
বাবলি
বুদ্ধদেব গুহ
পর্ব ১
ইম্ফলে এ সময়ে আনারসটা খুব সস্তা।
অভী দুপুরে বাড়িতে খেতে এসেছিল। খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। খাওয়ার পর বারান্দায় বসে আনারস খাচ্ছিল, এমন সময় ফোনটা বাজলো। কুলো সিং ওর মণিপুরী বেয়ারা-কাম-কুল্-কাম লোকাল গার্জিয়ান ফোনটা ধরেই উত্তেজিত গলায় বলল, বড় মেমসাবকা ফোন।
ফোনটা ধরতেই কমিশনারের স্ত্রী বললেন, অভী বলছ?
-হ্যাঁ।
-শোন, তোমার দাদা বলছিলেন, তোমার নাকি কোহিমা ও ডিমাপুর যেতে হবে অফিসের কাজে পরশু দিন। পরশু দিন না গিয়ে তুমি আগামী কাল ভোরে বেরোতে পারবে? তোমার গাড়ির কন্ডিশান ভালো আছে তো?
–গাড়ি? আমার তো অফিসের জীপেই যাবার কথা।
–হ্যাঁ। তা তো জানি। কিন্তু একটা বিপদ হয়েছে। আমার দিদির মেয়ে বাবলি, তুমি তো দেখেছ আমাদের বাড়িতে; ওর পরের সোমবার দিল্লিতে জয়েনিং ডেট, এদিকে ইন্ডিয়ান এয়ার লাইন্স-এর পাইলটরা নাকি সব স্ট্রাইক করেছেন, এইমাত্র রেডিওতে শুনলাম। তাই তোমার দাদার সঙ্গে কথা বলে তোমাকে ফোন করছি। তুমি কি কাল বেরিয়ে ওকে পরশু কি তার পরের দিন ডিমাপুরে পৌঁছে দিতে পারবে?
অভী বলল, ডিমাপুর থেকে ট্রেনে কলকাতা যেতে তো অনেকদিন লাগবে বৌদি।
-না, না, ও পথে, চা-বাগানে নেমে যাবে। ওখানে আমার দাদা ম্যানেজার। কোম্পানির প্লেনে ওকে কলকাতা পৌঁছে দেবেন উনি। সেখান থেকে প্লেনে দিল্লি চলে যাবে ও। পারবে?
অভী ফোন ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
এ প্রশ্নের কোনো মানে হয় না। ও তাঁকে দাদাই বলুক, আর যাই বলুক, যিনি অফিসের বড় সাহেব, যিনি ওর কনফিডেনশিয়াল রিপোর্ট লেখেন, তার স্ত্রী যতই মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করুন না কেন, এ প্রশ্নের একমাত্র উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। সে ব্যক্তিগত অসুবিধা থাক আর না-ই থাক। অবশ্য ওর এখানে একার সংসারে অসুবিধা কিছুই নেই। অতএব গলায় উৎসাহ এনে ও বলল, হ্যাঁ, হা, পারবো না কেন? বেশি উৎসাহ যাতে প্রকাশ না পায় সে বিষয়েও সাবধান হল, কারণ তা না হলে উনি ভাবতে পারেন ওর বোনঝির ত্রাতা হতে ও অত্যন্ত উৎসুক।
–পারবে?
–হ্যাঁ।
–তাহলে ফোনটা একটু ধরো, তোমার দাদা কথা বলবেন।
ঘোষ সাহেব ভারী গলায় বললেন, চৌধুরী, তাহলে তুমি লাঞ্চের পর অফিসে এসে কাজকর্ম যা আছে গুছিয়ে নাও, আর টুর প্রোগ্রামটা আজই আমায় পাঠিয়ে দাও। অ্যাপ্রুভ করে দেবো। আর ইতিমধ্যে তোমার বৌদিকে বলৈছি, উনি চা বাগানে ট্রাঙ্ক কল বুক করে দিন। বাবলি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে জয়েন করছে, শুনেছ তো? ও বেচারির জয়েনিং দিল্লিতে। না গেলেই নয়।
অভী বলল, না না, আমার কোনোই অসুবিধা নেই। তাছাড়া যেতে তো হতোই। আমি গাড়িটাকে চেক-আপের জন্য গ্যারেজে দিয়েই অফিসে আসছি।
–আচ্ছা। বলে ঘোষ সাহেব ফোন রেখে দিলেন।
পর্ব ২
অন্ধকার থাকতে কুলো সিং চা এনে অভীর ঘুম ভাঙালো। রাতে বেশ বৃষ্টি হয়েছিল। এ সময়টা প্রতি রাতেই বৃষ্টি হয় ইম্ফলে। চাঁদর জড়িয়ে শুতে হয় রাতে। বেশ একটা হিমেল আমেজ।
চান-টান করে তৈরি হয়ে নিল ও। ফাইল-পত্ৰ কুলো সিং সব গাড়িতে তুলে দিলো। কাল বিকেলেই তেল-টেল ভরে গাড়ি ঠিকঠাক করে রেখেছিল। টায়ারগুলোর অবস্থা ভালো নয়।
পথে পটাং করে ফেটে না যায়। দশ বছরের পুরোনো সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি সস্তায় পেয়ে কিনেছিল। একজন অল্পবয়সি ব্যাচেলারের পক্ষে এ গাড়ি যথেষ্ট ভালো। অন্তত খারাপ মনে হয় নি কখনও।
কিন্তু গাড়ি যখন কেনে, তখন একবারও ভাবে নি যে একজন যুবতী মেয়েকে নিয়ে নাগা-হিল্সের মধ্য দিয়ে এতখানি পথ এ গাড়িতে যেতে হবে। ভেবেই বেশ নার্ভাস লাগতে লাগল ওর।
বড় সাহেবের গাড়ি নিয়েই যেতে পারত। কিন্তু তার গাড়ির ইঞ্জিন নামান হয়েছে কালই সকালে। জীপে করে ঝড়ে-জলে এতখানি রাস্তা এই পাহাড়ে, মেয়েদের পক্ষে যাওয়া সত্যিই অসুবিধে।
বড় সাহেবের বাড়ি ঢুকে পড়ল অভী। তখনো সূর্য ওঠে নি। তবে চারপাশ আলো হয়েছে। ঝিরঝির করে হাওয়া দিচ্ছে দেবদারু গাছের পাতায় পাতায়। ওরা সকলে বারান্দাতেই বসেছিলেন। চা খাচ্ছিলেন।
বাবলিকে (যার ভালো নাম দময়ন্তী) অভী একদিন মাত্র দেখেছিল। বড় সাহেবের ছোট ছেলের জন্মদিনে। অনেকের মধ্যে দেখা। হাত জোড় করে নমস্কার করেছিল।
চেহারা এমন নয় যে চোখে পড়ে। বেশ একটু মোটার দিকে, মুখ চোখও যে ভীষণ সুন্দর তা নয়। তবে সব মিলিয়ে বেশ মিষ্টি। অন্যান্য অবাঙালি অতিথিদের সঙ্গে অনর্গল এবং সপ্রতিভ ইংরেজিতে কথা বললেও অভীকে বাংলায় বলেছিল, আপনার কথা অনেক শুনেছি। মাসীমা মেসোমশায়ের কাছে। এই ভিড়ে আলাপ হয় না। পরে একদিন আসবেন। গল্প করা যাবে, কেমন?
বড় সাহেবের এমন সর্বগুণসম্পন্না মোটা এবং মোটামুটি মিষ্টি শালী মেয়ের সঙ্গে বেশি গল্প করে চাকরির সর্বনাশ করে এমন মূর্খ রোমান্টিক অভী কখনোই ছিল না। তাই ওর চেয়ে বেশি আলাপ হয় নি সেদিন।
পোর্টিকোতে গাড়ি ঢুকতেই ওরা সকলে উঠে দাঁড়ালেন। গাড়ির বুট খুলে দিল অভী। স্যুটকেসটা ওঠানো হল। সঙ্গে বিছানা-টিছানা নেই। আসবার সময় প্লেনে এসেছিলেন। তাই বিছানা আনেন নি।
ঘোষ সাহেব বললেন, কোহিমার লাইন খারাপ। ফোনে পাইনি। সকালেও চেষ্টা করব। আশা করি এম, এল, এস হোস্টেলে জায়গা পেয়ে যাবে তোমরা রাত কাটাবার মতো। তাই আর বিছানাপত্রর লটবহর দিলাম না।
মিসেস্ ঘোষ বললেন, অভী দেখে বাবা, সাবধানে নিয়ে যেও। মা-মরা মেয়ে।
তারপর বাবলির দিকে ফিরে বললেন, দেখিস তুই আবার পথে ঝগড়া করিস না, যা ঝগড়াটে মেয়ে তুই।
যাকে একথা বলা হল, সে জবাব দিল না। ওদের প্রণাম করে বাবলি নিজেই সামনের দরজা খুলে বসল।
অভী দরজা বন্ধ করে ঘুরে এসে স্টিয়ারিং-এ বসল। তারপর বাড়ির গেট ছাড়িয়ে ওরা খোলা রাস্তায় এসে পড়ল।
বর্ষার ভোরের মণিপুরের যা নয়ন-ভোলানো দৃশ্য এমন একটা বড় দেখা যায় না। হু হু করে হাওয়া লাগছে চোখে-মুখে। অভী আড়চোখে দেখতে পাচ্ছে ওর সঙ্গিনীর চুল এলোমেলো হচ্ছে। গাল ও কপালময় অনেক ওড়াউড়ি করছে। কিন্তু সে তন্ময় হয়ে পথের দিকে চেয়ে আছে। ওর চোখ দেখে মনে হচ্ছিল পথকে ও নিশ্চয়ই ভালোবাসে।
দেখতে দেখতে ইম্ফল শহর পিছনে ফেলে কাকোকির দিকে এগিয়ে চলল। এ পথে অভীকে কোহিমা অবধি প্রায়ই যাওয়া আসা করতে হয়। আগে বৈরী নাগারা প্রায়ই অতর্কিতে আক্রমণ করত।
অবশ্য ও আসার পর কোনোদিনও দেখে নি, তখন নাকি বাস ও গাড়ির কনভয় যেতো একসঙ্গে সামনে ও পেছনে অনেক আর্মি ট্রাকের এসকর্ট নিয়ে। এখন সেসবও উঠে গেছে।
তবে নানা জায়গায় ভীষণরকম চেকিং হয়। বিশেষ করে নাগাল্যান্ডে ঢোকার মুখে খুজ্মাতে। এবং বেরোবার সময়ও।
এ পথের দু’দিকে যা দৃশ্য তা কাশ্মীরের উপত্যকার দৃশ্যকেও ম্লান করে দেয়। আর বর্ষাকালের তো তুলনা নেই। যেদিকে চোখ যায় সবুজ, শুধু সবুজ। মালভূমি থেকে ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে ওঠা প্রাচীন অথচ প্রসন্ন সব পাহাড়।
ইম্ফল থেকে বেশ কয়েক মাইল চলে এসেছে ওরা।
ইতিমধ্যে অভীর সঙ্গিনী কেবল একটি মাত্র কথা বলেছেন, আমার জন্যে আপনার মিছিমিছি এত কষ্ট করতে হল।
জবাবে অভী বলেছিল, কষ্ট যে হ’লই, এখনো সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হই নি।
কষ্ট হলে নিশ্চয়ই জানতে পারবেন।
উত্তর শুনে অবাক মুখ করে অভীর দিকে চেয়ে, মুখ নামিয়ে সঙ্গিনী চুপচাপ হয়ে গেছিলেন। তারপর আর কোনো কথা হয় নি।
পাহাড়ি পথে একটা বাঁক ঘুরতেই ওপাশ থেকে একটা জীপ এমনভাবে এলো যে একটু হলে অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেত।
অভী কোনোক্রমে সামলে নিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বার করে অপসৃয়মান জীপের ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলল, শালা।
বলেই, লজ্জা পেয়ে বাবলির দিকে চেয়ে বলল, সরি, ভেরি সরি। একা একা গাড়ি চালাই তো। সঙ্গে ভদ্রমহিলা কেউ থাকেন না। অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে।
বাবলি চোখ তুলে একবার অভীর দিকে তাকালো। তারপর একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলল ও, ও খুব ভয়ে পেয়ে গেছিল। তারপর বলল, আমার খুব চা তেষ্টা পেয়েছে।
অভী হাসল। বলল, আমারও; চলুন, সামনেই কাকোকি। সেখানে গরম চা ও সিঙাড়া খাব।
বাবলির মুখে এবার কথা ফুটল। বলল, এখনো আমরা মণিপুরে আছি নাগাল্যান্ডে পৌঁছে গেছি?
অভী বলল, নাগাল্যান্ড এখন কোথায়! পৌঁছতে দেরি আছে। কোহিমা পৌঁছতে পৌঁছতে তো বিকেল হয়ে যাবে।
–পথে কী কী জায়গা পড়বে?
–এই রে। আমি কী আর মুখস্থ করে রেখেছি। দাঁড়ান মনে করে দেখি–।
তারপরই বলল, মোটামুটি মনে আছে। এই ধরুন কানকোপকির পর কারোং তারপর মারাম। মারামের পর তাদূবী। তাদূবীর পর মাও। মাওতে এসে আমরা নাগাল্যান্ডে ঢুকব। মাও-এর পর খুজ্মা। খুজ্মার পর জাখ্মা। জাখ্মাতে এ অঞ্চলের আর্মি হেডকোয়ার্টার্স। জাখ্মার পর কোহিমা।
বাবলি বলল, নাগাল্যান্ডের সব জায়গার নামই কি মা দিয়ে?
–কেন?
একহাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাত নাড়িয়ে অভী বলল, কেন তা জানি। হয়তো ওরা খুব মা ভক্ত বলে।
বাবলি অভীর বলার ধরন দেখে হেসে ফেলল।
দেখতে দেখতে কানকোপকিতে এসে গেল ওরা। চায়ের দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়ে অভী গিয়ে বাবলির দরজা খুলল। বাবলি নামল।
দোকানটা অনেক উপরে পাহাড়ের গায়ে। তারপর অভীর সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে বাবলি চায়ের দোকানটায় পৌঁছলো।
এখানে বেশ ঠাণ্ডা। ইম্ফলেও বেশ ঠাণ্ডাই এখন।
তবে এদিকে ঠাণ্ডাটা বেশি। একটা হাওয়া দিয়েছে কনকনে। দোকানের বেঞ্চে বসতে বসতে অভী বলল, কোহিমাতে বেশ ঠাণ্ডা হবে।
মনে হচ্ছে, বলল বাবলি, বলে চাঁদরটা ভালো করে টেনেটুনে বসল।
সিঙাড়া ও চা খেতে খেতে বাবলি হঠাৎ বলল, আমার সিঙাড়া খাওয়া উচিত নয়। না?
অভী অবাক হয়ে বলল, কেন?
না, আমাকে সকলে বলে স্লিমিং করা উচিত।
অভী বলল। না না, আপনি তো মোটা নন।
বাবলি চায়ের প্লেটটা নামাল। নামিয়ে বলল, নই, না? আমার জাস্ট স্বাস্থ্য। ভালো, তাই না? তারপর চা দিয়ে সিঙাড়া গিলে ফেলে বলল, বিনা কারণে মিথ্যা কথা বলেন কেন?
অভী রীতিমত অপ্রতিভ হয়ে পড়ল। এমন যুবতী সে জীবনে দেখে নি যে নিজেকে মোটা বলে প্রচার করে আনন্দ পায়। জবাবে কিছু বলল না ও।
এমন সময় একটা বাস এসে কাকোকির পুলিশ স্টেশনের সামনে দাঁড়াল। .
বাস থেকে পায়জামা-পাঞ্জাবি ও শাল জড়ানো এক বাঙালি ভদ্রলোক নামলেন। বয়স বেশি না।
ভদ্রলোককে দেখেই অভী উঠে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে বলল, আরে রাজীববাবু যে, কোথায় চললেন?
ভদ্রলোক দূর থেকেই চেঁচিয়ে বললেন, কোহিমা। আপনি? আমিও তাই। অল রোডস, লিড টু রোম। বাবলি জিজ্ঞেস করল, ভদ্রলোক কে বলুন তো? কোথায় যেন দেখেছি মনে হচ্ছে।
অভী বেশ কৃতিত্বের সঙ্গে বলল, একে নিশ্চয়ই দেখেছেন। কলকাতাতেই থাকেন। ইনি ইয়াং জেনারেশানের একজন বেশ নামকরা সাহিত্যিক। এঁর নাম রাজীবলোচন! এঁর বিখ্যাত উপন্যাস “আশ্চর্যপতন” পড়েন নি?
বাবলি উত্তরে কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর নিচের দিকে চেয়ে খুব আতঙ্কিত গলায় বলল, ওমা, ওই দেখুন আপনার রাজীবলোচন ফুল্ললোচনে এদিকেই আসছেন। আপনি নিশ্চয়ই ওঁকে বলবেন, চলুন না, একসঙ্গে গাড়িতেই যাই। বাসে কেন কষ্ট করে যাবেন? তাই না?
অভী হাসল, বলল, হয়তো বলবো। আমি নিজে না বললেও উনিই হয়তো বলবেন, ওই জন্যই বোধহয় উঠে আসছেন।
বাবলি ফিফিস্ করে আদেশের সুরে বলল, না’ করে দেবেন।
–কেন? অবাক হয়ে অভী শুধালো। একজন তরুণ সাহি