
পত্রগুচ্ছ
কাজী নজরুল ইসলাম
মৌলবি আবদুল গফুরকে
Raniganj,
Moslem Hostel
23.7.17
পাক জোনাবেষু –
আদাব কোর্ণোশাৎ হাজার হাজার পাক জোনাবে পহুছে। বাদ আরজ , ইতিপূর্বে খাদেম আপনাকে ২ খানা পত্র বর্ধমানের ঠিকানায় লিখিয়াছিল, কিন্তু বড়োই দুঃখের বিষয়, কোনো উত্তর পাই নাই। পড়া-শুনা মন্দ হয় নাই। বোর্ডিং অবস্থা মাঝামাঝি। সকলেই ভালো।
রমজান শাহের পিতা সুরত শাহের নিকট আপনি যে ছয় টাকার মানতা হইয়াছিলেন। তন্মধ্যে কেবল ২ টাকা সে আপনাকে দিয়াছিল। বাকি ৪ টাকা আপনি চলিয়া যাইবার সময় আমার নামে চাপাইয়া দিয়াছিলেন এবং লিখাইয়াও লইয়াছিলেন। আমি জানি যে, চারি টাকা আপনি রমজানের হিসাবে চাপান নাই। তথাপি সুরত শাহ বলিতেছে’মৌলবি সাহেব তোমার টাকা চারিটি রমজানের হিসাবে চাপাইয়া দিয়াছেন; তুমি পাইবার কে?’ আমি তাহাকে বিশেষ করিয়া বুঝাইয়া দিলেও সে বুঝিতেছে না। শেষে বলিয়াছে যদি মৌলবি সাহেব লিখিয়া দেন যে তাহা রমজানের হিসাবে চাপান নাই তাহা হইলে আমি টাকা দিতে স্বীকৃত আছি। আপনি পুনরায় যখন টাকার জন্য এখানে আসেন তখনও বলিয়া যান যে, সে-টাকা রমজানের টাকা হইতে কাটাইয়া লই নাই। তথাপি সে বুঝিবে না। অতএব মেহেরবানি পূর্বক অপর কার্ডে স্পষ্ট করিয়া লিখিয়া দিয়া বাধিত করিবেন যে রমজানের টাকা হইতে বা তাহার হিসাবে আমার টাকা কাটাইয়া লন নাই। নতুবা এ গরিবের টাকা কয়টি অনর্থক যায়। আশা করি আমার পত্রপাঠ স্পষ্ট করিয়া জানাইয়া বাধিত করিবেন। পত্রের আশায় রহিলাম।
আজকাল কী করিতেছেন ও কোথায় আছেন জানাইবেন। পাক জোনাবে আরজ।
ইতি
খাদেম
নজরুল এসলাম
সম্পাদক, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা-কে
From:
QAZI NAZRUL ISLAM
Battalion Quartermaster Havilder
49th Bengalis,
Dated, Cantonment, Karachi,
The 19th August, 1919
আদাব হাজার হাজার জানবেন!
বাদ আরজ, আমার নগণ্য লেখাটি আপনাদের সাহিত্য-পত্রিকায় স্থান পেয়েছে, এতে কৃতজ্ঞ হওয়ার চেয়ে আমি আশ্চর্য হয়েছি বেশি। আমার সবচেয়ে বেশি ভয় হয়েছিল, পাছে বেচারি লেখা ‘কোরকে’র কোঠায় পড়ে। অবশ্য যদিও আমি ‘কোরক’ব্যতীত প্রস্ফুটিত ফুল নই; আর যদিই সেরকম হয়ে থাকি কারুর চক্ষে, তবে সে বেমালুম ধুতরো ফুল। যা হোক, আমি তার জন্যে আপনার নিকট যে কত বেশি কৃতজ্ঞ, তা প্রকাশ করবার ভাষা পাচ্ছিনে। আপনার এরূপ উৎসাহ বরাবর থাকলে আমি যে একটি মস্ত জবর কবি ও লেখক হব, তা হাতে-কলমে প্রমাণ করে দিব, এ একেবারে নির্ঘাত সত্যি কথা। কারণ, এবার পাঠালুম একটি লম্বা চওড়া ‘গাথা’ আর একটি ‘প্রায় দীর্ঘ’ গল্প আপনাদের পরবর্তী সংখ্যা কাগজে ছাপাবার জন্যে, যদিও কার্তিক মাস এখনও অনেক দূরে। আগে থেকেই পাঠালুম, কেননা এখন হতে এটা ভালো করে পড়ে রাখবেন এবং চাই কি আগে হতে ছাপিয়েও রাখতে পারেন। তাছাড়া আর একটি কথা। শেষে হয়তো ভালো ভালো লেখা জমে আমার লেখাকে বিলকুল ‘রদ্দি’ করে দেবে, আর তখন হয়তো এত বেশি লেখা না পড়তেও পারেন। কারণ, আমি বিশেষরূপে জানি, সম্পাদক বেচারাদের গলদঘর্ম হয়ে উঠতে হয় এই নতুন কাব্যি-রোগাক্রান্ত ছোকরাদের দৌরাত্ম্যিতে। যাক, অনেক বাজে কথা বলা গেল। আপনার সময়টাকেও খামকা টুঁটি চেপে রেখেছিলুম। এখন বাকি কথা কটি মেহেরবানি করে শুনুন।
যদি কোনো লেখা পছন্দ না হয়, তবে ছিঁড়ে না ফেলে গরিবকে জানালেই আমি ওর নিরাপদে প্রত্যাগমনের পাথেয় পাঠিয়ে দেব। কারণ সৈনিকের বড্ড কষ্টের জীবন। আর তার চেয়ে হাজার গুণ পরিশ্রম করে একটু আধটু লেখি। আর কারুর কাছে এ একেবারে worthless হলেও আমার নিজের কাছে ওর দাম ভয়ানক! আর ওটা বোধ হয় সব লেখকের পক্ষেই স্বাভাবিক। আপনার পছন্দ হল কিনা, জানাবার জন্যে আমার নাম ঠিকানা লেখা একখানা Stamped খামও দেওয়া গেল এর সঙ্গে। পড়ে মত জানাবেন।
আর যদি এত বেশি লেখা ছাপবার মতো জায়গা না থাকে আপনার কাগজে, তা হলে যে কোনো একটা লেখা ‘সওগাত-এর সম্পাদককে hand-over করলে আমি বিশেষ অনুগৃহীত হব। ‘সওগাত’-এ লেখা দিচ্ছি দু-একটা করে। যা ভালো বুঝেন জানাবেন।
গল্পটি সম্বন্ধে আপনার কিছু জিজ্ঞাসা বা বক্তব্য থাকলে জানালেই আমি ধন্যবাদের সহিত তৎক্ষণাৎ তার উত্তর দিব, কারণ, এখনও অনেক সময় রয়েছে।
আমাদের এখানে সময়ের money-value; সুতরাং লেখা সর্বাঙ্গসুন্দর হতেই পারে না। Undisturbed time মোটেই পাই না। আমি কোনো কিছুরই কপি বা duplicate রাখতে পারি না। সেটি সম্পূর্ণ অসম্ভব।
By the by আপনারা যে ‘ক্ষমা’ বাদ দিয়ে কবিতাটির ‘মুক্তি’ নাম দিয়েছেন, তাতে আমি খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। এই রকম দোষগুলি সংশোধন করে নেবেন। বড্ড ছাপার ভুল থাকে, একটু সাবধান হওয়া যায় না কি? আমি ভালো, আপনাদের কুশল সংবাদ দিবেন।
নিবেদন ইতি –
খাদেম
নজরুল ইসলাম
পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে
১
… ‘প্রবাসী’তে বেরিয়েছে ‘সবুজপত্র’-এ পাঠানো কবিতা, এতে কবিতার মর্যাদা বেড়েছে কী কমেছে, তা আমি ভাবতে পারছি না। ‘সবুজপত্র’-এর নিজস্ব আভিজাত্য থাকলেও ‘প্রবাসী’র মর্যাদা একটুকও কম নয়। প্রচার আরও বেশি। তা ছাড়া আমি কবিতা লিখেছি, পারসিক কবি হাফেজের মধ্যে বাংলার সবুজ দূর্বা ও জুঁই ফুলের সুবাস আর প্রিয়ার চূর্ণ কুন্তলের যে মৃদু গন্ধের সন্ধান আমি পেয়েছি, সে-সবই তো খাঁটি বাংলার কথা, বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আনন্দরসের পরিপূর্ণ সমারোহ। কত শত বছর আগের পারস্যের কবি, আর কোথায় আজকের সদ্য শিশির-ভেজা সবুজ বাংলা। ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের রুক্ষ পরিবেশে মৃত্যু সমারোহের মধ্যে বসে এই যে চিরন্তন প্রেমিক-মনের সমভাব আমি চাক্ষুস করলাম আমার ভাষায়, আমার আপন জন বাঙালিকে সেই কথা জানাবার আকুল আগ্রহই এই এক টুকরো কবিতা হয়ে ফুটে বেরিয়েছে। জানি না জুঁই ফুলের মৃদু গন্ধ ও দূর্বা শ্যামলতা এর মধ্যে ফুটেছে কি-না। তবু বাঙালির সচেতন মনে মানুষের ভাব জীবনের এই একাত্মবোধ যদি জাগাতে পারে তবে নিজেকে ধন্য মনে করব। অবশ্য বাঙালির কাছে পৌঁছে দেওয়ার ও যোগ্য বাহনে পরিবেশন করবার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আপনার। …
২
পবিত্রবাবু, কাল কলকাতায় এসে পৌঁছেছি ১। দেখা করতে এলাম ২, কিন্তু বরাত খারাপ। আমি ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে।৩ বাড়িটা আপনার সুপরিচিত। দেখা পাওয়ার আগ্রহে বসে থাকব।
হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম
৩
Dr. Bose’s Sanatorium
Quarter No. 49
Deoghar
শুক্রবার, বিকাল
ভো ভো লিভঁ মসিয়েঁ!
গতকাল শুভ দিবা দ্বিপ্রহরে অহম্ দানবের এই দেওঘরেই আসা হয়েছে। আপাতত আসন পেতেছি ওই উপরের ঠিকানাতে। শিমুলতলা যাওয়া হয়নি। পথের মাঝে মত বদলে গেল। পরে সমস্ত কথা জানাব। জায়গাটা মন্দ নয়। তবে এক মাসের বেশি থাকতে পারব না এখানে, কেননা এখানে খুব বেশি আনন্দ পাচ্ছি না।… ‘নারায়ণ’-এর টাকাটা দিয়েছিস অবিনাশদাকে৩? যদি হাতে টাকা থাকে, তবে ‘বিজলী’র দুটাকা তাদের অফিসে দিয়ে আমার ঠিকানায় কাগজ পাঠাতে বলিস।৪ … তোর বউ-এর খবর কী?৫ তাঁর সঙ্গে আমার চিঠির মারফতে আলাপ করিয়ে দিস। কালই চিঠি না পেলে কিন্তু তোদের মাঝে জোর কলহ বাধিয়ে দেব।… কান্তিবাবুকে আমার প্রীতি ভালোবাসা আর প্রণাম জানাস।৬ তোর গল্প লিখব, একটু গুছিয়ে নিই আগে। বড্ড শীত রে এ শা-র জায়গায়। টাকা ফুরিয়ে গেছে। আফজল৭ কিংবা খাঁ৮ যেন শিগগির টাকা পাঠায়। খোঁজ নিবি, আর বলবি আমার মাঝে মানুষের রক্ত আছে। আজ যদি তারা সাহায্য করে, তা ব্যর্থ হবে না – আমি তা সুদে আসলে পুরে দেব।
ইতি –
তোর পীরিত-দধি-লুব্ধ মার্জার
নজর্
আলি আকবর খান-কে
কান্দিরপাড়,
কুমিল্লা
23 July, 1921
(বিকেল বেলা)
বাবা শ্বশুর!
আপনাদের এই অসুর জামাই পশুর মতন ব্যবহার করে এসে যা কিছু কসুর করেছে, তা ক্ষমা কোরো সকলে, অবশ্য যদি আমার ক্ষমা চাওয়ার অধিকার থাকে। এইটুকু মনে রাখবেন, আমার অন্তর-দেবতা নেহায়েত অসহ্য না হয়ে পড়লে আমি কখনো কাউকে ব্যথা দিই না। যদিও ঘা খেয়ে খেয়ে আমার হৃদয়টাতে ঘা-টা বুঁজে গেছে, তবু সেটার অন্তরতম প্রদেশটা এখনও শিরীষ ফুলের পরাগের মতোই কোমল আছে সেখানে খোঁচা লাগলে আর আমি থাকতে পারিনে। তা ছাড়া, আমিও আপনাদেরই পাঁচজনের মতন মানুষ, আমার গণ্ডারের চামড়া নয়, কেবল সহ্যগুণটা কিছু বেশি। আমার মান-অপমান সম্বন্ধে কাণ্ডজ্ঞান ছিল না বা ‘কেয়ার’ করিনি বলে আমি কখনও এতবড়ো অপমান সহ্য করিনি। যাতে আমার ‘ম্যানলিনেসে’ বা পৌরুষে গিয়ে বাজে – যাতে আমাকে কেউ কাপুরুষ হীন ভাবতে পারে। আমি সাধ করে পথের ভিখারি সেজেছি বলে লোকের পদাঘাত সইবার মতন ‘ক্ষুদ্র-আত্মা’ অমানুষ হয়ে যাইনি। আপনজনের কাছ হতে পাওয়া অপ্রত্যাশিত এত হীন ঘৃণা, অবহেলা আমার বুক ভেঙে দিয়েছে। বাবা! আমি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। দোওয়া করবেন, আমার এ ভুল যেন দুদিনেই ভেঙে যায় – এ অভিমান যেন চোখের জলে ভেসে যায়!
বাকি উৎসবের জন্য যত শিগগির পারি বন্দোবস্ত করব। বাড়ির সকলকে দস্তুর মতো সালাম-দোওয়া জানাবেন। অন্যান্য যাদের কথা রাখতে পারিনি, তাদের ক্ষমা করতে বলবেন। তাকেও ক্ষমা করতে বলবেন, যদি এ ক্ষমা চাওয়া ধৃষ্টতা না হয়! আরজ – ইতি
চিরসত্য স্নেহসিক্ত –
নুরু
মোহাম্মদ আফজলউল হক-কে
Kandirpar
Coomilla
15th Chaitra
ভাই ডাবজল!
‘মোসলেম ভারত’ কি ডিগবাজি খেল নাকি?৩ খবর কী? ‘ব্যথার দান’ কেমন কাটছে?৪ কত কাটল? অন্যান্য কাগজে সমালোচনা বা বিজ্ঞাপন বেরুল না কেন? ‘সার্ভেন্ট’৫ আর ‘মোহাম্মদী’৬-র সমালোচনা আর ‘বিজলী’৭ ও বাংলার কথা’-য়৮ বিজ্ঞাপন দেখেছি মাত্র। ‘আরবি ছন্দ’ দেখেছেন?৯ কে কী বললে? আপনার মুমূর্ষু অবস্থা দেখেই ওটা ‘প্রবাসী’তে দিয়েছি। তার জন্য দুঃখিত হয়েছেন না-কি? আর সব খবর কী? ‘মোসলেম ভারত’-এর অবস্থা জানবার জন্য বড্ড উদ্বিগ্ন। এতদিন চট্টগ্রাম বা অন্য কোথাও যেতে পারিনি ; তার কারণ এ-বাড়িতে১০ অন্তত দুজন করে অনবরত শয্যাগত রোগশয্যায়। এখন আবার বসন্ত হয়েছে মেয়েদের। এসব ছেড়ে যেতে পারিনি। তা ছাড়া মায়ের স্নেহ আর নিজের আলস্য ঔদাস্য তো আছেই। চট্টগ্রামে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কনফারেন্সে আসবেন নাকি? আমি যাব নিশ্চয়ই দেখতে। দুই কাজই হবে। নিজের শরীরও ভালো নয়। মনের অশান্তির আগুন দাবানলের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। অবশ্য ‘আমি নিজেই নিজের ব্যথা করি সৃজন’! হ্যাঁ আমায় আজই কুড়িটি টাকা টেলিগ্রাফ-মানিঅর্ডার করে পাঠাবেন kindly। বড্ড বিপদে পড়েছি। আর কারুর কাছে আমি যাই-ই হই, আপনার কাছেও আমি হয়তো ভালোতে-মন্দতে মিশে তেমনই আছি। এই অসময়ে আমার আর কেউ নেই দেখে আপনারই শরণ নিলুম। আশাকরি বঞ্চিত হব না, তা আপনি যত দুর্দশাগ্রস্ত হোন না কেন। টাকা চাই-ই-চাই, ভাই! নইলে যেতে পারব না! অনেক কষ্ট দিলুম – আরও দেব। ‘ব্যথার দান’ মোট নয়খানা পেয়েছি মাত্র ; আরও খান পনেরো আমার দরকার। যাক টাকা পাঠাবেনই যা করে হোক।
আমার লেখাটা তা হলে ‘উপাসনা’য় দিয়ে দেবেন যদি ‘মোসলেম ভারত’-এ না বেরোয়।
চির-স্নেহানুবদ্ধ
নজরুল
মাহফুজুর রহমান-কে
১
হুগলি
১৬-৭-২৫
স্নেহভাজনেষু –
মাহফুজ! অনেক দিন তোমার খবর পাইনি। আমিও বাড়ি থাকি না – এখান ওখান ঘুরছি। কাল ফিরেছি বাঁকুড়া থেকে।১ মাঝে মাঝে প্রাণতোষের২ কাছে খবর পাই তোমার। সেও দেখা দিচ্ছে না কয়দিন থেকে। এখন কোথায় আছ, পাস করেছ কিনা – এবং কোথায়, কী কী পড়বে পাস করলে – তা জানিয়ো অবশ্য। – বইয়ের টাকা আদায় হয়ে থাকলে পত্রপাঠ পাঠিয়ে দেবে। বড্ড দরকার পড়েছে টাকার। আদায় না হয়ে থাকলে আদায় করবে পত্রপাঠ। বই বি