পথহারা

পথহারা

লুৎফর রহমান

পথহারা

Books Pointer Iconলুৎফর রহমান
Books Pointer Iconnovel

Posted byবেলা 08-May-2025

Change color

প্রথম পরিচ্ছেদ

বসন্তের নূতন বাতাসে পৃথিবীতে একটা নূতন জীবনের অভিনয় অনুভূত হইতেছিল। আম গাছের নূতন মুকুলে মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত। লতাপত্রে নবীনতা-প্রকৃতি হাস্যময়ী। মাঠের পার্শ্বে শ্যামশল্প কুঞ্জসারিগুলি পুলক সৌন্দর্যে মুখরা।

হালিমার বয়স চৌদ্দন সবে যৌবন সীমায় পদার্পণ করিয়াছে, কয়েক মাস পরে চাচাত ভাই আবদুল গণির সহিত তাহার বিবাহ হইবে।

হালিমা ভিতর ও বাহিরের সৌন্দর্যে সম্পদশালিনী কুসুমে কমনীয়তা, নূতন পাতার নবীনতা, জোছনার মাধুরী তার মধ্যে বিদ্যমান।

হালিমার পিতা নাই, মা আছেন। তিনি ইচ্ছা করেছেন, মেয়েকে দূরে বিবাহ না দিয়া দেবর-পুত্র আবদুল গণির সহিত বিবাহ দেন।


আবদুল গণিও পিতৃহীন। তাহার মায়ের ইচ্ছাও হালিমাকে বধূরূপে গ্রহণ করেন, কারণ সৎস্বভাবা কন্যা সব সময় পাওয়া কঠিন। তাহা ছাড়া বিশ্বস্তসূত্রে বুঝিয়েছেন, তাহার পুত্র হালিমাকে বড় পছন্দ করে।



আবদুল গণি বাংলা সাহিত্যের ব্যুৎপন্ন, ম্যাট্রিকুলেশন পাশ। জগতের খবর রাখা তাহার অভ্যাস। সে চাকরি করে না। কোনো ব্যবসায়ীর দোকানে কিছুদিন ছিল, এখন নিজেই ব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছে।


মহকুমায় তাহার দোকান। নানা রকমের ফসল কিনিয়া ভিন্ন ভিন কেন্দ্রে চালান দেয়।


বসন্তের এক স্নিগ্ধ অপরাহে হালিমা ছাদের উপর বসিয়া দূর গ্রাম্য গগনের পানে চাহিয়াছিল, এমন সময় কুলসুম আসিয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন। কুলসুম হালিমার ভাবি।


হালিমার বড় ভাই হাকিমী চিকিৎসা করেন। মৌলবী হইবার পর কয়েক বৎসর শাস্ত্র। অধ্যয়ন করিয়া এখন কলিকাতায় ব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছেন। তিনি বেশ বিচক্ষণ ব্যক্তি।


কুলসুম সুন্দরী এবং বুদ্ধিমান, চিত্ত ও রুচি তাহার মার্জিত। তিনি হালিমাকে ভালবাসেন। তার ইচ্ছা হালিমা বিবাহের পর আদর্শ বধূ হয় এবং শুভ আকাঙ্ক্ষা পূর্ব হইতেই নন্দাকে কতকগুলি উপদেশ দিবেন এই কল্পনা করিয়াছেন।


বিবাহিত হইয়া কুলসুম অনেক নূতন জ্ঞান লাভ করিয়াছেন এবং এই জ্ঞানলাভ যে খুব সহজে হইয়াছে তাহা নহে। ঠেকিয়া শিখিবার পূর্বে, তিনি ইচ্ছা করিয়াছেন, হালিমাকে কিছু শিখাইয়া দেন। কুলসুম হালিমার মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “হালিমা, কী ভাবছ?”



হালিমা বিস্ময়ে চাহিয়া কহিল, “ভাবি, আসুন। বিকেল বেলায় জীবনভরা বাতাস বয়ে যায়, আপনি নিচে পড়ে কী কচ্ছিলেন”?


কুলসুম : আম্মা একা একা মাছগুলি নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন, আমি ঠিক করে কেটেকুটে দিয়ে এলাম।


হালিমা : এ এক জ্বালা। সময় নেই, অসময় নেই সব সময়েই কাজ। বিয়ে হলে চাচিজানের তো আমার উপর অসীম আধিপত্য হবে।


কুলসুম : ছিঃ! শাশুড়ী কি বেটার বউয়ের উপর আধিপত্য খাটাতে যান, না কর্তব্য শিখাতে যান? অমন কথা বলতে নেই। যাকে তুমি ভালবাস, সে তোমার অতি আদরের


অতি প্রিয় স্বামী, তার মা কি কম ভালবাসার, শ্রদ্ধার জিনিস?


হালিম : তা ঠিক। আমার কথাটা ভালো হয় নাই–স্বামীর মার চেয়ে বউয়ের আপনার জন আর কে? মেয়ে-ছেলেকে নিজের মা অপেক্ষা স্বামীর মাকেই বেশি করে আপন মনে করতে হবে এবং সম্ভবত তাঁর কষ্ট দূর করতে হবে। ভাবি, তোমার মতো বউ ক’টা?



কুলসুম : বলি, আকাশের দিকে চেয়ে কী ভাবছ?


হালিমা : ঠিক বলব?


কুলসুম : আমি জানি না, তুমি আমার কাছে কোনো দিন অঠিক কথা বলবে। হালিমা কুলসুমের স্কন্ধে হাত রাখিয়া মুখের কাছে মুখ লইয়া কহিল, স্বামীর কথা।


কুলসুম : এ আর লজ্জার বিষয় কী?


হালিমা : বলেন কী? আপনার কাছে লজ্জা বোধ করি না বলে কি যার তার কাছে বলব, স্বামীর রূপ চিন্তা কচ্ছি?


কুলসুম : যুবতী মেয়ে-ছেলে যে মোটেই পুরুষ-ছেলের কথা ভাবে না, একথা তো সবাই জানে।


হালিমা তার ভাবির চুল টানিয়া দিল।


কুলসুম কহিলেন–স্বামীর কথা যেমনি করে ভাবছ তোমার কথাও তোমার স্বামী এমনি করে ভাবছেন।



হালিমা : আমার এমনি কপাল। আবার কহিল এখনও তো স্বামী হয় নি।


কুলসুম : আবদুল গণি তোমাকে ভালবাসে।


হালিমা : তা জানি। আশীর্বাদ করুন ভাবি যেন তাঁর এই ভালবাসা চিরকাল অটুট থাকে। যেমন আমার ভাই আপনাকে ভালবাসেন, তেমনি আমার স্বামীও যেন আমাকে ভালবাসেন।


কুলসুমের আখিদ্বয় উষ্ণ আঁখিজলে ভরিয়া উঠিল। কহিলেন খোদা করুন তোমার ভাগ্য যেন চিরকাল অটুট হয়ে থাকে। তবে একটা কথা-স্বামীর ভালবাসা অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে প্রত্যেক মেয়ে-ছেলেকে কিছু তদ্বির করতে হবে। বাইরের রূপের গৌরব করা স্ত্রীলোকের সাজে না, বাইরের রূপ ক’দিন থাকে? রূপ থাকলেও স্বামীর চোখে দুই এক বছরের মধ্যে তাঁর ওজ্জ্বল্য মাদকতা নষ্ট হয়ে যায়।


হালিমা : ওমা! বল কি সর্বনেশে কথা?


কুলসুম : সর্বনেশে কথা নয়। চিরকাল কি পুরুষের মনে উদ্দাম মাদকতা থাকে? স্ত্রীলোককে এমন কতকগুলি গুণ লাভ করতে হবে, যাতে স্বামীর হৃদয়ে এই উদ্দাম মাদকতার স্থানে পত্নীর প্রতি একটা শ্রদ্ধার ভাব জেগে উঠে। যাতে পাড়া-প্রতিবেশী, শ্বশুর শাশুড়ী, ননদ-ভাসুরের সম্মান-সুনজর লাভ করা যায় তার চেষ্টাও মেয়েমানুষকে করতে হবে সে জন্য কিছু সাধনা চাই।



হালিমা : ভাবি, দয়া করে আমাকে শিখিয়ে দিন কী উপায়ে স্বামীর শ্রদ্ধা চিরকাল সমভাবে লাভ করা যায়। এত প্রেম ও প্রণয় সবই কি ফাঁকি?


কুলসুম : এ সম্বন্ধে অনেক কথা বলা দরকার। এখন সন্ধ্যা হয়েছে, চল নিচে যেয়ে নামাজ পড়ি।


.


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ


রাত্রি এগারটার সময় আকাশে দু-একটা তারা দেখা যাইতেছিল। হালিমার মা আপন মনে মধুর কন্ঠে কোরান পাঠ করিতেছিলেন।


হালিমা তার ভাবির কাছে তখন শুইয়াছিল। জানালা দিয়ে মন্দ মন্দ সমীরণ, বহিতেছিল। হালিমা জিজ্ঞাসা করিল–ভাবি, যুবক-যুবতীর মধ্যে এই যে প্রেম প্রণয় এসব কি মিথ্যা?


কুলসুম : মিথ্যা নয়, প্রেমের মধ্যে যেটুকু শান্ত ও স্নিগ্ধ সেইটুকুই খাঁটি। প্রথম বয়সের মোহটুকু সাধারণ প্রেম নামে যুবক যুবতীর কাছে সমাদৃত। এই মোহ বেশিদিন টেকসই হয় না, তবে এই মোহকে আমি অশ্রদ্ধার চোখে দেখি না। মোহকে প্রেমে পরিণত করতে হবে, এই জন্য সাধনা চাই।



হালিমা : মোহ কি একটু ভালো করে বুঝিয়ে দিন।


কুলসুম : মোহ একটা উদ্দাম আবেগ-মনের মিথ্যা চাঞ্চল্য। ”তোমাকে না দেখলে থাকতে পারি না, তুমি আমার চোখের তারা তোমাকে আলতা পরিয়ে রানীর বেশে দেখতে চাই”–এসব মোহের কথা। আর প্রেম সে তত বাচাল নয়, প্রিয়তমের মঙ্গল, সুখ ও শান্তিই প্রেমের আকাক্ষিত বস্তু।


হালিমা : মোহ তাহলে ভালো জিনিস নয়?


কুলসুম : ভালো নয় সত্য, খারাপ বলেও মনে করতে নেই। স্বামী যদি এই মোহের মদিরা দিয়ে স্ত্রীকে পূজা করতে আরম্ভ করেন তো খুব সরল মনে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। স্বামীমোহ শেষকালে অবহেলায় পরিণত না হয়ে যাতে শ্রদ্ধায় পরিণত হতে পারে।


হালিমা : কোনো পুরুষই বিবাহের সময় ইচ্ছা করেন তা তাঁরা স্ত্রীকে শেষে ঘৃণা করবেন, বরং ইচ্ছা করেন তার স্ত্রীকে রত্নসিংহাসনে বসিয়ে নিজে দাস হয়ে স্ত্রীর চরণ পূজা। করবেন। মনের নেশা চাঞ্চল্য যখন কেটে যায়, তখন তিনি স্ত্রীর ব্যবহার অজ্ঞাতসারে লক্ষ। করতে থাকেন। যেমন স্ত্রীলোক ভাগ্যহীনা তারাই স্বামীর মনের এই পূজার ভাবকে না বুঝে দলিয়ে দেন। যারা চালাক তারা সদ্ব্যবহারের দ্বারা স্বামীর নাকে রসি লাগিয়ে রাখেন। স্বামীর নেশা কেটে গেলেও ক্ষতি হয় না। স্বামী স্ত্রীকে প্রতি শ্রদ্ধার অর্ঘ্য দিয়ে পূজা আরম্ভ করেন। পুরুষের নেশা যখন কেটে যায়, উদ্দাম আবেগের আগুন যখন নিবে যায়, তখন। তিনি সুবিধা পেলে অর্থাৎ স্ত্রীর উপর রিবক্ত হবার পথ পেলে স্ত্রীকে অবহেলা করেন। বুদ্ধিমতী, সৎস্বভাব স্ত্রী স্বামীকে সদ্ব্যবহারে মুগ্ধ করে রাখেন। স্বামী স্ত্রীকে অশ্রদ্ধা করতে বা কঠিন কথা বলতে সাহস পান না। তাঁর ভালবাসা অক্ষুণ্ণ থাকে স্বামীর মনের মত্তা মন্দীভূত হলেও স্ত্রীর কৌশলে না নূতন করে জেগে উঠে।



হালিমা কহিল : ভাবি, ঘোমটা জিনিসটা কী? নববধূরা স্বামীর সম্মুখে মুখ খোলেন–এতে কি কোনো লাভ আছে?


কুলসুম : ঘোমটা টেনে স্বামীর মনের ক্ষুধা বা পিপাসা বাঁচিয়ে রাখা আমি পছন্দ করি। নে। ছেলে-মেয়ে না হওয়া পর্যন্ত অনেক মেয়েরা স্বামীর কাছে ধরা দেয় না, এইভাবে মুখ ঢেকে রাখলে স্বামী মনে করেন, ওখানে যেন কি আছে।


হালিমা : ঘোমটা টানাটানি এক ভয়ানক ব্যাপার–যেমন বিরক্তিকর, তেমনি অসুবিধাজনক।


কুলসুম : অভ্যাসে সব ঠিক হয়ে যায়। ছেলে-মেয়ে হলেও কি স্বামী-স্ত্রীর বিরক্ত হতে পারেন না? যে সমস্ত স্ত্রীলোক স্বামীর ভালবাসার অপেক্ষা না করে ভাত-কাপড়ের জন্য। স্বামী গ্রহণ করে তারাই ছেলে-মেয়ে হওয়া পর্যন্ত স্বামী বশে রাখবার জন্য এই কৌশল করে। ছেলে হলে কিন্তু স্বামী মনে মনে স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট থাকলেন, দায়ে পড়ে স্ত্রীর ভাত কাপড় যোগালেন, এতে স্বামী স্ত্রী সুখ পান না। ছেলে হওয়া পর্যন্ত ঘোমটা টানাটানি, তারপর আবার স্বামীর ভালবাসার তোয়াক্কা না করা বুদ্ধিহীন রমণীদের কাজ।


হালিমা : স্ত্রীলোক স্বামীর প্রেমকে গ্রাহ্য করে না, এও কী সম্ভব?



কুলসুম : এমা! বার আনা স্ত্রীলোকই এইরূপ। স্ত্রীলোকের অমনোযোগ ও বেপরোয়া ভাবের ফলে অনেক স্বামী বিরক্ত হন, এমন কি অনেকে চরিত্রহীন হয়ে যান। নিজের নিবুদ্ধিতার দোষে রমণীদের কপাল যখন পুড়ে যায়, তখন তারা কাঁদতে থাকেন, তখন কাদলে কোনো লাভ হয় না। স্বামী যে স্ত্রীকে কটু কথা বলেন না স্ত্রীকে অবহেলা করেন, এর জন্য স্ত্রীলোকেরাই সাধারণত বেশি দোষী। অবশ্য সব জায়গায় একথা খাটে না।


হালিমা : তাহলে আপনি স্বামীর সম্মুখে মুখ ঢেকে রাখবার পক্ষপাতী নন?


কুলসুম : মোটেই না, স্বামীর সম্মুখে মুখ মাথা সবই খুলে রাখতে হবে। লোকের সামনে কিন্তু মাথা খুলতে নেই। একাকিনী যখন স্বামীর কাছে থাকবে, তখন গা মাথা কাপড় দিয়া মুড়ে একটা পোটলা বিশেষ হয়ে থেকো না। রমণীর সাজসজ্জা, রূপ, গহনা সব স্বামীর মনস্তুষ্টির জন্য। এতএব স্বামীর চোখ থেকে নিজেকে ঢেকে রেখে পাড়ার। মেয়েদের সামনে রূপ আগলা করে বেরিয়ে লাভ কী? ঘোমটা টেনে স্বামীর মনকে জয় করার কাজ নেই।


হালিমা : আচ্ছা বিয়ে তো হয়ে গেল, তারপর বাসরঘরে আমাকে সবাই নিয়ে যাবে, তখন কী করবো?



কুলসুম : ধীরে ধীরে যাবে। কোনো কোনো মেয়ে বাসর ঘরে কিছুতেই যেতে চায়। স্বামী যদি বুঝতে পারেন যে তার স্ত্রী তার কাছে আসতে খুবই বিরক্তি প্রকাশ করছে তাহলে তিনি মনে মনে বিরক্ত হবেন। ধীরভাবে, ঘরে ঢুকে স্বামীর পার্শ্বে বসে পড়াই বিধি।


হালিমা : বিয়ের সময় কবুল বলা কাজটা বড় ভয়ানক। ‘কবুল’ বলতে বল্লে বলতে হবে, না অনেক অনুরোধের পর ‘কবুল’ উচ্চারণ করতে হবে?


কুলসুম : অনেক মেয়ে কবুল করার সময় খুব ঝঞ্ঝাট বাধায়। কেউ হয়তো কথাই বলে না। ধীরভাবে প্রথমবারের অনুরোধেই কবুল উচ্চারণ করা উচিত। বিবাহ ব্যাপারটির মধ্যে লজ্জার কিছুই নাই। স্বামী গ্রহণ কাজটা অপমানজনক নয়, সুতরাং এতে লজ্জা বোধ করার কোনো কারণ নেই।


হালিমা : স্বামীর পার্শ্বে বসে পড়বো, তারপর?


কুলসুম : স্বামী যদি কোনো কথা জিজ্ঞাসা করেন, তবে খুব আদবের সঙ্গে উত্তর। দেবে। চুপ করে নির্বাক হয়ে থাকবে না।



হালিমা : আপনি করে বলবো, না তুমি করে বলবো?


কুলসুম : কেন? তুমি করে বলবে। স্বামী তো আর পীর সাহেব নন? হবে হুঁ হাঁ না বলে জি, জে ব্যবহার করবে। হুঁ, হাঁ বল্লেও বিশেষ দোষ নেই। আপনি করে বলে যেন পর করে দেওয়া হয়।


হালিমা : বাইরে অনেক মেয়ে বর-কন্যার কথা শ

**********