যেরকম টুনটুনি সেরকম ছোটাচ্চু

যেরকম টুনটুনি সেরকম ছোটাচ্চু

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

যেরকম টুনটুনি সেরকম ছোটাচ্চু

Books Pointer Iconমুহম্মদ জাফর ইকবাল
Books Pointer Iconjuvenile literature

Change color

উৎসর্গ

সাদাতউদ্দীন আহমেদ এমিল যে

আমার টুনটুনি এবং ছোটাচ্চু

বইয়ের ছবি এঁকে দেয় বলে আমি

এখনও এই বইগুলো লেখার উৎসাহ পাই!


ভূমিকা


যখন টুনটুনি এবং ছোটাচ্চুকে নিয়ে প্রথম লিখতে শুরু করেছিলাম তখন ভেবেছিলাম এগুলো হবে ছোটদের জন্য এক ধরনের ডিটেকটিভ গল্প। লিখতে লিখতে আবিষ্কার করেছি সেগুলো সবসময় পুরোপুরি ডিটেকটিভ গল্প থাকেনি। আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের যে বিষয়গুলো নিয়ে সমস্যা হয় কীভাবে কীভাবে সেগুলো গল্পের মাঝে চলে আসতে শুরু করেছে। এতে আমি যে খুব বেশি বিচলিত হয়েছি সেটা বলা যাবে না– কাউকে তো মাথার দিব্যি দিয়ে বলিনি গল্পগুলো সবসময়েই খাঁটি ডিটেকটিভ গল্প হবে এবং সেখানে কোনো উনিশ বিশ হবে না। একটুখানি উনিশ বিশ হলেই কী আর না হলেই কী?


কখনোই ভাবিনি যে আমি একই চরিত্র দিয়ে একাধিক বই লিখব। যেহেতু লেখা হয়েই গেছে এখন দেখতে হবে কতোদিন সেটা চালিয়ে যাওয়া যায়। আমার দিক থেকে বলতে পারি যতদিন পাঠকের আগ্রহ থাকবে আমি চেষ্টা করে যাব।


বাকিটুকু নির্ভর করবে টুনটুনি আর ছোটাচ্চুর ওপর–তারা সবাইকে নিয়ে বারবার আসতে রাজি হয় কী না সেটাই মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন!


মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বনানী,

ঢাকা

৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০


১. এক সেট গয়না

দরজায় টুংটাং শব্দ শুনে টুনি দরজা খুলে দেখে দরজার সামনে ফারিহা দাঁড়িয়ে আছে। ফারিহা তার মাথার চুল ছোট করে কেটে ফেলেছে, সেজন্যে আজকে তাকে দেখতে অন্য রকম লাগছে। টুনি খুশি খুশি গলায় বলল, “ফারিহাপু, তোমাকে দেখতে আজকে কী সুইট লাগছে!”


ফারিহা তার ছোট ছোট চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে হাসি মুখে বলল, “ভেবেছিলাম ন্যাড়া করে ফেলব। শেষ পর্যন্ত আর করলাম না।”


টুনি বলল, “কেন করলে না ফারিহাপু?”


“মনে হলো আমার মাথার চাঁদিটা ঢেউ ঢেউ। দেখতে কেমন লাগবে সেটা ভেবে আর ন্যাড়া করলাম না।


টুনি হি হি করে হেসে বলল, “মাথার চাঁদি কখনো ঢেউ ঢেউ হয় না ফারিহাপু।”


“হয়, হয়!” বলে ফারিহা ভেতরে ঢুকে একটা সোফায় বসে বলল, “শাহরিয়ার আছে?”


টুনি মাথা নাড়ল, বলল, “আছে। তুমি বসো ফারিহাপু, আমি ডেকে দিচ্ছি।


ফারিহা আবার তার চুলের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বলল, “আমার চুল দেখে শাহরিয়ার কী বলবে মনে হয়?”


টুনি মুখ টিপে হাসল, বলল, “ছোটাচ্চু ভান করবে যে সে লক্ষই করেনি!”


ফারিহা মাথা নাড়ল, বলল, “আমারও তাই মনে হয়। দেখি, ডেকে আনো দেখি।”


ছোটাচ্চু এসে ফারিহাকে দেখে একটুখানি চমকে উঠল কিন্তু সত্যি সত্যি ভান করল যে সে ফারিহার ছেলেদের মতো করে কাটা চুলটা আলাদা করে লক্ষ করেনি। খানিকটা উদাস মুখ করে বসে রইল। তখন ফারিহা নিজেই জিজ্ঞেস করল, “আমার এই চুলের স্টাইলটা তোমার কেমন লাগছে শাহরিয়ার?”


ছোটাচ্চু বলল, “সত্যি করে বলব?”


“সত্যি করেই তো বলবে।”


“তোমাকে দেখতে একটা ছেলের মতো লাগছে। শুধু ছেলে না, কেমন যেন গুন্ডা গুন্ডা টাইপ।”


ফারিহা হি হি করে হেসে নিজের হাতে নিজে কিল দিয়ে বলল, “তুমি ঠিক বলেছো। শুধু যে দেখতে গুন্ডা গুন্ডা লাগছে তা না, নিজেকে কেমন জানি মনেও হচ্ছে গুন্ডা গুন্ডা।”


ছোটাচ্চু একটু ভয়ে ভয়ে ফারিহার দিকে তাকাল, বলল, “সত্যি?”


“হ্যাঁ সত্যি। মনে হচ্ছে কারো শার্টের কলার ধরে একটা ঝাঁকুনি দেই। কাউকে ঘুষি মারি। কাউকে গালাগাল করি।”


ছোটাচ্চু আরও ভয়ে ভয়ে বলল, “গালাগাল? ঘুষি?”


“হ্যাঁ।” বলে ফারিহাপু ছোটাচ্চুর হাত ধরে টান দিয়ে বলল, “চল।”


“কোথায়?”


“দেখি, মারামারি করার জন্য কাউকে পাওয়া যায় নাকি।”


ফারিহাপু সত্যি সত্যি মুখটা কেমন জানি ভয়ঙ্কর করে এক হাত দিয়ে অন্য হাতে আস্তে আস্তে ঘুষি মারতে লাগল ৷


ছোটাচ্চু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “দাঁড়াও, শার্টটা একটু বদলে আসি।”


ফারিহা বলল, “ঠিক আছে, যাও।”


ছোটাচ্চু ঘর থেকে বের হতেই ফারিহাপু খিলখিল করে হাসতে লাগল। টুনির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল, “দেখেছো? দেখেছো? তোমার ছোটাচ্চু সত্যি সত্যি বিশ্বাস করেছে।”


টুনিও হাসল, বলল, “হ্যাঁ। আর তুমি বলেছো খুব জোর দিয়ে। ছোটাচ্চুকে যে যেটাই বলে সেটাই বিশ্বাস করে।”


ফারিহা মাথা নাড়ল, বলল, “সেইটা ঠিক।”


টুনি এবারে একটু ভয়ে ভয়ে বলল, “কিন্তু তুমি কি সত্যি সত্যি এখন কারো সাথে মারামারি করতে যাবে?”


ফারিহা মাথা চুলকে বলল, “বলে যখন ফেলেছি, তখন তো করতেই হবে। মারামারি না হোক একটু ঝগড়া-ঝাঁটি তো করা দরকার। কার সাথে করা যায়?”


টুনি বেশ খানিকটা দুশ্চিন্তা নিয়ে ফারিহার দিকে তাকিয়ে রইল। ফারিহাপু পারে না সেরকম কাজ মনে হয় দুনিয়াতে নাই।


গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ একসময় ফারিহা বলল, “টিশ ঢিশ ঢিশুম।”


ছোটাচ্চু ভুরু কুঁচকে বলল, “টিশ ঢিশ ঢিশুম মানে কী?”


“কোনো মানে নাই। “


“তাহলে?”


“তাহলে কী?”


“তাহলে এটা বলছো কেন?”


ফারিহা বলল, “কী আশ্চর্য, যে কথাটার মানে নাই সেই কথা বলা যাবে না?”


“আগে তো বলতে না। সেই জন্যে বলছি।


ফারিহাপু তখন হঠাৎ ব্রেক করে তার গাড়ি থামাল। ফারিহাপুর গাড়িতে উঠলে সবাইকে সিট বেল্ট লাগাতে হয়, তা না হলে নির্ঘাত ছোটাচ্চু সামনের ড্যাশ বোর্ডে একটা ধাক্কা খেত। ছোটাচ্চু একটু অবাক হয়ে বলল, “কী হলো, থামালে কেন? “


“চলো।”


“চলো? কোথায়?”


“চিনতে পারছো না কোথায়?”


জায়গাটা তখন ছোটাচ্চু চিনতে পারল। এইখানে তার আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির অফিস ছিল।


ছোটাচ্চু মাথা বের করে তাকিয়ে দেখল, এখনও অফিসের সাইনবোর্ডটা আছে, তার মানে তার ডিটেকটিভ এজেন্সিটা উঠে যায় নাই। সরফরাজ কাফী তার অফিসটা দখল করে তাকে বের করে দিয়েছে কথাটা চিন্তা করলে আগে রাগে ছোটাচ্চুর মাথা গরম হয়ে যেত। আজকাল আর হয় না। ব্যাপারটা চিন্তা করলে তার কাছে এখন পুরো ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর মনে হয়।


ছোটাচ্চু ভুরু কুঁচকে বলল, “এখানে থেমেছো কেন?”


“তোমার সরফরাজ কাফীকে একটু কচলে আসি।”


“কচলে আসবে? কচলে আসা আবার কী রকম কথা?” ছোটাচ্চু একটু অবাক হয়ে ফারিহার দিকে তাকাল। ফারিহা হঠাৎ করে এরকম অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে।


ফারিহাপু এক হাত দিয়ে অন্য হাতের তালুতে ঘুষি দিতে দিতে বলল, “সরফরাজ কাফী মানুষটা এত বড় একটা দুই নম্বুরি কাজ করেছে, তারপরেও তার সাথে একবারও কেউ কোনো কথা বলল না, একটু ডলে দিল না, এটা তো হতে পারে না।“


ছোটাচ্চু বলল, “তুমি কি এখন তার সাথে ঝগড়া করতে যাচ্ছ?” ফারিহাপু ফোঁস করে বলল, “আগে যাই। দেখি, ঝগড়া না মারামারি ঠিক কোনটা করা যায়।”


ছোটাচ্চু গম্ভীর হয়ে বলল, “দ্যাখো ফারিহা–”


ফারিহা হাত নেড়ে ছোটাচ্চুর কথা উড়িয়ে দিয়ে বলল, “তুমি আসো আমার সাথে। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো।” কথা শেষ করে ফারিহা ছোটাচ্চুর হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে ৷


আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির দরজা খুলে অনেক দিন পর ছোটাচ্চু ফারিহাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকল। আগে যেখানে রঞ্জনা বসত এখন সেখানে আরেকজন মেয়ে বসে আছে। মাথার চুলগুলো উঁচু করে বাঁধা, মুখে কড়া মেকআপ, ঠোঁটে কটকটে লাল রং। রঞ্জনা সব সময় শাড়ি পরে থাকত। এই মেয়েটা বিদঘুঁটে রঙের একটা সালোয়ার- কামিজ পরে আছে। মেয়েটির সামনে বসে একজন বয়স্কা মহিলা তার কথা বলছেন। ছোটাচ্চু এবং ফারিহাকে ঢুকতে দেখে দুজনেই তাদের দিকে ঘুরে তাকাল। মেকআপ করা মেয়েটি দাঁত বের করে হাসার ভঙ্গি করে বলল, “ওয়েলকাম টু দ্য আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি। আপনাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”


ফারিহা বলল, “আমরা সরফরাজ কাফীর সাথে দেখা করতে এসেছি।”


মেয়েটি বলল, “কাফী স্যার তো নেই। উনি সবসময় এখানে আসেন না। আপনারা কী এপয়েন্টমেন্ট করে এসেছেন?”


ফারিহা মাথা নাড়ল, “না, এপয়েন্টমেন্ট করে আসি নাই।”


“আপনাদের কেসটা আমাকে বলতে পারেন, আমি দেখি কী করতে পারি।”


সামনে বসে থাকা মহিলা একটু অধৈর্য হয়ে বললেন, “আমার কেসটা আগে শেষ করে দেন।”


মেকআপ করা মেয়েটা মহিলার দিকে তাকিয়ে আবার দাঁত বের করে হাসার মতো একটা ভয়ঙ্কর ভঙ্গি করে বলল, “ম্যাডাম, সব কাস্টমার আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবাইকে আমাদের সমানভাবে দেখতে হবে।”


মহিলা বিরক্ত হয়ে বললেন, “সেটা দেখতে চান দেখেন, কিন্তু আমার কাজটা করে দিতে পারবেন কি না বলেন।”


“অবশ্যই পারব। দ্য আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি পারে না এমন কোনো কাজ নেই। ঐ যে পিছনে তাকিয়ে দেখেন, আমাদের বড় বড় কেসগুলোর কথা আমরা বোর্ডে টানিয়ে রেখেছি। কিন্তু অ্যাকশান প্ল্যানটা কী হবে সেটা ঠিক করতে হবে। এডভান্স পেমেন্টের একটা ব্যাপার আছে-’


সামনে বসে থাকা মহিলা এবারে আরেকটু বিরক্ত হলেন। বললেন, “কী মুশকিল! ঘুরে-ফিরে আপনাদের শুধু একটা কথা! পেমেন্ট! পেমেন্ট! আরে বাবা, আমি কি না করেছি যে পেমেন্ট করব না?”


ছোটাচ্চুর লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, এটি এখন আর তার ডিটেকটিভ এজেন্সি নয়, কিন্তু তবু সে কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। হেঁটে হেঁটে তখন ঘরের অন্য মাথার বোর্ডে ঝোলানো আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সির বড় বড় কেসগুলো দেখতে গেল। তাকে বের করে দেওয়ার পর সরফরাজ কাফী কী কী কেস করেছে দেখার জন্য তার বেশ কৌতূহল হলো। তবে বোর্ডে ঝোলানো কেসগুলো দেখে ছোটাচ্চু বেশ অবাক হলো, এখানে নতুন একটি কেসও নেই। ছোটাচ্চু এখানে থাকার সময় যে কেসগুলো করেছে সেগুলোর কথাই লেখা। কী আশ্চর্য! সরফরাজ কাফী এতদিন তাহলে করেছে কী?


পাশে একটা শেলফ, সেখানে অনেকগুলো মগ, টি-শার্ট এবং চাবির রিং। সেগুলোর উপরে বড় বড় করে লেখা ‘দি আলটিমেট ডিকেটটিভ এজেন্সি’। তার এক সময়কার ডিটেকটিভ এজেন্সি কি এখন মগ আর টি-শার্ট বিক্রি করে চলছে? কী আজব!


ঠিক তখন ফারিহার গলা শুনে ছোটাচ্চু ঘুরে তাকাল। ফারিহা মেকআপ করা মেয়েটার সাথে কথা বলছে। সরফরাজ কাফী যেহেতু নেই, সে তার রাগ ঝাড়ার কোনো মানুষ পাচ্ছে না তাই এখন সে কী করবে বুঝতে পারছে না। ফারিহা কী বলছে শোনার জন্য ছোটাচ্চু কান খাড়া করল। শুনল ফারিহা জিজ্ঞেস করল, “আপনারা কি সব ধরনের কেস নেন?”


মেকআপ করা মেয়েটা বলল, “অবশ্যই! অবশ্যই নেই।”


“একজন মানুষ যদি আরেকজনের কোম্পানি দখল করে নেয় সেটার তদন্ত করতে পারবেন?”


এই মেয়েটি নিশ্চয়ই নতুন। সরফরাজ কাফী যে ছোটাচ্চুর দি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি দখল করে নিয়েছে সেটা নিশ্চয়ই জানে না। তাই খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, “অবশ্যই তদন্ত করতে পারব। কোম্পানি দখল করে নেয়া তো ছেলে খেলা নয়। ঘাঘু ক্রিমিনালরা ছাড়া এটা পারে না। আপনি শুধু বলেন, আমরা আমাদের এজেন্টদের লাগিয়ে দেব, দুই সপ্তাহে তদন্ত করে সব বের করে আনবে। ক্রিমিনালদের সোসাইটিতে ঘুরে বেড়ানোর কথা নয়। ক্রিমিনালরা থাকবে জেলখানার ভিতরে–”


“গুড!” ফারিহা এবারে খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, “একটা কাগজে লেখেন। কোম্পানিটার নাম হচ্ছে দি আলটিমেট ডিটেকটিভ এজেন্সি।”


ছোটাচ্চু দূর থেকে দেখল মেকআপ করা মেয়েটার চোয়াল কটাস করে ঝুলে পড়েছে। ফারিহা সেটা খেয়াল করল না, টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, “কোম্পানিটার আসল মালিক ছিল শাহরিয়ার হাসান। ঐ যে দাঁড়িয়ে আছে।”


মেকআপ করা মেয়ে এবং সামনে বসে থাকা মহ

**********