আমাদের সেই শহরে

আমাদের সেই শহরে

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

আমাদের সেই শহরে

Books Pointer Iconস্মরণজিৎ চক্রবর্তী
Books Pointer Iconnovel

Change color

“তোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”

এই প্রেডিকশনটা যে এমনভাবে একেবারে প্রথম দিনেই ফলে যাবে তা বুঝতে পারিনি। সত্যিই চারদিকটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যুদ্ধের বাজার। সাইরেন বেজেছে। বোমারু বিমান হানা দেবে যে-কোনও মুহূর্তে। হস্টেল থেকে বেরোবার সময় শুনলাম, কোথায় যেন ট্রান্সফরমার বিগড়েছে। নাও, ঠ্যালা বোঝে। মেসে গিয়ে রাতের খাবার সারার আগে এবড়ো-খেবড়ো পথে হোঁচট খেয়েই বোধহয় পেট ভরে যাবে। আমি ছোট-ছোট পায়ে এগোতে লাগলাম। নভেম্বরের প্রথম এখন। অল্প হিম পড়ছে। হস্টেল থেকে বেরোবার সময় দেবুকাকা ছিল আমার সঙ্গে। বলেছিল মাফলারটা মাথায় পেঁচিয়ে নিতে। নিয়েওছিলাম। কিন্তু অটো করে দেবুকাকা হোটেলের দিকে চলে যাওয়ার পর মাফলার খুলে নিয়েছি। এমনিতেই অন্ধকার তার উপর মাফলার জড়ালে মনে হচ্ছে যেন আরওই দেখতে পাচ্ছি না কিছু।

“কানা, বদ্ধকানা তুই। না হলে জয়েন্টে কেউ প্রশ্ন পড়তে ভুল করে!এখানে যদি ইঞ্জিনিয়ারিংটায় চান্স পেতিস, তা হলে অতদূর ঠ্যাঙাতে হত তোকে? নে, যা, ইডলি সাম্বার গেল। ওখানে গিয়েও যদি নিজের এমন ক্যালাসনেস দেখাস, তবে কিন্তু তোর ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”

হাওড়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে যখন মামা কথাগুলো বলছিল, চোখ ফেটে জল আসছিল আমার। এমনিতেই আমি হোমসিক ধরনের, তার উপর এতদূরে থাকা! আমার কেবল বাড়ির কথা, বন্ধুদের কথা মনে পড়ছিল। আর তার মাঝে মামার অমন খোঁচা!

এখন, এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সেই কথাগুলো মনে পড়তেই চোখটা জ্বালা করে উঠল। কে জানে আমার পোষা বেড়ালটা কী করছে এখন? বন্ধুরা কি আড্ডায় জড়ো হয়েছে সব? বোনটার গানের মাস্টার এসেছে? বাবা কি ফিরেছে অফিস থেকে?

আমি কিছু জানি না। শুধু জানি এই ঘুটঘুটে অন্ধকার পেরিয়ে আমায় আপাতত পৌঁছতে হবে ওই মেসে।

এই জায়গাটার নাম শ্রীপুরম। বেঙ্গালুরু থেকে এর দূরত্ব একশো চুয়াল্লিশ কিলোমিটারের মতো। পাহাড়, ঝরনা, নদী, ছোট্ট রেলস্টেশন, নারকোল গাছ আর দেবদারু-ইউক্যালিপটাসের বাগান দিয়ে ঘেরা ভীষণ সুন্দর জায়গা এই শ্রীপুরম। গতকাল সকালে এখানে এসে হোটেলে উঠেছিলাম আমরা। তারপর আজই ভর্তি হয়েছি কলেজে। এরই মধ্যে আমি আর দেবুকাকা মিলে ঘুরে নিয়েছি চারদিক। কালকেই ফিরে যাবে দেবুকাকা। তারপরই আমি একা।

তবে জায়গাটাকে তখন যেমন সুন্দর লাগছিল, এখন এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ততটাই কুৎসিত মনে হচ্ছে। কে জানে এখানে চার বছর কাটাব কী করে! আমাদের ক্যাম্পাসের পাশ দিয়েই গিয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়ে ২০৬। মেসের মেন গেট দিয়ে ঢুকতে হলে এই হাইওয়ের পাশ দিয়েই যেতে হয়। রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়ি থেকে ছিটকে আসা আলো ধরে এগোতে লাগলাম আমি। অচেনা জায়গা। কারও সঙ্গে আলাপও হয়নি। তার উপর শুনেছি এখানে ভালই র‍্যাগিং হয়। মেসে কোনও কিছু হবে না তো?

মেসের সামনে একটা হ্যাজাক জ্বলছে। দুর্বল আলোয় সবকিছুই কেমন যেন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট লাগছে। দুটো সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠলাম। ডানদিকে সাইনবোর্ড ঝুলছে। লেখা, ‘সমুদ্রম ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, সিনিয়র বয়েজ় হস্টেল অ্যান্ড মেস, শ্রীপুরম।’

বারান্দা থেকে বাঁদিকে বেঁকলেই বড় একটা প্যাসেজ। তার এক কোণে মেসের দরজা আর তার পাশে সার-সার ঘর। সিনিয়র দাদাদের। দুপুরবেলা ভর্তি হওয়ার পর অফিস থেকে একটা সবুজ রঙের কার্ড দিয়েছিল। বলা হয়েছিল যে, মেসের প্রথম মিল নেওয়ার সময় ওয়ার্ডেনকে দিতে হবে।

ওয়ার্ডেনকে আমি দুপুরবেলাতেই দেখেছিলাম। এখন মেসে ঢুকে দেখলাম দূরে একটা কোনায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি। নাম মিস্টার শিবযোগী। মানুষটার বয়স পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ। ছোটখাটো চেহারা। ফরসা। দেখলে মনে হয়, ফেলুদার পাশ থেকে জটায়ু উঠে এসেছেন স্বয়ং।

আমি পায়ে-পায়ে এগিয়ে গেলাম ওঁর দিকে।

“ইয়েস?”

আমি কার্ডটা বাড়িয়ে দিলাম, “স্যার, এই যে।”

“ও, নিউ স্টুডেন্ট!” উনি পাশের টেবিলের দিকে এগিয়ে তার উপর রাখা হ্যাজাকের আলোয় কার্ডটা দেখলেন, “সরসিজ চক্রবর্তী। ফার্স্ট ইয়ার, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন। হুম। চক্রবর্তী। তুমি তো এদিকের, মানে সাউথের নও। বেঙ্গলি?”

“হ্যাঁ স্যার।”

“গুড। তা বসে পড়ো যেখানে খুশি। আজ তোমাদের ব্যাড লাক। সাধারণত এখানে পাওয়ার কাট হয় না। কিন্তু আজ ফল্ট হয়েছে। জেনারেটর আছে, তবে শুধু কলেজের জন্য। আজ অ্যাডজাস্ট করে নাও। কাল থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে হোপফুলি। বাই দ্য ওয়ে, ওয়েলকাম টু সমুদ্রম ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি।”

শিবযোগী স্যার সরে গেলে, আমি চারদিকে তাকালাম। বড়-বড় চৌকো টেবিলের দু’দিকে একটা করে লম্বা বেঞ্চ পাতা। এক একটা বেঞ্চে চারজন করে বসতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেক টেবিলে আটজন করে বসবে। গোটা ঘরে দশটা টেবিল। কিন্তু প্রায় প্রত্যেকটাতেই আটজন করে বসে রয়েছে। আমি বসব কোথায়?

এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে খুব বোকা-বোকা লাগল। চলে যাব কি? কিন্তু না, যেতে হল না। তার আগেই শুনলাম একটা গলা, “কা-রে, খানা নহি হ্যায়? আ বৈঠ যা। জরা জাগা কর না।”

আমি দেখলাম একটু দূর থেকে একটা লম্বা কালোমতো ছেলে হাত তুলে ডাকছে আমায়। দেখেই বুঝলাম সিনিয়র। গলাটা হঠাৎ শুকিয়ে গেল। ছেলেটার মুখ-চোখ কেমন ঘোলাটে লাগছে। লাগছে, নাকি আলো-ছায়ার জন্য এমন মনে হচ্ছে? তবু পায়ে-পায়ে এগিয়ে গিয়ে বেঞ্চের এক কোণে বসলাম। বসামাত্র একটা স্টিলের থালায় দুটো রুটি আর একটু তরকারি চলে এল আমার সামনে। মেসের চারজন কর্মচারী খাবার দেয়। তাদের একজন থালাটা রেখে গম্ভীর গলায় ভাঙা হিন্দিতে যা বলল তার অর্থ হল, ব্যাচের মাঝে বসলে কাল থেকে আর খাবার দেবে না।

রাস্তায় হোঁচট আর এখানে ধমক। আমার পেট অর্ধেক ভরে গেল। রুটিটা অর্ধেক কাঁচা, বাকি অর্ধেক পোড়া। তরকারিটাও জঘন্য। কিন্তু প্রথম দিনেই তো আর খাবার ফেলা যায় না। তাই প্রাণপণ চেষ্টা করে দুটো রুটি শেষ করলাম। এবার ভাত। প্রতিটা টেবিলের মাঝে একটা বড় স্টিলের গামলা। তাতে ভর্তি ভাত রাখা আছে। আর তার পাশেই গর্ব করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ডালের বালতি। সঙ্গে কিছু দেবে না? আমার লোভী মনকে নিঃশব্দে থাপ্পড় মারল আমার চোখ। আশপাশে সবাই শুধু ডাল আর ভাতই খাচ্ছে, সঙ্গে কিছু নেই, আমিও তাই নিলাম। মনে পড়ল, বাড়িতে মাকে কী নাজেহালই না করেছি খাবার নিয়ে। বাবা তখন বলত, খাবার লক্ষ্মী, তাকে অবহেলা করতে নেই। হস্টেল জীবনের প্রথম রাতে এতকালের প্রতিশোধ লক্ষ্মীঠাকরুণ ভালভাবেই নিলেন।

“কী, খাবার কেমন লাগছে?” সেই লম্বা কালোমতো ছেলেটা এবার জানতে চাইল।

“খাবার? ভেরি গুড,” আমি অসম্ভব বিনয়ের সঙ্গে মটন বিরিয়ানি খাওয়ার মতো মুখ করে বললাম।

“তোর ভাল লাগছে! আচ্ছা?” এই অন্ধকারে কালোর মুখে আলো, “এই পুরো গামলার ভাত খেয়ে উঠবি। একটা দানাও যেন পড়ে না থাকে।”

অ্যাঁ? বলে কী? গোটা ভাত খাব কেমন করে? একে-একে টে

**********