নেক্রোপুরুষ

নেক্রোপুরুষ

মলয় রায়চৌধুরী

নেক্রোপুরুষ

Books Pointer Iconমলয় রায়চৌধুরী
Books Pointer Iconnovel

Posted byকাব্য রচিত05-Aug-2026

Change color

আমি এতোকাল যা করেছি, তা আমার নিজস্ব আর্ট ফর্ম, আমার সৃষ্টিচেতনার বহিঃপ্রকাশ ।


আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে শুতে ভালোবাসি ; এটাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য । [১]


তলপেটে বারবার ছোরা ঢুকিয়ে আপনি আমার গু-মুতকে রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন, উচিত কাজই করেছেন, জানি ডাক্তাররা আমাকে বাঁচাতে পারবে না, তারা চেষ্টা চালালেও, পুলিশ চাইবে না যে আমি বেঁচে থাকি, আপনি এখন রেকর্ড করতে চাইছেন আমার জীবনের ঘটনাগুলো, কেমন করে আমি এই শিল্পবোধে আক্রান্ত হলুম । করুন, করুন । তবে আপনি যদি আমার কথাগুলো ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে পড়েন, তাহলে ভালো হয় ।


আমার ইংরেজি, শুনে টের পাচ্ছেন নিশ্চয়ই, ইনডিয়ান ইংলিশ নয়, ইস্ট আফ্রিকান ইংলিশ । মাঝে-মাঝে আমি শ্বাস নেবার জন্য জিরিয়ে নেবো ; আপনি ট্র্যান্সক্রিপ্ট নেবার সময়ে ঘটনাগুলোর ঠিকমতন সংযোগ তৈরি করে নেবেন ।


আপনি জানতে চেয়েছিলেন আমি কোথাকার লোক । বলেছিলুম, অখণ্ড বাংলার । তবু আপনি জোর দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন আমি ‘অ্যাকচুয়ালি’ কোথাকার । কেউ কি বলতে পারে সে ‘অ্যাকচুয়ালি’ কোথাকার? বাবার কাছে শুনেছিলুম, আমাদের আদি বাড়ি ছিল চিটাগঙে । ইনডিয়ার পার্টিশানের পর কেউ কি চতুর্থ প্রজন্মে পৌঁছে বলতে পারেন যে তিনি ‘অ্যাকচুয়ালি’ চিটাগঙের বা বরিশালের বা ঢাকার বা কলকাতার বা দিল্লির ?


হ্যাঁ, আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে প্রেম করে পরমসন্তোষ পাই, নাঃ, পেতুম বলা ভালো । মেয়েদের শব মাত্রেই, হোয়াট ইউ কল, সচ্চিদানন্দময়ী, মানে যাদের বুকের বাইরে আর ভেতরে লেজার আলো কিং কোবরার মতন কুণ্ডলি পাকিয়ে ওৎ পেতে থাকে, আচমকা বেরিয়ে জাপটে ধরে, আলোয় আলো করে দ্যায় অস্তিত্বকে ।


এই প্রেমকে বেআইনি ঘোষণা করার মানে হয় না ; যে মারা গেছে তার নির্বাক অনুমতি নিয়েই তো তার সঙ্গে প্রেম করি, করেছি, কেননা মৃত্যু মানেই তো কাম, প্রতিটি নারীর শবই চিরঘুমন্ত সুন্দরী, স্বপ্নের মৌতাতে ভেসে আসে, ডানা মেলে, তাকে দেখতে সাধারণের চোখে ভালো হোক বা না হোক, ওনারা তো নিজের উইলে লিখে যান না যে মৃত্যুর পর কারোর সঙ্গে প্রেম করবেন না । আর নেহাৎই যদি কারোর মনে হয়, যার সঙ্গে প্রেম করতে চলেছেন তার মুখ কুৎসিত, তাহলে তাকে সুন্দরীর স্বপ্ন পরিয়ে দিতে পারেন, বহু সুন্দরীর মুখ আপনারা পেয়ে যাবেন পোস্টারে, বিজ্ঞাপনে, চকচকে পত্রিকার পাতায়, চোখ বুজে ইচ্ছামতন তা থেকে নিজের কল্পনা বেছে নিতে পারেন ।


কুয়াশায় মোড়া সন্ধ্যা কি বেআইনি, ধানখেতের ওপর দিয়ে বেগে পেছু নেয়া বৃষ্টি কি বেআইনি, শিমুলের কৌটো ফেটে উড়তে থাকা রোঁয়া কি বেআইনি, আঙুরঝুমকোয় লুকিয়ে থাকা মদ কি বেআইনি, সূর্যকে ঢেকে ফেলা গ্রহণের কালো কি বেআইনি, সমুদ্রের নীলে ধনুকের মতন তিমির নাচ কি বেআইনি, হরিণকে লক্ষ্য করে উড়ন্ত গতিতে ছুটতে থাকা চিতাবাঘ কি বেআইনি, মরুভূমিতে অতিদূরে ভেসে ওঠা মরিচিকার টলটলে জল আর খেজুরগাছের সবুজ সারি কি বেআইনি ! নয়তো ? তবে ? [২]


বুঝলেন তো ? আমি মৃত্যুর কালো নোংরা বোটকা বাসি মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চেঁচাই, মানে চেঁচাতুম, ‘ফেরত নিচ্ছি, ফেরত নিচ্ছি, ফেরত নিচ্ছি’; আমার চিৎকার শুনে মৃত্যু কালোকে ফর্সা করে তোলে, বোটকাকে সুগন্ধী করে তোলে, বাসিকে তরতাজা চনমনে করে তোলে । তার জন্য সাহস দরকার, ক্ষমতার সাহস, যে ক্ষমতা থাকে শরীরে, এই যে এইখানে, চেয়ে দেখুন, এইখানে ; কাপুরুষদের অমন সাহস থাকে না, কেননা তারা মতান্ধ, তারা নীতিবাদী, তারা আদর্শবাদী, তারা মৌলবাদী, তারা ফাঁকিবাজ, তারা কেবল অন্যের মগজে সুড়সুড়ি দেবার তালে থাকে । ক্ষমতা হল জ্ঞান, জৈব রসায়ন, ধৈর্য ধরে থাকতে হবে।


রাজনৈতিক দলরা দেশে দেশে ক্ষমতা চায় কেন ? ক্ষমতাকে সেই দলের কয়েকজন, বা কেবল একজন, কুক্ষিগত করতে চায় কেন ? অন্যের, মানে জনসাধারণের, ভালোর জন্য নিশ্চয়ই নয় । একবার কেউ ক্ষমতা দখল করলে জোঁকের মতন লেগে থাকে, রক্ত চুষে-চুষে খায় ; তারা ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোথাও পৌঁছোতে চায় না, কেননা ক্ষমতাই তাদের লক্ষ্য । বুঝলেন তো ? মৃত্যুর সঙ্গে যদি ক্ষমতাকে একাকার করে দেয়া যায়, তার চেয়ে কাম্য আর কিছু হতে পারে না । ইতিহাস ঘাঁটলেই টের পাবেন একনায়করা মৃত্যুকে কতো অনায়াসে ক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে-মিশিয়ে শাসন করে গেছে বছরের পর বছর, আর জনসাধারণ তখন পিণ্ড পিণ্ড শব, অবাধে প্রতিরোধহীন প্রেম করে গেছে ক্ষমতাধরের সাথে, তার নামে স্লোগান দিয়েছে, পতাকা উড়িয়েছে । [৩]


হ্যাঁ, আমি মেয়েদের শবের সঙ্গে প্রেম করতে ভালোবাসি ; বারবার ভুল করে ফেলছি, মরে যাবো কিছু দিনের মধ্যেই জেনেও অভ্যাস ছাড়তে পারছি না । ভালোবাসতুম, ভালোবাসতুম । মেয়েমানুষের শব মাত্রেই মহানন্দময়ী, মানে রিডিমিং, অস্তিত্বের উত্তরণ ঘটায় ।


একনায়কদের দেখবেন, তারা নিজেদের ক্ষমতার প্রতি সৎ, জীবনকে সমুদ্রের মতন সাগরে সাগরে বয়ে যেতে দেয় । একনায়কের জন্য, দলের জন্য, সম্প্রদায়ের জন্য, বিশেষ দর্শনের উদ্দেশে, যারা মরে যাবার জন্য সব সময় এক পা এগিয়ে, তারা ঘৃণ্য, তারাই ঘৃণ্য, ঘৃণ্য, ঘৃণ্য । দেখছেন তো সাদ্দাম হোসেনকে সরাবার পর সে দেশে কী ঘটছে, গাদ্দাফিকে সরাবার পর লিবিয়ায় কী ঘটছে, আফগানিস্তানে, সিরিয়ায় কী ঘটে চলেছে ! ভালোবাসা সে দেশগুলোয় বালির ঝড়ের সঙ্গে উড়ে চলে গেছে । এতো খুনোখুনি, যদি তারা নারীর শবকেও ভালোবাসা দিত, তাদের দেশে শান্তি নেমে আসতো । তারা তো নারীকে সম্ভ্রম জানাতেও কুন্ঠিত, আফগানিস্তানে ঢিল মেরে-মেরে যুবতীদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে আজও, নারীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হচ্ছে । দেখে, আমার ইচ্ছে করেছে আমি ওই বোরখা-ঢাকা নারীদের শবদেহকে জড়িয়ে কাঁদি।


আমি কোনো তর্কেই ঘৃণার যোগ্য নই । আমি ভালোবাসাকে মাংসের গেঁতো নোংরামি থেকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছি ।


দেহের ক্ষমতা অবাধ, নিজেকে জানতে হলে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করতেই হবে, ক্ষমতা কেউ দেয় না, নিজের ভেতর ডুবে তুলে আনতে হয় । ক্ষমতা থাকলে ভয়ও ভয়কে ভয় পায় । কোনো একজন মহাত্মা বলে গেছেন যে, যেদিন প্রেমের ক্ষমতা কাবু করতে পারবে ক্ষমতার প্রেমকে, সেদিন পৃথিবীতে নেমে আসবে শান্তি । আমি প্রেমের ক্ষমতা আর ক্ষমতার প্রেমকে মৃত্যুর বিন্দুতে মেলাতে পেরে শান্তির শীতল স্বর্গ গড়ে তুলতুম । প্রতিটি শবের সঙ্গে প্রেম করার সময় আমি নিজের কথা একেবারে ভুলে যেতুম, নির্বাকের সঙ্গে নির্বাক আলাপ দিয়ে শুরু করতুম, তার দুঃখযন্ত্রণায় তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতুম, প্রেম তো নির্বাক চিৎকার, যার সঙ্গে প্রেম করতুম, সে হাসিমুখে শুনে যেতো । সত্যকার ভালোবাসা কেবল মেয়েমানুষের শবের সঙ্গে সম্ভব । কোনো নারী যদি সত্যকার ভালোবাসা পেতে চায় তাহলে তাকেও পুরুষের শবের সঙ্গে প্রেম করতে হবে, অন্যথায় তাদের মাঝে যা ঘটবে তা ধর্ষণের নামান্তর ।


শবের দুঃখে আমি কষ্ট পাই, পেতুম , শবের যন্ত্রণায় আমি যন্ত্রণা ভোগ করি, করতুম ।


শরীর হলো সাম্রাজ্য , তার যাবতীয় গোপনতা অতিপবিত্র, সে চায় সত্যকে চূড়ান্তভাবে জয় করতে, শরীরের আনন্দ-আহ্লাদকে সিরিয়াসলি নিতে হবে, সিরিয়াসলি মানে জানেন তো, সে তো জানবেনই, আপনি ইংরেজি সাহিত্যে গ্র্যাজুয়েট, বলেছে পুলিশের অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার, যে আপনি বিদূষী, অনেক কিছুই জানবেন, তবে আপনি নাকি কোকেন জাতীয় রাসায়নিক মাদকও নেন, উত্তরাধুনিক জীবনযাপন করেন, আর সেই সূত্রেই এই ছেলেগুলোর সঙ্গে আপনার আলাপ ।


আমি ছোঁড়া চারটেকে বারবার বলেছি, বলতুম, নেশাটা একটু কম কর তোরা, নয়তো নিজেরাও ডুববি, আমাকেও ডোবাবি । শেষ পর্যন্ত তাই হল । ওদের কাছ থেকে আপনি আমার হদিশ পেলেন ।


আপনার দিদি আপনার মাদক নেবার অভ্যাস ছাড়াতে না পেরেই আত্মহত্যা করেছিলেন, তাও বলেছে পুলিশের ইনভেসটিগেটিং অফিসার । দিদিই আপনার অভিভাবক ছিলেন । আপনার উত্তরাধুনিক জীবনযাত্রা, রেভ পার্টিতে গিয়ে সারারাত ধুন্ধুমার নাচ, অচেনা-অজানাদের সঙ্গে ডিসকোয় মাতাল হওয়া, সপ্তাহান্তের উল্লাসে মাদকে আচ্ছন্ন হয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফেরা, অনুমোদন করেননি আপনার দিদি । আপনি ওনার নিষেধ শোনা প্রয়োজন মনে করেননি, উঁচু পদের চাকরিতে প্রচুর রোজগার করেন আর ব্যয় করেন, শুনেছি আপনার গল্প।


জানি, ওদের, ছেলে চারটেকে, আপনি নিজের সঙ্গে এনেছেন পুলিশকে অনুরোধ করে, আমার জীবনের ঘটনা যাতে ওরাও শোনে, ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ে ছেড়ে দিয়েছিল, আমার এই ইংরেজি আত্মজীবনী ওরাও বুঝতে পারছে নিশ্চয়ই । ওই তো মাথা নাড়ছে, বুঝতে পারছে দেখছি ।


আপনি অভিযোগ দায়ের করেছেন যে আমি নেকরোফাইল, ডাক্তাররাও বলেছে আমি নেকরোফিলিয়া রোগে ভুগি, পুলিশও দণ্ড সংহিতার সেই ধারায় আমাকে গ্রেপ্তার করে, হাসপাতালে চারজন সশস্ত্র পুলিশেকে এই ঘরে বসিয়েছে । কিন্তু বিস্বাস করুন, আমি নেকরোফাইল নই, নেকরোফিলিয়া নামে কোনো মানসিক রোগে ভুগি না, ইনসমনিয়া বা ডিমেনশিয়াতেও ভুগি না ।


আমি প্রেমের শিল্পবোধে ভুগি, নারীদেহের সঙ্গে প্রেমের শিল্পবোধে । প্রেম করা তো বেআইনি নয় । তাহলে কেন আপনি আমাকে ঘৃণার পাত্র বলে মনে করলেন ! ভুল, ভুল, ভুল, আপনাদের সবায়ের ভুল । যুদ্ধক্ষেত্রের মৃত্যু-মহামারীর মাঝে, গৃহযুদ্ধের খুনোখুনির মাঝেও, আমি খুঁজে পেয়েছি প্রেমের শান্তি, নারীদেহের শবকে জড়িয়ে, সারারাত জেগে থেকে । [৪]


মৃত্যু আমাকে ভালোবাসে, বলুন ঠিক কি না, নয়তো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকব কেন ! আমি মৃত্যুকে ভালোবাসি, মৃতার শরীরকে ভালোবাসি, মৃত্যুর ঐন্দ্রজালিক গন্ধকে ভালোবাসি,আর তো কখনও ভালোবাসতে পারব না তাদের, তারাও, কৃষ্ণাঙ্গী শবদেহরাও, আমাকে ভালোবাসতো, তাই চোখ বন্ধ করে থাকতো, আমি চোখের পাতায় চুমু খেতুম, এই ভালোবাসা ছিল শর্তহীন, প্রেম করার সময়ে আমি সেই নারীদেহের বয়ফ্রেণ্ড, প্রেমিক, স্বামী, বন্ধু, অভিভাবক, তারা তা জানে, আই মিন জানতো, জানতো কিনা বলুন, শবদেহ তো জানে যে ও মাত্র কয়েকদিনের অতিথি, দিনকতক পরেই কুৎসিত হয়ে যাবে, পচতে থাকবে, গায়ে পোকা ধরবে, হাড় চুণ হয়ে যাবে, বা ছাই হয়ে হাওয়ায় মিশে যাবে।


চোখের পাতায় বারবার চুমু খেয়ে আমি অনেকে শবদেহের চোখের পাতা মেলে ধরতে শিখিয়েছি, তারা অতিপরিচিতের মতন আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতো, ধন্যবাদ জানাতো অপলক ।[৫]


মৃত্যুর পরের দিনও কেবল ঠোঁটেই থাকে বিশুদ্ধতার জীবাণু ; শরীরের সবচেয়ে অনাবৃত এরোগেনাস এলাকা হল মানুষের ঠোঁট, যেখানে গিয়ে কেন্দ্রিত অজস্র স্নায়ুর শেষবিন্দু, সেখানে সামান্য স্পর্শ আমাদের মস্তিষ্কে তথ্যের প্রপাত গড়ে তোলে, ক্যানভাসে হাজার রঙের তুলির ছোঁয়ার মতন । চুমুর ম্যাজিকের মাধ্যমে শরীরে হরমোন আর নিউরোট্র্যান্সমিটারের ঝড় ওঠে । চুমু থেকে যে স্নায়বিক অনুপ্রাণন গড়ে ওঠে তা ত্বক, মগজ, মুখের মাংসপেশী আর ঠোঁটে অবিরাম আনাগোনা করে, যতক্ষণ চুমু খাওয়া বজায় থাকে ততক্ষণ । প্রগাঢ় চুমুর ফলে স্নায়ুবার্তা সৃষ্টি করে ডোপামাইন রসায়ন, যে রসায়ন থেকে আসক্তি আর আকাঙ্খার উৎসার ঘটে