
আমি হিন্দু কেন?
সংগৃহীত বইসমূহ
কথায় কথায় একদিন এক ভদ্রলোক হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি খ্রিস্টান?
আমি বললাম “না”।
দেশের নাম শুনে তিনি আবার জানতে চাইলেন, তাহলে তুমি কি মুসলিম?
না, আমি হিন্দু।
‘হিন্দু’ কথাটি শোনার পর তাঁকে কিছুটা বিভ্রান্ত মনে হলো। একটু ভেবে প্রশ্ন করলেন, তোমাদের ধর্মে কি আমাদের যিশুর মতো কেন্দ্রীয় কোনো ব্যক্তিত্ব আছেন?
না, ঠিক সেভাবে নেই।
তাহলে তোমাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের নাম কী?
বললাম, খ্রিস্টধর্মে বাইবেলের মতো এমন কোনো একক ধর্মগ্রন্থ নেই, যা সব হিন্দু একইভাবে অনুসরণ করেন। তবে আমাদের বহু প্রাচীন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আছে—বেদ, উপনিষদ, ভগবদ্গীতা এবং আরও অনেক কিছু।
তাঁর প্রশ্নগুলো শুনে বুঝতে পারলাম, ধর্ম সম্পর্কে তাঁর ধারণাটি একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে গড়ে উঠেছে। প্রত্যেক ধর্মের একজন কেন্দ্রীয় প্রবর্তক, একটি প্রধান ধর্মগ্রন্থ এবং সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাস থাকতে হবে।
তাই বিষয়টি একটু সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, একজন হিন্দু এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে পারেন। কেউ ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপে উপাসনা করতে পারেন। আবার কেউ ব্যক্তিগত ঈশ্বরের ধারণায় বিশ্বাস না করেও হিন্দু দর্শন, সংস্কৃতি ও জীবনপদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। এমনকি হিন্দু দর্শনের মধ্যে নাস্তিকতাবাদী ধারাও আছে।
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, এত মত, এত পথ! তাহলে এমন আপাতদৃষ্টিতে অগোছালো একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে কীভাবে? আমি তো বুঝতেই পারছি না—তুমি কি সত্যিই কোনো ধর্ম অনুসরণ করো?
হেসে উত্তর দিলাম, আমি প্রতিদিন মন্দিরে যাই না।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় আচারও পালন করি না। তবে সুযোগ হলে মন্দিরে যাই, প্রার্থনা করি এবং নিজের জীবনকে নৈতিক ও অর্থপূর্ণ করার চেষ্টা করি। আমার কাছে ধর্ম শুধু নিয়মিত কোনো আচার পালনের নাম নয়; ধর্ম হলো আমি কীভাবে চিন্তা করছি, অন্যের সঙ্গে কেমন আচরণ করছি এবং নিজেকে কতটা উন্নত করতে পারছি।
তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, তুমি কি সৃষ্টিকর্তাকে ভয় পাও না?
না। আমার কাছে ঈশ্বর এমন কোনো শাসক নন, যিনি আকাশে বসে শুধু আদেশ দিচ্ছেন এবং আদেশ না মানলে ভয়ংকর শাস্তি দেবেন। একজন হিন্দু ভয় থেকে নয়, উপলব্ধি, ভালোবাসা ও আত্মবিকাশের মাধ্যমে পরম সত্যের কাছে যেতে চায়।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি জানতে চাইলেন, তুমি কি কখনো অন্য ধর্ম গ্রহণ করার কথা ভেবেছ?
বললাম, আমি ভয় বা জোরের কারণে হিন্দু নই। আমি নিজের স্বাধীন চিন্তা ও পছন্দের কারণে হিন্দু।
“I am a Hindu—not by force or fear, but by choice and freedom.”
তারপর বোঝালাম, ঈশ্বরকে আমি শুধু সাদা-কালো কোনো ধারণার মধ্যে দেখি না। আমাদের অনেকেই পরম সত্যকে ‘পরব্রহ্ম’ বলেন। আপনি একে পরম চেতনা, বিশ্বচেতনা, মহাজাগতিক শক্তি কিংবা সর্বব্যাপী সত্য—যে নামেই ডাকুন না কেন, এর প্রকাশ সাকারও হতে পারে, আবার নিরাকারও হতে পারে।
তিনি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন, তোমরা কি প্রার্থনা করো?
অবশ্যই করি। আমাদের একটি প্রার্থনা হলো, “লোকাঃ সমস্তাঃ সুখিনো ভবন্তু।”
হেসে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এর অর্থ কী?
এর অর্থ, “জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।”
তারপর বললাম, আমরা “বসুধৈব কুটুম্বকম্”—এই আদর্শেও বিশ্বাস করি।
সেটির অর্থ কী?
আমি বললাম- সমগ্র পৃথিবী একটি পরিবার।
কথাটি শুনে তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ব্যাপারটি তো বেশ আকর্ষণীয়! শুনে মনে হচ্ছে এটি অনেক বেশি উদার, স্বাধীন এবং বহুত্ববাদী একটি চিন্তা।
বললাম, সনাতন ধর্ম এত বিস্তৃত যে একে শুধু একটি সংকীর্ণ সংজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। এর শিকড় প্রাচীন বৈদিক ঐতিহ্যের মধ্যে। এখানে প্রত্যেক মানুষ নিজের স্বভাব, মানসিকতা, উপলব্ধি এবং আধ্যাত্মিক বিকাশ অনুযায়ী পরম সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কারও পথ ভক্তি, কারও জ্ঞান, কারও ধ্যান, আবার কারও পথ নিঃস্বার্থ কর্ম।
একটু থেমে যোগ করলাম, এখানে সবাইকে একই পথে চলতে হয় না। কারণ পথ আলাদা হলেও মানুষের অনুসন্ধানটি মূলত একই—আমি কে, এই জগতের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী এবং কীভাবে আরও সত্যনিষ্ঠ, সচেতন ও কল্যাণময় জীবন যাপন করা যায়।
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, এখন বুঝতে পারছি। বাইরে থেকে যেটিকে অগোছালো মনে হয়, সেটিই হয়তো ভেতর থেকে স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্য।
হেসে বললাম, ঠিক তাই। এটি বিশৃঙ্খলা নয়; এটি একই সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বহু পথের স্বীকৃতি।
লিখেছেন Tanay Sarkar
ফেসবুক থেকে সংগৃহীত বইসমূহ