বিমানের নতুন দাদা

বিমানের নতুন দাদা

হেমেন্দ্রকুমার রায়

বিমানের নতুন দাদা

Books Pointer Iconহেমেন্দ্রকুমার রায়
Books Pointer Iconnovel

Posted byকাব্য রচিত08-Aug-2026

Change color

ছিদাম চাষার কথা বলছি।


ছিদামকে চাষা বললুম বটে, কিন্তু সে সাধারণ চাষা নয়। একদিক দিয়ে তাকে ধনী বললেও অত্যুক্তি হবে না।


ছিদামের বাপ ছকড়ি আমরণ জমিতে লাঙল চালনা করেছিল, এবং ছিদামকেও তার বাপের মৃত্যু পর্যন্ত যে লাঙল চালাতে হয়েছিল, একথা সকলেই জানে।


কিন্তু বাপ মারা যাওয়ার পর ছিদাম যখন দেখলে, সে কয়েক-শত-বিঘা-ব্যাপী চাষজমির মালিক, আর তার অধীনে কাজ করছে অগুনতি লোক, তখন সে নিজে হাতে-নাতে কাজ করা ছেড়ে দিলে। অবশ্য তার নিজের চাল-চলন কিছুই বদলাল না। প্রতিদিন সে নিজের চাষ-জমিতে হাজির থেকে সমস্ত কাজকর্ম তদারক করত—এমনকী রোদে পুড়তে, জলে ভিজতে ও শীতে কাঁপতেও তার কিছুমাত্র আপত্তি হত না।


কিন্তু যে-শ্রেণীর লোকই হোক, লক্ষ্মীলাভ করলে মানুষের মন অল্প-বিস্তর না বদলে পারে না। ছিদামের তিন ছেলে। সে নিজে হাঁটুর উপরে মোটা কাপড় পরে বটে, কিন্তু কলকাতায় লোক পাঠিয়ে ছেলেদের জন্যে ‘চাঁদনি-চক’ থেকে নানানরকম রংচঙে জামাকাপড় কিনে আনায়। ছিদামের নিজের কখনও হাতে-খড়িও হয়নি, কিন্তু ছেলেদের সে ভর্তি করে দিয়েছে গাঁয়ের স্কুলে। নিজে লেখাপড়া জানে না বলে লক্ষ্মীলাভ করে নানাদিকে আজ তার অসুবিধা হচ্ছে নানানরকম। দেনা-পাওনার ব্যাপার নিয়ে দু-লাইন চিঠি লেখবার জন্যেও তাকে পরের দ্বারস্থ হতে হয়। তার মূর্খতার সুযোগ নিয়ে ধূর্ত লোকেরা মাঝে মাঝে তাকে বেশ দু-পয়সা ঠকিয়েও যায়। এইসব বিপদ থেকে মুক্তি দেবার জন্যেই ছেলেদের সে স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়েছে।


ছিদামের বাড়ি বড়ো না হলেও সেখানা হচ্ছে কোঠাবাড়ি এবং ছিদামদের গাঁয়ে কোঠাবাড়ি আছে কেবল গায়ের জমিদারদের। এই হিসেবে মদনপুর গায়ের মধ্যে লোকে জমিদারদের পরেই নাম করত ছিদাম চাষার।


ছিদাম সেদিন সকালে বাড়ির সদর দরজার কাছে একখানা টুলের উপরে বসে কোয় টান মারছে, এমন সময় তার বড়োছেলে হারু সেখানে এসে হাজির হল।


এখানে হারুর একটুখানি পরিচয়ের দরকার, কারণ আমাদের কাহিনির নায়ক হচ্ছে এই হারু বা হারাধনই।


হারাধনের বয়স হবে পনেরো কী ষোলো। কিন্তু এই বয়সেই দেখতে সে হয়ে উঠেছে মস্ত জোয়ান এক পুরুষ মানুষের মতন। এখনই সে মাথায় পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা এবং তিন-চার বছরের ভিতরেই মাথায় যে ছয় ফুটকেও ছাড়িয়ে যাবে, এ-বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। তার বুকের ছাতি রীতিমতো চওড়া, আর তার সর্বাঙ্গ দিয়ে সর্বদাই চামড়ার তলা থেকে ঠেলে ঠেলে উঠছে সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট মাংসপেশি। প্রতিদিন নিয়মিত ডন-বৈঠক দিয়ে ও কুস্তি লড়ে দেহখানিকে সে রীতিমতো তৈরি করে তুলেছে। তার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ও সুন্দর মুখশ্ৰী দেখলে কেউ তাকে চাষার ছেলে বলে ধরতে পারবে না।


হারাধন এই বছরেই গাঁয়ের স্কুল থেকে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় সফল হয়েছে। যে-কোনও চাষার ছেলের পক্ষে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় সফল হওয়া অল্প গৌরবের কথা নয়, এবং এ-বিষয়ে সে নিজে এবং তার বাপ ছিদাম দুজনেই দস্তুরমতো সচেতন।


হারাধন চাষার ছেলের মতনও লালিত-পালিত হয়নি। কেমন করে লাঙল ধরতে হয়, তাও বোধহয় সে জানে না। স্কুলের সমস্ত ভদ্রলোকের সঙ্গে সে সমানভাবেই মেলামেশা করে এবং তার বাপের কাঞ্চন-কৌলিন্যের প্রসাদে গাঁয়ের ভদ্রলোকের ছেলেদের তরফ থেকেও কোনওরকম আপত্তি ওঠে না।


আর আপত্তি উঠবেই বা কেমন করে? মদনপুর হচ্ছে একখানি ছোটোখাটো গ্রাম। এখানকার অধিকাংশ তথাকথিত ভদ্রলোকই হচ্ছে গরিব গৃহস্থ। তাদের সংসারে অভাব অনটন লেগেই আছে এবং যখন-তখন অনেক ভদ্রলোককেই টাকা ধার করবার জন্যে ছিদামের দ্বারস্থ হতে হয়। ভদ্রলোকদের এই অক্ষমতা দেখে এবং নিজের ক্ষমতার পরিমাণ বুঝে ছিদাম মনে মনে অনুভব করে বিশেষ একটা গর্ব।


কিন্তু মাঝে মাঝে বেসুরো সুর বেরিয়ে পড়ে। হয়তো কোনওদিন হারাধন শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলে না, অমনি তার মুখ থেকে টিটকারি শোনা গেল, ব্যাটা চাষার ছেলে, কত আর বুদ্ধি হবে।


গাঁয়ের জমিদাররা যে বিশেষ সম্পত্তিশালী, তা নয়; হয়তো দরকার পড়লে হারাধনের বাপ এককথায় তাদের চেয়ে বেশি টাকা ঘর থেকে বার করে দিতে পারে। কলকাতা শহর হলে তাদের মতন জমিদারদের দিকে সাধারণ গৃহস্থরাও ফিরে চাইত না। কিন্তু তাহলে কী হয়, তবু তারা জমিদার। এই বনগাঁয়ের শিয়াল-রাজা!


অতএব জমিদার-বাড়ির যে ছেলেটি হারাধনের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে, সে স্পষ্টাম্পষ্টিই চাষার ছেলে বলে তাকে ঘৃণা ও উপেক্ষা করত। হারাধন একদিন তাকে 'ভাই' বলে ডেকে কথা কইতে গিয়েছিল, কিন্তু জমিদার-নন্দন উত্তরে তার সঙ্গে একটা কথাও কয়নি বা তার দিকে একবার ফিরেও তাকায়নি। এমনকী ক্লাসের ভিতরে চাষার ছেলে হারাধনের সঙ্গে এক বেঞ্চিতে বসতেও সে নারাজ ছিল। জমিদারের ছেলে প্রায়ই কলকাতায় যায় এবং শহরের সমস্ত হালচাল তার নখদর্পণে। যখন-তখন কলকাতা থেকে সে হাল-ফ্যাশানের কাপড়-চোপড় পরবার কায়দা শিখে আসে এবং হারাধনের ‘চাঁদনিচক’ থেকে সস্তায় কেনা রেডিমেড ও রংচঙে পোশাকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুখ টিপে-টিপে হাসে এবং অন্য কোনও ছেলেকে ডেকে চাপা-গলায় অথচ হারাধন যাতে শুনতে পায় এমন স্বরে বলে, চাষার ছেলে, ভদ্রলোক হয়েছেন! আহা, কী পোশাক! হতভাগা, পাড়াগেঁয়ে ভূত!


এইসব অপমান হারাধনকে মুখ বুজে সহ্য করতে হত। যদিও সে জানে ইচ্ছা করলে এক ঘুষি মেরেই জমিদারপুত্রকে এখনি ভূমিসাৎ করতে পারে, তবু মনের রাগ তাকে মনেই পুষতে হত নীরবে। কারণ তার বাপ বলে দিয়েছিল, জমিদারের সঙ্গে ঝগড়া করলে তাদের নিজেদেরই বিপদের সম্ভাবনা বেশি।


একদিন এমনিতরো কী-একটা ব্যাপারের পর হারাধন মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করলে, সে আর এ-গ্রামে থাকবে না। সে কলকাতায় চলে যাবে—যেখানে কেউ তাকে চাষার ছেলে বলে চেনে না। কলকাতা থেকে যদি সে কখনও ফিরে আসে, তবে ভদ্রলোক নাম কিনেই ফিরে আসবে। কয়েকদিন ধরে মনে মনে এই কথা ভেবে তার প্রতিজ্ঞা হয়ে উঠল ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার মতন অটল ও সুদৃঢ়। এবং হারাধনকে যারা চেনে তারাই জানে যে সে হচ্ছে অত্যন্ত একরোখা ছেলে, যা ধরবে তা করবেই।


এইবার সেদিন সকালের কথা বলি।


টুলের উপরে উবু হয়ে বসে তামাক টানতে টানতে ছিদাম যখন অর্ধ-নিমীলিত চোখে দেখলে হারাধন তার সামনে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, তখন একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে আস্তে আস্তে বললে, কীরে হারু, কিছু বলতে চাস নাকি? নতুন জামা-কাপড় চাই, না আর কিছু? সে জানত বিশেষ দরকার না হলে শ্রীমান হারু কোনওদিনই তার সামনে এসে হাজির হয় না।


হারাধন মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে, একটু দরকার আছে বাপি!


—দরকারটা কী শুনি?


অল্প ইতস্তত করে হারাধন মনের বাসনা একেবারেই প্রকাশ করে ফেললে। বললে, বাপি, আমি কলকাতায় যেতে চাই ছিদাম দুই ভুরু তুলে সবিস্ময়ে বললে, বলিস কী রে! কলকাতায় যাবি? কার সঙ্গে রে?


—কারুর সঙ্গে নয়।


এবারে আর ছিদামের বিস্ময়ে সীমা রইল না। সে বললে, কারুর সঙ্গে নয়? তুই একলা কলকাতা যাবি?


—হ্যাঁ বাপি।


ছিদাম গম্ভীর মুখে হুকোয় দু-চারটে টান মেরে বললে, তোর মাথায় এ কুবুদ্ধি কে দিলে শুনি?


—কেউ দেয়নি। আমি নিজেই অনেক ভেবে-চিন্তে স্থির করলুম যে কলকাতায় না গেলে কোনওদিনই আমি ভদ্রলোক হতে পারব না।


ছিদাম এইবারে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে তামাক-টানা ছেড়ে হুঁকোটা নীচে নামিয়ে রাখলে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বললে, কলকাতায় না গেলে তুই ভদ্রলোক হতে পারবি না, বটে? তোর কথার মানে কী রে ব্যাটা? তুই যে চাষার ছেলে, কলকাতায় গিয়ে সেটা ভুলতে চাস নাকি?


হারাধন পণ্ডিত না হলেও একালের লেখাপড়া কিছু কিছু শিখেছে। সে বললে, কে যে চাষার ছেলে, আর কে যে মুটের ছেলে, একথা কারুর গায়ে চিরদিন লেখা থাকে না! শুনেছি আমাদের গাঁয়ের জমিদারের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন খুনে, ঠগি, ডাকাত। কিন্তু আজও কি তাদের কেউ ওইসব নামে ডাকে? ডাকাতের বংশধররা যদি হতে পারে বড়ো বড়ো বাবু, ভদ্রলোক, তাহলে চাষার ছেলেরাই বা কী দোষটা করলে? ডাকাত হওয়ার চেয়ে কি চাষা হওয়া ভালো নয়? স্বর্গে যেতে পারে কারা, ডাকাতরা না চাষারা? তুমি তো জমিদারদের চেয়েও বড়োলোক, তবে তোমার ছেলে আমিই বা ভদ্রলোক হতে পারব না কেন?


ছিদাম জানে চাষ-বাস করতে, কুলি মজুর খাটাতে, শস্য বেচে টাকা জমাতে আর সেই টাকা সুদে খাটাতে ক-য়ের পাশে খ-কে দেখলে সে চিনতে পারে না, কেতাবি বুলিও কোনওদিন শিখতে পারেনি। হারাধন স্কুলে পড়লেও যে এমন সব আশ্চর্য কথা বলতে শিখেছে, এটা সে কোনওদিন ধারণাতেও আনতে পারেনি। তার মতন এক চাষার ছেলে হারাধনের মুখে এই সব বড়ো বড়ো কথা শুনে সে কেবল ভড়কেই গেল না, মনে মনে খুশিও হল খানিকটা। ছেলের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ছিদাম বললে, কলকাতা কত বড়ো শহর জানিস?


হারাধন বললে, কী করে জানব বাপি? তুমি তো কোনওদিন আমায় কলকাতায় নিয়ে যাওনি?


ছিদাম বললে, হেঃ, তোর বাপই কলকাতায় গেছে কবার রে ব্যাটা। মোটে তিনবার! একবার খুব ছেলেবেলায়, একবার দশ বছর আগে, আর একবার বছর-পাঁচেক আগে। যতবারই গিয়েছি, ততবারই দেখেছি, ওই রাক্ষুসে শহরটা দিনে দিনে যেন আরও ডাগর হয়ে উঠছে। সেখানে বাইরে বেরুলে লাখো লাখো মানুষের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে হয়, সেখানে পথে পা বাড়ালেই মস্ত মস্ত হাওয়া-গাড়িরা বাঘ-ভালুকের মতো মারমুখো হয়ে তেড়ে আসে, সেখানে হওয়া-গাড়িদের ফাঁকি দিলেও চোর-জোচ্চোর-গুণ্ডাদের ফাঁকি দেবার জো নেই, সেখানে লাল-পাগড়ি-পরা চৌকিদাররা চোরদের কিছু বলে না, কিন্তু সাধুদের ধরে নিয়ে যায় হাতে দড়ির বাঁধন দিয়ে! এমন শহরে যে তুই যেতে চাস, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবি কেমন করে?


হারাধন বললে, বুদ্ধির জোরে।


ছিদাম হা হা করে হেসে উঠে বললে, দু-পাতা পড়তে শিখলেই কারুর বুদ্ধির জোর বাড়ে না রে গাধা! আর খালি বুদ্ধির জোরই সব নয়, বুঝেছিস?


হারাধন বুক ফুলিয়ে বললে, আমার গায়ের জোরও আছে।


ছিদাম নীরবে আর একবার ছেলের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিলে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললে, আয়, দেখি তোর গায়ের জোরের একটু নমুনা। বলেই নিজের রৌদ্রদগ্ধ, পেশিবহুল সবল ও স্থুল ডান হাতখানা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিলে, হাতের পাঁচ আঙুল ফাঁক করে।


হারাধন বাপের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু আশ্চর্য হয়ে বললে, আমায় কী করতে বলো বাপি?


ছিদাম বললে, আমার এই হাতখানা দেখছিস? ভারী লাঙল ঠেলে ঠেলে আমার এই হাত হয়েছে লোহার মতন শক্ত! এই হাতের এক ঘুষি মেরে আমি ডাব ভেঙে তার জল খেতে পারি! আর এই হাতের এক এক টানে বড়ো বড়ো বলদ শান্ত-শিষ্ট ভেড়ার মতন সুড়সুড় করে আমার সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে। পারবি আমার এই হাতখানা ভাঙতে? পারবি আমার সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে?


হারাধন প্রথমটা ইতস্তত করতে লাগল। ভাবতে লাগল, ছেলে হয়ে বাপের সঙ্গে পাঞ্জালড়া উচিত কি না? সে আজ পর্যন্ত যত বই পড়েছে তার কোনওখানার ভিতরেই দেখেনি, বাপের সঙ্গে ছেলের পাঞ্জা-লড়ার কোনও কথাই। বাধো বাধো গলায় বললে, তোমার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ব কী বাপি?