সেফটিপিন

সেফটিপিন

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

সেফটিপিন

Books Pointer Iconস্মরণজিৎ চক্রবর্তী
Books Pointer Iconnovel

Posted byকাব্য রচিত28-Jul-2026

Change color

আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল ওয়াল্টার। কেমন। ধূসর হয়ে আছে চারিদিক। দূরে ধোঁয়ার গোল্লা উড়ছে! কামান আর মিনি রাইফেলের আওয়াজে থরথর করে কাঁপছে উপত্যকা। আকাশের অনেক উপরে গোল করে চক্কর মারছে শকুন। দেখলেই মনখারাপ হয়ে যায় ওয়াল্টারের। প্রায় এক বছর হল ক্রাইমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতদিনে প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছে। তবে তারা যতটা না যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গিয়েছে, তার চেয়ে বেশি মারা গিয়েছে যুদ্ধ-পরবর্তী আঘাত থেকে, রোগ থেকে, অনাহার থেকে। নেপোলিয়নের যুদ্ধের পরে এমন অবস্থায় আর পড়েনি ইউরোপ।


একদিকে রাশিয়া এবং অন্যদিকে তুর্কির অটোমান সাম্রাজ্য, ব্রিটেন, ফ্রান্স আর সার্ডিনিয়ার মিলিত জোটের এই যুদ্ধক্ষেত্র যেন দান্তের এক জীবন্ত ইনফার্নো!


আবার গোলার আওয়াজ হল। ওয়াল্টারের সম্বিত ফিরল। আলমা-র যুদ্ধ ঘন হয়ে উঠেছে খুব। সেভাস্তোপোলে রাশিয়ানদের নৌঘাঁটি ও বন্দর আক্রমণের জন্য মরিয়া ব্রিটিশ আর ফরাসি সৈন্যরা যুদ্ধ শুরু করেছে এই আলমা নদীর ধারে, দুটো ছোট পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায়। রাশিয়াকে জব্দ করতে হলে এই যুদ্ধে জিততেই হবে জোটশক্তিকে।


কিন্তু ওয়াল্টার এসব বোঝে না। ওর শুধু এসবের থেকে দূরে নিজের গ্রাম সমারসেটের কথা মনে পড়ে সারাক্ষণ। মনে পড়ে ভার্জিনিয়ার কথা। গোলাপি রিবন বাঁধা সোনালি চুলের ভার্জিনিয়া! এখানে আসার আগে শেষবার দেখে এসেছিল ওকে। ভার্জিনিয়া ওয়াল্টারকে নিজের হাতে তৈরি কেক খাইয়েছিল। সেদিন এত সুন্দর লাগছিল ভার্জিনিয়াকে যে, বলে বোঝানো যাবে না। ওয়াল্টারের মনে হচ্ছিল, ওর বুকের ভিতরে ঘোড়ার খুরের শব্দ তুলে যে-হৃৎপিণ্ডটা ছুটে চলেছে, সেটার আওয়াজ বুঝি শুনে ফেলবে ভার্জিনিয়া! ভার্জিনিয়ার। দিকে তাকাতে ওর কী যে লজ্জা করছিল। কিন্তু না তাকিয়েও পারছিল না।


।মনে হচ্ছিল পাথরের কোনও পরি যেন প্রাণ পেয়েছে। ভার্জিনিয়ার বাবা বেশ ধনী। ম্যাঞ্চেস্টারে খুব বড় কাপড়ের ব্যবসা রয়েছে ওদের। ইংল্যান্ড তো বটেই, স্কটল্যান্ডেও ওদের বাড়ি আছে কয়েকটা। কিন্তু তবু ভদ্রলোক নিজের সন্তানদের সমারসেটের এই ম্যানসনে রাখেন। চার বোন আর দুই ভাইয়ের মধ্যে ভার্জিনিয়া সবার ছোট। তাই খুব আদরের। কিন্তু এত বড় লোকের মেয়ে হয়েও একটুও অহংকার নেই ভার্জিনিয়ার। অর্গান বাজিয়ে যখন ভার্জিনিয়া গান করে, ওয়াল্টারের মনে হয় একটি পরি নেমে এসেছে ওদের গ্রামে। ষোলো বছরের ভার্জিনিয়াকে যেন ঈশ্বর সব কিছু ঢেলে দিয়েছেন।


ওয়াল্টারের বন্ধু জোসেফ এই নিয়ে খুব খ্যাপায় ওকে। বলে, “তোর সবটাতে বাড়াবাড়ি। পরি না আরও কিছু। আসলে তো ওর সঙ্গে তোর ইয়ের ধান্দা।”


খুব রেগে যায় ওয়াল্টার। মোটেই ও ভার্জিনিয়াকে নিয়ে খারাপ কিছু চিন্তা করে না। অমন পবিত্র মুখের মেয়েকে নিয়ে কেউ এসব ভাবে! বড়লোকের বখাটে ছেলে হলে যা হয় আর কী।


যুদ্ধে আসার আগে ভার্জিনিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল ওয়াল্টার। ভেবেছিল ওর মনের কথাটা বলে আসবে। কিন্তু পারেনি। অমন করে যে-মেয়ে তাকায়, তার সামনে কথা বলতে পারে এমন পুরুষ এখনও পৃথিবীতে জন্মায়নি।


ও চলে আসার আগে ভার্জিনিয়া শুধু গভীর গলায় বলেছিল, “নিজের যত্ন নিয়ো। আর বলল, কী আনবে আমার জন্য?”


কী আনতে পারে ওয়াল্টার? খুব আতান্তরে পড়ে গিয়েছিল ও। রাজকুমারীর জন্য যে সমস্ত পৃথিবীটাও কম পড়ে। ও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। ভার্জিনিয়া এগিয়ে এসে আলতো করে ধরেছিল ওর হাত।


তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, “কিছু আনবে না?” ওয়াল্টারের হাত কাঁপছিল। জিভ শুকিয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল পড়ে যাবে যে-কোনও সময়ে। এত কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ভার্জিনিয়া! এত সুন্দর জ্যাসমিনের গন্ধ আসছে শরীর থেকে। ওর হাতের উপর রেখেছে নিজের হাত। কেমন অবশ হয়ে যাচ্ছিল ও। তাও নিজের সব শক্তি একত্র করে ওয়াল্টার বলেছিল, “সবচেয়ে ভাল যে-জিনিসটা পাব, সেটাই তোমার জন্য আনব।”


ভার্জিনিয়া হাসতে গিয়েও কেমন যেন চুপ করে গিয়েছিল। তারপর আবছা গলায় বলেছিল, “চলে যাচ্ছ, সেটাই শুধু জানাতে এলে?”


শুধু কি সেটাই বলতে গিয়েছিল নাকি ওয়াল্টার? যা বলতে গিয়েছিল তা আর বলে উঠতে পারেনি। শুধু মাথা নামিয়ে বলেছিল, “ফিরে আসি..”


ভার্জিনিয়া বলেছিল, “আসবে কিন্তু, কেমন?”


এই যুদ্ধ পার করে ওয়াল্টার কি ফিরতে পারবে ওদের সেই শান্ত গ্রামের পরির মতো মেয়েটার কাছে? আঠেরো বছর বয়সের ওয়াল্টারকে যুদ্ধ যেন এই ক’মাসেই বুড়ো করে দিয়েছে।


“আরে তুমি এখানে, ওদিকে স্যরের জ্ঞান ফিরে এসেছে।”


পাশ থেকে আসা কথাটায় যেন আবার বাস্তবে ফিরে এল ওয়াল্টার। দেখল টম দাঁড়িয়ে রয়েছে। টম ওর সঙ্গে অসুস্থ সৈন্যদের দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছে। আসলে এত আহত সৈন্য চারিদিকে যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সামান্য দূরে ওদের আলাদা করে মেডিক্যাল ক্যাম্প করতে হয়েছে।


ওয়াল্টার বলল, “কখন?” টম অধৈর্য হল সামান্য। বলল, “এখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্নই করবে, নাকি যাবে? উনি খুঁজছেন তোমায়।”


প্রায় দৌড়ে ক্যাম্পের দিকে গেল ওয়াল্টার।


আইভরি রঙের তাঁবু। সামনে পরদা ঝুলছে। আহত সৈন্যদের স্ট্রেচারে বা হাতে-টানা গাড়িতে করে নিয়ে আসা হচ্ছে এখানে। পুঁজ, ক্ষত আর ওষুধের গন্ধে কেমন একটা বিচ্ছিরি পরিবেশ চারিদিকে। মাটিটাও কর্দমাক্ত। তার উপরে কাঠের পাটাতন পেতে দেওয়া হয়েছে হাঁটাচলার জন্য।


ওয়াল্টার পরদা সরিয়ে ভিতরে ঢুকল। দূরের খাটে জেনারেল স্যরকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। পিঠের ক্ষতস্থানের ব্যান্ডেজ বুকের সামনে অবধি দেখা যাচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, স্যর খুব ক্লান্ত।


কাল যুদ্ধের মাঠে আহতদের আনতে গিয়েছিল ওয়াল্টার। চারিদিকে কামানের গোলা পড়ছে। মিনি রাইফেল আর সুদবোর বন্দুকের গুলি উড়ছে। তার মধ্যে ওর সামনেই গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন স্যর। চারটে হাতে-টানা গাড়িতে জায়গা ছিল না একটুও। এদিকে একবার গেলে আবার ফিরে আসতে অনেক সময় লেগে যাবে। ওয়াল্টার বুঝেছিল, ততক্ষণ আর বাঁচবেন না স্যর।


নিমেষে কর্তব্য ঠিক করে নিয়েছিল ওয়াল্টার। দ্রুত নিজের পিঠে তুলে নিয়েছিল স্যরকে। আর স্যরের মিনি রাইফেলটা ঝুলিয়ে নিয়েছিল কাঁধে। কীভাবে যে অমন কাদামাটির মাঠ, অমন গোলা আর গুলির মাঝে স্যরকে নিয়ে ও ফিরে এসেছিল এই তাঁবুতে, এখনও স্পষ্ট মনে করতে পারছে না।


সেই স্যরের জ্ঞান ফিরেছে এখন। স্যরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল ওয়াল্টার। স্যর একটা হাত বাড়িয়ে আলতো করে ধরলেন ওর হাত। ক্ষীণ গলায় বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ মাই সন।”


ওয়াল্টার কী বলবে বুঝতে পারল না। শুধু হাসল।


স্যর নিজের কোটের দিকে ইঙ্গিত করলেন এবার। ওয়াল্টার পাশের হুকে ঝোলানো কোটটা নামিয়ে রাখল। রক্ত লেগে আছে। ফুটো হয়েছে গুলির। স্যর ইঙ্গিতে বললেন ভিতরের পকেটে হাত ঢোকাতে। ওয়াল্টার হাত ঢোকাল। আরে এটা কী! ও বের করে আনল জিনিসটা। আলোয় ঝকমক করে উঠল সেটা। ইঞ্চি তিনেক বড় একটা সোনার তৈরি সেফটিপিন ব্রোচ। উপরে হিরে আর পান্না বসানো।


ওয়াল্টারের বাবা মণি-মুক্তো কাটার কাজ করেন। পাথর চেনে ওয়াল্টার।


কোটটা আবার হুকে ঝুলিয়ে রেখে স্যরের হাতে সেফটিপিনটা তুলে দিল ওয়াল্টার।


স্যর নিলেন না। দুর্বল হাতে সেটা ওয়াল্টারের মুঠোয় দিয়ে ক্ষীণ গলায় বললেন, “দিস ইজ ফর ইউ মাই সেভিয়ার। এখানে আসার আগে আমার স্ত্রী আমাকে দিয়েছিল টোকেন হিসেবে। আমি জানি আমার জন্য তুমি যা করেছ, তার মূল্য হয় না। তাও তুমি এটা রাখো। এটা আমাকে তোমার সঙ্গে গেঁথে রাখবে। যাকে তুমি সবচেয়ে ভালবাসবে, তাকে এটা দেবে। কেমন?”


বিহুল হয়ে সেই অমূল্য সেফটিপিনের দিকে তাকাল ওয়াল্টার।


নিমেষে সবকিছু কেমন যেন আবছা হয়ে গেল ওর। এই যুদ্ধক্ষেত্র, রক্ত, চিৎকার, মৃত্যু সব ছাপিয়ে ওর সামনে ভেসে উঠল একটা মুখ। বিশাল ম্যানসনের বড় সিংহদরজায় দাঁড়িয়ে ওর চলে আসার পথের দিকে চেয়ে আছে একটি মেয়ে। চারিদিকে উঁচু গাছের মাথা ছাড়িয়ে। সূর্যের আলো এসে পড়েছে তার সোনালি চুলে। ঠান্ডায় সামান্য গোলাপি আভা ধরেছে তার গালে। সে অপেক্ষা করে আছে কখন তার কাছে ফিরে আসবে লাজুক ওয়াল্টার। কখন বলবে সেই কথাটা, যা বলা হয়নি আজও।