নীল সায়রের অচিনপুরে

নীল সায়রের অচিনপুরে

হেমেন্দ্রকুমার রায়

নীল সায়রের অচিনপুরে

Books Pointer Iconহেমেন্দ্রকুমার রায়
Books Pointer Iconthriller

Posted byকাব্য রচিত28-Jan-2026

Change color

প্রথম পরিচ্ছেদ – ঝড়

ঢং!

বড়ো ঘড়িতে বাজল সাড়ে—সাতটা! এই হল বিমল ও কুমারের চা—পানের সময়। রামহরি চায়ের ‘ট্রে’ হাতে করে ঘরে ঢুকেই দেখলে, তারা দুজনে একখানা খবরের কাগজের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে, আগ্রহভরে।

এই খবরের কাগজ ও এই আগ্রহ রামহরির মোটেই ভালো লাগল না। কারণ সে জানে, রীতিমতো একটা জবর খবর না থাকলে বিমল ও কুমার খবরের কাগজের উপরে অমন করে ঝুঁকে পড়ে না। এবং তাদের কাছে জবর খবর মানে সাংঘাতিক বিপদের খবর! এই খবর পড়েই হয়তো ওরা বলে বসবে, ‘ওঠো রামহরি! বাঁধো তল্পিতল্পা! আজকেই আমরা কলকাতা ছাড়ব!’ কতবার যে এমনি ব্যাপার হয়েছে, তার আর হিসাব নেই।

অতএব রামহরি ওই খবরের কাগজগুলোকে দু—চক্ষে দেখতে পারত না। তার মতে, ওগুলো হচ্ছে মানুষের শত্রু ও বিপদের অগ্রদূত!

রামহরি চায়ের ট্রে—খানা সশব্দে টেবিলের উপরে রাখলে—কিন্তু তবু ওরা কাগজ থেকে মুখ তুললে না!

রামহরি বিরক্ত কণ্ঠে বললে, ‘কী, চা—টা খাবে, না আজ কাগজ পড়েই পেট ভরবে?’

বিমল ফিরে বসে বললে, ‘কী ব্যাপার রামহরি, সক্কালবেলায় তোমার গলাটা এমন বেসুরো বলছে কেন?’

—’বলি, খবরের কাগজ পড়বে, না চা খাবে?’

কুমার হেসে বললে, ‘খবরের কাগজের ওপরে তোমার অত রাগ কেন?’

—’রাগ হবে না? ওই হতচ্ছাড়া কাগজগুলোই তো তোমাদের যত ছিষ্টিছাড়া খবর দেয়, তোমরা পাগলের মতো বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে চাও!’

বিমল হো হো করে হেসে উঠে বললে, ‘নাঃ।—রামহরি আমাদের বড্ড বেশি চিনে ফেলেছে, কুমার!’

—’না, তোমাদের ছেলেবেলা থেকে দেখছি, তোমাদের চিনব কেন? ওসব কাগজ—টাগজ পড়া ছেড়ে দাও!’

—’হ্যাঁ, রামহরি, এইবার সত্যিসত্যিই কিছুকালের জন্য আমরা কাগজ—টাগজ পড়া একেবারে ছেড়ে দেব!’

রামহরি ভারী খুশি হয়ে বললে, ‘তোমার মুখে ফুল—চন্নন পড়ুক! আমি তাহলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি!’

—’বাঁচবে কী মরবে জানি না রামহরি, তবে আমরা যে ইচ্ছা করলেও আর কাগজ পড়তে পারব না, এ বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। কারণ এবারে যে—দেশে যাচ্ছি সেখানে খবরের কাগজ পাওয়া যায় না।’

রামহরির মুখে এল অন্ধকার ঘনিয়ে। বললে, ‘তার মানে?’

—’আমরা যে শিগগিরই সমুদ্রযাত্রায় বেরুব।’

—’ওরে বাবা, সুমুদ্দরে? এবারে আবার কোন চুলোয়? পাতালে নয়তো?’

—’হতে পারে। তবে, আপাতত আগে যাব সাহেবদের দেশে—অর্থাৎ বিলাতে। সেখান থেকে একখানা গোটা জাহাজ রিজার্ভ করে যাব আফ্রিকা আর আমেরিকার মাঝখানে, আটলান্টিক মহাসাগরের এমন কোনও দ্বীপে, যার নাম কেউ জানে না।’

—’সঙ্গে যাচ্ছে কে কে?’

—’আমি, কুমার, বিনয়বাবু, কমল, বাঘা আর তুমি—অর্থাৎ আমাদের পুরো দল। এবারের ব্যাপার গুরুতর, তাই দু—ডজন শিখ, গুর্খা আর পাঠানকেও ভাড়া করতে হবে।’

রামহরি গম্ভীর মুখে বললে, ‘বেশ, তোমার যেখানে খুশি যাও, কিন্তু এবার আর আমি তোমাদের সঙ্গে নেই’—বলেই সে হন হন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

বিমল চায়ের ‘ট্রে’ টেনে নিয়ে মুখ টিপে হেসে বললে, ‘রামহরি নাকি এবারে আমাদের সঙ্গে যাবে না! কিন্তু যাত্রার দিন দেখা যাবে সেইই হন হন করে আমাদের আগে আগে যাচ্ছে!……যাক, নাও কুমার না চাও! চা খেতে খেতে কাগজখানা আর একবার গোড়া থেকে পড়ো তো শুনি! বার বার শুনে সমস্ত ঘটনা মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে ফেলতে হবে।’

কুমার খবরের কাগজখানা আবার তুলে নিয়ে চেঁচিয়ে পড়তে লাগল।

‘আটলান্টিক মহাসাগরে এক বিচিত্র রহস্যের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। যাঁহারা বলেন, এই বৈজ্ঞানিক যুগে পৃথিবীতে আর নতুন বিস্ময়ের ঠাঁই নাই, তাঁহারা ভ্রান্ত। ধরণী বিপুলা, মানবসভ্যতার সৃষ্টি—রহস্যের কতটুকু ধরা পড়িয়াছে? প্রতি যুগেই সভ্যতা মনে করিয়াছে, জ্ঞানের চরম সীমা তাহার হস্তগত, তাহার পক্ষে আর নতুন শিখিবার কিছুই নাই। কিন্তু পরবর্তী যুগেই তাহার সে—গর্ব চূর্ণ হইয়া গিয়াছে।

গ্রিকরা নাকি সভ্যতার উচ্চতম শিখরে আরোহণ করিয়াছিল—জ্ঞান—বিজ্ঞানে তাহারা ছিল অগ্রগণ্য। কিন্তু আজিকার কলেজের ছাত্ররাও প্লেটো ও সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞান—বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে অধিক অগ্রসর! গ্রিক সভ্যতা বিলুপ্ত হইল, পৃথিবীকে বিজয়—চিৎকারে পরিপূর্ণ করিয়া আবির্ভূত হইল রোমীয় সভ্যতা! তাহার বিশ্বাস ছিল ভূমণ্ডলকে দেখিতে পায় সে নিজের নখ—দর্পণে! কিন্তু, রোমানদের অঙ্কিত পুরাতন মানচিত্রে আধুনিক পৃথিবীর প্রায় অর্ধাংশকেই দেখিতে পাওয়া যায় না। মধ্যযুগের পরেও এই সেদিন পর্যন্ত উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু এবং আরও কত বড়ো বড়ো দ্বীপের অস্তিত্ব পর্যন্ত কাহারও জানা ছিল না! অন্যান্য গ্রহের কথা ছাড়িয়া দি, আজও পৃথিবীতে অনাবিষ্কৃত নব নব দেশ নাই, এমন কথা কেহ কি জোর করিয়া বলিতে পারে? দক্ষিণ আমেরিকায় ও আফ্রিকায় এখনও এমন একাধিক দুর্গম দেশ ও দুরারোহ পর্বত আছে, এ যুগের কোনও সভ্য মানুষ সেখানে পদার্পণ করে নাই! ওইসব স্থানে অতীতের কত গভীর রহস্য নিদ্রিত হইয়া আছে, তাহা কে বলিতে পারে? হয়তো কত নতুন জাতি, কত অজানা জীব সেখানে নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র এক সমাজ বা বসতি গড়িয়া বসবাস করিতেছে, আমরা তাহাদের কোনও সংবাদই রাখি না!

অতঃপর আগে যে রহস্যের ইঙ্গিত দিয়াছি তাহার কথাই বলিব।

সম্প্রতি এস এস বোহিমিয়া নামক একখানি জাহাজ ইউরোপ হইতে আমেরিকায় যাত্রা করিয়াছিল।

কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগরের ভিতরে আচম্বিতে এক ভীষণ ঝড় উঠিল। এই স্মরণীয় দৈব—দুর্ঘটনার সংবাদ আমাদের কাগজে গত সপ্তাহেই প্রকাশিত হইয়া গিয়াছে এবং সকলেই এখন জানেন যে, ও—রকম ভূমিকম্পের সঙ্গে ঝড় আটলান্টিক মহাসাগরে গত এক শতাব্দীর মধ্যে কেহ দেখে নাই। উক্ত দৈব—দুর্বিপাকে আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যবর্তী বহু দ্বীপে ও তীরবর্তী বহু দেশে অগণ্য লোক ও সম্পত্তি ক্ষয় হইয়াছে। কোনও কোনও ছোটো ছোটো দ্বীপের চিহ্ন পর্যন্ত সমুদ্রের উপর হইতে একেবারে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে! বহু বাণিজ্যপোত ও যাত্রীপোত অদ্যাবধি কোনও বন্দরে ফিরিয়া আসে নাই এবং হয়তো আর আসিবেও না।

‘বোহিমিয়া’ও পড়িয়াছিল এই সর্বগ্রাসী প্রলয়ঝটিকার মুখেই! কিন্তু ঝটিকা দয়া করিয়া যাহাদের গ্রহণ করে নাই, ‘বোহিমিয়া’ সৌভাগ্যবশত তাহাদেরই দলভুক্ত হইতে পারিয়াছে। গত আঠারোই তারিখে সে ক্ষতবিক্ষত দেহে আবার স্বদেশের বন্দরে ফিরিয়া আসিয়াছে। এবং তাহার যাত্রীরা বহন করিয়া আনিয়াছে এক বিস্ময়কর কাহিনি! জনৈক যাত্রী যে বর্ণনা দিয়াছে আমরা এখানে তাহাই প্রকাশ করিলাম!

অপার সাগরে ঝটিকা জাগিয়া ‘বোহিমিয়া’র অবস্থা করিয়া তুলিয়াছি ভয়াবহ! ঝড়ের ঝাপটে প্রথমেই তাহার ইঞ্জিন খারাপ হইয়া যায়। সমুদ্রের তরঙ্গ বিরাট আকার ধারণ করিয়া উন্মত্ত আনন্দে জাহাজের ডেকের উপর ক্রমাগত ভাঙিয়া পড়িতে থাকে,—সেই তরঙ্গের আঘাতে দুইজন আরোহী জাহাজের উপর হইতে অদৃশ্য হইয়া যায়। জাহাজের চারিদিকে বহুক্ষণ পর্যন্ত উত্তাল তরঙ্গের প্রাচীর ছাড়া আর কোনও দৃশ্যই দেখা যায় নাই। প্রলয়—ঝটিকার হুহুঙ্কার এবং মহাসাগরের গর্জন সেই অসীমতার সাম্রাজ্যকে ধ্বনিময় ও ভয়ানক করিয়া তোলে! আকাশব্যাপী নিবিড় অন্ধকার অশ্রান্ত বিদ্যুৎবিকাশে অগ্নিময় হইয়া উঠে। প্রকাশ, এত ঘন ঘন বিদ্যুতের সমারোহ এবং বজ্রের কোলাহল নাকি কেউ কখনও দেখেও নাই শোনেও নাই! এই মহা হুলুস্থুলুর মধ্যে, এই শত শত শব্দ—দানবের প্রবল আস্ফালনের মধ্যে, প্রাকৃতিক বিপ্লবের এই সর্বনাশা আয়োজনের মধ্যে নিজের নির্দিষ্ট গতিশক্তি হারাইয়া ‘বোহিমিয়া’ একান্ত অসহায়ভাবে বিশাল সমুদ্রের প্রচণ্ড স্রোতে এবং ক্রুদ্ধ ঝটিকার দুর্নিবার টানে দিগ্বিদিক ভুলিয়া কোথায় ছুটিতে থাকে, তাহা বুঝিবার কোনও উপায়ই ছিল না। জাহাজের ‘ইলেকট্রিসিটি’ জোগান দিবার যন্ত্রও বিগড়াইয়া যায়। ভিতরে বাহিরে অন্ধকার, আকাশে ঝড়, সমুদ্রে বন্যা ও তাণ্ডবের বিপ্লব, জাহাজের কামরায় কামরায় শিশু ও নারীদের উচ্চ ক্রন্দনধ্বনি, কাপ্তেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, নাবিকেরা ভীতিব্যাকুল,—এই কল্পনাতীত দুর্ভাগ্যের মধ্য দিয়া ‘বোহিমিয়া’ ভাসিয়া আর ভাসিয়া চলিয়াছে—কোন অদৃশ্য মহাশক্তির তাড়নায়—কোন অদৃশ্য নিয়তির নিষ্ঠুর আকর্ষণে! প্রতিমুহূর্তে তার নরক—যন্ত্রণাময় অনন্ত মুহূর্তের মতো—পাতালের অতলতা কখন তাকে গ্রাস করে, সকলে তখন যেন কেবল তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছিল!

প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পরে ঝড় যখন শান্ত হইয়া আসিল, ভগবানের অনুগ্রহে ‘বোহিমিয়া’ তখনও ভাসিয়া রহিল। এ যাত্রা রক্ষা পাইল বুঝিয়া ধর্মভীরু যাত্রীরা প্রার্থনা করিতে বসিল।

কিন্তু জাহাজ এখন কোথায়? তখন শেষ—রাত্রি, চন্দ্রহীন শূন্যতা, চতুর্দিকে আঁধার—প্রপাতের বাঁধ খুলিয়া দিয়াছে। জাহাজের ভিতরেও আলোর আশীর্বাদ নাই। কাপ্তেন ডেকের উপরে আসিয়া দাঁড়াইলেন।

আটলান্টিক মহাসাগর তখনও যেন রুদ্ধ আক্রোশে গর্জন করিতেছে, তাহার বিদ্রোহী তরঙ্গদল তখনও মৃত্যুসংগীতের ছন্দে রুদ্রতাল বাজাইয়া ছুটিয়া যাইতেছে, জাহাজ তখনও তাহাদের কবলে অসহায় ক্রীড়নক!

অনেকক্ষণ পরে কাপ্তেন সবিস্ময়ে দেখিলেন বহুদূরে অনেকগুলো আলোকশিখা জমাট অন্ধকার—পটে যেন সুবর্ণরেখা টানিয়া দিতেছে!

‘বোহিমিয়া’ সেইদিকেই অগ্রসর হইতেছিল।

আলোক—শিখাগুলি ক্রমেই স্পষ্ট ও সমুজ্জ্বল হইয়া উঠিতে লাগিল! দূরবিনের সাহায্যে কাপ্তেন দেখিলেন, সেগুলো মশালের আলো এবং তাহারা রাত্রিচর আলেয়ার মতো এদিকে—ওদিকে চলা—ফেরা করিতেছে!

কাপ্তেন বুঝিলেন, ‘বোহিমিয়া’ স্রোতের টানে কোনও দ্বীপের দিকে অগ্রসর হইতেছে এবং দ্বীপের বাসিন্দারা মশাল জ্বালিয়া যে—কারণেই হউক সমুদ্র—তীরে বিচরণ করিতেছে। সাগরতীরবর্তী দ্বীপের বাসিন্দারা ঝড়ের পরে প্রায়ই এইরকম বাহিরে আসিয়া অপেক্ষা করে, বিপদগ্রস্ত জাহাজ বা নরনারীদের সাহায্য করিবার শুভ—ইচ্ছায়।

খানিকক্ষণ পরে হঠাৎ আলোগুলো অদৃশ্য হইয়া গেল। নিকটেই কোনও দ্বীপ আছে জানিয়া কাপ্তেন ভগবানকে বারংবার ধন্যবাদ দিলেন।

তাহার পর পূর্ব আকাশে কুমারী ঊষা যখন তার লাল—চেলির ঝলমলে আঁচল উড়াইয়া দিল, সাগরবাসী রূপসি নীলিমা যখন শান্ত স্বরে প্রভাতী স্তব পাঠ করিতে লাগিল, সকলের চোখের সামনে তখন ভাসিয়া উঠিল—স্বপ্নরঙ্গমঞ্চের অর্ধস্ফুট দৃশ্যপটের মতো এক অভিনব দ্বীপের ছবি!

সে দ্বীপটি বড়ো নয়—আকারে হয়তো চার—পাঁচ মাইলের বেশি হইবে না। কিন্তু তাহাকে সাধারণ দ্বীপের পর্যায়ে ফেলা যায় না। সে দ্বীপকে একটি পাহাড় বলাই উচিত!

তাহার ঢালু গা ধীরে ধীরে উপর—দিকে উঠিয়া গিয়াছে। নীচের দিকটা কম—ঢালু, সেখান দিয়া অনয়াসে চলা—ফেরা করা যায়, কিন্তু তাহার শিখর দিকটা শূন্যে উঠিয়াছে প্রায় সমান খাড়াভাবে। সাগরগর্ভ হইতে তাহার শিখরের উচ্চতা দেড় হাজার ফুটের কম হইবে না।

দূরবিন দিয়া কাপ্তেন দেখিলেন, সেই পাহাড়—দ্বীপের কোথাও কোনও গাছপালা— এমনকী সবুজের আভাসটুকু পর্যন্ত নাই! আর—একটি অভাবিত আশ্চর্য ব্যাপার হইতেছে এই যে, দ্বীপের গায়ে নানাস্থানে দাঁড়াইয়া আছে মস্ত মস্ত প্রস্তরমূর্তি,—এক—একটি মূর্তি এত প্রকাণ্ড যে, উচ্চতায় দেড়শত বা দুইশত ফুটের কম নয়! পাহাড়ের গা হইতে সেই বিচিত্র মূর্তিগুলিকে কাটিয়া—খুদিয়া বাহির করাই হইয়াছে! দূর হইতে দেখিলে সন্দেহ হয়, যেন প্রাচীন মিশরি ভাস্করের গড়া মূর্তি!

কিন্তু গতকল্য যাহারা এই গিরি—দ্বীপে মশাল জ্বালিয়া চলা—ফেরা করিতেছিল, তাহাদের কাহাকেও আজ সকালে দেখা গেল না। এই দ্বীপের পাথুরে গায়ে যেমন শ্যামলতাও নাই, তেমনি কোনও জীবের বা মানুষের বসতির চিহ্নমাত্রও নাই! এমনকী, সেখানে একটা পাখি পর্যন্ত উড়িতেছে না!

তিনি বহুকাল কাপ্তেনি করিতেছেন, আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যেক তরঙ্গটি তাঁহার নিকটে সুপরিচিত, নাবিক—ব্যবসায়ে তিনি চুল পাকাইয়া ফেলিয়াছেন, কিন্তু এই দ্বীপটিকে কখনও দেখেন নাই, বা তাহার অস্তিত্বের কথা কাহারও মুখে শ্রবণও করেন নাই।……অথবা এই দ্বীপের কথা শুনিয়াও তিনি ভুলিয়া গিয়াছেন? তাঁহার এমন ভ্রম কি হইতে পারে? দ্বীপের খুব কাছে আসিয়া নোঙর ফেলিয়া কাপ্তেন তাড়াতাড়ি নিজের কেবিনে ছুটিয়া গেলেন। ‘চার্ট’ বাহির করিয়া অনেক খুঁজিলেন, কিন্তু তাহাতে এই শৈলদ্বীপের নাম—গন্ধও পাইলেন না! তবে এখানে এই দ্বীপটি কোথা হইতে আসিল?

অনেক ভাবিয়াও এই প্রশ্নের কোনও উত্তর না পাইয়া কাপ্তেন আবার বাহিরে আসিলেন। এবং তাহার পর জন—আষ্টেক নাবিককে

**********