তিলোত্তমাসম্ভব

তিলোত্তমাসম্ভব

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

তিলোত্তমাসম্ভব

Books Pointer Iconমাইকেল মধুসূদন দত্ত
Books Pointer Iconpoetry

Change color

তিলোত্তমাসম্ভব কাব‍্য

প্রথম সর্গ

ধবল নামেতে গিরি হিমাদ্রির শিরে—

অভ্রভেদী, দেব-আত্মা, ভীষণদর্শন;

সতত ধবলাকৃতি, অচল, অটল;

যেন উর্দ্ধ্ববাহু সদা, শুভ্রবেশধারী,

নিমগ্ন তপঃসাগরে ব্যোমকেশ শূলী—

যোগিকুলধ্যেয় যোগী! নিকুঞ্জ, কানন,

তরুরাজি, লতাবলী, মুকুল, কুসুম—

অন্যান্য অচলভালে শোভে যে সকল,

(যেন মরকতময় কনককিরীট)

না পরে এ গিরি, সবে করি অবহেলা,

বিমুখ পৃথিবীপতি পৃথ্বীসুখে যেন

জিতেন্দ্রিয়! সুনাদিনী বিহঙ্গিনীদল,

সুনাদী বিহঙ্গ, অলি মত্ত মধুলোভে,

কভু নাহি ভ্রমে তথা! মৃগেন্দ্র কেশরী,—

করীশ্বর,—গিরীশ্বরশরীর যাহার,—

শার্দ্দুল, ভল্লুক, বনচর জীব যত—

বনকমলিনী কুরঙ্গিণী সুলোচনা,—

ফণিনী মণিকুন্তলা, বিষাকর ফণী,—

না যায় নিকটে তার—বিকট শেখর

অদূরে ঘোর তিমির গভীর গহ্‍বরে,

কলকল করে জল মহাকোলাহলে,

ভোগবতী স্রোতস্বতী পাতালে যেমতি

কল্লোলিনী; ঘন স্বনে বহেন পবন,

মহাকোপে লয়রূপে তমোগুণান্বিত,

নিশ্বাস ছাড়েন যেন সর্ব্বনাশকারী!

দানব, মানব, যক্ষ, রক্ষ, দানবারি—

দানবী, মানবী, দেবী, কিবা নিশাচরী

সকলেরি অগম—দুর্গম দুর্গ যেন!

দিবানিশি মেঘরাশি উড়ে চারি দিকে,

ভূতনাথসঙ্গে রঙ্গে নাচে ভূত যেন।

এ হেন নির্জ্জন স্থানে দেব পুরন্দর

কেন গো বসিয়া আজি, কহ পদ্মাসনা

বীণাপাণি? কবি, দেবি, তব পদাম্বুজে

প্রণমি, জিজ্ঞাসে তোমা, কহ, দয়াময়ি!

তব কৃপা-মন্দর দানব-দেব-বল,

শেষের অশেষ দেহ—দেহ এ দাসেরে;

এ বাক্‌সাগর আমি মথি সযতনে,

লভি, মা, কবিতামৃত—নিরুপম সুধা!

অকিঞ্চনে কর দয়া, বিশ্ববিনোদিনি!

যে শশীর স্থান, মাতঃ, স্থাণুর ললাটে,

তাঁহারি আভায় শোভে ফুলকুলদলে

নিশার শিশিরবিন্দু, মুক্তাফলরূপে!—

কহ, সতি;—কি না তুমি জান, জ্ঞানময়ি?—

কোথা সে ত্রিদিব, যার ভোগ লভিবারে

কঠোর তপস্যা নর করে যুগে যুগে,

কত শত নরপতি রত অশ্বমেধে—

সাগর বিপুলবংশ যে লোভেতে হত?

কোথা সে অমরাপুরী কনকনগরী?

কোথা বৈজয়ন্ত-ধাম, সুবর্ণ আলয়,

প্রভায় মলিন যার ইন্দু, প্রভাকর?

কোথা সে কনকাসন, রাজছত্র কোথা,

রবির পরিধি যেন মেরু-শৃঙ্গোপরি—

উভয় উজ্জ্বলতর উভয়ের তেজে?

কোথা সে নন্দনবন, সুখের সদন।

কোথা পারিজাত-ফুল, ফুলকুলপতি?

কোথা সে উর্ব্বশী, রূপে ঋষি-মনোহরা,

চিত্রলেখা—জগৎজনের চিত্তে লেখা,

মিশ্রকেশী—যার কেশ, কামের নিগড়,

কি অমরে, কিবা নরে, না বাঁধে কাহারে?

কোথায় কিন্নর? কোথা বিদ্যাধরদল?

গন্ধর্ব্ব—মদনগর্ব্ব খর্ব্ব যার রূপে?

চিত্ররথ—কামিনীকুলের মনোরথ—

মহারথী? কোথা বজ্র, ভীমপ্রহরণ!

যার দ্রুত ইরম্মদে, গভীর গর্জ্জনে,

দেব-কলেবর কাপে করি থর থর;

ভূধর অধীর সদা, চমকে ভুবন

আতঙ্কে? কোথা সে ধনুঃ, ধনুঃকুলরাজা

আভাময়, যার চারু-রত্ন-কান্তিছটা

শোভে গো গগনশিরে (মেঘময় যবে)

শিখিপুচ্ছচূড়া যেন হৃষীকেশকেশে!

কোথায় পুষ্কর, আবর্ত্তক—ঘনেশ্বর?

কোথায় মাতলি বলী? কোথা সে বিমান,

মনোরথ পরাজিত যে রথের বেগে—

গতি, ভাতি—উভয়েতে তড়িৎ লাঞ্ছিত?

কোথায় গজেন্দ্র ঐরাবত? উচ্চৈঃশ্রবাঃ

হয়েশ্বর, আশুগতি যথা আশুগতি?

কোথায় পৌলোমী সতী, অনন্ত-যৌবনা,

দেবেন্দ্র-হৃদয়-সরোবর-কমলিনী,

দেব-কুল-লোচন-আনন্দময়ী দেবী,

আয়তলোচনা? কোথা স্বর্ণ কল্পতরু,

কামদ বিধাতা যথা, যার পূত পদ

আনন্দে নন্দনবনে দেবী মন্দাকিনী

ধোন্ সদা প্রবাহিণী কলকল কলে?—

হায় রে, কোথায় আজি সে দেববিভব!

হায় রে, কোথায় আজি সে দেবমহিমা!

দুর্দান্ত দানবদল, দৈববলে বলী,

পরাভবি সুরদলে ঘোরতর রণে,

পুরিয়াছে স্বর্গপুরী মহাকোলাহলে,

বসিয়াছে দেবাসনে পামর দেবারি।

যথা প্রলয়ের কালে, রুদ্রের নিশ্বাস

বাতময়, উথলিলে জল সমাকুল,

প্রবল তরঙ্গদল, তীর অতিক্রমি,

বসুধার কুস্তুল হইতে লয় কাড়ি

সুবর্ণকুসুম-লতা-মণ্ডিত মুকুট;—

যে সুচারু শ্যামঅঙ্গ ঋতুকুলপতি

গাঁথি নানা ফুলমালা সাজান আপনি

আদরে, হরে প্লাবন তার আভরণ।

সহস্রেক বৎসর যুঝিয়া দানবারি,

প্রচণ্ড দিতিজ ভুজ প্রতাপে তাপিত,

ভঙ্গ দিয়া বিমুখ হইলা সবে রণে—

আকুল! পাবক যথা, বায়ু যাঁর সখা,

সর্ব্বভুক্, প্রবেশিলে নিবিড় কাননে,

মহাত্রাসে উর্দ্ধশ্বাসে পালায় কেশরী;

মদকল নগদল, চঞ্চল সভয়ে,

করভ করিণী ছাড়ি পালায় অমনি

আশুগতি; মৃগাদন শার্দ্দুল, বরাহ,

মহিষ, ভীষণ খড়্গী—অক্ষয়শরীরী,

ভল্লুক বিকটাকার, দূরন্ত হিংসক

পালায় ভৈরবরবে, ত্যজি বনরাজি;—

পালায় কুরঙ্গ রঙ্গরসে ভঙ্গ দিয়া,

ভুজঙ্গ, বিহঙ্গ, বেগে ধায় চারি দিকে;—

মহাকোলাহলে চলে জীবন-তরঙ্গ,

জীবনতরঙ্গ যথা পবনতাড়নে!

অব্যর্থ কুলিশে ব্যর্থ দেখি সে সমরে,

পালাইলা পরিহরি সংগ্রাম কুলিশী

পুরন্দর; পালাইলা পাশী দেখি পাশে

ম্রিয়মাণ, মন্ত্রবলে মহোরগ যেন!

পালাইলা যক্ষনাথ ভীম গদা ফেলি,

করী যেন করহীন! পালাইলা বেগে

বাতাকারে মৃগপৃষ্ঠে বায়ুকুলপতি;

জরজর-কলেবর, দুষ্টাসুর-স্পরে

পালাইলা শিখি-পৃষ্ঠে শিখিবরাসন

মহারথী; পালাইলা মহিষ বাহনে

সর্ব্বঅন্তকারী যম, দন্ত কড়মড়ি,

সাপটি প্রচণ্ড দণ্ড—ব্যর্থ এবে রণে।

পালাইলা দেবগণ রণভূমি ত্যজি;

জয় জয় নামে দৈত্য ভুবন পুরিল।

দৈববলে বলী পাপী, মহা অহঙ্কারে

প্রবেশিল স্বর্গপুরী—কনক নগরী,—

দেবরাজাসনে, মরি, দেবারি বসিল!

হায় রে, যে রতির মৃণাল-ভুজপাশ,

(প্রেমের কুসুম-ডোর,) বাঁধিত সতত

মধুসখে, স্মরহর-কোপানল যেন

বিরহ-অনল রূপ ধরি, মহাতাপে

দহিতে লাগিল এবে সে রতির হিয়া।

সুন্দ উপসুন্দাসুর, সুরে পরাভবি,

লণ্ড ভণ্ড করিল অখিল ভূমণ্ডল;

ঔর্ব্বঋষি ক্রোধানল পশি যেন জলে,

জ্বালাইলা জলেশ্বরে, নাশি জলচরে।

তোমার এ বিধি, বিধি, কে পায়ে বুঝিতে,

কিবা নরে, কি অমরে? বোধাগম্য তুমি

ত্যজি দেববলদলে দেবদলপতি

হিমাচলে মহাবল চলিলা একাকী;—

যথা পক্ষরাজ বাজ, নির্দ্দয় কিরাত

লুটিলে কুলায় তার পর্ব্বত-কন্দরে,

শোকে অভিমানে মনে প্রমাদ গণিয়া,

আকুল বিহঙ্গ, তুঙ্গ-গিরি-শৃঙ্গোপরি,

কিম্বা উচ্চশাখ বৃক্ষশাখে বসে উড়ি;—

ধবল অচলে এবে চলিলা বাসব।

বিপদের কালজাল আসি বেড়ে যবে,

মহতজনভরসা মহত যে জন।

এই সুরপতি যবে ভীষণ অশনি-

প্রহারে চূর্ণিয়াছিলা শৈল-কুল-পাখা

হৈম, শৈলরাজস্থত মৈনাক পশিলা

অতলজলধিতলে—মান বাঁচাইতে!

যথা ঘোরতর বাত্যা, অস্থিরি নির্ঘোষে

গভীর পয়োধি নীর, ধরি মহাবলে

জলচর-কুলপতি মীনেন্দ্র তিমিরে,

ফেলাইলে তুলে কূলে, মৎস্যনাথ তথা

অসহায় মহামতি হয়েন অচল;

অভিমানে শিলাসনে বসিলা আসিয়া

জিষ্ণু-অজিষ্ণু গো আজি দানব-সংগ্রামে

দানবীরি! মহারথী বসিলা একাকী;

নিকটে বিকট বজ্র, ব্যর্থ এবে রণে,

কমল চরণে পড়ি যায় গড়াগড়ি,

প্রচণ্ড আঘাতে ক্ষতশরীর কেশরী

শিখরী সমীপে যথা—ব্যথিত হৃদয়ে!

কনক-নির্ম্মিত ধনু—রতন-মণ্ডিত,

(কাদম্বিনী ধনী যারে পাইলে অমনি

যতনে সীমন্তদেশে পরয়ে হরষে)

অনাদরে শোভে, হায়, পর্ব্বতশিখরে,

ধবল-ললাট-দেশ উজলি সুতেজে,

শশিকলা উমাপতি-ললাট যেমতি।

শুন্য তূণ—বারিশূন্য সাগর যেমনি,

যবে ঋষি অগস্ত্য শুষিলা জলদলে

ঘোর রোষে! শঙ্খ, যার নিনাদে আকুল

দৈত্যকুল—করী-অরি-নিনাদে যেমতি

করিবৃন্দ—নিরানন্দে নীরব সে এবে!

হায় রে, অনাথ আজি ত্রিদিবের নাথ!

হায় রে, গরিমাহীন গরিমা-নিধান!

যে মিহির, তিমিরারি, কর-রত্ন-দানে

ভূষেন রজনী-সখা, স্বর্ণতারাবলী,

গ্রহরাশি,—রাহু আসি গ্রাসিয়াছে তাঁরে!

এবে দিনমণি দেব, মৃদু-মন্দ-গতি,

অস্তাচলে চালাইলা স্বর্ণ-চক্ররথ,

বিশ্রাম বিল

**********