
মজুমদারবাড়ির রহস্য
মনোজ সেন
এই নগেন মিত্তিরকে সন্ত্রস্ত দেখায় একমাত্র যখন তিনি মজুমদারবাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে যান। তখন তাঁর নতমস্তক, কাছে গেলে শোনা যায় চাপাগলায় তিনি রামনাম করে চলেছেন।
অবশ্য তাঁর আর দোষ কি? পানবাজারের কোনো লোককেই এই বাড়ির সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে যেতে দেখা যায়নি। কারণ, এই তল্লাটে সর্বত্র পানবাজারের মজুমদারবাড়ির একটি ভয়ংকররকমের হানাবাড়ি বলে সুনাম বা দুর্নাম আছে।
বাড়িটা যে খুব বিশালাকৃতি প্রসাদোপম তা নয়। বসবাসের একেবারেই অনুপযুক্ত তাও নয়। দোতলা বাড়ি, ভেতরে প্রকাণ্ড উঠোন ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উঠোনটা আগে আবর্জনা আর ঝোপঝাড়ে ঢাকা ছিল, কিছুদিন আগে পরিষ্কার করা হয়েছে। বাড়ির একপাশে মাঝামাঝি প্রায় দোতলা পর্যন্ত উঁচু খিলেন করা দেউড়ি। তিরিশ ইঞ্চি চওড়া দেওয়াল আর তিন থেকে চার ইঞ্চি মোটা সেগুনকাঠের দরজা বা জানলাগুলো স্বস্থানেই আছে। তাদের কোনো লয়ক্ষয় থাকার কথা নয়, যদিও তাদের পলেস্তারা বা রংচঙের আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
বাড়িটা বহুবার হাতবদল হয়েছে; কিন্তু কোনো ক্রেতাই দু-তিন সপ্তাহের বেশি এ বাড়িতে টিকতে পারেননি। কিছুদিন আগে এই বাড়িটা কিনে পুরঞ্জয় সরকার আর তার স্ত্রী পারমিতা এখানেই থাকবে বলে উঠে এসেছে। রবিবার সকালে পুরঞ্জয় বাজারের থলি হাতে বাড়ি থেকে বেরনো মাত্র, হবি তো হ, একেবারে মিত্তিরমশাইয়ের সামনে পড়ে গেল।
পুরঞ্জয় হাতজোড় করে কাষ্ঠ হেসে বলল– নমস্কার।
নগেনবাবু চমকে মুখ তুলে সামনে করজোেড় দণ্ডায়মান পুরঞ্জয়কে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। কাষ্ঠ লোষ্ট্র ইষ্টক কোনোরকম হাসির চেষ্টা না-করে টাকমাথাটা একটু নাড়লেন। হাতজোড় করা গেল না কারণ তখন তাঁর একহাতে ছাতা অন্যহাতে থলে। বললেন কী নাম?
থতমত খেয়ে পুরঞ্জয় বলল— আজ্ঞে, পুরঞ্জয় সরকার।
—পুরঞ্জয়? অদ্ভুত নাম!
—আজ্ঞে, পুরঞ্জয় মানে…
—আমাকে মানে বোঝানোর কোনো দরকার নেই। আমার নাম নগেন্দ্রনাথ মিত্র। তা, আপনিই তো ওই বাড়িটা কিনেছেন? আর, আপনার স্ত্রীকেও সঙ্গে করে এনেছেন?
ওপরে-নীচে ঘাড় নাড়ল পুরঞ্জয়।
নগেনবাবুর পরবর্তী প্রশ্নবাণ হল— কেন?
—এখানে থাকব বলে, অবশ্যই।
—থাকবেন বলে, না কি এইখান থেকে ধরাধাম থেকে ঝটপট দু-জনে চিরবিদায় নিতে চান বলে?
—এই বাড়িতে যাঁরা থেকেছেন তাঁরা সকলেই কি ঝটপট ধরাধাম থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন?
—সেটা তো আমি বলতে পারব না। তবে, তাঁরা যে ঝটপট এই বাড়ি থেকে, শুধু বাড়ি কেন, একেবারে এই গ্রাম থেকে বিদায় নিয়েছেন সেটা জানি। আপনারাও যে নেবেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মনে করবেন না যেন যে আমি আপনাকে ভয় দেখাচ্ছি। আমি কেবল আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি।
নগেনবাবুর শেষ কথাগুলো গায়ে মাখল না পুরঞ্জয়। বলল- যাঁরা চলে গেছেন তাঁরা কেন গেছেন বা কি তাঁদের অভিজ্ঞতা হয়েছিল সে সব কথা কি কাউকে বলে গেছেন?
নগেনবাবু মাথা নেড়ে বললেন— না। তাঁদের চলে যাওয়ার তাড়া এতই বেশি ছিল যে সে সময়টা আর নষ্ট করেননি তাঁরা। তবে হ্যাঁ, এখানে একজন আছেন যিনি এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও, এই গ্রামেই রয়ে গেছেন। তাঁর কাছে গেলে একেবারে ঘোড়ার মুখের খবর পাবেন –কে তিনি? কী নাম?
—তাঁর নাম বোধ হয় শিবপদ সান্যাল। থাকেন তাঁতিপাড়ায় একটা বাড়িতে। তিনি একসময়ে বর্ধমানে একটি বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনা করতেন বলে শুনেছি। তাঁর কাছেই এ বাড়ির কিছু খবরাখবর পেলেও পেতে পারেন। অত্যন্ত মিতভাষী লোক। কখনোই ঝেড়ে কাশেন না। সবসময় বিরক্ত হয়েই আছেন। কাজেই, কতটা খবর তাঁর পেটের থেকে বের করতে পারবেন, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।
—কিছু খবর আমাদের কাজের মেয়ে কাজলের কাছে পেয়েছি। তবে সেসবের কোনোটাই বিশ্বাসযোগ্য নয়। অপরিণত মস্তিষ্কের অবাস্তব কল্পনা। ভয় পেতে মানুষ ভালোবাসে। তার থেকেই এইসব ভয়ংকর কল্পনার সৃষ্টি। সে যাই হোক, আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। আপনি যে নিঃস্বার্থভাবে পরের উপকার করে থাকেন সেটা জানা রইল।
বলে পুরঞ্জয় মৃদু হেসে বাজারের দিকে রওনা হল। আর নগেনবাবু ভুরু কুঁচকে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে এই লোকটার কথায় রেগে যাবেন না খুশি হবেন সেই সমস্যার সমাধান করতে লাগলেন। রামানাম নেবার কথাটা আর মনেই এল না। শেষ পর্যন্ত এই ভেবে নিজেকে শান্ত করলেন যে, এই অপরিণত মস্তিষ্কের অবাস্তব কল্পনা যে কি বস্তু তা বাবাজি শিগগির টের পাবেন আর তখন কেঁদে কোনো কুল পাবেন না।
সেইদিনই বিকেলবেলা পুরঞ্জয় আর পারমিতা সাইকেলরিকশা করে অধ্যাপক শিবপদ সান্যালের বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হল। একতলা ছোটো বাড়ি, সামনে এক ফালি খালি জমি। সেখানে একটা বাগান করবার প্রচেষ্টা চলছে, দেখা গেল। একজন খাকি হাফপ্যান্ট পরিহিত মালী আর একজন পাজামা আর হাতকাটা গেঞ্জি পরা প্রৌঢ় ভদ্রলোক সেখানে সেই কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।
জানা গেল, সেই প্রৌঢ় ভদ্রলোকই গৃহকর্তা অধ্যাপক শিবপদ সান্যাল। অত্যন্ত অমায়িক মানুষ। পরিচয় পর্ব শেষ হলে সাদরে অতিথিদের ভেতরে নিয়ে গেলেন।
বসবার ঘরটি নিতান্তই সাদামাটা। আসবাব বলতে একটি রঙিন চাদরে ঢাকা তক্তপোশ, একটি নীচু টেবিল আর তার চারদিকে চারটে হাতলওলা কাঠের চেয়ার। আরও আছে চারটে বইয়ে ঠাসা আলমারি।
শিবপদবাবু অতিথিদের বসতে বলে একটা পাঞ্জাবি পরে আসতে ভেতরে চলে গেলেন। পুরঞ্জয় বসল না। ঘুরে ঘুরে বইয়ের আলমারিগুলো দেখতে দেখতে স্বগতোক্তি করল— যাক, ভদ্রলোক বই-কুণ্ঠ নন। কথা বলা যাবে। সজ্জন ব্যক্তি। ইতিহাসের অধ্যাপক।
শিবপদবাবু ঘরে ঢুকে সহাস্যে বললেন— ঠিক ধরেছেন। বহু বছর বর্ধমানের কারমাইকেল কলেজে ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাস পড়িয়েছি বটে। এখন অবশ্য পড়াচ্ছি না পড়ছি। বসুন, চা আসছে।
শিবপদবাবু হাসতে হাসতে বললেন— এখানে আসতে না আসতেই একেবারে মিত্রমহাশয়ের খপ্পরে পড়ে গেলেন? উনি কিন্তু আমাকে একেবারেই পছন্দ করেন না। সে যাই হোক, কথাবার্তা শুরু করবার আগে আপনার বিষয়ে কিছু বলুন।
পুরঞ্জয় বলল— আমার নাম পুরঞ্জয় সরকার আর ইনি আমার স্ত্রী পারমিতা। আমার বাবা ডাক্তার, আমাদের আদি বাড়ি পূর্ব বাংলায়। ১৯৪৭ সালে আমার বাবা গুসকরায় এসে ডাক্তারি শুরু করেন আর কিছুদিনের মধ্যেই বেশ ভালো পশার করে ফেলেন। পারমিতা ছিল আমাদের প্রতিবেশী। ওর বাবার ওখানে বেশ বড়ো ধান-চালের ব্যাবসা। পাশাপাশি বাড়ি। ছোটোবেলা থেকে একসঙ্গে। যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে কলকাতায় গেলুম, তখনও যোগাযোগ ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং যখন পাশ করলুম তখন পারমিতা কেমিস্ট্রি নিয়ে বি এস সি পড়ছে বর্ধমানে। আমি কোনোদিন চাকরি করিনি। শক্তিগড়ের কাছে রহিমগঞ্জে একটা পরিত্যক্ত ছোটো কারখানা ছিল, মেশিন শপ । খুব সস্তায় সেটা কিনে ফেললুম। বাবা টাকা দিল। সেখানে কাজ শুরু করলুম । বছর দুয়েকের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেল। তখন পারমিতা এম এস সি পাশ করে গেছে। সে এসে আমার সঙ্গে যোগ দিল। এই সময়ে খুব খেটেছি, জানেন।
পারমিতা বলল— আজও খাটে। সবসময় কারখানার ভেতরে চরকির মতো ঘুরছে। কোথাও কোনো সমস্যা হলেই নিজেই জামার হাত গুটিয়ে মিস্ত্রিদের সঙ্গে কাজে লেগে যায়।
শিবপদবাবু জিজ্ঞাসা করলেন— তুমি কী করো?
—আমি কোয়ালিটি কন্ট্রোল, লার আর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দেখি।
—কী তৈরি হয় তোমার কারখানায়?
পুরঞ্জয় বলল— টেক্সটাইল বা জুট মিলের স্পেয়ার পার্টস। আজকাল তো আমার ক্লায়েন্টরা তাদের নিজেদের ডিজাইনে স্পেশাল পারপাস মেশিনও তৈরি করাচ্ছে।
—কোথাকার ক্লায়েন্ট এরা?
—পশ্চিমবাংলার কিছু আছে। তবে বেশিরভাগই বম্বে, নাগপুর বা মাদ্রাজের।
—বাঃ, খুব ভালো। কিন্তু তোমরা নিজেদের বাড়িতে না থেকে এই অজপাড়াগাঁয়ে বাড়ি কিনতে গেলে কেন?
—নিজেদের বাড়িতে থাকা অত্যন্ত অস্বস্তিকর হয়ে পড়ল। নীচু জাতের বাঙাল ছেলে বিয়ে করবার জন্যে পারমিতার বাবা প্রচণ্ড রেগে যান এবং মেয়ের আর কোনোদিন মুখ দর্শন করবেন না বলে ঘোষণা করেন। এই অবস্থায় একেবারে পাশের বাড়িতে থাকাটা সুখকর হচ্ছিল না, তাই—
—ঠিক আছে। বুঝেছি। কিন্তু তাই বলে এই মান্ধাতার আমলের ভূতুড়ে বাড়ি?
—মান্ধাতার আমলের ভূতুড়ে বাড়ি বলেই তো কিনলুম। এত কমদামে গুসকরার কাছে এত বড়ো বাড়ি আর কোথাও পাওয়া যেত? এখান থেকে বাসে গুসকরা মাত্র পাঁচটা স্টপ। এখান থেকে আমাদের ফ্যাক্টরিতে যেতে লাগে মাত্র মিনিট কুড়ি। তা ছাড়া আমি দেখেছি, এ বাড়ির মালমশলায় কোনো ভেজাল নেই। এর জান এখনও আরও একশো বছর। আর ভূত? তার সঙ্গে আমরা দু-জনেই মোকাবিলা করতে তৈরি আছি। আমরা দু-জনেই বিজ্ঞানের ছাত্র। ভূত যদি থাকেও, সেই বায়বীয় অপদার্থ আমাদের কোনো শারীরিক ক্ষতি করতে পারবে— সেই ভয় আমাদের নেই। আমাদের ভয় দেখিয়ে বাড়ি ছাড়া করবে, ভূতের সেই আশার গুড়ে বালি!
—ভূতের সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করেও থাকবে? তোমাদের spirit আছে। তার মানে, ও বাড়ির spirit-দের কপালে দুঃখ আছে।
পুরঞ্জয় হাসতে হাসতে বলল। এবার আপনার কথা বলুন।
শিবপদবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন— আমার কথা তেমন কিছু গেয়ে বেড়াবার মতো নয়। আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন। সেই সূত্রে সারা অবিভক্ত বাংলা ঘুরেছেন। অবসর নিয়ে বর্ধমানে বাড়ি কিনে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। সেইজন্যে আমি বাংলার প্রায় সমস্ত জেলা স্কুলে পড়েছি। আমার কর্মজীবন সেই বর্ধমানের কারমাইকেল কলেজে। অবসর নেবার একবছর আগে আমার স্ত্রীবিয়োগ হয়। আমার দুই ছেলে। দু-জনেই বিদেশে থাকে। কাজেই আমাকে একাই থাকতে হয়। মন লাগল না বলে বর্ধমানের বাড়িটা আমার বোন আর ভগ্নীপতিকে দান করে দিয়েছি। সেটা ঠিক কাজ হয়নি। তীর্থে তীর্থে অনেক ঘুরেছি। তাতে শুধু টাকাই খরচ হয়েছে, লাভ কিছুই হয়নি। শেষপর্যন্ত আবার বর্ধমান। বোন আর ভগ্নীপতি আমাকে চিনতেই পারল না। তখন থাকবার জন্যে সস্তায় আপনাদের বাড়িটা কিনেছিলুম।
—ছাড়লেন কেন? ভূতের উৎপাতে?
—না, মানুষের উৎপাতে। রাস্তায় ঘাটে, বাজারে, বাসস্টপে যার সঙ্গেই দেখা হয়, সেই বলে ‘বাড়ি ছাড়ুন’। নগেন মিত্তির তো বাড়ি ছাড়ছি না বলে রীতিমতো রেগেই গেলেন। শেষমেষ আমার ছাত্র সুবল দে আমাকে জোর করে প্রায় টানতে টানতে ওর এই বাড়িটাতে এনে ফেলল। দাম যা নিল তা প্রায় কিছুই নয়। আমি আপত্তি করাতে বলল—ধরে নিন এটা আমার গুরুদক্ষিণা।
—আপনি তো কিষনলাল জয়সওয়ালের কাছ থেকে কিনেছিলেন?
—হ্যাঁ। সে ওখানে একটা গেঞ্জির কল খুলবে বলেছিল। কিন্তু খুলতে পারল না। ওয়াকাররা সবাই পালিয়ে গেল। তখন কিষনলাল যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে বাড়ি বেচে চলে গেল।
—কিষনলাল আপনাকে বলেছিল যে বাড়িটা হানাবাড়ি?
—বলেছিল। তবু কিনলুম কারণ ওই টাকায় বর্ধমানে একটা দোচালা শেডও পাওয়া যাবে না। আরও একজন কিনতে চেয়েছিল। তাই, আমাকে একটু দামটা বাড়াতে হয়েছিল। তবে সেটা তেমন কিছু নয়। আমার পরে আসেন অ্যাডভোকেট রমেন ঘোষ। রমেনবাবু বোধ হয় সপ্তাহ দুয়েক ছিলেন। তার পরে আপনারা। বুঝতেই পারছেন, শুধু যাওয়া, শুধু আসা।
—হ্যাঁ, দিব্যি বুঝতে পারছি। এবারে বলুন, ওখানে আপনার অভিজ্ঞতা কী?
—অভিজ্ঞতা বলতে অতিপ্রাকৃত কিছু যদি বলেন, তবে বলব তেমন কিছু নয়। একমাত্র মাঝে মাঝে, না, মাঝে মাঝে নয়, প্রায়ই মাঝরাতের দিকে ঘুম ভেঙে যেত আর তখন খুব নিশ্বাসের কষ্ট হত। আমার ধারণা তার কারণ, ভূতের উপ