কলকাতার রাত্রি রহস্য

কলকাতার রাত্রি রহস্য

হেমেন্দ্রকুমার রায়

কলকাতার রাত্রি রহস্য

Books Pointer Iconহেমেন্দ্রকুমার রায়
Books Pointer Iconthriller

Posted byকাব্য রচিত28-Jan-2026

Change color

প্রথম দৃশ্য – শহরের সাধারণ ছবি

প্রস্তাবনা

রাতের কলকাতা কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের জন্য লিখিত হল।

সেকেলে কলকাতার দৃশ্য আছে হুতোম প্যাঁচার নক্সা১-য়। আমার এ বইখানিও নকশা২ এবং এতে আছে একেলে কলকাতার সময় বিশেষের ছবি। আমার তুলিতে হুতোমের তেমন পাকা রং নেই, লোকের ভালো না লাগাই সম্ভব! ভরসা খালি এইটুকু যে, দুধ না পেলে অনেকে ঘোল খেতেও রাজি আছেন।


আর কিছু না হোক এই নকশা অনেকেরই ছানি-পড়া চোখে অব্যর্থ ঔষধের কাজ করবে। কলকাতার রাত্রি রহস্য সম্বন্ধে আমাদের অধিকাংশেরই দৃষ্টি যারপরনাই ঝাপসা। রাতের কলকাতা তাঁদের চোখ সাফ করে দেবে। ছেলে-মেয়ের বাপরা বুঝবেন, আসল বিপদ কী এবং কোনখানে। তাঁদেরই অসাবধানতায় কুসংসর্গে পড়ে অপ্রাপ্তবয়স্করা নরকে আসা-যাওয়া করবার সুযোগ পায়।


তবু আমি সম্পূর্ণ ছবি দিইনি। ছবির সবটা আঁকতেও পারতুম, কিন্তু সে সম্পূর্ণতা এমন কল্পনাতীতরূপে ভয়ানক, যে আঁকতে প্রবৃত্তি হল না। অল্প যেটুকু দেখিয়েছি, তাই-ই হয়তো নীতিবাগীশের ধাতে সহ্য হবে না। কী করব, উপায় নেই, আরও রেখে-ঢেকে বলা অসম্ভব। এ শ্রেণির নকশা এর চেয়ে শিষ্ট ভাবে ও শ্লীল ভাষায় লেখা চলে না। তবু আমি হুতোমের চেয়ে সবদিকেই— কী ভাষায় আর কী বিষয়ে— ঢের বেশি সাবধান হয়েছি। আমাকে স্থানীয় আবহাওয়া ফোটাবার জন্য মাঝে মাঝে গ্রাম্য কথাও ব্যবহার করতে ও নরকের পর্দা তুলতে হয়েছে এবং স্থানে স্থানে অল্পস্বল্প আদিরসকেও৩ একেবারে পরিহার করতে পারিনি। কিন্তু এরকম গ্রাম্য কথা, নরকের দৃশ্য ও আদিরস একালকার উচ্চশ্রেণির কথা-সাহিত্যের মধ্যেও যথেষ্ট আছে— অধিকন্তু আধুনিক ঔপন্যাসিকরা আমার চেয়েও ঢের বেশি অগ্রসর হয়েছেন। আজকালকার উপন্যাস ও থিয়েটারি নাটকগুলির তুলনায় রাতের কলকাতা যে বাইবেলের মতো পবিত্র, এইটুকুই আমার সান্ত্বনা। পাঠক লক্ষ করলে আরও দেখবেন যে, পাপকে আমি পাপ বলেই বরাবর চিনিয়ে দিয়েছি, তার প্রতি সকলের ঘৃণা ও বিরক্তি আকর্ষণেরই চেষ্টা করেছি, আধুনিক অনেক উপন্যাসের মতো পাপের প্রতি পাঠকের সহানুভূতি উৎপাদনের প্রয়াস এ পুস্তকের কোথাও নেই। কাজেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, রাতের কলকাতা-কে একজন পাঠকও অশ্লীল বলে ভাবতে পারবেন না। এ পুস্তকের কোথাও অন্যায়রূপে অশ্লীলতার সমাবেশে পাঠকের মনকে উত্তেজিত করবার চেষ্টামাত্র নেই।


যেসব ব্যাপার এতে আছে, তার অধিকাংশই স্বচক্ষে দেখেই লেখা হয়েছে। শোনা কথায় নির্ভর করলে আরও অনেক ব্যাপার লেখা যেত, আমি তা করিনি। আমি গোয়েন্দার মতো পথে পথে ঘুরে এইসব বিবরণ সংগ্রহ করেছি এবং গণিকা পল্লির উপাদান সংগ্রহে অনেক প্রথম শ্রেণির ‘বিশেষজ্ঞ’-রও সাহায্য পেয়েছি। পাঠকদের মধ্যেও যদি কোনো বিশেষজ্ঞ থাকেন, আশা করি তিনি বিচার করে দেখবেন যে, আমার পরিচিত ‘বিশেষজ্ঞ’-দের দেওয়া উপাদানগুলি নির্ভরযোগ্য কিনা! এখনও অগুনতি উপাদান আমার হাতে রইল— যার মধ্যে কলকাতার আরও ঢের বিশেষত্ব আছে। পাঠক সমাজে আগ্রহের সাড়া পেলে সেগুলি নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে আবার দেখা দেব।৪ নইলে এইখানেই ইতি।


মেঘনাদ গুপ্ত৫


কলকাতা!


—ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর১.১, ভারতের সর্বপ্রধান নগর, প্রাচ্যের প্যারি, সর্বজাতির মিলনক্ষেত্র, বাঙালি গর্বের নিধি, নব-সভ্যতার জন্ম-পীঠ, প্রাসাদকীর্ণ কলকাতা!


দিবারাত্র তার পথে পথে জনতার স্রোত বইছে; মান্ধাতার পালকি১.২, গোরুর গাড়ি১.৩ আর মানুষ-গাড়ির১.৪ পাশে পাশে পরম আধুনিক বৈদ্যুতিক ট্রাম, বাস ও মোটরগাড়ি ছুটছে এবং তার দেহে ছায়া ফেলে আকাশে উড়ছে উড়োজাহাজ; চশমা-নাকে, লপেটা-পায়ে, টেরি-মাথায়, ছড়ি-হাতে কাপুড়ে-বাবু১.৫; কালো অঙ্গে ফিটফাট বিলাতি পোশাক ‘ইঙ্গ-বঙ্গ’ পুঙ্গব; নানান অদ্ভুত আকারের টুপি আর হরেক রকমের জামাকাপড় পরে পারসি, গুজরাটি, মারাঠি, শিখ, পাঠান, কাবুলি, নেপালি, ভুটানি, পাঞ্জাবি, মগ১.৬, জাপানি, চীনে ও মাড়োয়ারি প্রভৃতি নিখিল প্রাচ্যের মনুষ্য-নমুনা; ইংরেজ, স্কচ, আইরিশ, ফরাসি ও আমেরিকান প্রভৃতি পাশ্চাত্য জাতির উগ্র মূর্তি আবার সেই সঙ্গে অর্ধনগ্ন উড়িয়া আর পূর্ণনগ্ন নাগা সন্ন্যাসীর দল১.৭— মানবতার এমন অপূর্ব জগাখিচুড়ি পৃথিবীর আর কোথাও গেলে চক্ষে পড়বে না! একদিকে বড়ো বড়ো রং-বেরঙের আকাশছোঁয়া অট্টালিকাশ্রেণি, তারই ছায়ায় ছায়ায় হেলে-পড়া, ঘুঁটে দেওয়া মেটে দেয়াল১.৮ অগণ্য কুঁড়েঘর এ দৃশ্যও অন্যত্র দুর্লভ! রাজপথের একদিকে মূর্তিমান ঐশ্বর্যের মতো শকটারোহী, নির্বিকার, সুসজ্জিত, জগতের দুঃখ-দারিদ্র্যে অচৈতন্য লক্ষ্মীর বরপুত্ররা এবং অন্যদিকে প্রকাশ্য রাস্তার ধুলায় ছেঁড়া কাঁথা পেতে চিরদারিদ্র্যের উপাসক, কোটরগত-চক্ষু, অস্থিচর্মমাত্রসার দীন ভিখারির দল নাভিশ্বাস টানতে টানতে মৃত্যুর অপেক্ষায় পড়ে আছে— আবার তাদের স্তিমিত নেত্রের সামনে দিয়ে চলেছে সারে সারে ঢাক-ঢোল-ভোঁপু বাজিয়ে, ফুলের গন্ধ বিলিয়ে, কোঁচানো চাদর উড়িয়ে নিশ্চিন্তপ্রাণ বরযাত্রীর দল— নিয়তির এ হেন নির্দয় পরিহাসলীলা আর কোথায় গেলে দেখা যায়? জীবন ও মৃত্যু এখানে একত্রে বাস করে, এক ডালের মধু ও কাঁটার মতো!


কবিবর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তও কলকাতার সম্বন্ধেই বলেছেন—


এই কলিকাতা— কালিকা ক্ষেত্র, কাহিনী ইহার সবার শ্রুত,

বিষ্ণুচক্র ঘুরছে হেথায়, মহেশের পদধূলে এ পূত।

হিন্দুর কালী আছেন হেথায়, মুসলমানের মৌলা আলি,

চারি কোণে সাধু পীর চারিজন মুস্কিলাসান চেরাগ জ্বালি।

সকল ধর্ম মিলেছে হেথায় সমন্বয়ের মন্ত্র-সুরে,

স্বাগত সাধক-ভক্ত-বৃন্দ মরতের বৈকুণ্ঠপুরে।১.৯


বাস্তবিক, কলকাতাকে প্রথম দৃষ্টিতে দেখলেই মনে হয়, এ নগর সাধুর তীর্থক্ষেত্র, ধার্মিকের সাধন-নিকেতন, পবিত্রতার পুণ্য আশ্রম! হিন্দুর কালী, তারা, মহাদেব, শনি, জগদ্ধাত্রী, জগন্নাথ, শীতলার মন্দির১.১০, বৌদ্ধের বিহার, জৈনের পরেশনাথ দেবালয়১.১১, ক্রিশ্চানের গির্জা, মুসলমানের মসজিদ— এর চারিদিকে ধোঁয়ামাখানো আকাশের গায়ে নানা আদর্শের শিল্প বিচিত্র মাথার পর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতি পদেই একটি-না-একটি মন্দির ও তার সামনে দলে দলে ভক্তের ভিড় পথিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সকালে-সন্ধ্যায় পূজার্চনা, শঙ্খঘণ্টার রোল, ঝমাঝম দর্শনীর ধ্বনি! অধিকাংশ হিন্দু দেব-দেবীরই অবস্থা যে বেশ উন্নত, সেটা মন্দিরের মর্মরমণ্ডিত সুচিকন গৃহতল, দেব-দেবীর সমুজ্জ্বল স্বর্ণালংকার ও সেবাইতদের ভোগপুষ্ট নধর দেহগুলি দেখলেই বুঝতে বিলম্ব হয় না।


কিন্তু বাইরেকার এই ধর্মের বর্মের তলায় কত যে অন্যায়, কত যে জঘন্যতা ও যে পাশবিকতা আত্মগোপন করে আছে, তীক্ষ্নদৃষ্টি না থাকলে কেউ তা দেখতে পাবে না! একদিকে চিৎপুরের চিত্রেশ্বরী১.১২ ও আর একদিকে কালীঘাটের কালিকাদেবী১.১৩ কলকাতার ঘাঁটি আগলে থাকলে কী হবে তাঁদের দিব্যদৃষ্টিতে ধূলি নিক্ষেপ করে শয়তান তার শত পাপসঙ্গীকে নিয়ে, নিত্যই তো শহরের মধ্যে এসে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছে।


কবি সত্যেন্দ্রনাথ বলেছেন—


এই কলিকাতা ব্যাঘ্র-বাহিনী ছিল এ একদা বাঘের বাসা,

বাঘের মতন মানুষ যাহারা তাহাদেরি ছিল যাওয়া ও আসা!


সেকালে এখানে যেমন বাঘের মতন মানুষ ছিল, একালেও তেমনি মানুষরূপী বাঘের অভাব কলকাতায় নেই। এই সব মানুষ-বাঘের দল এখন বরং বেশি ভারী হয়েছে। তবে এরা বীরত্বে বা তেজে নয়— হিংসায় এবং পশুত্বেই বাঘের মতন। এই বাঘ-বাঘিনির দল সারা কলকাতায় ছড়িয়ে আছে, দিনেদুপুরে দলে দলে তারা আমাদের মধ্যে বিচরণ করছে। শিকারের খোঁজে সর্বদাই ওত পেতে প্রস্তুত হয়ে আছে অদৃশ্য মড়কের মতো! আমরা তাদের চিনি না, তারা কিন্তু আমাদের নাড়ি-নক্ষত্রের সব খবর রাখে নখদর্পণে! রাত্রে যখন কলকাতার বুকের উপরে প্রগাঢ় তিমিরের পর্দা নেমে আসে, এই বাঘ-বাঘিনিরা তখন অতর্কিতে, নানা কৌশলে আমাদের আক্রমণ করে। বনের বাঘ চায় মানুষের রক্ত-মাংস, কিন্তু এরা চায় আমাদের আত্মার সারাংশ! আর, একবার যার আত্মা তাদের খপ্পরে গিয়ে পড়ে, আর তার বাঁচোয়া নেই। পল্লিগ্রামের নিশ্চিন্ত-প্রাণ পিতামাতারা আপনাদের সুকুমার মতি সন্তানদের কলকাতায় পাঠিয়ে দেন— মানুষ হবার জন্যে। কিন্তু বাঘ-বাঘিনির পাল্লায় পড়ে প্রায়ই তাদের মনুষ্যত্ব নিঃশেষে নিহত হয় এবং দেশে ফিরে যায় তারা এক একটি আস্ত জানোয়ার বা ভূত হয়ে।


কলকাতার বাইরের চাকচিক্য, শোভা-সৌন্দর্য, আলোক-হাস্য, ধর্মের ভাণ, গির্জা-মন্দির-মসজিদের জটলা দেখে কেউ যেন না ভোলেন। চেরাগের তলাতেই কত জমাট অন্ধকার আছে, আজ আমরা সেই গোপন দৃশ্যেরই কতক কতক খুলে দেখাব। আমরা সকলে সারাজীবন এই কলকাতার কোলে বসে কাটিয়ে দিই, এই কলকাতার অঙ্কেই আমাদের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহের লীলা, কলকাতার বাসিন্দা বলে আমাদের মন গর্বে ও গৌরবে স্ফীত, কিন্তু কলকাতার যথার্থ স্বরূপ আমাদের মধ্যে কয়জনে দেখেছে? কলকাতার এই দুর্গম ও ভয়াবহ প্রাসাদ-অরণ্যে, নিস্তব্ধ গভীর রজনীতে কয়জন ভ্রমণ করবার সাহস রাখে? আমাদের আশেপাশে নিত্য কত ‘রোম্যান্স’, কত চিত্তোত্তেজক ঘটনা, কত বিয়োগান্ত নাটকের অভিনয় হচ্ছে, তা দেখবার আগ্রহ কয়জনের আছে? সকালে খবরের কাগজের রিপোর্ট— তার মূল্য কতটুকু? মারাত্মক বিপদ মাথায় নিয়ে, বারংবার গুন্ডার ছুরি এড়িয়ে, ‘অ্যাডভেঞ্চার’-এর ‘স্পিরিট’ সার্থক করবার জন্যে একাকী আমি, একগাছা ছোটো কিন্তু শক্ত লাঠিমাত্র সম্বল করে, সন্ধ্যা থেকে শেষরাত পর্যন্ত কলকাতার পথে পথে নিশাচরের মতো নিয়মিতরূপে ভ্রমণ করেছি—দুর্নীতির ছোঁয়াচ লাগবার ভয় না রেখে অনেক অস্থানে-কুস্থানে ঢুকতেও ইতস্তত করিনি। আমার এই দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতার সমস্ত এই ছোটো পুস্তকে ধরবে না। তবে কতক কতক আভাস ও ইঙ্গিত দিয়ে যাব, পাঠকদের ভালো লাগলে, ভবিষ্যতে কলকাতার আরও নানা রূপ সবিস্তারে বর্ণনা করবার চেষ্টা করব।


***


টীকা – কৌশিক মজুমদার


প্রস্তাবনা


১. হুতুম প্যাঁচার নকশায়— হুতুম প্যাঁচার নকশা নামটি ভুল। সঠিক নাম হুতোম প্যাঁচার নকশা। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৭৮৩ শকে (আনু. ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে)। নাম ছিল ‘হুতোম প্যাঁচার কলিকাতার নকশা’। ষোলো পৃষ্ঠার এই বইতে একটিই নকশা ছিল। নাম ‘চড়ক’। দাম ‘পয়শায় দুখানা’। তারপর আরও নকশা যোগ করে ১৮৬২ সালে প্রকাশ পায় ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা/ প্রথম ভাগ’, ১৮৬৩-তে দ্বিতীয় ভাগ এবং ১৮৬৪-তে দুই ভাগ একত্রে। ১৮৬৮-তে যে সংস্করণটি প্রকাশিত হয়, সেটিই ছিল লেখক কালীপ্রসন্ন সিংহের জীবিতকালে প্রকাশিত শেষ সংস্করণ। পরে ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে সজনীকান্ত- ব্রজেন্দ্রনাথ এই বইটির পুনঃপ্রকাশ করেন। তাঁদের সম্পাদনাতেই ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে এটি পুনরায

**********