আমি চঞ্চল হে

আমি চঞ্চল হে

বুদ্ধদেব বসু

আমি চঞ্চল হে

Books Pointer Iconবুদ্ধদেব বসু
Books Pointer Icontravel

Change color

আবার পুজোর ছুটি এলো, আবার এলো শরৎ। বর্ষার পুবেল হাওয়া উত্তরে মোড় নিয়ে কোনাকুনি বইতে শুরু করেছে, এ-খবরটা এই রাজধানীর অতি সংকীর্ণ ও গৃহবহুল গলিও চাপা দিয়ে রাখতে পারেনি। আকাশে শাদা মেঘের সাবলীল স্থাপত্য ভেঙে-চুরে মিলিয়ে গিয়ে এখন নীলের জোয়ার উপচে পড়ছে কানায়-কানায়; সৰ্পিল গলির দু-ধারে উঁচিয়ে-ওঠা বাড়িগুলোর ফাঁকে-ফাঁকে হঠাৎ যেটুকু চোখে পড়ছে, তাতেই মনটা থেকে-থেকে প্রচণ্ড দোলা খেয়ে উঠছে। ঋতুর জগতে মস্ত একটা আলোড়ন যে চলেছে তার স্পষ্ট আভাস পাচ্ছি আকাশে-বাতাসে শরীরে চামড়ায়। যেন দীর্ঘ অসুখের অশান্তি-বিশৃঙ্খলার পরে কাপড়-চোপড় ধোবাবাড়ি পাঠিয়ে বিছানা-পার্টি রোদ্দুরে দিয়ে নতুন করে সংসার পাতবার আয়োজন।

আজকাল রাস্তায় বেরুলেই দেখতে পাই, ট্যাক্সি চলেছে মালপত্রে বোঝাই হয়ে ইস্টিশানের দিকে। মনটা ঈর্ষার কামড়ে মুচড়িয়ে ওঠে। কী সুখী ওরা, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি, কলকাতার হাটবাজার হিশেব-নিকেশ পিছনে ফেলে রেলগাড়ির কামরার কোণে একবার গ্যাট হয়ে যারা বসতে পেরেছে, তাদের মতো সুখী আর কে! আর আমার মতো দুঃখীই বা আর কে, এই অতুলনীয় ভ্রমণ-ঋতুতেও যাকে অল্-ডে টিকিটধারী নাবালকদের সংস্রবে ট্রামে চড়ে যেতে হচ্ছে কলকাতার এ-পাড়া থেকে ও-পাড়ায়। ‘ভবানীপুরের তেতলা বাড়িতে আলাপ চলছে সরু-মোটা গলায়—’ আমার বাড়ি ভবানীপুরে হলেও তেতলা নয়, এবং সেখানে এবার সরু-মোটা গলায় যে-আলাপ চলছে, আবু পাহাড় ড্যালহাউসি দূরে থাক, চিরকালের চিরচেনা দার্জিলিঙের সঙ্গেও তার কিছুমাত্র সম্পর্ক নেই। গেলো বছর উড়িষ্যার কোনো- কোনো জনপদে ভ্রমণের শেষে আমরা সামনের ছুটির জন্য যে-সমস্ত ভ্রমণের সংকল্প করে রেখেছিলাম, এখন পর্যন্ত তাদের পূর্ণতার কোনো লক্ষণই দেখতে পাচ্ছিনে। হয়তো তারা পূর্ণ হবে— পরে— আরো পরে? নাকি তারা বিস্মৃতির পাতালে তলিয়ে যাবে, যেখানে আমার কত অলিখিত গল্প কবিতার ভাঙা কল্পনার ভিড়? ভবিষ্যতের নামহীন দেবতাই জানেন।

জীবনে যা চাই তা পাইনে, যখন পাই, তখন আর তা চাইনে, এই রকমের একটা কথা আছে। কথাটার পিছনে আছে বহু যুগের বহু মানুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, তবু এর সঙ্গে সম্পূর্ণ সায় দিতে পারিনে। কথাটা এইভাবে বলা যায় যে আমাদের সমস্ত চাওয়ার পিছনে আছে এক হিংসুক নেমেসিস : তাকে এড়ানো প্রায় অসম্ভব। ধরা যাক, এমন একদিন ছিলো যখন আমি অন্য সমস্ত কিছুর চাইতে এইটেই বেশি করে চাইতাম যে আমার একটি বই ছাপা হয়ে বেরোক। আর এখন সেই বইয়ের সংখ্যার ঠিক অঙ্কটা মনে রাখবার চেষ্টাও অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছি; এবং এখানে এসেই যে থামবে এমন আশা করবারও উপায় দেখিনে। আমাকে খেতে হয় : আমাকে লিখতে হয়। আমাকে বাঁচতে হয় : আমাকে লিখতে হয়। এমনকি, এই যে কথাগুলো লিখছি, এ-ও আরো একটা বইয়েরই সূত্রপাত।

তবু জীবনে মাঝে-মাঝে মির‍্যাকলও ঘটে, তা না-হলে জীবন একেবারেই অর্থহীন হতো। কোনো আশা, কোনো কল্পনা— যা হয়তো অনেকদিন ধরে মনের অন্তঃপুরে গোপনে লালন করেছি, তা একদিন সত্যি-সত্যি পূর্ণ হয় : যা চেয়েছি তা-ই ঘটে, যখন এবং যেমন করে চেয়েছি, ঘটে সেই সময়ে ঠিক তেমনি করেই। স্থান-কাল-ঘটনার নৈমিত্তিকতায় চির-বন্দী আমরা, আমাদের পক্ষে এর চাইতে বড়ো সার্থকতা কিছু নেই। তা-ই হয়েছিলো গেলো বছর, যখন সমুদ্রে আর মন্দিরে আর হ্রদে, মর্মরে আর রোমাঞ্চে কয়েকটি দিন আমাদের কানায় কানায় ভরে গিয়েছিলো।

—কয়েকটা দিন! পাঁজির হিশেবে সময়টা খুব বেশি হয় না, সত্যি। কিন্তু যখনই আমরা আমাদের পরিচিত পরিবেশ ও দৈনন্দিন নিয়মিত কাজের এলাকার বাইরে চলে আসি তখনই একটা কাণ্ড ঘটে। মুহূর্তে দ্রুত হয়ে ওঠে সময়ের লয়। এখানে, আমাদের দিন কাটে শান্ত মন্থরতায়, নিয়মের মসৃণ আরামে; প্রতিটি দিন- রাত্রির চেহারা মোটামুটি তার পূর্ববর্তীরই মতো; কালকের দিন-রাত্রির কোন অংশ কী ভাবে কাটবে, আজ তা মোটামুটি বলে দেয়া যায় সহজেই। দিনগুলোর গায়ে ঘণ্টা-মাফিক কাজ, বিক্ষেপ ও বিশ্রামের খাঁজ কাটা, তার সাহায্যে তাদের চেহারাটা স্পষ্ট-নির্দিষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। এবং এও বলতে হবে যে জীবনের অধিকাংশ যাপন করবার পক্ষে এ-অবস্থাই আদর্শ। দিনের প্রতি ঘণ্টায় যদি নতুন উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ ঘটতো তাহলে ও-কথাগুলোর কোনো অর্থই থাকতো না, এবং জীবনটা নির্বোধ লাগতো এডগার ওয়ালেসের গল্পের মতোই যেখানে প্রতি পাতায় একটা করে খুন ঘটে। চিরন্তন পিকনিকের মতো ক্লান্তিকর কিছুই নয়, যদি সে-রকম কোনো জিনিশ আমরা কল্পনাতেও আনতে পারি। যারা কেবল ‘ফূর্তি’ করে জীবন কাটায়, আসলে তাদের মতো ঘোরতর অসুখী আর কেউ নয়।

কিন্তু ওখানে, বাইরে, সবই অন্যরকম। এবং এ-রূপান্তর আরম্ভ হয় ইস্টিশানে গিয়ে গাড়িতে ওঠবার মুহূর্ত থেকেই। যেন প্রবেশ করি সময়ের অন্য কোনো স্তরে : গন্তব্যস্থানে পৌঁছিয়ে দু-দিন কাটিয়েই মনে হয় যেন একমাস এখানেই আছি। কেননা দিনরাত্রির গায়ের চিরপরিচিত খাঁজগুলো তখন হারিয়ে যায়, স্পষ্ট কোনো রেখা আর খুঁজে পাইনে। কখন শোয়া, কখন খাওয়া, কখন বেড়ানো কিছুরই ঠিক নেই, আর কাজ নামক অমন মস্ত জিনিশটাই একেবারে সশরীরে অনুপস্থিত। প্রতি মুহূর্তে চোখে ও মনে নতুন ও অনভ্যস্ত ছাপ পড়ছে, দিনগুলো তাই যতিচিহ্নহীন এলোমেলো অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে গেলাম, এটা দেখলাম, ওটা করলাম : এই করে-করে একটা দিন অসম্ভবরকম স্ফীত হয়ে উঠে নিছক সময়ের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে যায়; একটা দিনের মধ্যে আমাদের মন যতবার ও যত নতুনভাবে নাড়া খায় বাড়িতে অভ্যস্ত জীবনে একমাসের মধ্যেও তা হয় না। এও বোধহয় বলা যায় যে বাড়িতে বসে আকস্মিক উত্তেজনাতেও মনে যে-ছাপ পড়ে, তা থেকে বাইরের এই ছাপগুলোর প্রকৃতিই আলাদা। পারিপার্শ্বিকের যেটা নিছক অভিনবত্ব সেটাই, আমার মনে হয়, সময়ের এই সম্প্রসারণের একটা কারণ। যেটা নতুন, যেটা অপরিচিত ও অনভ্যস্ত বলে কখনো অদ্ভুত কখনো আশ্চর্য, তার সম্বন্ধে মনের প্রতিক্রিয়া স্বভাবতই প্রবল। বাইরে গেলেই, সেইজন্যে, মনের ও ইন্দ্রিয়ের সচেতনতা অনেকগুণ সূক্ষ্ম হয়ে ওঠে; আমাদের দেখাতে অনেক বেশি দেখা, শোনাতে অনেক বেশি শোনা; আমাদের অনুভূতিতে অনেক বেশি অনুভব।

কেননা একটা জিনিশ নিজের সত্তায় যতই আশ্চর্য কি অপরূপ হোক, তার সম্পূর্ণ মহিমা উপলব্ধি করতে হলে বিস্ময়ের দৃষ্টি নিতান্তই দরকার। পুরীতে সমুদ্রের ধার দিয়ে নুলিয়ারা অন্যমনে হেঁটে যায়; যদি কখনো সমুদ্রের দিকে তাকায় তা শুধু এই দেখতে যে নবীন কোনো স্নানার্থীর সাহায্যকারীর প্রয়োজন আছে কিনা। পুরীতে আমরা যে-হোটেলে ছিলুম সেখান থেকে সমুদ্রদর্শনের অপূর্ব সুযোগ মেলে : কিন্তু সে-সুযোগ সম্বন্ধে আমাদের চমৎকার ম্যানেজারটি শুধু পয়লা নম্বরের একটা বিজ্ঞাপন হিশেবেই সচেতন। এবং তিনি যে অবশ্যতই স্থূলমনা কি নির্বোধ কি কল্পনাহীন তাও নয়। তাঁর অবস্থায় পড়লে আমারও কি প্রায় ঐ মনোভাবই ঠিক হতো না? ধরা যাক, রোজ আমি বাস্-এ করে নির্দিষ্ট একটি কর্মস্থলে যাওয়া-আসা করি; চৌরঙ্গির

**********