

লণ্ডনে, ১৮৯৫ খ্রীস্টাব্দে


মনে কবিলে আশ্চর্য বোধ হয়, কিন্তু নিশ্চিতই আমার সৌভাগ্য বলিতে হইবে যে, আমার গুরুদেব শ্রীমৎ স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতাবলী তাহার ১৮৯৫ ও ১৮৯৬ খ্রীস্টাব্দে ইংলণ্ড-আগমনকালে—উভয়বারই আমি শ্রবণ করিয়াছিলাম, তথাপি ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের প্রথম দিকে ভারতে আসিবার পূর্বে তাহার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে অতি অল্পই জানিতাম; এমনকি কিছুই জানিতাম না বলিলেও চলে। সৌভাগ্য, কেন না এই পূর্ব পরিচয় না থাকার ফলেই আমি মানসনেত্রে স্বামীজীর ব্যক্তিত্বেব যে স্বতঃ প্রকাশ ঘটিত তাহার প্রতি পদে, ভারতীয় অরণ্য, নগর ও রাজপরূপ যথার্থ পরিবেশের মধ্যেই তাহাকে দেখিতে পাই—প্রাচ্য আচার্যকে প্রাচ্য জগতের আবেষ্টনীর মধ্যেই দেখিয়া থাকি। এমনকি সুদূর লণ্ডনেও যখন আমি তাহাকে প্রথম দেখি, এখন ঐ ঘটনা স্মরণ করিয়া আমার চিত্ত যেরূপ আলোড়িত হয়, সূর্যালোকমণ্ডিত স্বদেশের বহু স্মৃতিপরম্পরা তাহার চিত্তও সেইরূপ আলোড়িত করিয়া থাকিবে। সময়টি ছিল নভেম্বর মাসের এক রবিবারের শীতল অপরাহু। স্থান ওয়েস্ট-এণ্ডের এক ড্রইংরুম। অর্ধবৃত্তাকারে উপবিষ্ট শ্রোতৃমণ্ডলীর দিকে মুখ করিয়া তিনি বসিয়াছিলেন। তাঁহার পশ্চাতে ছিল কক্ষের অগ্নি রাখিবার স্থানে প্রজ্বলিত অগ্নি। আর যখন তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্নের উওর দিতেছিলেন, এবং মধ্যে মধ্যে উত্তরটি উদাহরণ দ্বারা ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কোন সংস্কৃত গ্রন্থ হইতে সুব করিয়া আবৃত্তি করিতেছিলেন, তখন গোধূলি ও অন্ধকারের মিলন-সদ্ভুত সেই দৃশ্যটি নিশ্চয়ই ভারতের কোন উদ্যানে, অথবা সূর্যাস্তকালে কূপের নিকটে, কিংবা গ্রামের উপকণ্ঠে বৃক্ষতলে উপবিষ্ট সাধু এবং তাহার চারিদিকে সমবেত শ্রোতৃবৃন্দ—এইরূপ এক দৃশ্যেবই কৌতুককর রূপান্তর বলিয়া তাঁহার বোধ হইয়া থাকিবে। ইংলণ্ডে আচার্য হিসাবে স্বামীজীকে আমি আর কখনও এমন সাদাসিধা ভাবে দেখি নাই। পববর্তী কালে তিনি সর্বদাই বক্তৃতা দিতেন; অথবা প্রশ্নাদির উত্তর দিতেন। প্রশ্নগুলি সমাগত বহু সংখ্যক শ্রোতৃবৃন্দের মধ্যে কেহ কেহ নিয়মমাফিক উত্থাপন করিতেন। কেবল এই প্রথমবারেই আমরা মাত্র পনর-ষোল জন অভ্যাগত ছিলাম। আমাদের মধ্যে অনেকেই আবার ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বামীজী আমাদের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলেন—তাহার পরিধানে ছিল গৈরিক পরিচ্ছদ ও কোমরবন্ধ—যেন তিনি আমাদের নিকট কোন্ এক দূর দেশের বার্তা বহন করিয়া আনিয়াছেন। মধ্যে মধ্যে তিনি এক অদ্ভুত অভ্যাস মত ‘শিব! শিব!’ বলিয়া উঠিতেছিলেন। তাহার প্রশান্ত আননে বিরাজ করিতেছিল কোমল ও মহত্ত্বব্যঞ্জক ভাবের সংমিশ্রণ—যাহা সাধারণতঃ ধ্যানপরায়ণ ব্যক্তিগণের মুখমণ্ডলে দেখা যায়। সম্ভবতঃ ঐ ভাবই র‍্যাফেল তাহার দিব্য শিশুর (Sistine Child-এর(১)) ললাটে অঙ্কিত করিয়া দেখাইয়া গিয়াছেন।


সে অপরাহ্নের পর আজ দশ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, এবং সেদিনকার কথাবার্তার একটু আধটু মাত্র এখন মনে পড়িতেছে। কিন্তু সেই বিস্ময়কর প্রাচ্য সু সংযোগে যে-সকল সংস্কৃত শ্লোক তিনি আবৃত্তি করিয়া শুনাইয়াছিলেন, তাহা কখনও ভুলিবার নহে; ঐ সুরের ঝঙ্কার আমাদের গীর্জায় প্রচলিত গ্রেগরি(২)-প্রবর্তিত সুরের কথা এত মনে করাইয়া দেয়, অথচ উহা হইতে কত ভিন্ন।


.


তাহার নিজের সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন করিলে তাহার উত্তর দিতে তিনি বেশ আগ্রহী ছিলেন, এবং একটি প্রশ্নের উত্তরে বুঝাইয়া দিলেন, তাঁহার পাশ্চাত্যে আগমনের কারণ হইল—তিনি বিশ্বাস করেন, বিভিন্ন জাতির মধ্যে, বর্তমানে যেরূপ পণ্যদ্রব্যের বিনিময় চলিতেছে, ঐরূপ পরস্পরের মধ্যে আদর্শের আদান-প্রদানেরও সময় আসিয়াছে। এই সময় হইতে বরাবর কথাবার্তা বেশ সহজভাবে চলিয়াছিল। তিনি প্রাচ্যের “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম” রূপ অদ্বৈতবাদের ব্যাখ্যা করিতেছিলেন। সেই প্রসঙ্গে তিনি বিবিধ ইন্দ্রিয়জ্ঞান এক অদ্বিতীয় সত্তার বিভিন্ন বিকাশ বলিয়া বর্ণনা করিলেন, এবং গীতা হইতে শ্লোক উদ্ধৃত করিয়া তাহার ইংরেজী অনুবাদ করিয়া দিলেন—”ময়ি মিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব” –সূত্রে গ্রথিত মণিসমূহের ন্যায় এই সকল আমাতে অবস্থিত।


তিনি আমাদের বলিলেন, খ্রীস্টধর্মের ন্যায় হিন্দুধর্মেও প্রেমই ধর্মভাবের চরম উৎকর্ষ বলিয়া স্বীকৃত হয়।


তিনি আরও বলিলেন, হিন্দুগণ মনে করেন, শরীর ও মন এক তৃতীয় পদার্থ আত্মার দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত। এই বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে, যাহার ফলে পরবর্তী শীতকালে আমি সম্পূর্ণ নূতন দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া জগৎকে দেখিতে আরম্ভ করি।


তিনি বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুধর্মের পার্থক্য বর্ণনা করিতেছিলেন এবং আমার মনে আছে, তিনি শান্তভাবে এই কয়টি কথা বলেন, “বৌদ্ধগণ ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছিলেন।” সুতরাং এই হিসাবে বৌদ্ধধর্ম ছিল আধুনিক অজ্ঞেয়বাদের (Agnosticism-এর) সম্পূর্ণ বিপরীত মতাবলম্বী। বরং ইন্দ্রিয়জ জ্ঞান মনেরই খেয়াল মাত্র, অতএব অনুমানও তাহাই, এইরূপ সন্দেহ অজ্ঞেয়বাদের মূলমন্ত্র বলিয়া অজ্ঞেয়বাদ অনেকটা হিন্দুধর্মেরই সদৃশ।


আমার মনে আছে, তিনি বিশ্বাস (faith) শব্দটিতে আপত্তি প্রকাশ করেন এবং উহার পরিবর্তে প্রত্যক্ষানুভূতি (realisation) শব্দটি ব্যবহার করিতে বিশেষ আগ্রহান্বিত হন। সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা করিতে গিয়া তিনি ভারতের একটি প্রবাদ উদ্ধৃত করেন, “কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে জন্মানো ভাল, কিন্তু উহার গণ্ডির মধ্যেই মৃত্যু অতি ভয়ঙ্কর।”


আমার মনে হয়, সম্ভবতঃ এই প্রসঙ্গেই পুনর্জন্মবাদও আলোচিত হইয়াছিল। বোধহয় তিনি কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান—এই তিনটিকে আত্মজ্ঞান লাভেরতিনটি উপায় বলিয়া উল্লেখ করেন। আমার বেশ মনে আছে, তিনি কিছুক্ষণ ধরিয়া মানবের অনন্ত শক্তি সম্বন্ধে বলেন এবং ঘোষণা করেন, সকল ধর্মের একমাত্র শিক্ষা এই—”ত্যাগ কর, ত্যাগ কর।”


তিনি এই ভাবের দু-একটি কথাও বলিয়াছিলেন যে, ভারতবর্ষে উচ্চতম ধর্মের সহিত পুরোহিত ও মন্দিরাদির কোন সম্পর্ক নাই, এবং তাহার দেশের সর্বোচ্চ ধার্মিক ব্যক্তির নিকট স্বৰ্গকামনা ‘কতকটা নিম্নস্তরের’ বলিয়াই বিবেচিত হয়।


আত্মার মুক্ত স্বভাবরূপ আদর্শ তিনি নিশ্চয় উল্লেখ করিয়া থাকিবেন। মানব-সেবাই প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের উদ্দেশ্য বলিয়া পাশ্চাত্যে আমাদের যে ধারণা, তাহার সহিত তাহার মতের আপাতবিরোধও ঘটিয়াছিল। কারণ আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, সেদিন অপরাহ্নে তিনি সর্বপ্রথম সোসাইটি (society) শব্দটি এমন এক অর্থে ব্যবহার করিয়াছিলেন, যাহা আমি কখনও সঠিকরূপে বুঝিতে পারিয়াছি বলিয়া মনে করি না। যতদূর মনে পড়ে, তিনি পূর্বোক্ত আদর্শটির উল্লেখ করিয়াই আমাদের দিক হইতে যে সকল প্রতিবাদ উঠিবার সম্ভাবনা তাহা অনুমান করিয়া বলেন, “আপনারা বলবেন এতে সমাজের কোন উপকার হয় না। কিন্তু এই আপত্তি স্বীকার করে নেবার পূর্বে আপনাদের প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে, সমাজের স্থায়িত্ব জিনিসটা স্বয়ং একটি উদ্দেশ্যস্বরূপ।”


ঐ সময়ে আমি মনে করিয়াছিলাম, ‘সোসাইটি’ (সমাজ) অর্থে তিনি সমগ্র মানবজাতির উল্লেখ করিতেছেন, এবং বিচার করিয়া দেখিলে শেষ পর্যন্ত জগৎনশ্বর, অতএব জগতের উপকারের জন্য যাহা কিছু করা যায় তাহাও নশ্বর—এইরূপ মতবাদ প্রচার করিতেছেন। কিন্তু এই অর্থই কি তাহার অভিপ্রেত ছিল? তাহা হইলে মানবসেবাই যে চিবকাল তাহার জীবনব্রত ছিল, তাহার সহিত এই মরে সামঞ্জস্য হয় কিরূপে? অথবা, তিনি শুধু একটি ভাবমাত্র বর্ণনা করিতেছিলেন এবং নিজে সরিয়া দাঁড়াইয়া ঐ ভাবটিকে যতদর সম্ভব সমর্থন কবিতেছিলেন? অথবা, তাহার ‘সোসাইটি’ শব্দটি সেই অদ্ভুত প্রাচ্যদেশীয় ‘সমাজ’ শব্দের একটি ভুল অনুবাদমাত্র। প্রাচ্যে ‘সমাজ’ বলিলেই তাহার সহিত ঈশতন্ত্র শাসনের(৩) কিছু কিছু বুঝায়, এবং অন্য নানা ভাবের সঙ্গে আমাদের দেশে চার্চ বা যাজকসম্প্রদায়ের শাসন সম্বন্ধে যে ধারণা আছে তাহাও ইহার অন্তর্ভুক্ত।


পরিব্রাজক আচার্য হিসাবে তাহার নিজের পদমর্যাদা কি, এই প্রশ্নেরও তিনি কিছু আলোচনা করেন, এবং বলেন, ধর্মসঙঘ সম্পর্কে অথবা একজনের কথায় বলিতে গেলে, “যে ধর্মমত সম্প্রদায়ে সীমাবদ্ধ (পরিণতি লাভ করে), তাহার সম্পর্কে ভারতের তেমন আস্থা নাই।” তিনি বলেন, “আমাদের বিশ্বাস ‘সঙ’ থেকে চিরকালই নূতন উৎপাতের সৃষ্টি হয়ে থাকে।”


তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করিলেন, ঐ সময়ে পাশ্চাত্যে বহুল প্রচলিত কয়েকটি ধর্মসম্প্রদায় কাঞ্চনাসক্তিবশতঃ অচিরে বিনষ্ট হইবে। তিনি ঘোষণা করেন–মানুষ সত্য হইতেই সত্যে অগ্রসর হইয়া থাকে, মিথ্যা হইতে সত্যে নহে।


বস্তুতঃ এই মূল সত্যটিকেই তিনি সর্বদা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হইতে প্রচার করিতেন যে, সকল ধর্মই সমভাবে সত্য, এবং আমাদের পক্ষে কোন অবতারের বিরুদ্ধ-সমালোচনা অসম্ভব, যেহেতু অবতারগণ সকলেই সেই এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মের বিভিন্ন প্রকাশমাত্র। এই স্থলে তিনি গীতার সেই সর্বশ্রেষ্ঠ শ্লোকটি উদ্ধৃত করেন–


“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।

অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং স

**********