নির্বাচিত কলাম

নির্বাচিত কলাম

তসলিমা নাসরিন

নির্বাচিত কলাম

Books Pointer Iconতসলিমা নাসরিন
Books Pointer Iconshort story

Posted byচয়ন সরকার28-Jun-2025

Change color

“নির্বাচিত কলাম” একটি বাংলা নারীবাদী গ্রন্থ। বাংলাদেশী লেখক তসলিমা নাসরিনের প্রথম গদ্যকর্ম। “নির্বাচিত কলাম” নারীবাদী ও ধর্মমুক্ত মানবতাবাদী হিসেবে বিখ্যাত তসলিমা নাসরিনের লেখা একটি ধ্রুপদী গ্রন্থ। (উইকি)


বয়স তখন আমার আঠারো উনিশ। ময়মনসিংহ শহরের একটি সিনেমা হলে দুপুরের শো ভেঙেছে। সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে রিক্সা। আমি একটি রিক্সায় উঠে বসলাম। ভিড়ের কারণে রিক্সা খানিক থেমে আছে, খানিক চলছে। ওই থেমে থাকবার সময় আমার ডান বাহুতে হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলাম। দেখি, একটি আধ-খাওয়া জ্বলন্ত সিগারেট আমার বাহুতে চেপে ধরেছে বারো-তেরো বছর বয়সের একটি ছেলে। পরনে শার্ট, লুঙ্গি। ছেলেটিকে আমি চিনি না, কোনওদিন দেখিনি। আমি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলাম। ছেলেটি দিব্যি হাসতে হাসতে চলে গেল। ভাবছিলাম চিৎকার করব, কাউকে ডাকব, অথবা দৌড়ে ছেলেটিকে ধরব, লোক ডেকে তার বিচার চাইব। মেয়েদের একটি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে, সম্ভবত সে কারণেই ছেলেটিকে শাস্তি দেবার জন্য সেদিন কোনও চেষ্টা করিনি। আমি ওই বয়সেই চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আমি ছেলেটিকে ধরব অথবা ধরবার জন্য লোকজনের সাহায্য চাইব, সবাই আমাকে ভিড় করে দেখবে, আমার শরীরের বাঁক দেখবে, উজ্জ্বলতা দেখবে, যন্ত্রণা দেখবে, আমার আর্তস্বর, আমার ক্রোধ, আমার কান্না দেখবে। কেউ আহা উহু করবে, কেউ গায়ে পড়ে জানতে চাইবে ব্যাপারটি কী, কেউ ছেলেটিকে ধরে এনে কষে দুই থাপ্পড় মারবার কথা বলবে, কেউ আমার বাড়ি কোথায়, বাবা কে ইত্যাদির খোঁজখবর নেবে। আসলে সবাই তারা আমাকে উপভোগ করবে। আমার অসহায়ত্ব উপভোগ করবে। পোড়া বাহু দেখবার নাম করে আসলে আমার সুডোল খোলা বাহুটিই দেখবে। আমি চলে গেলে পেছনের শুভার্থীরা সমস্বরে সিটি দেবে। এসব ভেবেই আমি আমার সমস্ত যন্ত্রণা নিজের ভেতরে চেপে রেখেছিলাম।


আমার ডান বাহুতে এখনও পোড়া দাগ, আমি সেই নির্যাতনের চিহ্ন বহন করে চলেছি। আমি ওই অশিক্ষিত ছেলেটিকে দোষ দেব কী, শিক্ষিতরাই যেখানে নির্দোষ নয়। আমার চোখের সামনে বান্ধবীর উরুতে চিমটি কেটে দৌড় দিয়েছে একটি ছেলে, আমার বোনের ওড়না টেনে পালিয়েছে একটি অচেনা যুবক, ভিড়ের মধ্যে স্তন ও নিতম্ব স্পর্শ করবার জন্য ওত পেতে থাকে একশ একটা অন্ধকার হাত। সেই হাতগুলো সব অশিক্ষিতের নয়, আমি জানি, ওখানের অনেক হাতই শিক্ষিত হাত।


এসবের কোনও প্রতিবাদ আমি করি না। বরং আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি, এইজন্য যে, এখনও এসিড ছুঁড়ে কেউ আমার মুখ পোড়ায়নি, আমার দু’চোখ অন্ধ করেনি। এখনও আমার সৌভাগ্য যে একপাল পুরুষ আমাকে ধর্ষণ করেনি। আমার সৌভাগ্য যে, আমি এখনও বেঁচে আছি। আমার যে অপরাধের জন্য আমি এতসব অত্যাচারের আশঙ্কা করছি, তা হচ্ছে, আমি ‘মেয়েমানুষ’। আমার শিক্ষা, আমার মেধা আমাকে ‘মানুষ’ করতে পারেনি, ‘মেয়েমানুষ’ করেই রেখেছে। এই দেশে মেয়েরা কোনও যোগ্যতা বলেই ‘মানুষে’ উর্ত্তীর্ণ হতে পারে না। অনেকে, এই সমাজের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক, বোধবুদ্ধি সম্পন্ন রুচিবান মানুষ, সকলেই, আমি জানি, এক বাক্যে মেনে নেবেন সিনেমা হলের কাছে সিগারেটের আগুনে বাহু পোড়ার ঘটনাটি আমার ব্যক্তিগত। ‘ব্যক্তিগত’ বলে তাঁরা আসলে দায়িত্ব এড়াতে চান। কিন্তু যে মেয়েরা ঘর থেকে বাইরে পা ফেলে, সেই মেয়েরা- আমি একা নই- সবাই প্রস্তুত থাকে রাস্তায় যে কোনও অশ্লীল মন্তব্য নীরবে সহ্য করার জন্য। প্রতিটি মেয়ে জানে, তার জামায় একমুখ পানের পিক ফেলে দেঁতো হাসি উপহার দিয়ে নির্বিকার চলে যাবে একটি অপরিচিত যুবক। সে প্রস্তুত থাকে এসিড, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা ইত্যাদি, যে কোন দূর্ঘটনার জন্য। রাস্তায় বেরোলে গায়ে দু’তিনটে ঢিল এসে পড়া বিরল কোনও ঘটনা নয়। ছুঁড়ে ফেলা সিগারেট থেকে রিক্সায় বসা কিশোরীর কাপড়ে আগুন ধরে যায়, এবং অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় বাড়ি ফেরা- মাত্র দু’মাস আগে এই শহরের অনেকেই বেশ উপভোগ করেছে। মানুষ একদা গুহায় বাস করত, কন্যা সন্তান জন্মালে জ্যান্ত কবর দিত। সেই থেকে সময় অনেক এগিয়েছে কিন্তু মানসিকতা খুব একটা এগোয়নি।


ময়মনসিংহ শহরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল, কলেজ, সিনেমা হলের পাশে কাঠের থামের উপর এক ধরনের সাইনবোর্ড ঝুলত, ওতে লেখা ছিল ‘বখাটেদের উৎপাতে টহল পুলিশের সাহায্য নিন’। এই ব্যবস্থাটি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। সম্ভবত বখাটেরা ওর গুঁড়িসুদ্ধ উঠিয়ে নিয়ে গেছে। যতদিন সাইনবোর্ড ছিল, মেয়েদের স্কুলে যাওয়া-আসার সময় বখাটে ছেলেরা ওই থামে হেলান দিয়েই শিস দিত। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, টহল পুলিশের উৎপাতে একবার স্কুলের মেয়েরা বখাটেদের সাহায্য নিতে বাধ্য হয়েছিল।



কলকাতা সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত অভিধানগুলো বিগত ৩০ বছর ধরে বাংলাভাষী সহৃদয় পাঠকের অনিকূল্য লাভ করে আসছে। ১৯৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ‘সমার্থ শব্দকোষ ‘একটি ভিন্ন ধরনের বাংলা অভিধান। এই সমার্থক শব্দকোষ বাংলাভাষার থিসরাস। কোনও শব্দ, তার প্রতিশব্দ, সেই শব্দের আনুশাংগীক,সমশ্রেণীভুক্ত এবং সমবর্গীয় শব্দ কে এই অভিধানে একত্রিত করা হয়েছে। সমার্থ শব্দকোষ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে একটি অতুলনীয় সংযোজন। এই মূল্যবান অভিধানে ‘পুরুষ’ শব্দের সমার্থ শব্দ -পুরুষ মানুষ, বেটাছেলে, ছেলে, মরদ, মদ্দ, মদ্দা, মর্দ, পুমান, মিনসে, নর, মানব,মানুষ, মনুষ্য,আদমী, এবং নারীর সমার্থ শব্দ-স্ত্রী, মেয়ে, মানবী, মানবিকা, কামিনী, অবলা, আওরত, জেনানা, যোষিৎ, যোষিতা, যোষা, জনি, বালা, প্রমদাজন, বনিতা, ভামিনী, শর্বরী, প্রতিপদর্শিনী লেখা হয়েছে। নারীর সমার্থ শব্দ সংখ্যা এখানে অধিক কিন্তু লক্ষ্যনীয় এই, ‘মানুষ’ শব্দটি পুরুষের সমার্থক শব্দ হিসেবে উল্ল্যেখিত অথচ নারীর সমার্থক শব্দ হিসেবে কোথাও মানুষ অথবা মনুষ্য লেখা নেই। সুধীজন সমাদৃত গ্রন্থটিকে পুরুষ ও নারীর অদ্ভুত অর্থ আমাকে স্তম্ভিত করেছে।


আমি এইরকম স্তম্ভিত হই,যখন দেখি বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্রী নিবাসগুলো সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যায়,হাঁস-মুরগীর খোঁয়ার যেমন বন্ধ হয়।অচিরেই এইসব গৃহপালিত জন্তুর নাম নারীর সমার্থ শব্দ তলিকায় স্থান পাবে,এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। একটি ছাত্র তার প্রয়োজন মত হলে বা হোষ্টেলে যাওয়া আসা করে,সেক্ষেত্রে ছাত্রীর প্রয়োজন অপ্রয়োজন জরুরি কোন বিষয় নয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার একইরকম অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় দুজনেই অংশগ্রহণ করেছে; ছাত্রীর জন্য কিছু দুর্বল, কিছু সহজ,কিছু নিচু স্থরের শিক্ষাব্যাবস্থা সেখানে নেই। নির্দিষ্ট একটি সময়ে হলে ফিরবার কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষ যে বাণী দিবেন,তা শুনে যে কোন দুর্বল স্নায়ু ও অসুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ সহজে কাবু হয়ে যাবে,কিন্তু নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন মেয়েরা এই অবৈধ ও অশ্লীল নিয়মটি মেনে নিয়ে নিজেরাই প্রমাণ করেছে -তারা অশহায়, দুর্বল, তারা পুরুষের ভোগের সামগ্রী, প্রাচীর এবং প্রহরী ছাড়া তারা নিরাপদ নয়। (ছাত্রীদের হল সন্ধ্যায় বন্ধ হয় বলে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা তাঁদের প্রবচনে-কথনে ছাত্রীদের পতিতা বলেন না? বলেন। বলবেন।)


আসলে রাত কিছু নয়, অন্ধকার কিছু নয়, দুর্ঘটনা কিছু নয়, সকল কিছুর উদ্দ্যেশ্য নারীকে দমন করা। যাবতীয় বিপর্যয়, বিঘ্ন, দুর্যোগ, সঙ্কট ; যাবতীয় দু:সময়, দু:শাসন, সন্ত্রাস, অতিক্রম করে সে আবার না স্বাবলম্বী হয়ে উঠে, স্বছন্দ হয়ে উঠে, সবল ও দুর্লভ হয়ে উঠে।


আর তা যদি হয়ে উঠে তাহলে তো ভীষন অসুবিধে। কারণ বিদ্যাধরী মেয়ে ‘আধুনিক ক্রীতদাসী’ হওয়ার জন্য চমৎকার।স্বামীকে মুগ্ধ ও তুষ্ট করবার জন্য এদের নিরলস রুপচর্চা,এদের সভা সমিতি, শিল্প সংস্কৃতি, নারী আন্দোলন -সবই হচ্ছে ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি বাংগালী মেয়েদের বালিশের ওয়াড়ে রংগীন সুতোয়, ‘সতীর দেবতা পতি’ চর্চার আধুনিকরণ।


জার্মেইন গ্রীয়ারের লেখা ‘ফিমেল ইউনাক’ গ্রন্থে মেয়েদের হাইহিল জুতো আবিষ্কারের একটি চমৎকার কারণ তুলে ধরা হয়েছে। পুরুষ যখন একটি মেয়েকে আক্রমন করে,মেয়েটি নিজেকে বাঁচাবার জন্য প্রথমে দৌড় দেয়, সে যেন ভাল দৌড়াতে না পারে, হাইহিলের ব্যবস্থা সেজন্যই।



আমি ভারত বেড়াতে গিয়েছি। কলকাটা, দিল্লী, আগ্রা, জয়পুর, সিমলা, কাশ্মীর ঘুরে এসেছি শুনে প্রথম যে প্রশ্নটি লোক করে, সে হোল -সঙ্গে কে ছিল? কাশ্মীর এর বরফাচ্ছাদিত গূলমার্গ, বানিহাল টাণেল, হিমালয়ের উপর ঝুলন্ত চেয়ার, ডাল থেকে সিকারা হাউজবোট সম্পর্কে আমি উচ্ছ্বসিত হই। কিন্তু তাদের ওই এক প্রশ্ন- সঙ্গে কে ছিল?


আমি উত্তরে বলি -একা।


একা? একা একটি মেয়ে বাইরে বেড়াতে যেতে পারে নাকি? কার ও বিশ্বাস হয় না।এরপর কেউ আমার শান্তিনিকেতন, দীঘার সমুদ্র, কন্যাকুমারী বিচিত্র অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহ দেখায় না । যে চিন্তাটি তাদের মস্তিষ্ক জুরে ঘেটি পাকায় , তা হল সঙ্গে কে ছিল। আমি একবার বলেছিলাম, সঙ্গে অতসী, কৃষ্ণকলি আর মল্লিকা ছিল।


আর?


আর কেউ না।


কেন? পুরুষ মানুষ কেউ ছিল না?


না।


লোকে অবাক চোখে তাকায়। পুরুষ ছাড়া মেয়েরা একজনও যা সাতজনও তা।


এক্ষেত্রে আমার বয়সী একটি ছেলে যদি একইভাবে দার্জিলিং, সিমলা, কাশ্মীর ঘুরে আসত, একা, তবে বিমোহিত সকলেই বলত, আহা কি পবিত্র মন! কি চমৎকার রুচি ! কি অগাত সৌন্দর্য বোধ ! কি অপূর্ব জীবন !


ধরা যাক আমার খুব সমুদ্র দেখতে ইচ্ছা করছে, আমার খুব সীতাকুণ্ড পাহাড়ে যেতে ইচ্ছা করছে, আমার খুব যেতে ইচ্ছা করছে শালবন বিহার, কাপ্তাই লেকে স্পীডবোট নিয়ে সারা বিকেল ঘুরতে ইচ্ছে করছে, সাঁতার কাটতে ইচ্ছে করছে পদ্মায়, তখন কি করতে হবে? একজন পুরুষ জোগাড় করতে হবে।


পুরুষ ছাড়া মেয়েরা দূরে কোথাও যেতে পারে না। সে যে বয়সের ই হোক না কেন। বাসে চরলে কন্ট্রাক্টর জিজ্ঞাসা করে, আপনার সঙ্গের লোক কই? তারা নিশ্চিত সঙ্গে একজন লোক অর্থাৎ পুরুষ আচেই। নানা জায়গায় পুরুষ থাকা না থাকা নিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হয় মেয়েদের। সঙ্গে যদি পুরুষ থাকে, সে যদি স্বামী অথবা নিকটাত্মীয় না হয়, তাহলে অসুবিধে- কে এই লোক? কি সম্পর্ক? আর যদি সঙ্গে পুরুষ না থাকে তাহলেও অসুবিধে নেই কেন? অত্যন্ত সচেতন ভাবে পুরুষের উপর মেয়েদের নির্ভর করানো হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পিতার কন্যারা অথবা স্বামীর বধূরা দুচার টে আত্মীয় বাড়ি আর মার্কেট ঘরাঘুরি করেই ভাবে ‘ নারী স্বাধীনতা’ হয়ে গেল।


আসলে তা হয় না। মেয়েদের পায়ের শৃঙ্খল খুব শক্ত শৃঙ্খল। হাত-পা ছেড়ে বসে থাকলে কেউ তার শিকল খুলে দিয়ে বলবে না বেরিয়ে আয়। রূপকথায় শুভার্থী পাওয়া যায় বাস্তবে নয়।


মেয়েরা এমন শখ করে পায়ে মল পরে। এই মল জিনিসটি আবিস্কারের এবং মেয়েদের পরানোর পেছনে একটি উদ্দেশ্য আছে। মল পরলে মেয়েদের গতিবিধি- তারা কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, শব্দ শুনে জানা যায়। আর বোকা মেয়েরা সেই মল, যা একটি সিমানার ভেতরে তাদের বন্দী রাখে,তা পরে, ভাবে যে তাদের পায়ের সৌন্দর্য বুঝি বেড়েছে।



দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় কবি, আমার পিতার বয়সী, আমার কবিতার খুব প্রশংসা করেন কেবল আমার কাছে। জনসমক্ষে করেন না, কাগজেও লেখেন না, কারণ কবিতা যতই ভাল লিখি না কেন, আমি তো মেয়ে, একটি মেয়ের প্রশংসা কি ফলাও করে করা যায়, চরিত্র যাবে যে!


এ দেশের চরিত্র সচেতন বুদ্ধিজীবিরা গোপনে মেয়ে নিয়ে ঘোরাফেরা পছন্দ করেন, শহরের বড় বড় রেস্তোরাঁয় সবচেয়ে কোনার টেবিলে বসে চৈনিক খেতে খেতে গল্প করতে ভালবাসেন, কারণ তাঁদের মধ্যে তো কুৎসিত সংস্কার নেই, তাঁদের জীবন নিস্তরঙ্গ পুকুর নয়, উত্তাল সমুদ্র; জীবনের বিচিত্র সব আনন্দ আহরণে তাঁরা ব্যস্ত। মেয়েদের কানে তাঁরা ঘন ঘন বলেন-‘ভালবাসি’। কিন্তু প্রকাশ্যে বলেন না, চেপে যান। কারণ জাতে উঠে গেলে মেয়ে নিয়ে কথাবার্তা ভাল শোনায় না।


আমার এক ঔপন্যাসিক বন্ধু সেদিন বললেন, ‘তোমার কলাম বেশ ভাল হচ্ছে।’ আমি ধন্যবাদ জানাবার পর তিনি গম্ভীর কণ্ঠে যে বাক্যটি উচ্চারন করলেন, আমি তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, বললেন-‘সেলিনা হোসেনের চেয়ে তোমার গদ্য ভাল।’


–হঠাৎ সেলিনা হোসেনের প্রসঙ্গ কেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম।


তিনি বললেন-মেয়েদের মধ্যে সেলিনা হো

**********