সামান্য কুয়াশা ছিল (ভূতনাথের ডায়েরি)

সামান্য কুয়াশা ছিল (ভূতনাথের ডায়েরি)

অনীশ দেব

সামান্য কুয়াশা ছিল (ভূতনাথের ডায়েরি)

Books Pointer Iconঅনীশ দেব
Books Pointer Iconhorror

Posted byকাব্য রচিত31-Oct-2025

Change color

আগাম কোনও খবর না দিয়েই বর্ষা এবার সময়ের আগেই হাজির। আর শুধু হাজির নয়, ইনিংসের প্রথম বল থেকেই একেবারে ঝোড়ো ইনিংস খেলতে শুরু করেছে। যেমনই বৃষ্টির জোর তেমনই হাওয়ার দাপট। শুরুতে অবশ্য এতটা বোঝা যায়নি। বিকেল পড়ে আসার আগেই সুপ্রকাশ পালিতের বৈঠকখানায় সকলে এসে পড়েছেন—জগৎ শ্রীমানী, বরেন মল্লিক, বিজন সরকার আর প্রিয়নাথ জোয়ারদার। আজ ওঁরা অন্যদিনের তুলনায় একটু তাড়াতাড়ি এসেছেন। কারণ, আজ শোকসভা। ওঁরা এসে পৌঁছনোর কিছুটা পরে শুরু হয়েছে ঝড় আর বৃষ্টির ঘটা।

ওঁরা পাঁচজন নীচু গলায় কথা বলছিলেন। ওঁদের কথাবার্তায় কেমন যেন একটা বিষণ্ণ সুর মাখানো ছিল। আর একইসঙ্গে সদ্য-চলে-যাওয়া মানুষটার নানান স্মৃতি ওঁদের মনে অস্থিরভাবে উঁকিঝুঁকি মারছিল।

তিনদিন আগে এ-পাড়ার ডাকসাইটে উকিল বাসুদেব ভদ্র হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। ওঁর বয়েস হয়েছিল প্রায় সত্তর বছর। কিন্তু শরীর জবরদস্ত ছিল। রোজ ভোর পাঁচটায় শিরদাঁড়া টান-টান করে হেঁটে গঙ্গাস্নানে যেতেন। ওকালতিতে অসম্ভব দাপট ছিল, জজসাহেবরাও তটস্থ হয়ে থাকতেন। বাসুদেববাবুর সঙ্গে পাড়ার অনেকেরই হৃদ্যতা ছিল। ওঁর আচমকা চলে যাওয়ায় অনেকেই কম-বেশি ধাক্কা খেয়েছেন। কেউ-কেউ আবার যেন ভগবানের অদৃশ্য নোটিশ দেখতে পেয়েছেন।

সুপ্রকাশ পালিতের সঙ্গে বাসুদেব ভদ্রর বয়েসের তফাত থাকলেও যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল। তা ছাড়া সুপ্রকাশবাবুদের রাঁচির জমিজমা ইত্যাদি নিয়ে বাসুদেববাবু মামলাও লড়েছিলেন। সেইজন্যই সুপ্রকাশবাবু নিজে উদ্যোগ নিয়ে সবাইকে খবর দিয়ে একটা ঘরোয়া স্মরণসভা গোছের আয়োজন করেছেন।

সুপ্রকাশ বাসুদেব ভদ্র সম্পর্কে নানা কথা বলছিলেন। অন্য চারজন একমনে ওঁর কথা শুনছিলেন। মাঝে-মাঝে সুপ্রকাশ থামলে অন্যরা নিজেদের দু-একটা মন্তব্য করছিলেন।

বরেন মল্লিক বললেন, ‘বাসুদেবদা খুব মিশুকে ছিলেন। আমার লন্ড্রিতে যখনই যেতেন প্রাণ খুলে গল্প করতেন।’

বৈঠকখানার একটা জানলা খোলা ছিল। সেটা দিয়ে ঠিক টিভির সিনেমার মতো বাইরের ঝড়বৃষ্টি দেখা যাচ্ছিল। ঝোড়ো বাতাস হঠাৎই বেশ বেড়ে গেল। শনশন হাওয়া কাটার শব্দ উঠল বাইরে। জানলা দিয়ে বৃষ্টির ছাট ভেতরে ঢুকে পড়ছিল। সেটা লক্ষ করে সুপ্রকাশ পালিত বিজন সরকারকে বললেন, ‘জানলাটা একটু বন্ধ করে দিন না…।’

বিজন সরকার এ-পাড়ার শান্তি কমিটির সেক্রেটারি। বেশিরভাগ সময়েই খোশমেজাজে থাকেন। তবে এখন নিষ্প্রভ মুখে বসে আছেন।

সুপ্রকাশ পালিতের কথায় হাত বাড়িয়ে জানলার পাল্লা দুটো ভেতর থেকে এঁটে দিলেন। তারপর নীচু গলায় বললেন, ‘ভদ্রবাবুর পদবির সঙ্গে তাঁর ক্যারেক্টারের দারুণ মিল ছিল। পাড়ার ব্যাপারে কখনও আমাকে খালি হাতে ফেরাননি।’

হঠাৎই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জগৎ শ্রীমানী বললেন, ‘বাসুদেবটা মারা যাওয়ার সময়েও ওকালতি প্যাঁচ কষে গেল…।’

সকলে অবাক হয়ে ওঁর দিকে তাকাতেই তিনি যোগ করলেন, ‘…আমাকে সমন ধরিয়ে দিয়ে গেল। জানিয়ে দিল, আমার ওভারটাইম চলছে।’

‘না, না—ও-কথা বলছেন কেন!’ সুপ্রকাশ পালিত সামাল দেওয়ার সুরে জগৎবাবুকে লক্ষ্য করে বললেন। তারপর কাচের শার্সি-আঁটা জানলার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে যোগ করলেন, ‘এরকম জোর বর্ষা এবারে এই প্রথম নামল। চার-ছ’ঘণ্টার মধ্যে থামবে বলে মনে হয় না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুপ্রকাশ। শার্সির গা বেয়ে জলের ফোঁটা গড়িয়ে নামছিল। সেই রেখার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ গলায় বললেন, ‘আমাদের জীবনটাও যেন কাচের গায়ে জলের রেখার মতন। মাধ্যাকর্ষণের মতো কোনও একটা টানে কিছুক্ষণ এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলা। তারপর-তারপর সব শেষ। কী বলো, ভূতনাথ?’

প্রিয়নাথ ভীষণ চুপচাপ ছিলেন। সকলের কথা যেন শুনছিলেন, অথচ শুনছিলেন না। ওঁর চশমার কাচে আলো পড়ে চকচক করছিল। চশমার গাঢ় রঙের মোটা ফ্রেমের সঙ্গে ভুরু জোড়া যেন মিশে গেছে। তার ওপরে কয়েকটা ছোট-বড় ভাঁজ স্পষ্ট নজরে পড়ছে।

অনেকক্ষণ ধরে সিগারেট খেতে পারেননি বলে প্রিয়নাথের গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, মুখের ভেতরটা কেমন বিস্বাদ লাগছিল। তিনি আপনমনে চুপচাপ বসে বাসুদেব ভদ্রর কথা ভাবছিলেন। সুপ্রকাশের শেষ কথাটার খেই ধরে ঠোঁটের কোণে দুর্জ্ঞেয় হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘মৃতেরা ছুটি নিয়ে বেড়াতে এলে সেটাকে বলা হয় জীবন। বেঁচে থাকা মানে স্বপ্ন দেখা—ঘুম ভাঙলেই মৃত্যু। বাসুদেববাবুর স্বপ্নটা বেশ লম্বা ছিল। নাকি বলব ছুটিটা বেশ লম্বা ছিল…।’

প্রিয়নাথের কথা শুনে সকলেই কেমন চুপ করে গেলেন। প্রিয়নাথ মৃত্যু নিয়ে এত ভাবেন! মৃত্যুকে যেন ওঁরা নতুনভাবে অনুভব করতে পারছিলেন। সুপ্রকাশ পালিত কিছুক্ষণের জন্য চোখ বুজলেন। ঘরের পরিবেশ যেন অনুভব করতে চাইলেন।

ওঁরা সকলে তক্তপোশের ওপরে বসে ছিলেন। তার কাছাকাছি ছিল একটা হাতলওয়ালা বড় চেয়ার। চেয়ারের রং পালিশ কিছু বোঝার উপায় নেই। তার ওপরে ধূপদানিতে কয়েকটা ধূপ জ্বলছিল। সেই ধূপের গন্ধে ঘরের ভেতরে স্মৃতিচারণের আবহাওয়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বাসুদেব ভদ্র সম্পর্কে ওঁরা যাঁর-যাঁর মতন করে দু-চার কথা বলছিলেন। প্রিয়নাথ চুপ করে ওঁদের কথা শুনতে লাগলেন।

প্রিয়নাথের মনে হল, ধূপের গন্ধের সঙ্গে প্রথম বৃষ্টির গন্ধ মিশে গিয়ে ঘরের ভেতরে কেমন এক অলৌকিক আমেজ তৈরি হয়ে গেছে। তিনি ঘরের দেওয়ালে টাঙানো অ্যানসনিয়া পেন্ডুলাম-ঘড়িটার দিকে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে তাকিয়ে রইলেন।

হঠাৎই প্রিয়নাথ বললেন, ‘আপনারা বাসুদেববাবু সম্পর্কে নানা কথা বললেন। আমার সঙ্গে ওঁর তেমন কিছু ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তবে আমার ভূত-প্রেতের নেশার কথা তিনি জানতেন। তাই একদিন নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটা অদ্ভুত কাহিনি শুনিয়েছিলেন—শুনলে বিশ্বাস হবে না এমন কাহিনি…।’

এমন সময় একজন মাঝবয়েসি লোক ঘরে ঢুকল। পরনে ধুতি আর হাতাওয়ালা গেঞ্জি। হাতে শৌখিন ট্রে। তাতে সাজানো চা আর বিস্কুট।

সুপ্রকাশ লোকটিকে ডেকে বললেন, ‘আয়, নিরঞ্জন। সকলের হাতে-হাতে দিয়ে দে।’

নিরঞ্জন প্রত্যেকের হাতে চায়ের কাপ-প্লেট তুলে দিল। বিস্কুটের প্লেটটা নামিয়ে রাখল সকলের হাতের নাগালে। তারপর ধীরে ধীরে পা ফেলে চলে গেল।

পেন্ডুলাম-ঘড়িতে আটটার ঘণ্টা বাজল।

চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়ে প্রিয়নাথ নীচু গলায় বললেন, ‘বাসুদেববাবু ওকালতিতে হাতেখড়ি দেওয়ার আগে বছরখানেক নানা পেশায় যুক্ত ছিলেন। খাতা লেখার কাজ করেছেন, ওষুধের সেলসম্যান ছিলেন, হোটেলের ম্যানেজারি করেছেন, শাড়ির দোকানে চাকরি করেছেন। খানিকটা অস্থির মতির জন্যেই বোধহয় কোনও কাজেই টিকে থাকতে পারেননি। তারপর বাড়ির চাপে, আর ওঁর বাবার বকুনি খেয়ে ল’ পড়তে ঢোকেন। ব্যস, ওঁর জীবনটা একটা পথ পেয়ে গেল।

‘যে-ঘটনাটার কথা বাসুদেববাবু বলেছিলেন সেটা একটা ছোটখাটো হোটেলকে নিয়ে। তিনি তখন সেই হোটেলের ম্যানেজার ছিলেন…।’

বাসুদেবের বারবার হাই উঠছিল। এই ভয়ঙ্কর শীতে বারবার হাই তোলা মানে হিম-বাতাস বুকের ভেতরে টেনে নেওয়া। কিন্তু উপায় কী। কাউন্টার থেকে পাতাতাড়ি গুটিয়ে যে সরে পড়বেন তার উপায় নেই। ঠিক রাত এগারোটায় মালিকের ফোন আসবে। উনি দেখতে চান কাঁটায়-কাঁটায় রাত এগারোটা পর্যন্ত তাঁর হোটেল খোলা আছে কি না। বাসুদেবকে যে চোদ্দোশো টাকা মাস-মাইনে দেন, তার পাইপয়সা পর্যন্ত কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করে নেন। কিন্তু কাস্টমার কোথায়! খোলা দরজা দিয়ে শুধু অন্ধকার রাত আর শীতের হালকা কুয়াশা চোখে পড়ছে।

আর কখনও-কখনও দিল্লি রোড ধরে ছুটে যাওয়া ট্রাকের ঘোলাটে হেডলাইট।

যে-রাস্তাটা দিল্লি রোড থেকে ডানকুনির দিকে ঘুরে গেছে তারই বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে বাসুদেবের হোটেল। দোতলা হোটলটা যে অত্যন্ত কষ্ট করে দাঁড়িয়ে আছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তার জরাজীর্ণ চেহারার দিকে তাকালেই স্পন্ডিলাইটিসের পেশেন্ট বলে মনে হয়। হোটেলের পলেস্তারা থেকে শুরু করে জল-কল-আলোর ব্যবস্থা পর্যন্ত সবই নড়বড়ে অগোছালো।

হোটেলটার নাম ‘দ্য হোস্ট’। সদর দরজায় তেরছা হয়ে থাকা রং-চটা একটা সাইনবোর্ডে ইংরেজি হরফে নামটা লেখা আছে। এ-হোটেলের ম্যানেজারিতে জয়েন করার পর থেকেই বাসুদেবের বারবার সাধ হয়েছে, হোটেলের নামের আগে একটা ‘জি’ হরফ বসিয়ে ‘দ্য গোস্ট’ করে দেন। বেকার জীবনের টানাপোড়েন ঘোচাতে কপাল ঠুকে এখানে কাজে লেগে গেছেন বটে, কিন্তু এখানে কাজ বলতে তেমন কিছু নেই। সারাদিন শুধু পালিশ-চটা কাউন্টারে বসে থাকো আর রাস্তার গাড়ি গোনো। আর মাঝে-মাঝে সাতকাজের ফরমাশের লোক এবং রাঁধুনি পঞ্চাননকে ডেকে একটু তম্বি করো।

বাসুদেব আরশোলাকে যথেষ্ট ভয় পান। কেন তিনি জানেন না। এ অনেকটা যেন মন্ত্রশক্তির মতো। যারা আরশোলা ভয় পায়, তারা জানে না কেন। আর, যারা ভয় পায় না, তারাও জানে না তার কারণ কী। এ-হোটেলে সুপ্রচুর আরশোলা আছে—নানা মাপের, নানা ধরনের। ফলে বাসুদেব আর পঞ্চানন বেশ ভয়ে-ভয়ে দিন কাটান। এবং রাতও।

হোটেলের মালিকের নাম হরেকৃষ্ণ মণ্ডল। জঘন্যরকম বড়লোক। তবে নানান কুসংস্কারে ভোগেন। আর ধর্ম-কর্ম নিয়ে থাকেন। অন্তত বাইরে থেকে দেখে তাই মনে হয়।

‘দ্য হোস্ট’-এ হরেকৃষ্ণবাবু মাসে মাত্র একবার আসেন। হিসেবপত্র বুঝে নিয়ে চলে যান। তাঁর অন্যান্য আরও জমকালো ব্যবসা আছে। সেগুলো নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। তবে তাঁর নিয়মের এতটুকু নড়চড় হওয়ার জো নেই।

যেমন, ঢুকে থেকেই বাসুদেব দেখছেন এ-হোটেলে একটা নিয়ম চালু আছে। হোটেল কখনও ফাঁকা রাখা চলবে না—কমসে কম খাতায়-কলমে। অর্থাৎ, সব ঘর ফাঁকা থাকলেও অন্তত দুটো ঘর ভরতি বলে সবসময় দেখাতে হবে। কারণ, হোটেলে কোনও বোর্ডার যদি এসে দ্যাখে সব ঘরই ফাঁকা, তা হলে সে হয়তো ঘাবড়ে গিয়ে এ-হোটেলে আর উঠবে না। অন্য কোনও হোটেল খুঁজবে।

যুক্তিহীন কুসংস্কার। কিন্তু কোনও উপায় নেই।

সেই কারণেই হরেকৃষ্ণবাবুর ঠিক করে দেওয়া দুটো কাল্পনিক নাম-ঠিকানা সবসময় হোটেল-রেজিস্টারে লেখা থাকে। অরিন্দম পোদ্দার, পাদরীপাড়া, চন্দননগর, হুগলি। আর কালাচাঁদ নস্কর, ব্রহ্মপুর, গড়িয়া। প্রথমজনকে আপাতত রাখা হয়েছে রুম নম্বর বারোয়—দোতলার দ্বিতীয় ঘরে। আর কালাচাঁদ নস্কর আছেন তেরো নম্বর ঘরে। অর্থাৎ দোতলার তিন নম্বর ঘরে।

হোটেলে মোট সাতটা ঘর। একতলায় তিনটে, দোতলায় চারটে। তার মধ্যে একটা সিঙ্গল, বাকিগুলো ডাবল-বেড-এর ঘর। একতলার সিঙ্গলটায় বাসুদেবের থাকার কথা। তাই-ই থাকেন। তবে বেশিরভাগ সময়েই ঘর ফাঁকা থাকে বলে দোতলার চার নম্বর ঘরটায় তিনি রাত কাটান। ওই ঘরটায় দুটো জানলা বেশি আছে। হাওয়া-বাতাস ঠিকমতো খেলতে পারে। আর আরশোলার ভয় কম।

বাসুদেব শীতকাতুরে মানুষ। উলিকটের গেঞ্জি, ফুলহাতা সোয়েটার, মাফলার ইত্যাদি চড়িয়েও ওঁর শীত যাচ্ছিল না। তার ওপরে ঘুমে চোখ বুজে আসতে চাইছিল। বারবার রিসেপশনের দেওয়াল-ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এগারোটা বাজতে এখনও মিনিট পনেরো মতন বাকি। পঞ্চানন বোধহয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর জন্য সিঁড়ির নীচের একটা খুপরি বরাদ্দ করা আছে। একটু আগেই ও বলে গেছে, বাসুদেবের রাতের খাবার ঘরে ঢাকা দেওয়া আছে।

সুতরাং শীত এবং একঘেয়েমিতে ক্লান্ত বাসুদেব দেওয়াল-ঘড়ির মিনিটের কাঁটার সঙ্গে হাত ধরে হাঁটছিলেন। কতক্ষণে ওটা বারোটার দাগে পৌঁছবে?

ঠিক তখনই ওরা এল।

খোলা দরজার ফ্রেমে কালো অন্ধকারের পটভূমিতে ঠিক ছবির মতো দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুরুষ ও একজন মহিলাকে দেখতে পেলেন বাসুদেব। দেখে খানিকটা চমকে উঠলেন। ওরা যেন আচমকা হাজির হয়েছে দরজায়। কারণ, বাসুদেব ওদের হেঁটে আসতে দেখেননি। কখন কোথা দিয়ে দরজার কাছে চলে এল ওরা!

সামান্য কুয়াশা গায়ে মেখে পুরুষ ও মহিলাটি ভেতরে ঢুকল। খানিকটা যেন ছন্দে পা ফেলে চলে এল কাউন্টারের সামনে—বাসুদেবের খুব কাছে। বাসুদেব উগ্র পারফিউমের গন্ধ পেলেন।

ওদের দেখে বাসুদেবের কেমন যেন সন্দেহ হল। ওরা কি অবিবাহিত দম্পতি? এ-হোটেলে রাত কাটাতে এসেছে? কিন্তু ওদের পোশাক-আশাক ভারী অদ্ভুত।

পুরুষটির বয়েস তিরিশের এপিঠ-ওপিঠ। ইয়োরোপীয় ধাঁচের কাটা-কাটা মুখ। চওড়া কাঁধ। চোখ ছোট-ছোট, কিন্তু চাউনি যেন বর্শার ফলা। মাথার চুল তেল-চকচকে। টান-টান করে পিছনদিকে আঁচড়ানো। দাড়ি-গোঁফ কামানো তামাটে মুখে কেমন যেন ফ্যাকাসে ভাব। আর চোয়ালের হাড় সামান্য উঁচু হয়ে থাকায় মুখে একটা নিষ্ঠুর ভাব ফুটে উঠেছে।

সঙ্গের মেয়েটির বয়েস পঁচিশ কি ছাব্বিশ। ফরস

**********