রাত ভরে বৃষ্টি

রাত ভরে বৃষ্টি

বুদ্ধদেব বসু

রাত ভরে বৃষ্টি

Books Pointer Iconবুদ্ধদেব বসু
Books Pointer Iconnovel

Change color

হয়ে গেছে-ওটা হয়ে গেছে—এখন আর কিছু বলার নেই। আমি, মালতী মুখোপাধ্যায়, একজনের স্ত্রী আর একজনের মা, আমি ওটা করেছি। করেছি জয়ন্তর সঙ্গে, জয়ন্ত আমাকে চেয়েছে, আমিও তাকে। নয়নাংশু হয়ত ভাবছে আগেই করেছিলুম, কিন্তু না—আজই প্রথম। আজ রাত্রে—চার ঘন্টা আগে। এই বিছানায়। যেখানে মালতী এখন শুয়ে আছে।

কেমন ক’রে হ’লো? খুব সহজ। সত্যি বলতে আগে কেন হয় নি জানি না—আমার সংযমে, জয়ন্তর ধৈর্যে, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। রাত্তির ন-টা নাগাদ জয়ন্ত এলো, আর তক্ষুনি এমন বৃষ্টি নামলো যে আধ ঘন্টার মধ্যে জল দাঁড়িয়ে গেলো আমাদের গলিতে। দশটা, সাড়ে-দশটা—বৃষ্টি আর থামে না। অংশু গেছে তার মুমূর্ষ পিসিমাকে দেখতে বেলেঘাটায়, বুন্নি আমার মা-র কাছে। থাকছে আজ, দুর্গামণি ভাঁড়ার ঘরে মাদুর বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। আমি ফ্ল্যাটের দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে শোবার ঘরে এলুম-বৃষ্টির ছাঁটে কিছু ভিজেটিজে যাচ্ছে কি না দেখার জন্য। ‘আমার সিগারেট ফুরিয়ে গেলো, নয়নাংশুর দেরাজে আছে নাকি দু-এক প্যাকেট?’ বলতে বলতে জয়ন্তও এলো শোবার ঘরে। আমি নিচু হ’য়ে যখন দেরাজ ঘাঁটছি তখন জয়ন্ত পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরলো, আমি মুখ তুলে তাকিয়ে বললুম, ‘তাহলে সিগারেট চাও না?’ সে আমার কানের উপর ঠোঁট চেপে ডাকলো, ‘লোটন!’ আমি তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে আলো নিবিয়ে দিলুম। এমনি করে হয়ে গেলো ব্যাপারটা।

ভালো লাগছে, এখন বেশ ভালো লাগছে আমার। বুঝতে পারছি এতদিন এটা ঠেকিয়ে রেখে ভালো করি নি।

গা-ভরা আরাম নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, হঠাৎ চোখ খুলে দেখি আলো জ্বলছে আর চুপচুপে ভেজা জামা-কাপড়ে দাঁড়িয়ে আছে নয়নাংশু। আমি বললুম,’ এই এলে?’ ‘হা—আমার পাজামাগুলো কোথায় আছে জানো নাকি? ‘ঐ যে বাঁ দিকের দেরাজে’, বলে আমি আবার একটু চোখ বুজলুম, অলস লাগছিলো, উঠতে ইচ্ছে করছিলো না। অংশু বললে, ‘এত রাতে ফ্ল্যাটের দরজা খোলা রেখে ভালো করো নি, তুমি আর দুর্গামণি ছাড়া কেউ বাড়ি নেই, দু-জনেই অঘোরে ঘুমুচ্ছো–যাকে বলে চোরকে ডেকে আনা, এ হলো তাই-ই।’ ‘খোলা ছিলো নাকি দরজা?’ নয়নাংশু কাপড় ছাড়তে বাথরুমে ঢুকলো, আমি হঠাৎ তাকিয়ে দেখলুম ওর খাটের উপর আমার ব্লাউজটা পড়ে আছে, আমি শুয়ে আছি কোনোমতে শুধু শাড়িটা জড়িয়ে—তড়াক ক’রে উঠে ব্লাউজ প’রে নিলুম, শাড়িটা ঠিকমতো ঘুরিয়ে দিয়ে, চুল আঁচড়ে, মুখে একটু পাউডারও বুলিয়ে নিলুম তাড়াতাড়ি-আয়নায় মনে হলো না মালতীকে অন্য দিনের চাইতে কিছু আলাদা দেখাচ্ছে। কিন্তু কী রকম ভুল হয়, আশ্চর্য—তখন আমি ভালবাসতে গিয়েও দরজা বন্ধ করতে ভুলি নি (প্রেম তাহলে বেপরোয়া উদ্দাম নয়?), কিন্তু জয়ন্ত চ’লে যাবার পর হাট হ’য়ে রইলো ফ্লাটের দরজা, ঘরের দরজা, জামাটা পর্যন্ত গায়ে দিতে মনে থাকলো না, তক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়লুম। নয়নাংশু কিছু লক্ষ্য করেছে নাকি? তা করুক গে—একজন বিবাহিতা মহিলা তাঁর শোবার ঘরে যে-ভাবেই শুয়ে থাকুন, তা নিয়ে কার কী বলবার আছে?

খেতে বসে অংশু জিগেস করলে, ‘এত রাত অবধি না-খেয়ে ছিলে কেন?’ ‘রাত অনেক বুঝি? ‘বারোটা। খেয়ে নিলেই পারতে।’বারোটা শুনে অবাক লাগলো আমার, জয়ন্ত আসার পর থেকে ঘন্টাগুলি ছিলো কি ছিলো না তখন যেন মনে করতে পারছিলুম না, যদি বুঝতুম এত রাত হয়েছে তা হলে আমার নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তা হতো অংশুর জন্য, আর সে ঘরে ঢোকামাত্র বলতুম, ‘কী। কাণ্ড! এত রাত করলে! এদিকে আমি ভেবে-ভেবে সারা!’ অংশুর দিকে তাকিয়ে মনে হ’লো সে এখনো ঐ রকম কিছু শুনতে চাচ্ছে আমার মুখে; তাই বললুম, ‘তোমার এত দেরি হ’লো কেন? ‘বাঃ, কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ! কী তুমুল বৃষ্টি আজ কলকাতায়-বেলেঘাটা গঙ্গা হয়ে গেছে, হেঁটে-হেঁটে শেয়ালদার মোড়ে এলুম, তারপর রিকসাতে জোড়াগির্জে অবধি এসে তবে একটা ট্যাক্সি জুটলো।’ বেশ তৃপ্তির সঙ্গে কথাগুলো বললে নয়নাংশু, যেন সুন্দরবনে বাঘ মেরে এসেছে-আমার মনে পড়লো কয়েকদিন আগে বাথরুমে একটা বিছে দেখতে পেয়ে চেচিয়ে উঠেছিলো সে, তারপর কোথেকে একটা লাঠি যোগাড় ক’রে খুব সাবধানে দূর থেকে মেরেছিলো ঐ একরত্তি প্রাণীটাকে। আমার কাছে এসে বলেওছিলো, ‘ওটাকে মেরেছি।’ আমি ওর দিকে না তাকিয়ে জবাব দিয়েছিলুম, ‘খুব বীরত্ব করেছো!’ (যেন চার বছর আগেকার বুন্নি বলছে, ‘মা, মা, শোনো—জানালায় একটা কাক বসেছিলো, আমি তাড়িয়ে দিয়েছি!’) ওকে মাঝে মাঝেই বালকের মতো লাগে আমার, বাচ্চা ছেলের মত—আর, একজন পূর্ণ যুবতীর বালক স্বামী হলে কেমন লাগে? জয়ন্ত হ’লে কী করতো ওখানে? কথাটি বলতো না-নিঃশব্দে পিষে দিতো স্যান্ডেলের তলায়।

মুর্গির ঝোল দিয়ে ভাত মেখে নিয়ে নয়নাংশু বললে, ‘তোমাকে অনেকদিন বলেছি—আমার জন্যে বসে থেকো না, সময়মতো খেয়ে নিয়ো।’ আমি জবাব দিলুম, ‘একা-একা খেতে বিশ্রী লাগে আমার। কথাটা কিন্তু খাঁটি- একটুও বানানো নয়—নয়নাংশুর ফিরতে যত দেরিই হোক ওকে ফেলে খেতে পারি না আমি, এটা আমার অভ্যাস—হয়তো একেই সংস্কার বলে— ছেলেবেলায় মা-কে দেখতুম বাবার জন্যে বসে থাকতে, হয়তো তা’ই থেকে এসেছে। অংশু মুহূর্তের জন্য খাওয়া থামিয়ে জিগেস করলে, ‘কেউ এসেছিলো?” আমি তৎক্ষণাৎ জবাব দিলুম ‘জয়ন্ত-জয়ন্তবাবু এসেছিলেন ন-টা নাগাদ। তোমার জন্য অনেকক্ষণ ব’সে ছিলেন।’(এই এক ঝামেলা—অন্যদের সামনে ‘বাবু’ বলা, ‘আপনি’ বলা!) ‘আমার জন্য কেন?’ ‘কী যেন দরকার ছিলো ওঁর পত্রিকার ব্যাপারে। তা ওকে বসিয়ে রাখলে না?’ বলে নয়নাংশু আমার চোখে চোখ ফেললো। আমি চোখ নামিয়ে নিলুম না, বরং বেশ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বললুম, ‘বেশ কথা! বারোটা অবধি বসিয়ে রাখা যায় নাকি কাউকে! আর আমি বললেই বা উনি থাকবেন কেন- নিজের বৌ ছেলেপুলে নেই! এর পর নয়নাংশু বললে, ‘কী করে গেলেন এই বৃষ্টির মধ্যে?’ এর উত্তরে আমি অনায়াসে ঝাঝিয়ে উঠে বলতে পারতুম, ‘কী করে গেলেন তার আমি কী জানি!’ কিন্তু আমি তা করলুম না, মুখে হাসি টেনে বললুম, ‘জানো তো জয়ন্তবাবু কী রকম মানুষ-ও -সব বৃষ্টিফৃষ্টিকে উনি পরোয়া করেন না।’ আমার হাসির উত্তরে আরো একটু স্পষ্ট করে হেসে বললো,’ ঠিক বলেছো। মনে আছে বুন্নির জন্মদিনে-কাল-বোশেখির ঝড়ে এমন হ’লো যে টাম -বাস সব বন্ধ, রসা রোড জলে থৈ-থৈ, জয়ন্তবাবু তারই মধ্যে হেঁটে হেঁটে চলে এলেন টালিগঞ্জ থেকে। সত্যি আশ্চর্য!’ আমি কোনো জবাব দিলুম না ও-কথার, কেননা সেই সন্ধ্যাটা আমি ভুলি নি নয়নাংশু তা ভালোই জানে—এমন দু-একটা ঘটনা ঘটে যা ভোলা যায় না; আমি সেদিন‌ বুঝেছিলাম যে জল ভেঙে তিন মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে বুন্নির জন্য আসেনি জয়ন্ত, নয়নাংশুর জন্যও আসেনি—আমার জন্য, আমারই জন্য এসেছে। আর তা অংশুও বুঝে নিয়েছিলো—বোকা তো নয়, প্রথম থেকে বুঝে নিয়েছিলো কী হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে, আর ঐ একটা বিষয়ে টনটনে জ্ঞান নেই এমন কোন স্বামী আছে পৃথিবীতে?

খাওয়ার পরে নয়নাংশ

**********