
আমার ছেলেবেলা
বুদ্ধদেব বসু
আমার ছেলেবেলার কথা আগে অনেকবার লিখেছি। ‘সাড়া’ উপন্যাসের প্রথম অংশে, ‘আমার বন্ধু’ ও ‘অন্য কোনখানে’ উপন্যাসে, ‘পুরানা পল্টন’, ‘নোয়াখালি’, ‘চার্লস চ্যাপলিন’, ও ‘রামায়ণ’ প্রবন্ধে, কোনো-কোনো ছোটো গল্পে ও কবিতায়, তাছাড়া কয়েকটা উপলক্ষমূলক ক্ষুদ্র রচনাতেও সেই ইতিবৃত্ত টুকরো-টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে। কল্পনায় বা অন্য বিষয়ে আশ্রিত হলেও সেই ভগ্নাংশগুলিতে আত্মজৈবনিক যাথার্থ্য নেই বলা যায় না। তবু যাকে বলে ‘নিছক তথ্য’ তারও প্রয়োজন ঘটে মাঝে- মাঝে, তথ্যান্বেষীর কৌতূহল থেকে কবিরাও আজকাল নিস্তার পান না, আর আমিও যথাস্থানে তথ্যের মূল্য স্বীকার করে থাকি। সেইজন্যেই এই লেখাটার অবতারণা।
একটা কথা বলা দরকার। পূর্বোক্ত রচনাগুলির কোনো-কোনো বিষয় এই লেখাটাতেও ব্যবহার করতে বাধ্য হবো। সে-সব যাঁদের পড়া আছে, তাঁদের কাছে এই পুনরুক্তির জন্য মার্জনা চেয়ে রাখছি।
– বুদ্ধদেব বসু
আমি জন্মেছিলাম কুমিল্লায়, আমার দাদামশায়ের তৎকালীন কর্মস্থলে, বঙ্গাব্দ ১৩১৫, ১৫ অগ্রহায়ণ, খ্রিষ্টাব্দ ১৯০৮, ৩০ নভেম্বর তারিখে। পিতার নাম ভূদেবচন্দ্র বসু, মাতা বিনয়কুমারী—কন্যাবস্থায় তাঁর পদবি ছিলো সিংহ। ‘বিনয়কুমারী’ নামটি আমি কারো মুখে উচ্চারিত হতে শুনিনি, ‘মুকুল’ পত্রিকার একটি পুরোনো খণ্ডে কাঁচা হস্তাক্ষরে লেখা দেখেছিলাম—কেমন করে সেটিকে আমার মায়ের নাম বলে শনাক্ত করেছিলাম তা আমার মনে নেই। আমি বিনয়কুমারীর প্রথম ও শেষ সন্তান—আমার জন্মের পরে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই প্রসবোত্তর ধনুষ্টংকার রোগে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুই আমার নামকরণের কারণ।
আমার জন্মের ও তাঁর মৃত্যুর সময় বিনয়কুমারীর বয়স ছিলো ষোলো—আমাদের এ-কালের হিশেবে তিনি তখনও বালিকা। তিনি ছিলেন তাঁর পিতামাতার একমাত্র সন্তান এবং ভূদেবচন্দ্র পত্নীকে হারিয়ে বছরখানেকের জন্য পরিব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলেন। এই দুই কারণে আমি আমার মাতামহ-মাতামহীর ঘরেই মানুষ হয়েছিলাম— কার্যত তাঁরাই ছিলেন আমার পিতামাতা।
তাঁদের নাম চিন্তাহরণ সিংহ ও স্বর্ণলতা (পৈতৃক পদবি ঘোষ)। চিন্তাহরণ ছিলেন বোধহয় এফ. এ.-পাশ বা বি. এ.-ফেল-করা মানুষ; প্রথম বয়সে স্কুলমাষ্টারি করতেন, পরে পুলিশ-বিভাগে কর্ম নেন। পুলিশে ঢোকার পর তিনি দু-একটা অনুচিত ব্যসনে মেতেছিলেন, উৎকোচগ্রহণেও তাঁর দ্বিধা ছিলো না— এ-সব কথা আমাদের পারিবারিক মহলে ঘূর্ণিত হতো মাঝে-মাঝে। আর সেই সঙ্গে এ-কথাটাও অনেকবার আমার কানে এসেছে যে তাঁর কন্যার মৃত্যুর পরে সব কদভ্যাস তিনি পরিত্যাগ করেন; আমি তাঁকে যখন দেখেছি তখন তিনি নিতান্তই গৃহপালিত জীব। নিশ্চিন্তে বলা যায় পুলিশের চাকুরে হবার মতো কোনো যোগ্যতাই তাঁর ছিলো না— অত্যন্ত ভীরু ও শঙ্কাপরায়ণ মানুষ তিনি, দেহ তেমন বলিষ্ঠ নয়; মাসের মধ্যে যেদিন তাঁকে রাত্তিরে ‘রাউণ্ড’ দেবার কাজে বেরোতে হয় সেদিন সন্ধে নামলেই তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে যায়; রাস্তায় বেরিয়ে দূর থেকেও কোনো ঊর্ধ্বতন রাজপুরুষকে দেখলে তিনি যেন অজানা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে পালাবার পথ খুঁজে পান না; কোনো কল্পিত বিপদেও অত্যন্ত অবসন্ন হয়ে পড়েন। সন্দেহ নেই, কর্তৃপক্ষও তাঁকে অযোগ্য বলেই জানতেন, কেননা তাঁর বয়স যখন প্রায় পঞ্চাশ, তখনও তিনি ক্ষুদ্র দারোগামাত্র, গরীয়ান ইন্সপেক্টর-পদে উন্নীত হতে পারেননি।
স্বামী-স্ত্রীতে স্বভাবের মিল ছিলো না। স্বর্ণলতা ছিলেন স্বাস্থ্যবতী ও প্রবল ব্যক্তিত্বশালিনী; ঘরোয়া পার্লামেন্টের বৈঠকে তিনি যেমন তীক্ষ্ণভাষিণী হতে পারতেন, তেমনি হাস্য-পরিহাসমুখর পারিবারিক আড্ডা জমানোতেও তাঁর দক্ষতা ছিলো চারদিকের আত্মীয়বর্গকে আকর্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করার মতো ক্ষমতা তিনি ধারণ করতেন; পিতৃকুল ও শ্বশুরকুলের অনেকেই ঘুরে-ঘুরে বেড়াতে আসতেন তাঁর কাছে, আসতেন ভারমুক্ত হতে গর্ভবতীরা— অনেক নবজাতক ও নবজামাতার পরিচর্যা তাঁকে করতে দেখেছি। তিনি স্কুলে কতদূর পড়েছিলেন জানি না, কিন্তু তাঁর পোস্টমাষ্টার- পিতার গৃহে বাংলা লেখাপড়া ভালোই শিখেছিলেন মনে হয়; চিঠিপত্র বেশ গুছিয়ে লিখতেন, বাড়িতে ছিলো অনেককালের পুরোনো চামড়ায়-বাঁধাই বঙ্কিমের ভল্যুম, সন্ধেবেলা কখনো-কখনো মাসিকপত্র থেকে গল্প পড়ে শোনাতেন আমাদের— সেটা আমার খুব ভালো লাগতো, তাঁর কণ্ঠস্বর মন্দ্রিত ও উচ্চারণ স্পষ্ট ছিলো।
চিন্তাহরণ ও স্বর্ণলতা— এঁরাই আমার বাল্যজীবনকে পরিবৃত করে রেখেছিলেন। বিশেষত আমার দাদামশায়ের সঙ্গে আমি এমন এক ধরনের স্নেহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম, যার বুনোনটা খুব ঘন, প্রায় কোথাও ফাঁক নেই— পিতাপুত্রের সম্বন্ধের চেয়ে অনেকটাই বড়ো তার আয়তন। কেননা তিনি ছিলেন আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু, ও প্রথম ক্রীড়াসঙ্গী— চাকুরির সময়টুকু বাদ দিয়ে তিনি আমাকেই তাঁর জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে অল্প বয়সে স্কুলে ভর্তি করেননি— সেজন্যে আমি অন্তহীনভাবে কৃতজ্ঞ; যে-রকম যত্নে আমাকে তিনি ইংরেজি শিখিয়েছিলেন তার কোনো তুলনা হয় না। শীতের ভোরে বেড়াতে বেরিয়েছি তাঁর সঙ্গে— আমার পরনে কান-ঢাকা টুপি আর আলস্টার— তিনি চলতে-চলতে জিগেস করছেন : ‘Do you see what I see?” আর আমি তাঁর চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে বলে উঠছি, ‘A tree!’, ‘A dog!’, ‘A bullock-cart!’—এমনি সারাটা সময়। রবিবার বিকেলে তাঁর সঙ্গে আমার খেলা জমে শব্দরচনা ও শব্দহরণের চৌকো এ বি সি ডি-গুলো নিয়ে- সেটাও ইংরেজি চর্চারই একটা উপায়; তিনি ইচ্ছে করে আমার কাছে হেরে গেলেন বুঝেও আমি খুশি না-হয়ে পারি না। পারিবারিক ছোটো ছোটো চিঠিপত্র তিনি আমাকে দিয়েই লেখান; আমার সাত বছরের জন্মদিন থেকে আমাকে একটি রোজনামচা লেখার কাজে লাগিয়ে দিলেন— সবই ইংরেজিতে। শুরুতে তিনি বাক্যগুলো বলে দিতেন আমাকে, বা সাহায্য করতেন : অল্পদিনের মধ্যে আমার কলম স্বাধীনভাবে সচল হয়ে উঠলো।
আমার ইংরেজির জন্য দাদামশাই যে এত বেশি যত্ন নিয়েছিলেন, তার কারণ কি তাঁর কলোনিয়েল মনোভাব? হয়তো তা-ই— বাড়িতে দিল্লি-দরবারের মস্ত রঙিন ছবিও দেখেছি, রৌপ্যমুদ্রার উপরে অঙ্কিত মহারানীর মূর্তিটিকে মহিলারা বলতেন ‘সাক্ষাৎ ভগবতী’। তবু বলবো যে এখনকার স্বাধীন ভারতের বিত্তশালী সমাজে যে- ইঙ্গোন্মাদনার জোয়ার ডেকেছে (যেন ছেলেমেয়েরা ফিরিঙ্গি টানে এক ধরনের খিচুড়ি- ইংরেজি বলতে পারলেই শিক্ষার চূড়ান্ত হলো!), সে-রকম কিছুই আমার পরিবেশের মধ্যে ছিলো না তখন। ইংরেজি ছিলো আমাদের কাছে বইয়ের ও স্কুল-কলেজের ভাষা— জীবনের ভাষা বাংলা। আমার বাংলার জন্য চিন্তাহরণকে কোনো শ্রম করতে হয়নি, আমার শিক্ষক ছিলেন শুধু লেখকরা— যোগীন্দ্রনাথ উপেন্দ্রকিশোর থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত জাদুকরগণ।
দাদামশাই আমাকে সংস্কৃত টাও ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর উৎসাহে আমি ‘নরঃ নরৌ নরাঃ’ ও ‘তি তস্ অন্তি’র প্রথম সিঁড়িগুলো ভেঙেছিলাম, মুখস্থ করেছিলাম কিছু চাণক্যশ্লোক, কয়েক পৃষ্ঠা ‘হিতোপদেশ’ চর্বণ করেছিলাম। আরো দুটো সংস্কৃত কবিতা আমরা কণ্ঠস্থ ছিলো, মনে পড়ে— একটার নাম ‘মোহমুদগর, গভীর বৈরাগ্যবোধক সমিল একটি পদ্য, শঙ্করাচার্যের রচনা বলে কথিত, প্রথম লাইন ‘মূঢ় জহিহি ধনজনতৃষ্ণাম্; বিষয়টা ঠিক&