
শিউলি
নিমাই ভট্টাচার্য
মালপত্র গুছিয়ে রাখার পর হট কেসটাকে দেখিয়ে শৈবাল বললেন, দোয়েলকোয়েল, তোমরা আগে দাদুনকে খাইয়ে দিও। তারপর তোমরা দুজনে..
উনি কথাটা শেষ করার আগেই দোয়েল একটু হেসে বলল, তোমার ভয় নেই। তোমার বাবাকে আমরা না খাইয়ে রাখব না।
এবার উনি মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বলেন, তোমরা দাদুনকে একলা রোখে কোথাও যাবে না। দাদনের সব কথা শুনবে।
কোয়েল সঙ্গে সঙ্গে দাদুনের গলা জড়িয়ে ধরে বেশ গম্ভীব হয়ে বলে, এই বুড়ো! শুনলে তো ছেলের কথা? আমাদের পারমিশান না নিয়ে তুমি কোথাও যেতে পারবে না।
দোয়েল বলে, তুই কিছু চিন্তা করিস না কোয়েল। পুরীতে তো দাদুন ছেলেকেও কাছে পাবে না, পুত্রবধূকেও কাছে পাবে না। আমরা যা বলব, বুড়োকে তাই শুনতে হবে।
ওদের কথায় শুধু শৈবাল আর বৃদ্ধ অনিলবাবু না, সামনের বার্থের বৃদ্ধা ও মধ্যবয়সী ভদ্রলোকও হাসেন।
শৈবাল ঐ ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করেন, আপনারাও কী পুরী যাচ্ছেন?
উনি পাশের বৃদ্ধাকে দেখিয়ে বলেন, আমার মামীমা যাচ্ছেন। আমি যাচ্ছি না।
শৈবাল বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বলেন, মাসীমা, আপনিও মেয়ে দুটোর দিকে একটু খেয়াল রাখবেন।
দোয়েল সঙ্গে সঙ্গে বলে, দিদাকে কিছু করতে হবে না। আমরাই দিদাকে দেখব।
বৃদ্ধা এক গাল হাসি হেসে বলেন, আমার মত বুড়িকে দেখাশুনা করতে তোমাদের কষ্ট হবে না তো?
না, না, কিছু কষ্ট হবে না।
দোয়েল মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, এই বুড়োকে যদি সামলাতে পারি, তাহলে আপনার মত সুন্দরী দিদাকে দেখাশুনা করতে আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না।
বৃদ্ধা চাপা হাসি হেসে বলেন, আমাকে আর সুন্দরী বলো না। তোমাদের মত সুন্দরী তো চোখেই পড়ে না।
কোয়েল বলে, ও কথা বলবেন না দিদা। আপনাকে এই বয়সেই যখন এত সুন্দর দেখতে, তখন অল্প বয়সে যে কত সুন্দর ছিলেন, তা ভাবাই যায় না।
উনি চাপা হাসি হেসে বলেন, তোমরা যাই বলো না কেন, আমি অল্প বয়সেও তোমাদের মত সুন্দর ছিলাম না।
বৃদ্ধ অনিলবাবু একবার হাতের ঘড়ি দেখেই ছেলেকে বললেন, হ্যাঁরে খোকা, তুই এবার যা। বাড়িতে বৌমা একলা আছেন।
দোয়েল বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, বাবা, তুমি যাও। মায়ামাসী আজ কাজে আসবে না। মা অনেকক্ষণ একলা একলা আছে।
শৈবাল বাবাকে প্রণাম করার পর দুই মেয়েকে একটু আদর করে ট্রেন থেকে নামার আগে বলেন, তোমরা রোজ একবার করে ফোন করতে ভুলে যেও না যেন।
দোয়েল বলল, হা হা, রোজই ফোন করবো। সময় পেলে তুমিও ফোন করো
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করব।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধার বোনপো মাসীকে প্রণাম করে বিদায় নিলেন।
দুপাঁচ মিনিট পরই ট্রেন ছাড়ল।
.
ট্রেন ছাড়ার পর পরই কোচ অ্যাটেনডান্ট চার্টের উপর চোখ বুলিয়েই অনিলবাবুকে জিজ্ঞেস করে, আপনি মিঃ ব্যানার্জী?
হ্যাঁ।
আর ওরা দুজনে মিস ডি ব্যানার্জী আর মিস কে ব্যানার্জী?
হ্যাঁ।
এবার কোচ অ্যাটেনড্যান্ট বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বলে, আপনি মিসেস চৌধুরী?
বৃদ্ধা উত্তর দিলেন, হ্যাঁ।
কোচ অ্যাটেনডান্ট সঙ্গে সঙ্গে চলে যায়।
দোয়েল হট কেস খুলতে খুলতেই বলে, দাদুন, হাত ধুয়ে এসো। কোয়েল সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে সাবান-তোয়ালে বের করে বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে দেয়।
অনিলবাবু বাথরুম থেকে ঘুরে আসতেই দোয়েল ওর হাতে লুচিআলুর দমের প্লেট তুলে দেয়।
দ্বিতীয় প্লেটটি ও মিসেস চৌধুরীর দিকে এগিয়ে ধরতেই উনি একটু হেসে বললেন, দিদি তোমরা খাও। আমি খেয়ে এসেছি।
কোয়েল বাড়ি থেকে যা খেয়ে এসেছেন, তা এতক্ষণে হজম হয়ে গেছে।
দোয়েল বলে, এই ছোট্ট ছোট্ট দুচারটে লুচি খেতে আপনার কোনো কষ্ট হবেনা। আমরা তিনজনে খাবো আর আপনি খাবেন না, তাই কখনো হয়?
কিন্তু…
না, না, দিদা, এক যাত্রায় পৃথক ফল হতে পারে না। নিন, নিন, ধরুন।
মিসেস চৌধুবী প্লেট হাতে নিতেই কোয়েল ওর দিকে তাকিয়ে বলে, দ্যাটস্ লাইক এ গুড গার্ল!
ওর কথা শুনে উনি না হেসে পারেন না।
খেতে খেতেই মিসেস চৌধুরী অনিলবাবুব দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনার এই দুটি নাতনি কী যমজ?
হ্যাঁ।
কোয়েল সঙ্গে সঙ্গে পাশ ফিরে বলে, দাদুন, মিথ্যে কথা বলছ কেন?
ও মিসেস চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে, আমরা যমজ না। দিদি আমার থেকে সাত মিনিটের বড়।
মিসেস চৌধুরী চাপা হাসি হেসে বলেন, তাহলে তো তোমরা যমজ না!
লুচি-আলুর দমের পর্ব শেষ হতেই দোয়েল সবাইকে মিষ্টি দেয়।
মিষ্টি খেতে খেতেই মিসেস চৌধুরী দোয়েল-কোয়েলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা বুঝি একটু রাত করে খাওয়া-দাওয়া করো?
কোয়েল সঙ্গে সঙ্গে বলে, হ্যাঁ
দোয়েল বলে, দশটা পর্যন্ত তো আমরা পড়াশুনাই করি। তারপর আমরা সবাই মিলে একটু আড্ডা দেবার পরই সবাই একসঙ্গে খেতে বসি।
তোমার দাদুনও অত রাত্রে খাওয়াদাওয়া করেন?
ও হাসতে হাসতে বলে, আমরা দুই বউ দুপাশে না বসলে তো বুড়ো যেতেই পারে না।
কোয়েল সঙ্গে সঙ্গে বলে, জানেন দিদা, এই বুড়ো যেমন আমাদের দুজনকে দুপাশে না নিয়ে ঘুমুতে পারে না, আমরা দুজনেও বুড়োকে কাছে না নিয়ে শুতে পারি না।
তোমাদের দাদুন সত্যি ভাগ্যবান।
এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর অনিলবাবু মিসেস চৌধু