বাংলার রেনেসাঁস

বাংলার রেনেসাঁস

অন্নদাশঙ্কর রায়

বাংলার রেনেসাঁস

Books Pointer Iconঅন্নদাশঙ্কর রায়
Books Pointer Iconarticles

Posted byবেলা 26-May-2025

Change color

বাংলাদেশের রেনেসাঁস

১

ছেলেবেলা থেকেই শুনে এসেছিলুম যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় তথা ভারতে একটা নবজন্ম ঘটে গেছে, ফরাসিতে যাকে বলে রেনেসাঁস। কী জানি কেন ওই ফরাসি প্রতিশব্দটাই লোকে পছন্দ করে। যাঁদের বিদেশিতে আপত্তি তাঁরা বলেন নবজাগরণ। কিন্তু তাঁরাও স্বীকার করেন যে, গত শতাব্দীতে একটা নবজাগরণ ঘটে গেছে।

সম্প্রতি এক সেমিনারে গিয়ে শুনলুম রেনেসাঁস বা নবজন্ম বা নবজাগরণ বলে যাকে চিহ্নিত করা যায় তেমন কিছুই ঘটেনি। কারণ, দেশটা ছিল পরাধীন ও জনগণ ছিল শোষিত ও নিরক্ষর। সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ধনতন্ত্রের আওতায় মুষ্টিমেয় অভিজাত বা ভদ্রলোক শ্রেণির সাহিত্যিক বা শিল্পী বা মনীষী কি রেনেসাঁসের মতো অত বড়ো একটা ব্যাপার ঘটাতে পারতেন? পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর ফ্রান্স বা ইংল্যাণ্ডের সঙ্গে তার কি কোনো সাদৃশ্য ছিল? যেটা রেনেসাঁস নয় সেটাকে রেনেসাঁস বলে ভ্রম করা হয়েছে।



আবার এমন কথাও শোনা গেল যে বাংলার রেনেসাঁস তো চৈতন্যদেবের সময়েই ঘটেছিল। বৈষ্ণব পদাবলি যার সাক্ষী। অমন অপূর্ব জাগরণ যে-দেশে ঘটেছিল, সে-দেশে ঊনবিংশ শতাব্দীতে এমন কী ঘটল যে তাকেই বলতে হবে রেনেসাঁস? যেটা রেনেসাঁস নয় সেটাকে রেনেসাঁস বলে ভ্রম করা হচ্ছে।


বুঝতে পারা যাচ্ছে দেশে দুই দল ভাবুক আছেন। যাঁরা দেশাভিমানী তাঁরা বলবেন, দেশের রেনেসাঁস দেশের অতীত থেকে বা দেশের মাটি থেকেই জন্মায়। ইউরোপে যেমন জন্মেছিল। রেনেসাঁসের বীজ বাইরে থেকে উড়ে আসে না সমসাময়িক কালের হাওয়ায়। আর যাঁরা সমাজবাদী, তাঁরা বলেন, সত্যিকার রেনেসাঁস কখনো উপরের স্তর থেকে হতে পারে না, হতে পারে নীচের স্তর থেকে। সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি-বিদেশি ধনতন্ত্র মিলে রেনেসাঁস ঘটাতে পারে না, পারে জাগ্রত জনগণ।


এই নেতিবাদী মনোভাব আমার ছেলেবেলায় ছিল না। স্বদেশি যুগের নেতারাও স্বীকার করতেন যে বিদেশি শাসন যতই মন্দ হোক-না কেন, সেই অন্ধকারের ভিতরেও আলোর দেওয়ালি জ্বলেছিল। জ্ঞানের আলো এসে অজ্ঞানের আঁধার দূর করে ঊনবিংশ শতাব্দীতে।


তবে ইউরোপেও আজকাল রেনেসাঁসের সংজ্ঞা ও সময় নিয়ে নানা মত। কারো কারো মতে রেনেসাঁস শুরু হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে তুর্কদের কনস্টান্টিনোপল অধিকার ও গ্রিক পন্ডিতদের ইটালিতে আশ্রয়লাভের সময় থেকে নয়; আরও আগে থেকে। যখন আরবরা স্পেন অধিকার করে ও তাদের সঙ্গে গ্রিক গ্রন্থের আরবি তর্জমা ইউরোপের নজরে পড়ে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তো তখন থেকেই প্রতিষ্ঠিত। এঁদের মত মেনে নিলে মহাকবি দান্তেও রেনেসাঁসের সন্তান। এটা কিন্তু অধিকাংশের মত নয়। অথচ এটার পক্ষে প্রবল যুক্তি হল দান্তের যুগে ল্যাটিন থেকে ইটালিয়ান ভাষার উত্তরণ, অবজ্ঞাত লোকভাষায় নিখুঁত ছন্দ নিখুঁত মিল বিদগ্ধ চিন্তা গভীর অনুভূতি।



সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষার উত্তরণ, হিন্দি ভাষার উত্তরণ; অন্যান্য লোকভাষার উত্তরণও কি অনুরূপ ঘটনা নয়? সেটা যদি রেনেসাঁসের লক্ষণ না হয়, তবে কীসের লক্ষণ? সেইজন্যে রেনেসাঁসের সংজ্ঞা সম্বন্ধে একমত হওয়া শক্ত। অধিকাংশের মতে রেনেসাঁসের প্রধান লক্ষণ হল দিব্যচেতনার পরিবর্তে মানবিক চেতনা, ব্রহ্মজ্ঞানের পরিবর্তে বস্তুজ্ঞান, পারলৌকিক বা অলৌকিক কার্যকারণ পরম্পরার পরিবর্তে ঐহিক বা প্রাকৃতিক কার্যকারণ পরম্পরা, ভক্তির পরিবর্তে যুক্তি, আপ্তবাক্যের পরিবর্তে প্রমাণসিদ্ধ বাক্য, অথরিটির পরিবর্তে লিবার্টি। প্রাচীন গ্রিসে এসব ছিল। খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তনের ফলে এসব রহিত হয়। সব কিছুর জন্যে বাইবেলে যেতে হয়। বাইবেলই ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন। তাহলে মানবমনের বিকাশ হবে কী করে? মানুষের কি কেবল আত্মা আছে? মন নেই, দেহ নেই? দেহ থাকলে শারীরতত্ত্বও জানতে হয়। শারীরতত্ত্ব জেনে মানুষের ছবি আঁকতে হয়, মূর্তি গড়তে হয়। শারীরতত্ত্ব জানতে হলে শবব্যবচ্ছেদ করতে হয়। এসব যে নিষিদ্ধ।


প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গে একটা ছেদ বা ডিসকন্টিনিউইটি ঘটেছিল। তার ফলে এনেছিল একপ্রকার অন্ধকার, সেটা মনের রাজ্যে। তেমনি একপ্রকার অবদমন, সেটা দেহের রাজ্যে। মানবমনকে বিশ্বপ্রকৃতিকে শৃঙ্খলিত করে যে শৃঙ্খলা, তার থেকে মুক্তির জন্যেও আকুলতা জেগেছিল। আবশ্যক হয়েছিল আরও একটা ছেদ, আরও একটা ডিসকন্টিনিউইটি। এবার প্রাচীন গ্রিসের সঙ্গে নয়, মধ্যযুগের শাস্ত্রনিবদ্ধ চার্চশাসিত বিদ্যার সঙ্গে। তাই পুরাতন বিদ্যার জায়গায় এল নতুন বিদ্যা—ওল্ড লার্নিং-এর জায়গায় নিউ লার্নিং। এটা একটা নতুন ধর্ম নয়, একটা নতুন মনোভাব। এটা ধর্মের সঙ্গে মেলে না বলে এর নাম দেওয়া হয় মানবিকবাদ বা হিউম্যানিজম। মানুষই সব কিছুর মাপকাঠি। পৃথিবী স্থির না অস্থির এই নিয়ে যে বাদবিসংবাদ ঘটে, সেটা আসলে খ্রিস্টীয় বা ধর্মীয় বিশ্ববীক্ষার পক্ষে জীবন-মরণের প্রশ্ন। পৃথিবী অস্থির হলে তো সব কিছুই অস্থির।



ইউরোপীয় রেনেসাঁসের আরও একটা দিক ছিল। শিল্পের দিক। ধর্মের আঁচল ধরা জ্ঞানের মতো ধর্মের আঁচল ধরা সৌন্দর্য কয়েকটি ধর্মীয় বিষয়ে নিবদ্ধ ছিল। তার বাইরে গেলেই আধ্যাত্মিক বা নৈতিক অর্থে পতন। রেনেসাঁস দিল শিল্পীকে মুক্তি। গ্রিক রোমক দেবদেবীর অস্তিত্বে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস না থাকলেও তাদের পৌরাণিক কাহিনিকে চিত্রভাস্কর্যে রূপায়িত করা হল। আঁকা হল, গড়া হল নগ্নকায় ভেনাস। এক এক করে নিষেধের গন্ডি লঙ্ঘন করা হল। যে গন্ডি প্রাচীন ঐতিহ্যের নয়, মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের। এক্ষেত্রে প্রাচীন আধুনিক পরস্পরের বন্ধু। আধুনিকদের প্রেরণার উৎস প্রাচীন ক্ল্যাসিকাল সাহিত্য ও শিল্প। এক-একটি প্রাচীন কীর্তি আবিষ্কৃত হয় আর সাহিত্যিক বা শিল্পীরা নতুন প্রেরণা পেয়ে সৃষ্টিতৎপর হন। তাতে হয়তো খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে অসঙ্গতি বা বিচ্ছেদ হল, কিন্তু তার জন্যে কেউ দ্বিধান্বিত নন।


অতীতের পুনরাবিষ্কারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে বহির্বিশ্ব আবিষ্কার। আকাশের গ্রহনক্ষত্রের মতো পৃথিবীর সাগর-মহাসাগর দেশ-মহাদেশ। আগেকার দিনে লোকের ধারণা ছিল স্বর্গ, মর্ত ও পাতাল পরস্পরসংলগ্ন। তার চিত্র আঁকা হত। কোথাও তার কোনো সমর্থন পাওয়া গেল না। ভূগর্ভে আর যা-ই থাক পাতাল নেই। আকাশে আর যা-ই থাক স্বর্গ নেই। বাইবেলের জগৎ বিজ্ঞানের জগতের সঙ্গে মেলে না। মানুষ কোনটা বিশ্বাস করবে? ধীরে ধীরে বিজ্ঞানের জগৎকেই স্বীকার করে নিল। বাইবেলের জগৎ যে সহজে পথ ছেড়ে দিল তা নয়। রেনেসাঁসের পর এল কাউন্টার রেনেসাঁস। সাহিত্যের উপরে, বিজ্ঞানের উপরে এমন উপদ্রব শুরু হল যে, ইটালির রেনেসাঁস এক শতাব্দীর মধ্যেই স্তব্ধ। তারপরের শতাব্দীটা তার তুলনায় বন্ধ্যা। অন্যান্য দেশেও এর অনুরূপ দেখা যায়। তবে যেসব দেশে খ্রিস্টধর্মের রিফর্মেশন ঘটে সেই প্রোটেস্টান্ট দেশগুলিতে কাউন্টার রেনেসাঁস তেমন অত্যাচার করতে পারে না। আর ফ্রান্স যদিও ক্যাথলিক দেশ তবু সেইখানেই দেখা দেয় অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটেনমেন্ট। যার মানসসন্তান ফরাসি বিপ্লব। এই চারটি যুগান্তকারী পর্যায় এক শতাব্দী কালের মধ্যে উপস্থিত হয়নি। মোটামুটি চার শতাব্দী সময় নিয়েছে। এই চার শতাব্দীর ঐতিহাসিক বিবর্তন একসঙ্গে এসে সমাগত হয় আটলান্টিক ও ভারতমহাসাগর পার হয়ে বাংলার উপকূলে। তথা ভারতবর্ষের উপকূলে। তাদের স্বাগত জানান সর্বপ্রথম রামমোহন রায়। তিনি যেন তাদেরই অপেক্ষায় অন্ধকার রাত্রে জাগ্রত ছিলেন। বিদেশি বিধর্মী ও বিজেতার সঙ্গে তিনি তাদের ঘুলিয়ে ফেলেন না। পৃথিবীর একপ্রান্তের ঐতিহাসিক পরিবর্তন অপর প্রান্তের ঐতিহাসিক পরিবর্তন উদবোধন করতে পারে। রামমোহন বিশ্বাস করতেন যে, বাংলায় তথা ভারতে অনুরূপ পরিবর্তন অত্যাবশ্যক। সূচনা যাঁরা করেন, তাঁরা সব দেশেই মুষ্টিমেয় শিক্ষিত ব্যক্তি। কেউ-বা অভিজাত কেউ-বা মধ্যবিত্ত। জনগণ হঠাৎ একদিন জেগে উঠে রেনেসাঁসও করেনি, রিফর্মেশনও না, এনলাইটেনমেন্ট তো নয়ই। এক ফরাসি বিপ্লবেই জনগণকে রঙ্গমঞ্চে দেখা গেল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ফরাসি বিপ্লবের পুনরাবৃত্তির লেশমাত্র সম্ভাবনা ছিল না এদেশের মাটিতে। প্রথম তিনটির অনুবৃত্তির সম্ভাবনা যে ছিল এটা রামমোহনের চোখে পড়ে।



আমাদের রেনেসাঁস ভারতবর্ষের ইতিহাসে ঘটেছে, কিন্তু ভারতবর্ষের ইতিহাস থেকে ধারাবাহিকতার সূত্রে আসেনি। ইউরোপের ইতিহাস থেকে আবির্ভূত হয়েছে। কিছুকালের জন্য ভারতের ইতিহাস ইউরোপের ইতিহাসের সামিল। গোড়ায় অর্থনৈতিক অর্থে, পরে রাজনৈতিক অর্থে, শেষে সাংস্কৃতিক অর্থে। ইচ্ছা করলে তৃতীয়টাকে প্রতিরোধ করতে পারা যেত। বলতে পারা যেত চাইনে রেনেসাঁস, চাইনে রিফর্মেশন, চাইনে এনলাইটেনমেন্ট। পরবর্তীকালে বলাও হল। কিন্তু রামমোহন ও তাঁর সহযোগীরা বহিরাগত ভাবধারাকে সাদরে আবাহন করেন। দেশজ না হলেও কালোপযোগী বলে। সেনা এলে আধুনিক যুগটাই আসত না। নতুন ভোরের আলোর রেখাও আসত না।


আমাদের রেনেসাঁস ইউরোপীয় রেনেসাঁসের মতো মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে আধুনিক যুগের আলোকে উত্তরণ। আমাদের রিফর্মেশন অর্থাৎ ধর্মসংস্কার তথা সমাজসংস্কার আমাদের রেনেসাঁসের সমকালীন, যদিও স্বতন্ত্র। আমাদের এনলাইটেনমেন্ট স্বতন্ত্র নয়, যদিও সমকালীন। রামমোহনের মধ্যে তিনটেই একসূত্রে গ্রথিত। ফরাসি বিপ্লবের সঞ্চালিকা ভাবধারাও তাঁর মধ্যে কাজ করছিল, তিনিও ভালোবাসতেন সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা। তবে বিপ্লবটার অনূরূপ তাঁর স্বকালে ও তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। আপাতত রেনেসাঁস নিয়েই আমাদের আলোচনা। রিফর্মেশন আমাদের আলোচ্য নয়। এনলাইটেনমেন্ট অর্থাৎ রুশো ভলতেয়ার দিদেরো প্রভৃতিকে রেনেসাঁসের কোটায় ফেলা যায় না। অথচ আমাদের ইয়ংবেঙ্গল গোষ্ঠী এঁদের দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত যে, এনলাইটেনমেন্টকে বাদ দিলে ইয়ংবেঙ্গলকেও বাদ দিতে হয়। আর ইয়ংবেঙ্গলকে বাদ দিলে আমাদের রেনেসাঁস অঙ্গহীন হয়। আসলে আমাদের রেনেসাঁস ইউরোপের চার শতাব্দীর বিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ও বিমিশ্র অনুবর্তন। অথচ অনুকরণ নয়। আমরা কতক নিয়েছি কতক বাদ দিয়েছি। আমাদের প্রেরণার উৎস খ্রিস্টপূর্ব গ্রিস নয়। ইসলামপূর্ব ভারত নয়। প্রতীচ্যের নতুন বিদ্যা, নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান।



খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য তার পূর্ববর্তী গ্রিক ঐতিহ্যকে অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করত। আর আপনাকে করত আলোকের সঙ্গে। রেনেসাঁসের পর হিউম্যানিস্টদের একভাগ খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যকেই অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করেন, আর পুনরুদিত গ্রিক ঐতিহ্যকে আলোকের সঙ্গে। মধ্যযুগের অন্য নামই হল অন্ধকার যুগ। অথচ সেই যুগটাই ছিল খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ। আমাদের এদেশে যাঁরা রেনেসাঁসের দীক্ষা নিলেন তাঁদের মধ্যে একভাগ বলতে আরম্ভ করলেন যে আমাদের মধ্যযুগটাও ছিল অন্ধকার যুগ। কিন্তু সেকথা বললে কেবল যে ইসলাম প্রভাবিত আরব্য ও পারসিক ঐতিহ্যকে খর্ব করা হয় তাই নয়, নানক কবীর চৈতন্য প্রবাহকেও উপেক্ষা করা হয়। মধ্যযুগ নিয়ে এই যেমন সমস্যা, তার পূর্ববর্তী যুগ নিয়েও তেমনি আরেক। ইসলামি ধর্ম প্রচারকরা হয়তো তাকে অন্ধকার যুগ বলে শ্রদ্ধা করে থাকবেন, কিন্তু প্রাচীন আরবরা প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। প্রাচীন পারসিকরাও। ইসলাম এতে দেশসুদ্ধ মানুষকে মুসলমানও করেনি, খ্রিস্টধর্ম যেমন করেছিল ইউরোপের মানুষকে। তেমন কোনো ছেদ বা ডিসকন্টিনিউইটি ইউরোপের মতো ভারতের পূর্বতন ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘটেনি। সেটা ঘটে থাকলে পরে আবার পূর্বতন ঐতিহ্যকে পুনরাবিষ্কার করে মধ্যযুগের অন্ধতার সঙ্গে ছেদ বা ডিসকন্টিনিউইটির প্রশ্ন উঠত।


এদেশে প্রাচীন ভারতীয় বা হিন্দু সংস্কৃতি প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতির মতো আচ্ছন্ন বা বিলুপ্ত হয়নি। মধ্যযুগের ইসলামি বা আরব্য পারসিক সংস্কৃতি তাকে আচ্ছন্ন বা বিলুপ্ত করতে চায়নি বা পারেনি। যেকোনো দেশে যেকোনো যুগে নবজাগরণ ঘটতে পারে, কিন্তু যেকোনো নবজাগরণই রেনেসাঁস নামের যোগ্য নয়। যেখানে ছেদ নেই, ডিসকন্টিনিউইটি নেই, সেখানে অন্ধকার থেকে আলোকে উত্তরণের প্রশ্ন ওঠে না। তা সেখ্রিস্টীয় আলোকই হোক আর গ্রিক আলোকই হোক। অবিকল ইউরোপীয় অর্থে রেনেসাঁস এদেশে ঘটবার কথা নয়। কিন্তু একথা তো অস্বীকার করা যায় না যে বস্তুজগৎ সম্বন্ধে অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতীয়দের যে জ্ঞান ছিল সেজ্ঞান অজ্ঞান। অজ্ঞানের পরিণাম জ্ঞানের হাতে পরাজয়। অন্ধকারের পরিণাম আলোকের কাছে পরাভব। আরও আগে ইসলামধর্মী আরব, তুর্ক ও মোগলদেরও বস্তুজগৎ সম্বন্

**********