
কিছুক্ষণ
হুমায়ূন আহমেদ
পরিচ্ছেদঃ ১ম
ট্রেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাড়বে। চিত্রাকে সিদ্ধান্ত যা নেবার এখনই নিতে হবে। সে ট্রেনে থাকবে, না-কি স্যুটকেস নিয়ে নেমে যাবে? বিশাল এই স্যুটকেস হাতে নিয়ে নামা তার পক্ষে সম্ভব না। নেমে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে কুলি ডাকতে হবে। দেরি করা যাবে না। এক্ষুণি ডাকতে হবে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। ছটায় ছাড়ার কথা। এখন বাজছে পাঁচটা পঞ্চাশ। দুঃখে চিত্রার চোখে পানি এসে যাচ্ছে।
চিত্রার হাতে প্রথম শ্রেণীর স্লিপিং বার্থের টিকেট। হাত পা ছড়িয়ে যাবে। ট্রেনে তার একফোঁটা ঘুম হয় না। তাতে অসুবিধা নেই গল্পের বই পড়তে পড়তে যাবে। হাত ব্যাগে দুটো গল্পের বই আছে। দুটাই ভূতের গল্প। স্টিফেন কিং। চলন্ত ট্রেনে ভূতের গল্প পড়তে ভাল লাগে। স্টেশনের বুক স্টল থেকে এক কপি রিডার্স ডাইজেস্ট কিনেছে। ট্রেনে বাসে ডাইজেস্ট জাতীয় পত্রিকা পড়তে আরাম। মন দিয়ে পড়তে হয় না। চোখ বুলালেই চলে।
ট্রেন এখনো দাঁড়িয়ে। আজ কি ট্রেন লেট হবে? চিত্রা জানালা দিয়ে মুখ বের করল। একজন কুলিকে জানালার পাশেই দেখা যাচ্ছে। সে কি ডাকবে তাকে? বলবে স্যুটকেস নামিয়ে দিতে?
সে ঠিক করল নেমেই যাবে আর তখনই বিশাল বড় বড় দুটা কালো ট্রাঙ্ক দরজায় নামল। ট্রাঙ্কের সঙ্গে বেডিং, বেতের ঝুড়ি। এইসবের মালিক এক মাওলানা। সুফি সুফি চেহারা যার গা থেকে আতরের গন্ধ আসছে। মাওলানার স্ত্রী গর্ভবতী। বোরকায় তাঁর অস্বাভাবিক বিশাল পেট ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। ভদ্রমহিলা দৌড়ে ট্রেনে উঠার পরিশ্রমে ক্লান্ত। তিনি ট্রাঙ্কের উপর বসে পড়েছেন। বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। বিশাল এই ঝামেলা ডিঙিয়ে চিত্রার পক্ষে নামা অসম্ভব। বোরকাপরা মহিলা স্বামীকে বললেন, পানি খাব। পানি। আর ঠিক তখনই ট্রেন দুলে উঠল।
চিত্রার প্রধান সমস্যা দুজনের যে কামরায় তার সিট সেখানে বুড়ো এক ভদ্রলোক আধশোয়া হয়ে আছেন। ভদ্রলোকের মাথা অস্বাভাবিক ছোট। তিনি তাঁর ছোটমাথা হলুদ রঙের মাফলার দিয়ে পেঁচিয়ে বলের মতো বানিয়েছেন। গায়ে প্রায় মেরুন রঙের কোট। কোন রুচিবান মানুষ এই রঙের কোট পরে বলে চিত্রার জানা নেই। তাঁর হাতে সিগারেট। সিগারেটে একেকটা টান দিচ্ছেন আর বিকট শব্দে কাশছেন। ঘর ভর্তি সিগারেটের ধূয়া। ভদ্রলোকের পরণে লুঙ্গি। এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা ট্রেনে বা লঞ্চে উঠেই কাপড় বদলে লুঙ্গি পরে ফেলে। উনি মনে হয় সেই জাতের। প্লেনে উঠেও কি এরা এই কাণ্ড করে? হয়ত করে। লাঞ্চ টাইমে গামছা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায় গোসলের জন্যে। বিমানবালার কাছে গায়ে মাখার জন্যে তেল চায়। অসহ্য!
ভদ্রলোকের লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত উঠে এসেছে। কাঠির মতো দুটো পা বের হয়ে আছে। পা ভর্তি পাকা লোম। ভদ্রলোক আবার কিছুক্ষণ পর পর এক পা দিয়ে আরেক পা ঘসছেন। পায়ের বেহালা বাজাচ্ছেন। কি কুৎসিত! কি কুৎসিত।
এমন একজন মানুষের সঙ্গে দিনাজপুর পর্যন্ত যেতে হবে? চিত্রা করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। কামরায় ঢুকছে না। রেলের একজন এটেনডেন্টকে পাওয়া গেলে জিজ্ঞেস করত খালি কোনো কামরা আছে কি-না। এত বড় স্লিপিং বগি। একটাও খালি সিট থাকবে না? শাদা পোশাকের কোনো এটেনডেন্টকে দেখা যাচ্ছে না। প্রয়োজনের সময় এদের কাউকেই পাওয়া যায় না।
চিত্রাকে এই বিপদে ফেলেছে তার রুমমেট লিলি। ট্রেনের টিকিট লিলি তার মামাকে দিয়ে কাটিয়েছে। সেই মামা না-কি রেলের বিরাট অফিসার। লিলি তার মামাকে বলেছে টু সিটার স্লিপারের একটা টিকিট দিতে। সেখানে যেন অন্য কেউ না যায়। একটা সিট অবশ্যই খালি যাবে। লিলির মামার কাছে এই ব্যবস্থা করা না-কি কোনো বিষয়ই না।
এখন দেখা যাচ্ছে বিষয়। লিলির ক্ষমতাবান রেল মামা কিছু করতে পারেন নি। চিত্রাকে যেতে হবে পা ভর্তি সাদা লোমের বুড়োটার সাথে। যে বুড়ো দুই পা ঘসে ঘসে পা বেহালা বাজাবে। মহান পা-সঙ্গীত! ইচ্ছা করলে চিত্রা এখনই লিলির সঙ্গে কথা বলতে পারে। মোবাইল ফোন সঙ্গে আছে। কিন্তু লাভ কি। লিলি নিশ্চয়ই বুড়োকে সরাতে পারবে না।
ম্যাডাম, কোনো সমস্যা?
চিত্রা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রেলের একজন এটেনডেন্ট। হাতে চাবির গোছা। সরল ধরনের চেহারা। গোল মুখ, বড় বড় কান। চিত্রা শরীর বিদ্যা নামের একটা বই-এ পড়েছে যাদের মুখ গোলাকার, কান বড় বড় তারা সরল প্রকৃতির হয় এবং অন্যকে বিপদে সাহায্য করার মানসিকতা এদের আছে। এরা পরোপকারী।
চিত্রা বলল, স্লিপিং বার্থে খালি কোনো সিট কি আছে? আমি এই বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে যেতে চাচ্ছিনা। উনি ক্রমাগত সিগারেট খাচ্ছেন। একটু আগে একটা শেষ করেছেন এখন আরেকটা ধরিয়েছেন।
এটেনডেন্ট বলল, কামরার ভেতরে সিগারেট খাওয়া যাবে না, আমি উনাকে নিষেধ করে দিচ্ছি।
আর কোনো সিট কি আছে?
বাথরুমের কাছের ফোর সিটারে একটা খালি আছে কিন্তু সেখানে আপনি যেতে পারবেন না।
যেতে পারব না কেন?
ম্যাডাম, সামান্য অসুবিধা আছে। তারপরেও খোঁজ নিয়ে দেখি। আপাতত নিজের কামরায় বসুন।
এটেনডেন্ট স্যুটকেস ঢুকিয়ে দিল। চিত্রাকে তার পেছনে পেছনে যেতে হল। চিত্রাকে ঢুকতে দেখে বুড়ো পা গুটিয়ে নিল। পিট পিট করে তাকাল। বুড়োর নাকের নিচে বিশাল গোঁফ। উপরের ঠোঁটটা গোঁফের কারণে ঢাকা পড়ায় তাকে কার্টুন ফিগারের মত লাগছে।
চিত্রা বলল, দয়া করে সিগারেট খাবেন না। আমি সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারি না।
বুড়ো বলল, তুমি কি আমার সঙ্গে যাচ্ছ? আমার রুম মেট?
জি।
ভালো সমস্যা হল। আমি সিগারেটে টান না দিয়ে থাকতে পারি না।
করিডোরে গিয়ে খাবেন।
বুড়ো বলল, আমার শরীর ভালো না। আর্থরাইটিসের ব্যথা। হাঁটাহাঁটি করতে পারি না। প্রতিবার সিগারেটের জন্যে করিডোরে যাওয়া আমার জন্যে সমস্যা। যাই হোক তোমার নাম কি?
চিত্রা।
চিত্রা নামের অর্থ কি?
জানি না। (চিত্রা তার নামের অর্থ জানে। বুড়োটাকে অর্থ বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না। চিত্রা একটা নক্ষত্রের নাম।)
হত। বাবা আবার কি মনে করে নামের আগে আব্দুর বসিয়েছেন। তুমি কি পড়াশোনা করছ? ছাত্রী?
জি।
কি পড়ছ?
ফিজিক্স।
কোন ইয়ার?
থার্ড ইয়ার। এবার অনার্স দেব।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি?
জি।
ইউনিভার্সিটি খোলা না?
খোলা।
ইউনিভার্সিটি খোলা, তাহলে যাচ্ছ কোথায়? ক্লাস মিস করে ঘোরাঘুরি করার মানে কি?
জবাব না দিয়ে চিত্রা বের হয়ে গেল। ক্লাস মিস দিয়ে ঘোরাঘুরি করলে বুড়োর কি? বুড়োর সঙ্গে অকারণ কথা বলার চেয়ে করিডোরে হাঁটাহাঁটি করা ভালো। ট্রেনে বুফে কার নিশ্চয়ই আছে। বুফে কারে জানালার পাশে বসে চা খেতে খেতে দূরের দৃশ্য দেখা যেতে পারে। সন্ধ্যা এখনো মিলায়নি। শেষ বিকেলের আলোয় দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত দেখতে ভালো লাগার কথা। রিডার্স ডাইজেস্ট খুলে jokes পড়া যেতে পারে। যদিও সে এখনো রিডার্স ডাইজেস্টের কোন জোক পড়ে হাসেনি। ভাগ্য ভাল থাকলে এবার হয়ত হাসবে।
তিন কামরা পরেই বুফে কার। সেখানে চা নেই আছে কফি। চা বিক্রিতে লাভ নেই। কফিতে লাভ বলেই কফি। কফির কড়া গন্ধ চিত্রার ভালো লাগে না তারপরেও সে কফি নিয়ে জানালার পাশে বসল। ব্যাগের ভেতর মোবাইল ফোনের রিং বাজছে। মনে হচ্ছে হাত ব্যাগের ভেতর ছোট্ট কোনো শিশু হাতপা ছুঁড়ে কাঁদছে। এক্ষুনি তাকে কোলে নিতে হবে।
টেলিফোন করেছে লিলি। ধরবে না ধরবে না করেও চিত্রা টেলিফোন ধরল। লিলি অকারণে কথা বলবে। বিরক্ত অবস্থায় কারোর অকারণ কথা শুনতে ভাল লাগে না।
হ্যালো চিত্রা, ট্রেন ছেড়েছে?
হুঁ।
টঙ্গী পার হয়ে গেছে?
হুঁ।
হুঁ হুঁ করছিস কেন। কথা বল। নিজের মতো করে টু সিটের স্লিপার পেয়েছিস?
হুঁ।
বললাম না মামাকে বললেই মামা ব্যবস্থা করে দেবে। এখন দরজা বন্ধ করে হাফ নেংটা হয়ে শুয়ে পড়। তুইতো আবার ট্রেনে ঘুমাতে পারিস না। গল্পের বই নিয়ে বসে যা। গান শোনার যন্ত্রপাতি নিয়েছিস? এম পি থ্রীটা আছে না?
না।
সেকি? আমার ওয়াকম্যানটা তোকে নিয়ে যেতে বললাম না? বের করে তোর টেবিলে রেখেছিলাম।
ওয়াকম্যানে গান শুনতে আমার ভালো লাগে না। মনে হয় কানের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে কেউ গান করছে।
লিলি আনন্দিত গলায় বলল, এটাইতো ভালো। শুধু পুরুষ গায়কদের গান শুনবি। মনে হবে কোনো পুরুষ তোর কানে চুমু খাচ্ছে।
চিত্রার বিরক্তি লাগছে। লিলির মুখ আলগা। অশালীন কথাবার্তা সে অবলীলায় বলে। চিত্রা বলল, লিলি একটা কথা—তোর মামা কিন্তু আমাকে একা সিট দেননি। আমার সঙ্গে এক বুড়ো আছে।
বলিস কি? আমি এক্ষুনি মামাকে টেলিফোন করছি।
এখন টেলিফোন করে লাভ কি?
অবশ্যই লাভ আছে। প্রয়োজনে ট্রেন ব্যাক করে ঢাকা যাবে। নতুন বগি লাগানো হবে। নো হাংকি পাংকি।
কেন অর্থহীন কথা বলছিস?
লিলি বলল, আমি মোটেই অর্থহীন কথা বলছি না। আমি অর্থহীন কথা বলার মেয়ে না। এক্ষুনি টেলিফোন করে আমি মামার বারটা বাজিয়ে দিচ্ছি। আর শোন, বুড়ো যেহেতু আছে—খবরদার ঘুমাবি না। বুড়োগুলো হয় sex starved। শুধু ছোঁক ছোঁক করে। রাতে ঘুমিয়ে পড়বি হঠাৎ জেগে উঠে দেখবি বুড়ো তোর বিশেষ কোনো জায়গায় হাত রেখে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
Please stop it
এরচে ভয়ংকর কিছুও ঘটতে পারে। যেমন ধর…
চিত্রা টেলিফোনের লাইন অফ করে দিল। লিলি থামবে না— নোংরা কথা বলতেই থাকবে। লিলি পরীর মতো একটা মেয়ে। মায়া মায়া চোখ। পবিত্র চেহারা অথচ কি সব নোংরা ধরনের কথা।
চিত্রা কফিতে চুমুক দিল। যা ভেবেছিল তাই অতিরিক্ত চিনি এবং কুসুম গরমও না। কফি থেকে হরলিক্সের গন্ধও আসছে। এর মানে কি? বয়কে ডেকে একটা ধমককি দেয়া যায় না? অবশ্যই দেয়া যায়। তবে এই মুহূর্তে ধমক দেয়া যাবে না। অন্য একজন ধমকা ধমকি করছেন। তিনি গর্ভবতী বোরকাওয়ালীর স্বামী–মাওলানা। তিনি পানি কিনতে এসেছেন। ছোট এক বোতল পানি তের টাকা চাচ্ছে। অথচ বাইরে বার টাকা। বয় নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, বাইরে থেকে পানি কিনেন। খামাখা প্যাচাল পারেন কেন?
মাওলানা এখনো তার স্ত্রীকে পানি খাওয়াননি ভেবে চিত্রার খারাপ লাগছে। তার স্বামীও কি এরকম ইনসেনসেটিভ হবে?
চিত্রা যাচ্ছে বিয়ে করতে। যদিও তার বড় মামা খোলাসা করে কিছু বলছেন না। তিনি খোলাসা করে কিছু বলার মানুষও না। তিনি জানিয়েছেন-আমার শরীর খুব খারাপ, স্ট্রোক হয়েছে। একটা পা অবস। আমি তোকে প্রতিষ্ঠিত দেখে মৃত্যুর জন্যে তৈরি হতে চাই। চিত্রাকে প্রতিষ্ঠিত দেখার মানে নিশ্চয়ই তাকে বিবাহিতা দেখা। পুরুষদের কাছে মেয়েদের প্রতিষ্ঠার একটাই অর্থ বিবাহ।
চিত্রা কফির কাপ সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে এটেনডেন্টকে খুঁজে বের করবে। সে কোনো ব্যবস্থা করেছে কি-না দেখব।
বুড়ো সিগারেট হাতে করিডোরে দাঁড়ানো। চিত্রাকে দেখে বলল, কোথায় গিয়েছিলে?
অভিভাকের মতো গলা, যেন কৈফিয়ত তলব করছে। চিত্রার যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাবে। বুড়োর কৈফিয়ত তলবের কিছু নেই।
চিত্রা, তুমি উপরের সিটে থাকবে। আমার পক্ষে উপরে উঠা সম্ভব না। তাছাড়া আমাকে ঘন ঘন সিগারেট খেতে হবে।
চিত্রা জবাব দিল না। জবাব দেবার কিছু নেই। বুড়োর সঙ্গে খেজুরে আলাপেরও কিছু নেই।
বুড়ো সিগারেটে লম্বাটান দিয়ে বলল, এই স্লিপিং কারে একটা ডেডবডি যাচ্ছে এটা কি জান? বাথরুমের লাগোয়া যে কামরা সেখানে।
চিত্রা বলল, তাই না-কি?
ইয়াং ছেলের ডেডবডি। সঙ্গে মা আছে, ভাই আছে। স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার হল এরা কেউ কাঁদছে না। মনে হয় অধিক শোকে পাথর।
চিত্রা জানালার দিকে এগিয়ে গেল। বুড়োর সঙ্গে বক বক করার কোনো ইচ্ছা নেই। ট্রেনে একটা ডেড বডি য