কনকলতা

কনকলতা

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কনকলতা

Books Pointer Iconসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
Books Pointer Iconnovel

Posted byপাঠক সমাজ22-Jul-2026

Change color

অল্প বয়েস থেকেই ক্ষেমেন্দ্রর চরিত্র অতি বিচিত্র। মানুষকে সাধারণত তার পরিবার ও পরিবেশের পটভূমিকায় বিচার করা হয়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে কতকগুলি ছাঁচ আছে, সেই অনুযায়ী তৈরি হয় মানুষ। পুরুতের ছেলে পুরুত, উকিলের ছেলে উকিল, চাষার ছেলে চাষা। ডাক্তারের ছেলে বড়জোর ইঞ্জিনিয়ার হয়, কিন্তু তাকে গৃহভৃত্য হিসেবে কল্পনা করা যায় না। কিছু কিছু ব্যতিক্রম আছে, সেগুলোও নিয়মের মধ্যেই পড়ে। ধনী পরিবার হঠাৎ দরিদ্র হয়ে যেতে পারে। কোনো কারখানার শ্রমিক অকস্মাৎ হয়ে উঠতে পারে সম্পন্ন ব্যবসায়ী। এই সব ব্যতিক্রম প্রমাণ করে যে আমাদের সামাজিক কাঠামোর চতুর্দিকে দুর্গের মতন সুদৃঢ় দেওয়াল নেই, কিছু কিছু স্বাধীন সুযোগের পথও খোলা রয়েছে। পথগুলোর দু'একটাই মাত্র ওঠে ওপরের দিকে, বেশির ভাগই নেমে যায় গভীর খাদে। ক্ষেমেন্দ্রকে অবশ্য এই নিয়ম কিংবা ব্যতিক্রম কোনোটার সঙ্গেই মেলানো যেত না ঠিক। ক্ষেমেন্দ্রর জন্ম কলকাতার এক বিশিষ্ট বংশে। ক্ষেমেন্দ্রর ঠাকুর্দা হরিশঙ্কর ঘোষাল ব্রিটিশ আমলে সামান্য অবস্থা থেকে ভাগ্য ফিরিয়ে ছিলেন। সমুদ্র-পার থেকে সাহেবরা এ দেশে এসেছিল শাসন ও শোষণ করতে, সেই শোষণের যন্ত্র হিসেবে কিছু কিছু দিশি লোকদেরও কাজে লাগানো প্রয়োজন ছিল তাদের। সাহেবরা অনুগ্রহ করে তাদের ছিটেফোঁটা দিত, কারুর কারুর ক্ষেত্রে এই ছিটেফোঁটা লাগা আঙুলই এক সময় হঠাৎ ফুলে গিয়ে কলাগাছ হয়েছে। এ ইতিহাস এখন সকলেরই জানা। হরিশঙ্কর ঘোষাল একটি ব্রিটিশ কম্পানিতে সাধারণ কর্মচারী হয়ে ঢুকেছিলেন, ক্রমে তিনি সেই কম্পানির এজেন্ট হন। যখন ঝনঝন শব্দে প্রত্যাশার অতীত টাকা-পয়সা আসতে লাগলো তাঁর পকেটে, তখনও হরিশঙ্কর মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পেরেছিলেন। তিনি জানতেন, ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মী অতি চঞ্চলা, টাকা-পয়সা, সোনা-দানা সবই এক সময় মায়ার মতন মিলিয়ে যেতে পারে। একমাত্র স্থির সত্য হলো মাটি। টাকা পয়সাগুলোকে তিনি দ্রুত মাটিতে রূপান্তরিত করতে লাগলেন। অর্থাৎ জমিদারি কিনতে লাগলেন একের পর এক। জীবদ্দশাতেই তিনি ইংরেজদের দালালির পরিচয় ঘুচিয়ে প্রখ্যাত জমিদার হলেন। বন্ধ করে দিলেন এজেন্সি হাউজ, কোনো রকম ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেন না। তখন বাঙালীদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের খানিকটা নীচু চোখে দেখা হতো, জমিদারদের সম্মানের সঙ্গে তাদের কোনো তুলনাই চলতো না। হরিশঙ্করের জমিদারির প্রধান অংশ বীরভূম ও বর্ধমানে, কিন্তু তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী তিনি কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোডে একটি বিশাল বাড়ি বানালেন। বাড়ি তো নয়, প্রাসাদ। পথ-চলতি মানুষেরা সে বাড়ির দিকে ফিরে ফিরে তাকাতো। মাঝে মাঝেই শহরের বড়মানুষদের ডেকে ভোজ দিতেন হরিশঙ্কর, তাতেই তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়লো। বেশ একটা পরিপূর্ণ জীবন উপভোগ করে হরিশঙ্কর শেষ নিশ্বাস ফেলেছিলেন। হরিশঙ্করের চার মেয়ে, এক ছেলে। এটাও তাঁর একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। তখনকার দিনে মেয়েদের পিতৃসম্পত্তিতে কোনো অধিকার ছিল না। বাছা বাছা পাত্রের সঙ্গে, যথেষ্ট অর্থ-ব্যয় করে, একটু দূরে দূরে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছিলেন হরিশঙ্কর। এক ছেলে তাঁর বংশরক্ষা করবে এবং সমস্ত সম্পত্তিও অটুট রাখবে। হরিশঙ্করের ছেলে জ্ঞানশঙ্কর তাঁর পিতাকে নিরাশ করেন নি। তাঁর বিষয়বুদ্ধি যথেষ্ট। তিনি জমিদারি সম্প্রসারণ করলেন এবং আয় বাড়ালেন। অন্যান্য কিছু কিছু জমিদারদের মতো তাঁর নিছক আমোদ-বিলাসের দিকে ঝোঁক ছিল না। কলকাতা ছেড়ে তিনি প্রায়ই জমিদারি পরিদর্শনে যেতেন এবং সেই সময় কয়েকটা দিন বোলপুরে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আশ্রমে থেকে আসতেন। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য ছিলেন জ্ঞানশঙ্কর, জমিদারির আইনকানুন বিষয়ে তাঁকে পরামর্শ দিতেন। শান্তিনিকেতনের আশ্রমের জমি সংক্রান্ত কোনো সমস্যা দেখা দিলে জ্ঞানশঙ্করকে চিঠি লিখতেন রবীন্দ্রনাথ। ঘোষালদের ভবানীপুরের প্রাসাদেও রবীন্দ্রনাথ দু'বার পদার্পণ করেছেন। জ্ঞানশঙ্করের স্ত্রী হিরণ্ময়ী যখন যমজ পুত্র-কন্যার জন্ম দিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাদের নামকরণ করে চিঠি পাঠালেন শান্তিনিকেতন থেকে। কন্যার নাম স্রবন্তী আর পুত্রের নাম স্রগবান। স্রবন্তীর অর্থ প্রবাহিণী, নদী। আর স্রগবান হচ্ছে মাল্যবান। কন্যার নামটি বেশ পছন্দ হলেও পুত্রের নামটি বড়ই খটোমটো, হিরণ্ময়ীর মোটেও পছন্দ নয়, কিন্তু কবিগুরুর দেওয়া নাম প্রত্যাখ্যানও করা যায় না। পুত্রের নাম কাগজে কলমেই রইলো স্রগবান, ডাকনাম দেওয়া হল চন্দ্র, পরবর্তীকালে সেই পুত্র চন্দ্রবাবু বা চাঁদুবাবু নামেই সবার কাছে পরিচিত। জ্ঞানশঙ্কর তাঁর বাড়িতে বড় বড় ওস্তাদদের ডেকে গান-বাজনার আসর বসাতেন। রামকৃষ্ণ মিশন ও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে দান-ধ্যান করতেন নিয়মিত। কোনো দুঃস্থ ছাত্র বি এ পরীক্ষার ফি যোগাড় করতে না পারলে প্রমাণের কাগজপত্র নিয়ে চলে আসতো ঘোষাল-বাড়িতে। এদের সাহায্য করার জন্য জ্ঞানশঙ্করের ঢালাও আদেশ দেওয়া ছিল। এইসব কারণে জ্ঞানশঙ্করের যশ ছড়ালো চতুর্দিকে। তাঁর পিতা ছিলেন শুধু ধনী জমিদার, জ্যানশঙ্কর হলেন অভিজাত। বাঙালী অ্যারিস্টোক্রাটদের অন্যতম। যমজ ছেলে-মেয়ের জন্ম দেবার পর হিরণ্ময়ীর আর কোনো সন্তান হয়নি। চন্দ্র আর স্রবন্তী বড় হয়ে উঠতে লাগলো, দু'জনেরই ভারি সুন্দর চেহারা। চন্দ্র লেখাপড়াতেও ভালো, স্কুল ছেড়ে সে ভর্তি হলো প্রেসিডেন্সি কলেজে। স্রবন্তীকে শান্তিনিকেতনে পাঠাবার খুব ইচ্ছে ছিল জ্ঞানশঙ্করের কিন্তু হিরণ্ময়ী কিছুতেই মেয়েকে কাছ-ছাড়া করতে চান না। একবার শীতের সময় কাশীতে বেড়াতে গিয়ে হিরণ্ময়ীর সঙ্গে পরিচয় হলো নাটোরের মেজোতরফের রানীর সঙ্গে। সেই রানী স্রবন্তীকে দেখে এমনই পছন্দ করে ফেললেন যে তখুনি তার সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে দিতে চান। স্রবন্তী তখন সবে মাত্র ষোলো ছাড়িয়ে সতেরোতে পা দিয়েছে, প্রস্তুত হচ্ছে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার জন্য। ভাইয়ের তুলনায় সে পড়াশুনোতে একটু পিছিয়ে ছিল। জ্ঞানশঙ্কর চেয়েছিলেন মেয়েকেও তিনি ছেলের মতন উচ্চশিক্ষা দেবেন। কিন্তু নাটোরের রানী খুবই পীড়াপিড়ি করতে লাগলেন, হিরণ্ময়ীরও খুব ইচ্ছে, একটা রাজবাড়ির সঙ্গে কুটুম্বিতা করলে তাঁদের বংশমর্যাদা আরও বাড়বে। জ্ঞানশঙ্কর বেশি বাধা দিতে পারলেন না। দারুণ ধুমধাম করে হলো সেই বিয়ে। কিশোরী স্রবন্তী বধূ হয়ে চলে গেল নাটোর রাজবাড়ির অন্তঃপুরে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে চন্দ্র অর্থনীতি নিয়ে বি এ পাশ করলো সসম্মানে। এরপর তার এম এ পড়ার সাধ। এই সময় কানাঘুষো শোনা গেল, একটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান তরুণীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। তাকে নিয়ে সে ময়দানে হাওয়া খেতে যায়। বেশি রাত করে বাড়ি ফেরে। হাতখরচের জন্য সে যা পায় তাতে তার কুলোয় না, মায়ের কাছ থেকে সে প্রায়ই আবদার করে অতিরিক্ত টাকাপয়সা নেয়। এ-খবর শুনে জ্ঞানশঙ্কর এবং হিরণ্ময়ী দুজনেই দারুণ শংকিত হলেন। এ পরিবারে এ পর্যন্ত কোনোরকম বেলেল্লাপনার ঘটনা ঘটেনি। এত বড় বাড়িতে আশ্রিত-পরিজনের সংখ্যা অনেক, তাদের মধ্যে জ্ঞানশঙ্করের এক মামাতো ভাই মদ্যপান করে এক রাত্তিরে খানিকটা হাঙ্গামা বাধিয়েছিল। পরদিন সে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলেও জ্ঞানশঙ্কর দয়া করেন নি, সেই মামাতো ভাইটিকে বাড়ি থেকে বিদায় করে দিয়েছিলেন। ছেলেকে সুপথে ফেরাবার জন্য একমাত্র উপায় তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে সংসারী করা। হিরণ্ময়ী জেদ ধরলেন, এক মাসের মধ্যেই তিনি ছেলের বিয়ে দেবেন, তার আগে এই এক মাসের জন্য ছেলেকে পাঠিয়ে দেওয়া হোক আমেদপুরের কুঠিবাড়িতে, জমিদারির কাজকর্ম শিখুক। জ্ঞানশঙ্কর ইতস্তত করতে লাগলেন। তাঁর নিজের স্বাস্থ্য ভালো, জমিদারি তিনি নিজেই আরও দীর্ঘকাল সামলাতে পারবেন। তিনি চেয়েছিলেন, ছেলেকে এম এ পাশ করিয়ে বিলেত ঘুরিয়ে আনাবেন। ইদানীং বিদ্বান জমিদারদের সমাদরই বেশী। শুধু জমিদারি পরিচালনা নয়, লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে আসন নিয়ে তাঁরা রাজনীতিতেও অংশগ্রহণ করছেন। আর একটা চিন্তাও জ্ঞানশঙ্করের মাথায় ঘুরতে লাগলো। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ছুঁড়িটার সঙ্গে চাঁদুর ঘনিষ্ঠতা হয়েছে ঠিক কতখানি? দাঁদু কি ওর অঙ্গ স্পর্শ করেছে? ওদের কি সহবাস হয়েছে? জ্ঞানশঙ্করের নৈতিকতা এমনই প্রবল যে কোনো পুরুষের পক্ষে একাধিক নারীর সঙ্গে মিলন তাঁর কাছে অকল্পনীয়। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান হোক আর যাই-ই হোক, এক রমণীর সঙ্গে চাঁদুর শরীর-সংস্পর্শ হলে তাকেই তো বিবাহ করা উচিত। জ্ঞানশঙ্করের মুখে এরকম সংশয়ের কথা শুনে হিরণ্ময়ী কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। স্বামী-গর্বে তাঁর বুক ভরে গেল। তাঁর স্বামী কোনোদিন দ্বিতীয় নারীর দিকে চোখ তুলে তাকান নি। কিন্তু নারী হিসেবে হিরণ্ময়ী জানেন, পুরুষরা সতীত্ব নিয়ে যতটা ছুঁৎমার্গ করে, স্ত্রীলোকেরা ততটা গুরুত্ব দেয় না। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক, প্রায় সমস্ত স্ত্রীলোককেই একাধিক পুরুষের স্পর্শ সহ্য করতেই হয়। নারীর জীবনে যত গোপন ঘটনা থাকে তা বোধহয় স্বয়ং ব্রহ্মাও জানতে পারেন না। পুরুষমানুষ হচ্ছে সোনার থালা, তাতে কোনো দাগ লাগে না। চাঁদু যদি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েটাকে ছোঁওয়া-ছুঁয়ি করেও থাকে, তাতেও মহাভারত অশুদ্ধ হয় নি। কিন্তু তাই বলে ঘোষাল পরিবারে একটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েকে পুত্রবধূ করে আনার কোনো প্রশ্নই উঠে না। জ্ঞানশঙ্করের অতি বিশ্বস্ত অনুচরের নাম নকুল। একমাত্র তারই অধিকার আছে অন্দরমহলে প্রবেশ করার। এই নকুল চাঁদুকে দুদিন অনুসরণ করে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েটিকে দেখে এসেছে। তার কাছে প্রশ্ন করে হিরণ্ময়ী জানলেন যে সেই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েটি অসাধারণ সুন্দরী, তার দুধে-আলতা রং, হরিণ-পানা চোখ, মেঘের মতন চুল। তাদের পরিবারটিও হেলাফেলা করার মতন নয়। ভিভিয়ান নাম্নী ওই মেয়েটির বাবা রেল কোম্পানিতে বড় ইঞ্জিনিয়ার। ভিভিয়ান কনভেন্টের ছাত্রী, লেখাপড়ায় ভালো। এসব শুনে হিরণ্ময়ী আরও ভয় পেয়ে গেলেন। কোনো নষ্ট-চরিত্রের নারীর সঙ্গে চাঁদু কিছুদিন ঘোরাফেরা করলে তেমন বিপদের কিছু ছিল না, টাকা-পয়সা খরচ করে সেরকম মেয়েকে সরিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু যদি প্রেম হয়? হিরণ্ময়ী নকুলকে বলে দিলেন, যেমন ভাবেই হোক, এক মাসের মধ্যে এক পরমা রূপসী কন্যাকে খুঁজে বার করতেই হবে, সে কন্যা অতি গরিব ঘরের হলেও ক্ষতি নেই, সে কন্যা যেন রূপে ঐ মেমসাহেবটিকে টেক্কা দিতে পারে, তার কিছু বিদ্যাও থাকা চাই। খোঁজাখুঁজি চললো চতুর্দিকে। চাঁদুকে আমেদপুর যাবার প্রস্তাব দিতে সে কিছুমাত্র আপত্তি জানালো না, সে পরিতোষ নামে এক বন্ধুকে নিয়ে চলে গেল। সেখানে দু'বন্ধুতে ঘোড়ায় চড়া শিখতে লাগলো এবং গ্রামে গ্রামান্তরে গিয়ে খোঁজখবর নিতে লাগলো প্রজাদের। এদিকে যখন পাত্রী দেখা চলছে গণ্ডায় গণ্ডায়, তারই মধ্যে আবার একটি উদ্বেগজনক সংবাদ আনলো নকুল। ভিভিয়ানকেও নাকি কলকাতায় দেখা যাচ্ছে না। সে গেল কোথায়? সে খবরও যোগাড় করতে দেরি হলো না। লর্ড সিনহাদের পরিবারের সঙ্গে ভিভিয়ানের বাবার বিশেষ পরিচয় আছে, সেই সূত্রে ভিভিয়ান ও তার ছোট বোন লর্ড সিনহাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেছে। সিনহাদের জমিদারি বীরভূমেরই রায়পুরে। আমেদপুর থেকে রায়পুর তো খুব বেশি দূর না! তবে কি ওরা দু'জনে ষড়যন্ত্র করেই কলকাতার বাইরে চলে গেছে? রাতের পর রাত হিরণ্ময়ী ও জ্ঞানশঙ্কর দুশ্চিন্তায় আর ঘুমোতে পারেন না। চাঁদু তাঁদের একমাত্র পুত্র ও বংশধর। সে শান্ত, ভদ্র এবং বুদ্ধিমান, তবে কখনো কখনো তার তীব্র জেদ প্রকাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু তা অন্যায় জেদ নয়। তাকে নিয়ে আগে কখনো কোনো সমস্যায় পড়তে হয় নি তার মা-বাবাকে। এখন চাঁদু কি এক খৃষ্টানকে বিয়ে করে বংশমর্যাদা ডোবাতে চায়? উঠতি বয়েসের যুবা, রূপমুগ্ধ পতঙ্গ, তাকে জোর করে ফেরাতে গেলে যদি সে বিগড়ে যায় একেবারে? বংশমর্যাদার প্রশ্ন তুললে যদি সে বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কই ত্যাগ করে? চাঁদু ও ভিভিয়ানের প্রণয়কাহিনীর প্রকৃত মর্ম জ্ঞানশঙ্কর ও হিরণ্ময়ী কোনোদিনই জানতে পারেন নি। তার কারণ তাঁরা ভিভিয়ানকে শুধুমাত্র একটি আংলো ইন্ডিয়ান যুবতী বলেই ধরে নিয়েছিলেন। সব মানুষই যে এক ছাঁচের মধ্যে পড়ে না, মানুষই এটা বোঝে না। সব ব্রাহ্মণেরই যেমন ব্রাহ্মণত্ব নেই, তেমনি সব অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের অ্যাংলো ইন্ডিয়ানত্বই একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। ভিভিয়ানরা পাঁচ ভাই বোন। তার তিন দাদা বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রেলে চাকরি নিয়েছে, ছড়িয়ে আছে ভারতের নানা প্রান্তে। তারা না ইংরেজ, না ভারতীয়। ইংরেজরা তাদের খুব কাছে ঘেঁষতে দেয় না, আর ভারতীয়রা তাদের থেকে দূরে সরে থাকে। তারা ভারতীয়দের কাছে সাহেব সেজে থাকে, অথচ প্রকৃত সাহেবরা তাদের মনে করে ভারতীয়। তারা ইংরিজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানে বলে না। কিন্তু ইংরেজরা তাদের উচ্চারণ সম্পর্কে বিদ্রুপ করে। এটাই তখনকার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ছাঁদ। কিন্তু ভিভিয়ানের যখন সাত বছর বয়েস তখন হাঙ্গা