
জন্তু
দেবারতি মুখোপাধ্যায়
প্রথমেই বলি, যে হাড়-হিম-করা কাহিনি আপনাদের শোনাতে বসেছি, তা গল্পকথা নয়, নির্ভেজাল সত্য ঘটনা। সত্যঘটনাকে কাহিনি আকারে পরিবেশন করতে বসলে লেখককে সাধারণত যে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়, ঘটনাপঞ্জির ভাঁজে ভাঁজে জুড়ে দিতে হয় রোমাঞ্চ, কাল্পনিক কথোপকথন, সেই সুযোগ আমি এখানে সামান্যই পেয়েছি। তার কারণ ইংরেজির সেই আদি ও অকৃত্রিম প্রবাদ। Truth is stranger than fiction.
এই হৃদয়বিদারক কাহিনির তীব্রতা এতটাই বেশি, আঘাত এতটাই ভয়ানক, নিষ্ঠুরতার প্রাবল্য এতটাই অবিশ্বাস্য, যে লেখক হিসেবে এখানে আমার খুব বেশি কিছু করার ছিল না। এই গল্প পড়তে পড়তে আপনি শিহরিত হয়ে উঠবেন, পাশবিকতায় কেঁপে উঠবেন, আপনার শিশুসন্তানকে আতঙ্কে জড়িয়ে ধরবেন। আবার এই কাহিনি এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আপনার শরীরে অ্যাড্রিনালিন নিঃসরণ দ্রুততর হবে। রক্ত ছলকে বেরোতে চাইবে আপনার ত্বক ছিঁড়ে, ক্রমে সেই নিষ্ফল রাগ জন্ম দেবে হতাশার। যদি আপনার হৃদয় দুর্বল হয়, তবে এই লেখা আপনার জন্য নয়।
এই কাহিনি এক দৈত্যের গল্প। শিশুরা ছোটোবেলায় মা-ঠাকুমার কোলে বসে বড়ো বড়ো চোখে যে দৈত্যের গল্প শোনে, দৈত্য যখন রাজপ্রাসাদ থেকে ঘুমন্ত রাজকন্যাকে নিয়ে চলে যায়, তাদের প্রশ্বাস-নিশ্বাস যেমন ঘন হয়ে ওঠে, এই কাহিনিও তেমনই এক মানুষরূপী দৈত্যের। কিন্তু এই দৈত্য সোনার কাঠি-রুপার কাঠি দিয়ে রাজকন্যাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখত না, নির্মম নিস্পৃহতায় শেষ করে ফেলত জীবনদীপ।
গৌরচন্দ্রিকা খুব বেশি দীর্ঘায়িত না করে প্রথমেই চলে যাই ১৯৭৫ সালে। পাঠানকোটের এয়ার ফোর্স স্টেশন। হিমালয়ের কোলে প্রকাণ্ড অঞ্চল জুড়ে ভারতীয় বায়ুসেনার সংরক্ষিত এলাকা। এক শান্ত বিকেলে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে সেখানে বিস্ফোরণ হল।
মুহূর্তে চারদিকে হইহই পড়ে গেল। সাইরেন বেজে উঠল। বেশ কয়েকটা ফায়ার ইঞ্জিন যতক্ষণে অকুস্থলে এসে পৌঁছোল, ততক্ষণে গলগল করে বেরোতে-থাকা কালো ধোঁয়া আকাশ ঢেকে ফেলেছে।
দুজন জুনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার ছুটতে ছুটতে এল। কোনো সন্দেহ নেই, জঙ্গিরা অতর্কিতে হামলা চালিয়েছে। এখন কতটা জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত, সেটাই দেখতে হবে। দ্রুতগতিতে এসে তারা থমকে গেল। বিস্মিত চোখে দেখল, বিশেষ একটা বাংলো থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
বাড়িটার সামনের অংশ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। কিছু জওয়ান বন্দুক তাক করে উবু হয়ে বসে আছে, কয়েকজন ক্রমশ ভস্মীভূত হতে-থাকা বাড়ি থেকে স্ট্রেচারে করে বের করে আনছে একজন আহত মহিলাকে।
এক ওয়ারেন্ট অফিসার আরেকজনকে বলল, ”কী অদ্ভুত দেখো! শুধু মেজর ভি. কে. শর্মার বাড়িতে অ্যাটাক হয়েছে।”
”সেটাই তো দেখছি। টেররিস্টরা তো শুধু একখানা বাড়ির ওপর হামলা করে না।” দ্বিতীয়জন চিন্তিত মুখে বলল, ”এহ, মিসেস শর্মা শুধু নন, ওঁদের ছেলেও দেখছি মারাত্মকভাবে ইনজিয়োরড।”
খবর পেয়ে মেজর ভি. কে. শর্মা যখন এলেন, ততক্ষণে ফায়ার ব্রিগেড বাড়ির আগুন নিভিয়ে ফেলেছে। মেজর শর্মার স্ত্রী ও কিশোর পুত্রকে আর্মি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দুজনেরই আঘাত গুরুতর।
আকস্মিক এই হামলার তদন্ত করার জন্য দ্রুত গঠন করা হল স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন কমিটি। সেই কমিটি তদন্ত শুরু করে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কেস সলভ করে দিল।
সেই দুজন জুনিয়র অফিসারের সন্দেহই অমূলক। কোনো জঙ্গি হানা বা বিদেশি শত্রুর আক্রমণ নয়, মেজর ভি. কে. শর্মার বাড়ি লক্ষ করে হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়েছিল এয়ার ফোর্সেরই এক সেনা, তার নাম দরবার সিং। কয়েকদিন আগে কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য দরবার সিং মেজর শর্মার কাছে ধমক খেয়েছিল। এই কদিন মনে মনে ফুঁসেছে সে, তারপর অ্যামিউনিশন ডিপার্টমেন্ট থেকে হ্যান্ড গ্রেনেড চুরি করে মেজরের বাড়ি লক্ষ করে ছুড়েছে। ঠিকমতো লাগলে মেজরের স্ত্রী ও পুত্রের ওখানেই মৃত্যু হত।
দরবার সিংকে গ্রেপ্তার করা হল, কিন্তু একেবারে হাতেনাতে পাওয়া প্রমাণের অভাবে সে ছাড়াও পেয়ে গেল। তবে চাকরি থেকে তাকে তৎক্ষণাৎ বরখাস্ত করা হল। পাঠানকোট এয়ার ফোর্স স্টেশনের সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। স্বাভাবিক, এই ধরনের প্রতিশোধপরায়ণ অসুস্থ মানসিকতার সহকর্মী কে-ই বা চায়!
তারা অনুমানও করতে পারল না, এই প্রতিশোধস্পৃহা থেকে দরবার সিং একদিন একটা গোটা দেশকে কাঁপিয়ে দেবে। তার নামের আগে শুধু ‘সিরিয়াল কিলার’ নয়, বসবে ‘বেবি কিলার’ শব্দবন্ধ।
পাঠানকোট এয়ার ফোর্স আন্দাজও করতে পারল না, পঁচিশেরও বেশি দুধের শিশুকে কখনো মিষ্টি, কখনো লজেন্স, কখনো আইসক্রিমের লোভ দেখিয়ে ঠান্ডা মাথায় খুন করে চলবে দরবার সিং। এই ভয়ংকর অনুমান তাদের পক্ষে করা সম্ভবও ছিল না।
দরবার সিং জাতে পাঞ্জাবি, তার বাড়ি ছিল পাঞ্জাবের অমৃতসর জেলার জাল্লুপুর খেরা গ্রামে। তার জীবনে তিনটে শখ ছিল। মদ খাওয়া, বউকে পেটানো আর বউকে জোর করে যখন-তখন সহবাসে বাধ্য করা। তার বউ প্রথম কয়েক বছর মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করলেও ক্রমশ তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল। ১৯৭৫ সালে দরবার সিং যখন চাকরি থেকে বরখাস্ত হল, তখন বাড়িতে তাদের তিন তিনটে বাচ্চা। অথচ চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে দরবারের হিংস্রতা আরও বেড়ে চলেছিল। সঞ্চয়ের টাকা ভেঙে ভেঙে মদে চুর হয়ে থাকে, আর বাচ্চারা খিদের জ্বালায় কাঁদলেই তাদের মারে, বউকেও রেহাই দেয় না।
তার বউ লোকের বাড়ি ঠিকে কাজ করতে শুরু করল, সেই টাকায় বাচ্চাদের খাবার কিনে আনলে দরবার প্রায় দিন তা ছুড়ে ফেলে দেয়, জোর করে টাকাকড়ি কেড়ে নিয়ে বসে বসে মদ গিলতে শুরু করে। বছরের পর বছর এভাবে চলতে চলতে তার বউও পালটা মারতে লাগল। বাড়িতে অশান্তি, মারধোর লেগেই থাকছিল। ছেলেমেয়েরা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত। খুব বাড়াবাড়ি হলে পাড়ার লোকেরা এসে শান্ত করত।
অবশেষে একদিন দরবারকে বাড়ি থেকে বের করে দিল তার বউ। অন্য সময় হলে দরবার বউকে আধমরা করে দিত, কিন্তু চাকরি খোয়ানো এবং আরও নানা কারণে পাড়া প্রতিবেশী তাকে দেখতে পারে না। তাদের সমর্থনেই ওর বউ এত সাহস পেয়েছে।
”বেরোও! বেরোও বাড়ি থেকে! আমি খেটেখুটে পয়সা আনব, আর উনি মদ গিলে এসে মারধর করবেন! ছেলে মেয়েগুলোকে পর্যন্ত মারছে! একটা বাজে লোক!”
”ঠিক বলেছ। আমিও প্রতিদিন ওর বদমায়েশি দেখি। এইসব লোক সংসারে থাকার নয়!” দরবার সিং-এর প্রতিবেশী অকুণ্ঠভাবে ওর স্ত্রী-কে সমর্থন করে।
বউয়ের একতরফা চিৎকারে রাগে জ্বলতে জ্বলতে দরবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে কোথায় যাবে, কী করবে, প্রথমে কিছু ভেবে পেল না। অন্যমনস্কভাবে সে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছোল অমৃতসর বাস স্ট্যান্ডে। যেদিকে দু-চোখ যায়, হাতের সামনে যা বাস পেল, তাতেই উঠে বসল।
আর এভাবেই দরবার সিং এসে পৌঁছোল কাপুরথালা শহরে। পাঠানকোট এয়ার ফোর্স নিষ্কৃতি পেল, দরবারের পরিবার মুক্তি পেল।
কিন্তু এবার দরবারের সামনে খোলা পৃথিবী।
অতএব নরক হয়ে উঠল&nbs