পাতাঝরার মরশুমে

পাতাঝরার মরশুমে

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

পাতাঝরার মরশুমে

Books Pointer Iconস্মরণজিৎ চক্রবর্তী
Books Pointer Iconnovel

Change color

হাড়িকাঠটা দেখলেই গা ছমছম করে দিয়েগোর। লাল সিঁদুর মাখানো কালো কাঠের তৈরি জিনিসটা, ইংরেজি ইউ অক্ষরের মতো দেখতে। সারাদিন এরকম ধুলো বালির মধ্যে পড়ে থাকলেও বেশ চকচক করে জিনিসটা। শুনেছে সত্তর-আশি বছর আগেও নাকি এখানে লুকিয়ে চুরিয়ে নরবলি হত। কোনও এক তান্ত্রিক নাকি নর রক্ত পান করতেন।

এই গাছটার পিছনেই একটা বড় বাউন্ডারি ওয়াল। তার মধ্যে একটা বিশাল ম্যানশন ধরনের বাড়ি। আগে দিয়েগো দেখত যে বাড়িটা একদম অযত্নে পড়ে আছে। কেমন প্লাস্টার-খসা, গাছ-গজানো, ভাঙাচোরা চেহারা। কিন্তু গত কয়েক মাসে বাড়িটাকে সারানো হয়েছে, সাজানো হয়েছে। লোহার গেটের ফাঁক দিয়ে ও দেখেছে যে ভেতরের বাগানটাও প্রুন করে সুন্দর করা হয়েছে। হালকা কুসুম রং করা হয়েছে বাড়ির দেওয়ালে। কে বাড়িটায় আসছে কে জানে। তবে যে-ই আসুক সে যে খুবই বড়লোক সেটা দিয়েগো বুঝতে পেরেছে। এই শেষ বিকেলের অল্প আলোতেও নতুন বাড়িটা ঝিকোচ্ছে। দিয়েগো ভাবল এমন বাড়ি বাটানগরে আর নেই।

“কাকা, যাই বলো পরশুর ম্যাচটা কিন্তু জিততেই হবে। তা হলে তিন বছর পরপর কাপটা রাখার চান্স আছে আমাদের। তুই তো জানিস রিটার্ন ম্যাচে ওদের টিম বরাবর হারে। গুরু তোমায় বাঁচাতেই হবে, নিজের নামটা সার্থক করতেই হবে।” জ্যাকসনের কথায় দিয়েগো ওর দিকে মুখ ফেরাল। জ্যাকসনটা এরকমই, কাকা, জ্যাঠা যা খুশি ডাকে। সবাই জ্যাকসন জ্যাকসন বলে বটে, আসলে কিন্তু জ্যাকসন ওর নাম নয়। ওর আসল নাম হল মনোময় মুখোপাধ্যায়। ওকে জ্যাকসন নামে কেন ডাকা হয় তার পিছনে একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে।

দিয়েগোরা তখন ক্লাস এইটে পড়ে। একদিন স্কুলে মনোময় এল অদ্ভুত দেখতে একটা বেল্ট পরে। লাল রঙের, লোহার চকড়াবকড়া নাট-বল্টুর মতো কী সব লাগানো সেটায়। আর বকলেশের জায়গায় লোহার একটা কচ্ছপ লাগানো। স্কুলের সাদা জামা কালো প্যান্টের সঙ্গে একদম মানাচ্ছিল না সেটা। প্রথমেই যাদব স্যারের ক্লাস ছিল। জ্যাকসনের কাণ্ড দেখে তিনি তো রেগে লাল, বললেন, “এসব কী পরেছিস? জোকারের মতো লাগছে। খোল এক্ষুনি, খুলে ফেল।”

মনোময় গম্ভীরভাবে উত্তর দিয়েছিল, “স্যার, বেল্ট খুললেই কেলো হবে, আজ আবার আন্ডার প্যান্ট পরিনি। আর এরকম বেল্ট তো মাইকেল জ্যাকসনও পরে। তখন তো কোনও দোষ হয় না।”

স্যার আর কিছু বলেননি, মানে বলার আর কিছু ছিল না আর কী।

সেই ঘটনাটা কীভাবে যেন সারা স্কুলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

তার পর থেকেই মনোময় হয়ে উঠেছে জ্যাকসন। আর এই ক্লাস টুয়েলভ অবধি পৌঁছোতে পৌঁছোতে মনোময় নামটাই প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে, আর জ্যাকসন নামটা চলে এসেছে সামনের সারিতে। এমনকী স্কুলের হেডস্যার পর্যন্ত মাঝে মাঝে মনোময়ের বদলে জ্যাকসন ডেকে ফেলেন।

তবে হ্যাঁ, একটা ব্যাপার ঠিক বলেছে জ্যাকসন, এই ফুটবল ম্যাচটা জিততেই হবে। তা হলেই পরপর তিনবার ‘টমাস চ্যালেঞ্জ কাপ’ উঠে আসবে ওদের নঙ্গী হাই স্কুলে। যদিও একটা রিটার্ন ম্যাচ আছে, সেটাও ওদের, মানে রবিন মেমোরিয়ালের নিজের মাঠে, কিন্তু গত দু’বারই রিটার্ন ম্যাচটা ওরা হেরেছে। আর সঠিকভাবে বলতে গেলে হেরেছে দিয়েগোর কাছেই। এবার, ক্লাস টুয়েলভের দিয়েগোর নঙ্গী হাই স্কুলের হয়ে শেষবার খেলা। কারণ এইচ এস পাশ করলেই তো এখানকার পাঠ শেষ।

দিয়েগো নামটাও ওর নিজের নয়। ওর আসল নাম দয়ারাম আংরে। ওরা মারাঠি। বহুকাল আগে ওদেরই কোনও পূর্বপুরুষ মহারাজা শিবাজির সেনাপতি ছিলেন। সেই বর্গির আমল থেকে ওরা এই বঙ্গদেশে, ওদের মধ্যে এখন আর মারাঠা দেশের নামগন্ধ নেই। দিয়েগোরা বাংলার জল-মাটির সঙ্গে মিশে সম্পূর্ণ বাঙালি হয়ে গেছে। এমনকী দিয়েগোর মা বাঙালি বাড়ির মেয়ে। বাবা এই ছোট শহরেরই ‘বাটা শু কোম্পানি’-তে ম্যানেজার।

তা বলে সেটাই কিন্তু দিয়েগোর একমাত্র পরিচয় নয়। দিয়েগোর আরেকটা পরিচয় আছে। সেটা হল ওর বাঁ পা। যেটা দিয়ে ও অনায়াসে ফুটবল পা থেকে মাথা আর মাথা থেকে পায়ে নাচায়। খুব সহজেই পাঁচ-ছ’জনকে কাটিয়ে ও পৌঁছে যায় বিপক্ষের গোলে। মাঝ মাঠ থেকে আচমকা ড্রপ শটে গোল করে গোলকিপারকে বোকা বানায় যখন তখন। ফুটবল-পাগল বাটানগরের লোকেরা হাঁ হয়ে ওর খেলা দেখে। তাদের মনে পড়ে যায় এরকমই বেঁটেখাটো, ঝাঁকড়া চুলের একজনকে। নিমেষে যিনি ছত্রাখান করে দিতে পারতেন পৃথিবীর যে-কোনও ডিফেন্স। বল পায়ে যিনি ক্রমশ মানুষ থেকে ঈশ্বর হয়ে উঠেছিলেন। দয়ারাম বল নিয়ে এগোয়, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বিপক্ষের ডিফেন্স। সমস্ত লোকেরা অবাক হয়ে দেখে, বেঁটে, ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটার জাদু। তারা আনন্দে চিৎকার করে ওঠে “দিয়েগো, দিয়েগো।”

দিয়েগো জানে জ্যাকসন পরশুর ম্যাচের কথাটা কেন ওকে বলছে। কারণ ও জানে দিয়েগো ছাড়া গতি নেই। কিন্তু ফুটবল টিম গেম। এভাবে একা কেউ পারে? দিয়েগো বলল, “দুর, কী যে বলিস। আমি একা কী করব? টিম সাপোর্ট না-থাকলে হয়?”

“মাইরি আর কী। ’৮৬ সালে মারাদোনার টিমে কোনও সাপোর্ট ছিল? মারাদোনা পারলে তুইও পারবি।”

“মামদোবাজি, না? কোথায় মারাদোনা আর কোথায় আমি চারাপোনা! ভাগ।”

“গতবারের ম্যাচটায় তো তুই-ই একা ওদের পুঁতে দিলি। চার গোল! মাইরি, ওদের ক্যাপ্টেন রুদ্রকে দেখে মনে হচ্ছিল কোরামিন দিতে হবে। দ্যাখো বস্ তুমি খেলে দাও, বাকিটুকু আমি দেখে নেব।”

বাকিটুকু যে কী সেটা ঠিক বুঝল না দিয়েগো। কারণ খেলার পর আর থাকেটা কী? ভাবল জিজ্ঞেস করবে। পারল না। সামনেই গঙ্গার দিক থেকে জোরে হর্ন বাজল একটা। দিয়েগো মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাল। ওরা বসে আছে গঙ্গার পাড়ে। এখন জোয়ার চলছে। ছোটমতো একটা জাহাজ যাচ্ছে, হর্নটা তারই। শেষ বিকেলের আলোয় ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে গোটা দৃশ্যটা। নভেম্বরের প্রথম, অল্প অল্প ঠান্ডা পড়ছে। কুয়াশাও। গঙ্গার ও-পাড়ের ইটখোলার চিমনি থেকে বেরোনো ধোঁয়ায় একটু ঘোলাটে হয়ে আছে চারিদিক। কিন্তু তবু দারুণ দেখাচ্ছে। গঙ্গার পাড়ে এই বিরাট অশ্বত্থ গাছ, সিঁদুর-মাখা হাড়িকাঠ আর সামনের একফালি সবুজ পাড়। এটাই ওদের আড্ডার জায়গা। ওরা বলে গ্যাজনখানা। রোজ প্র্যাকটিস থেকে ওরা এখানে চলে আসে। ওরা মানে দিয়েগো, জ্যাকসন, ডুডু আর কবীর। মাঝে মাঝে অবশ্য আমনও আসে। আমন ওদের এক বছরের জুনিয়ার। ক্লাস ইলেভেনে পড়ে, সায়েন্স নিয়ে।

তবে আজ আর কেউ নেই। শুধু ওরা দু’জন। “কী রে চুপ মেরে গেলি যে? কিছু অভয়বাণী ছাড়, না হলে তো প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন থেকে চোনা সব ডিসকাউন্ট রেটে পড়তে থাকবে।”

জ্যাকসন আবার খোঁচাল।

“ধুর, আমি কী বলব?” দিয়েগো নিস্পৃহ গলায় বলল।

জ্যাকসন লাফিয়ে উঠল, “ন্যাকামি কোরো না, তুমি হচ্ছ বাটানগরের মারাদোনা। তুমি ইচ্ছে করলেই হবে।”

দিয়েগো নিরুপায় গলায় বলল, “চেষ্টা করব।”

“ব্যস, ব্যস ওতেই হবে। তবে পাঁচ গোলের বেশি দিস 

**********