ঈশ্বরের ডাইরি – ১

ঈশ্বরের ডাইরি – ১

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

ঈশ্বরের ডাইরি – ১

Books Pointer Iconস্মরণজিৎ চক্রবর্তী
Books Pointer Iconuncategorized

Change color

আলোর টুকরো আজ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে! আর তার মাঝে ও শুনল, ‘না, তুমি এমন কথা বলবে না আমায়! কোনওদিনও বলবে না! আমি অন্য একজনকে ভালবাসি! তুমি আমার কেউ নও! কোনও অধিকার নেই তোমার! দূরে থাকবে, তুমি দূরে থাকবে আমার থেকে। বুঝেছ!’

ও শুধু তাকাল মুখ তুলে! মনে হল আকাশ থেকে হাজার হাজার মৃত পাখির পালক ঝড়ে পড়ছে সামনে! আর তার মধ্যে দিয়ে ওর চলে যাওয়ার পথটুকুই আজ স্পষ্ট হয়ে আছে কেবল! ওর মনে হল আজ থেকে ওর জীবনে চলে যাওয়াটুকুই থাকবে শুধু, ফিরে আসা বলে কিছু থাকবে না কোনওদিন!

ও মাথা নিচু করল। তারপর আলোছায়া পেরিয়ে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল মনমরা গলিটার বাঁকে। না, পেছনে ফিরে তাকাল না একবারও।

ঈশ্বরের ডাইরি – ১

আমি জানি একদিন সে আসবে। জানি তার আসার পথে যে কলকাতা নামক শহরটা পড়ে সেখানে পাহাড় থাকবে একটা। তাতে উঠে মাঝে মাঝে অন্ধ বোষ্টম দাদু পতাকা নাড়াবে। আমি জানি একদিন সেই পাহাড়ের মাথায় প্রচুর কাক জড়ো হয়ে পুচ পুচ করে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট হাগু করবে। আমি জানি একদিন আমাদের বাড়িতে রাখা কামানটা দিয়ে আমি সেই সব মুনাফাখোর কাকেদের মেরে ক্রান্তি আনব। আমি জানি একদিন সেই আনন্দে মনুমেন্ট খুলে মাটিতে শুইয়ে সেটা দিয়ে ময়দানের মতো একটা বিরাট রুটি বেলা হবে! আর সেই রুটির টুকরো ছড়িয়ে নতুন করে ডেকে আনা হবে আরও নানান রকমের আধ ঢ্যামনা, ফুল ঢ্যামনা কাকেদের! আর জানি এই এসব দেখে একদিন আমি আবার অসুখ থেকে সেরে উঠে সবার মতো ডিপ্রেশানে ভুগতে শুরু করব! আমি জানি একদিন আমাকেও আমার মাইনে দিয়ে মাপা হবে! আমাকে আমার সেলফি দিয়ে পছন্দ করা হবে! জানি, জন্মদিনের বেলুন কিনতে গিয়ে আমি কিনে আনব ডটেড আর রিবড! নিজের প্রেমিকাকে বিক্রি করে দেব উন্নতি আর লোভের কাছে। আমি জানি তার পরের দিন আমি মানুষ হয়ে উঠে ইঁদুরের মতো দৌড়তে শুরু করব আবার! আবার আমি কিছু না করেও অন্যের পরিশ্রমের কাজে হাফ-পন্ডিতি আঙুল খুঁচিয়ে নিজেকে কয়েক মিনিটের জন্য বিখ্যাত আর শব্দ করে তুলব! আমি জানি তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ব আর জেগে উঠে দেখব টিভি সিরিয়ালের মতো সবার হাসিকান্নারাগকষ্টবমিপায়খানার পেছনে মিউজিক বেজে উঠছে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে! আমি জানি একদিন আমিও জানব কী করতে নেই! তবু ভালমানুষের মতো মুখ করে সেটাই করে যাব রোজ! আমি জানি একদিন আমিও পা চাটব চালাক লোকেদের মতো। রাজা-উজির মারব ছদ্ম-মেধাবীদের মতো! একদিন আমিও ভাল হয়ে উঠে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বুড়ো আঙুলের জোরে বিপ্লব আনব দেশে! আমিও একদিন অন্যের মাংস খেয়ে ঢেকুর তুলব! তারপর আচমকা একদিন ভোরবেলা উঠে বুঝব আসলে এখানে রাত্রি চলছে কুড়ি হাজার বছর ধরে! বুঝব মা, বাবা, ভাই, বোন, প্রেমিকা, প্রেমিক আসলে কেউ হয় না আমাদের! বুঝব সবাই আমরা মৃত এক অ্যালব্যাট্রস পাখি গলায় ঝুলিয়ে ঘুরছি! যে আমায় বাঁচিয়েছে আমরা তাকে হত্যা করে সেই দোষে আটকে আছি পৃথিবী নামক তেল-সাগরে ভেসে থাকা এক জাহাজে! আর তবু আমি বিশ্বাস রাখব যে একদিন সে আসবে! বিশ্বাস রাখব, সে আমাদের এই জোড়াতাপ্পি দেওয়া জাহাজটাকে আবার পথ দেখিয়ে এই গোলকধাঁধা থেকে বের করে নিয়ে যাবে নতুন এক ভোরবেলার শহরে!

১ আদিত

আজও রাস্তার পাশে ঈশ্বরকে বসে থাকতে দেখল আদিত। ঈশ্বর বেশ লম্বা। ভারি চেহারা। জামা কাপড় হাকুচ কালো। এক মাথা এলোমেলো চুল। বড় দাড়ি। চামড়াতেও ম্যাপের মতো ছোপ ছোপ ময়লার দাগ। কিন্তু যখনই ঈশ্বরকে চোখে পড়ে আদিতের, ও দেখে একটা খাতায় উপুড় হয়ে কীসব যেন লিখছে ও! অবাক লাগে। রাস্তায় পড়ে থাকা একটা পাগল কী লেখে এত! কে ওকে এমন খাতা কিনে দেয়! এমন পেন কিনে দেয়!

ওকে দেখে আদিতের কেমন একটা হিংসে আর হীনমন্যতা আসে। এত শব্দ আর হইচইয়ের মধ্যে কী করে একটা পাগল নিজেকে এক বিন্দুতে এমন করে ধরে রাখে! আদিত পারে না কেন এমন? কেন বারবার বাঁধন খুলে যাওয়া ঝাঁটার মতো ছড়িয়ে পড়ে ওর মন! কী আছে পাগলটার মধ্যে যা ওর নেই!

লেক গার্ডেন্স স্টেশনে আপ বজবজ লোকাল ঢুকছে। লেভেল ক্রসিং পড়ে আছে। কিন্তু আদিত কখনও লেভেল ক্রসিঙের তলা দিয়ে গলে যায় না। এমন কী পাশ দিয়েও যায় না! ও অপেক্ষা করে গেটের সামনে। যতক্ষণ না গেট খোলে ও রেল লাইন পার হয় না!

ওকে এমন করতে দেখে মাকু খুব হাসে। বলে, ‘শালা তুই নিয়ম মানার জন্য নোবেল প্রাইজ পাবি! অস্কারও পেতে পারিস!’

আদিত বিরক্ত হয় মাকুর কথায়। বলে, ‘দেশটা কার? কার এই দেশ? আমাদের না? এই নিয়মগুলো করা হয়েছে কেন? মানার জন্য তো নাকি? সবাই বলবে দেশের কিছু হচ্ছে না, কারও কিছু হচ্ছে না, কিন্তু কেউ শালা নিয়মকানুন কিছু মানবে না। সবাই নিয়ম ফোটায়, কিন্তু অন্যের জন্য! সবাই এমন করলে দেশটা চলবে?’

মাকু তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। তারপর কিছু সময় পরে বলে, ‘ছোটবেলায় মাথায় চোট পেয়েছিলি? নাকি কোনও পার্ভার্ট কাকু তোকে ইয়ে করেছিল? বিয়ন্ড রিপেয়ার এমন চু… মানে ঘেঁটে গেলি কী করে বলত?’

ট্রেনটা স্টেশানে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা হুইসল দিল! আদিতের মনে হল কেউ যেন সরু লোহার শলাকা কানের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে! তীব্র শব্দ একদম সহ্য করতে পারে না আদিত! আচ্ছা পাশেই এত বড় লেক। এত সব গাছ। এত এত পাখি আছে তাতে, সেই সব তুলো বলের মতো এক ফোঁটা দুই ফোঁটা পাখির বাচ্চাদের কতটা কষ্ট হয় এমন শব্দে! মনে মনে যেন কষ্টে কুঁকড়ে যাওয়া পাখির বাচ্চাদের দেখতে পায় আদিত। কেমন একটা কষ্ট হয় ওর! আর এক ঝলকে ওর মনে পড়ে যায় স্মাহির কথা!

স্মাহিদের বাড়িতে কত্ত পাখি ছিল! ওর জেঠুর পাখির শখ ছিল খুব। বিরাট লম্বা বারান্দার এক পাশে তারের জাল দিয়ে ঘেরা বিশাল একটা খাঁচা ছিল পাখির! কত রকমের রঙবেরঙের পাখি ছিল সেই খাঁচায়!

খাঁচার লোহার জাল ধরে দাঁড়িয়ে পাখিদের দিকে তাকিয়ে থাকত আদিত! কী ভাল যে লাগত! মনে হত এত রঙ কী করে এল পৃথিবীতে!

মাঝে মাঝে স্মাহি এসে দাঁড়াত ওর পাশে। পাখিদের নাম বলে দিত ওকে। বলে দিত কোন পাখি কোন অঞ্চলের। কী খায়! কেমন করে বাসা বানায়!

একবার আদিত জিজ্ঞেস করেছিল, ‘পাখিদের বাসা কেন বলে? পাখিদের বাড়ি কেন বলে না?’

স্মাহি হেসেছিল। কী সুন্দর মুক্তোর মতো দাঁত ছিল স্মাহির! ছোট্ট মুকুট কপাল। নাকের দুই পাশে ছোট্ট দুটো তিল! থুতনিতে আলতো একটা টোল! রঙ্গন ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁটের ওপর আলতো একটা কাটা দাগ! স্মাহি হাসলে আদিতের মনে হত কে যেন হাজার হাজার আয়না ছড়িয়ে দিয়েছে চারিদিকে! মনে হত বাতাসে অক্সিজেন বেড়ে গেল! মনে&

**********