বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন

বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন

অতুল সুর

বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন

Books Pointer Iconঅতুল সুর
Books Pointer Iconhistory

Change color

বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন – ড. অতুল সুর

Bangla O Bangalir Bibartan [an Ethno-Cultural History of Bengali] By. Dr. Atul sur Published

যে দেশের

ভূমিসন্তান হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি

সে দেশের দেশমাতৃকার চরণে

নিবেদিত হল

গৌড়চন্দ্ৰিকা

প্রাচীন বাঙলার অপর নাম ছিল ‘গৌড়’। সেজন্য বইখানার ভূমিকার নাম দেওয়া হয়েছে ‘গৌড়চন্দ্রিকা’। আর বইখানার শিরোনামে গৃহীত ‘বিবর্তন’ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে আভিধানিক অর্থে। ‘বিবর্তন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘পরিবতর্ন’। ‘বিবর্তন’ শব্দের সঙ্গে অবনতি বা উন্নতির কোন সম্পর্ক নেই। একমাত্র সম্পর্ক হচ্ছে রূপান্তরের সম্পর্ক। সেজন্য কালের ঘূর্ণনে বিভিন্ন যুগে বাঙালী জীবনে যে রূপান্তর ঘটেছে, তারই ইতিহাস দেওয়া হয়েছে এই বইখানাতে। তবে এ ইতিহাস কোন ‘পোশাকী’ বা ‘ফরম্যাল’ ইতিহাস নয়। সম্পূর্ণভাবে এটা ‘আটপৌরে’ বা ‘ইনফরম্যাল’ ইতিহাস। এটা বিষয় – বিন্যাসের পদ্ধতি থেকেই বুঝতে পারা যাবে। এক কথায় বইখানাতে পাওয়া যাবে বাঙালী জীবনের সৃজন, বিকাশ ও বিপর্যয়ের ইতিহাস।

বইখানা লেখা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের উক্তিকে স্মরণ করে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—’আমরা ইতিহাস পড়ি-কিন্তু যে ইতিহাস দেশের জনপ্রবাহকে অবলম্বন করিয়া প্রস্তুত হইয়া উঠিয়াছে, যাহার নাম লক্ষণ, নানা স্মৃতি আমাদের ঘরে বাইরে নানা স্থানে প্রত্যক্ষ হইয়া আছে, তাহা আমরা আলোচনা করি না বলিয়া ইতিহাস যে কী জিনিস, তাহার উজ্জ্বল ধারণা আমাদের হইতে পারে না।’

বাঙালির জীবনযাত্রা শুরু হয়েছিল মানুষের আর্বিভাবের দিন থেকে। ভূ-তাত্ত্বিক আলোড়ন ও চঞ্চলতার ফলে বাঙলা দেশ গঠিত হয়ে গিয়েছিল প্লাওসিন যুগে। ভূতত্ত্ববিদগণের হিসাব অনুযায়ী সেটা ঘটেছিল প্রায় দশ থেকে পঁচিশ লক্ষ বৎসর পূর্বে। মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল আরও পরে, আজ থেকে পাঁচ লক্ষ বৎসর আগে। তার আগেই ঘটেছিল জীবজগতে ক্রমবিকাশের এক কর্মকাণ্ড। বানরজাতীয় জীবগণ চেষ্টা করছিল বিভিন্ন লক্ষণযুক্ত হয়ে নানা বৈশিষ্ট্যমূলক শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হতে। এরূপ এক শাখা থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল নরাকার জীবসমূহ (Primates)। এরূপ নরাকার জীবনসমূহের কঙ্কালাস্থি আমরা পেয়েছি ভারতের উত্তর-পশ্চিম শিবালিক শৈলমালা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে। বিবর্তনের ছকে তাদের আমরা নাম দিয়েছি শিবপিথেকাস, রামপিথেকাস, সুগ্রীবপিথেকাস ইত্যাদি। আরও উন্নত ধরনের নরাকার জীবের কঙ্কালাস্থি পাওয়া গিয়েছে ভারতের দক্ষিণ-পূর্বে জাভা-দ্বীপে ও চীন দেশের চুংকিং-এ। এখন এই তিনটি জায়গায় তিনটি বিন্দু বসিয়ে যদি সরলরেখা দ্বারা সংযুক্ত করা হয়, তা হলে যে ত্রিভুজ সৃষ্ট হবে, তারই মধ্যস্থলে পড়বে বাঙলা দেশ। সুতরাং, এরূপ নরাকার জীবসমূহ যে বাঙলা দেশের ওপর দিয়ে যাতায়াত করত, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এসব নরাকার জীব থেকেই মানুষের উদ্ভব ঘটেছিল।

মানুষের প্রথম সমস্যা ছিল আত্মরক্ষা ও খাদ্য আহরণ। জীবন- সংগ্রামের এই সমস্যা সমাধানের জন্য, তাকে তৈরি করতে হয়েছিল আয়ুধ। আয়ুধগুলো একখন্ড পাথর অপর একখন্ড পাথরের সাহায্যে তার চাকলা তুলে হাতকুঠার ও অন্য আকারে নির্মিত হত। এগুলোকে আমরা প্রত্নোপলীয় যুগের আয়ুধ বলি। গঠনপ্রণালী ও চারিত্রিক বিশিষ্টতার দিক দিয়ে এগুলোকে আমরা কালানুক্রমিক সাতটা যুগে ফেলি। যথা (১) আবেভিলিয়ান, (২) অ্যাশুলিয়ান, (৩) লেভালয়সিয়ান, (৪) মুস্টেরিয়ান, (৫) অরিগনেসিয়ান, (৬) সলুট্রিয়ান ও (৭) ম্যাগডেলেনিয়ান। এগুলো সম্বন্ধে সবচেয়ে বেশি অনুসন্ধান ও অনুশীলন হয়েছে পশ্চিম ইউরোপে। সেজন্যই এই সকল আয়ুধের ‘টাইপ’-এর নাম পশ্চিম-ইউরোপের অঞ্চলবিশেষের নাম অনুসারে করা হয়েছে। তবে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদগণ তাদের কাজের সুবিধার জন্য প্রত্নোপলীয় যুগকে তিন ভাগে ভাগ করেন, যথা— আদি, মধ্য ও অন্তিম। আয়ুধ নির্মাণ ছাড়া, প্রত্নোপলীয় যুগের মানুষের আরও কয়েকটা বৈশিষ্ট্য ছিল, যথা ভাবপ্রকাশের জন্য ভাষার ব্যবহার, পরিবার গঠন, পশু-শিকার সুগম করবার জন্য পর্বত-গুহায় বা পর্বতগাত্রে পশুর চিত্রাঙ্কন দ্বারা ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় গ্রহণ, ও আগুনের ব্যবহার।

মুস্টেরিয়ান যুগের আগেকার যুগের মানুষের কোন কঙ্কালাস্থি আমরা পাইনি। মুস্টেরিয়ান যুগে যে জাতির মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাদের আমরা নিয়ানডারথাল মানুষ বলি। তবে সে জাতির মানুষ এখন লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। যে জাতির মানুষ থেকে আধুনিক জাতিসমূহ উদ্ভূত হয়েছে, তাদের আবির্ভাব ঘটে আনুমানিক ৪০,০০০ বৎসর পূর্বে। তাদের আমরা ক্রোম্যানিয়ন। (Cro-Magnon) জাতির মানুষ বলি।

খুব প্রাচীনকালের মানুষের কঙ্কালাস্থি ভারতে পাওয়া যায়নি। বিখ্যাত প্রত্নাস্থিতত্ত্ববিদ স্যার আর্থার কীথ ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে যখন তাঁর ‘অ্যাটিকুইটি অভ্ ম্যান’ নামক বই লেখেন, তখন তিনি বলেছিলেন— ‘প্রাচীন মানুষের সম্বন্ধে যাঁরা অনুসন্ধান করেন, তাঁরা ভারতের দিকেই আশার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন, কিন্তু এ পর্যন্ত তাঁদের নিরাশ হতে হয়েছে।’ অনুসন্ধানের উদ্যোগের অভাবই এর একমাত্র কারণ। সম্প্রতি (১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে) মেদিনীপুর জেলার রামগড়ের অদূরে সিজুয়ায় পাওয়া গিয়েছে এক জীবাশ্মীভূত ভগ্ন মানব-চোয়াল। রেডিয়ো কারবন— ১৪ পরীক্ষায় এর বয়স নির্ণীত হয়েছে ১০, ৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তার মানে প্রত্নোপলীয় যুগের একেবারে অন্তিম পর্বে, কেননা নবোপলীয় যুগ শুরু হয়েছিল ৮,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বা তার কিছু পূর্বে।

তবে প্রত্নোপলীয় যুগের প্রথম দিকের মানুষের কঙ্কালাস্থি পাওয়া না গেলেও, মানুষ যে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই বাঙলা দেশের বাস করে এসেছে, তার প্রমাণ আমরা পাই বাঙলা দেশের নানাস্থানে পাওয়া তার ব্যবহৃত আয়ুধসমূহ (tools) থেকে। (পৃষ্ঠা ৭০ দেখুন)। এগুলো সবই পশ্চিম-ইউরোপে প্রাপ্ত প্রত্নোপলীয় যুগের হাতকুঠারের অনুরূপ। প্রত্নোপলীয় (Palaeolithic) যুগের পরিসমাপ্তির পরই সূচনা হয় নবোপলীয় (neolithic) যুগের। এ যুগেই কৃষি ও বয়নের উদ্ভব হয়, এবং মানুষ পশুপালন করতে শুরু করে। তবে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন যা নবোপলীয় যুগে ঘটেছিল, তা হচ্ছে মানুষ তার যাযাবর জীবন পরিহার করে, স্থায়ীভাবে গ্রামে বাস করতে শুরু করেছিল। ধর্মেরও উদ্ভব ঘটেছিল। তাদের ধর্মীয় জীবন সম্বন্ধে আমি আমার ‘ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ গ্রন্থে আলোচনা করেছি, সেজন্য এখানে আর তার পুনরাবৃত্তি করছি না। নবোপলীয় যুগের কৃষ্টির নিদর্শন আমরা দার্জিলিঙ থেকে মেদিনীপুর পর্যন্ত নানাস্থানে পেয়েছি। শুধু তাই নয়, নবোপলীয় যুগের অনেক কিছুই আমরা আজ পর্যন্ত আমাদের দৈনন্দিন জীবন ধরে রেখেছি, যথা ধামা, চুবড়ি, কুলা, ঝাঁপি, বাটনা, বাটবার শিল-নোড়া ও শস্য পেষাইয়ের জন্য যাঁতা ইত্যাদি। এগুলো সবই আজকের বাঙালি নবোপলীয় যুগের ‘টেকনোলজি’ অনুযায়ী তৈরি করে। তা ছাড়া, নবোপলীয় যুগের শস্যই, আজকের মানুষের প্রধান খাদ্য।

জীবনচর্যাকে সুখময় করবার জন্য মানুষের জয়যাত্রা নবোপলীয় যুগেই ত্বরান্বিত হয়। কেননা, মাত্র পাঁচ হাজার বৎসরের মধ্যেই নবোপলীয় যুগের গ্রামীণ সভ্যতা তাম্রাশ্মযুগের নগরসভ্যতায় বিকশিত হয়। তাম্রাশ্মযুগের নগরসভ্যতার নিদর্শন আমরা পেয়েছি বর্ধমান জেলার পাণ্ডুরাজার ঢিবি ও সন্নিহিত অঞ্চলে। এই বইয়ের অন্যত্র আমি বলেছি— ‘তাম্ৰাশ্মযুগের সভ্যতার অভ্যুদয়ে তামাই প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। মিশর বলুন, সুমের বলুন, সিন্ধু উপত্যকা বলুন, সর্বত্রই আমরা সভ্যতার প্রথম প্রভাতে তামার ব্যবহার দেখি। সুতরাং আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি যে তাম্রাক্ষ্ম সভ্যতার উন্মেষ এমন কোন জায়গায় হয়েছিল, যেখানে তামা প্রভূত পরিমাণে পাওয়া যেত। এখানে সেখানে তামা অবশ্য সামান্য কিছু কিছু পরিমাণে পাওয়া যেত, কিন্তু তা নগণ্য। বাঙলাই ছিল সে-যুগের তামার প্রধান আড়ত। তামার সবচেয়ে বৃহত্তম খনি ছিল বাঙলা দেশে। বাঙলার বণিকরাই ‘সাত সমুদ্দুর তের নদী’ পার হয়ে, ওই তামা নিয়ে যেত সভ্যতার বিভিন্ন কেন্দ্রসমূহে বিপণনের জন্য। এজন্যই বাঙলার বড় বন্দরের নাম ছিল তাম্রলিপ্তি। ওই তামা সংগৃহীত হত ধলভূমে অবস্থিত তৎকালীন ভারতের বৃহত্তম তাম্রখনি হতে।’ (পৃষ্ঠা ৭১) আমি আরও বলেছি যে এই তামার সঙ্গে বাঙালী অন্যত্র নিয়ে গিয়েছিল শিব ও শক্তিপূজার বীজ, যা বাঙলার নিজস্ব ধর্ম। বস্তুত বাঙলাদেশে যত শিবমন্দির দেখতে পাওয়া যায়, তত আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। এখানে একথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে বাঙালী এখনও তার ঠাকুরঘরে ব্যবহার করে তাম্রাশ্মযুগের সম্পদ, যথা পাথর ও তামার থালাবাসন, তামার কোষাকুষি ইত্যাতি। (৩৮৪ পৃষ্ঠায় ‘সংযোজন’ দেখুন )

তাছাড়া, নিম্নবাঙলার অনেক স্থানে যেমন মেদিনীপুর জেলার তমলুক (প্রাচীন তাম্রলিপ্তি), তিলদা (তমলুক থেকে ২৪ মাইল দূরে), পান্না (ঘাটাল থেকে ৪ মাইল দক্ষিণে), বাহিরি (কাঁথি মহকুমায়) ও রঘুনাথপুর (তমলুক থেকে ১২ মাইল দক্ষিণে), এবং চব্বিশ পরগনার বেড়াচাঁপা বা চন্দ্রকেতুগড় (কলকাতার ২৩ মাইল উত্তরে), আটঘরা (কলকাতার ১২ মাইল দক্ষিণে), হরিহরপুর (মল্লিকপুর রেল স্টেশনের নিকটে, ) হরিনারায়ণপুর (ডায়মন্ড হারবারের ৪ মাইল দক্ষিণ) প্রভৃতি স্থানে কীলকচিহ্নাঙ্কিত প্রাচীন মুদ্রা, কুশান ও গুপ্ত যুগের মুদ্রা, পোড়ামাটির নানারকম মূর্তি, মৃত্তিকা নির্মিত সীলমোহরাদি আবিষ্কৃত হয়েছে। নানারকম প্রত্নবস্তু থেকে প্রমাণিত হয় যে গ্রীক ও রোমান জগতের সঙ্গে এ অঞ্চলের সমৃদ্ধিশালী বাণিজ্য ছিল।

* * * *

বাঙালীকে মিশ্র জাতি বলা হয়। এ সম্পর্কে বলা প্রয়োজন যে অধুনা লুপ্ত প্রায় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আদিম অধিবাসিগণ ব্যতীত, জগতে এমন কোন জাতি নাই, যারা মিশ্র জাতি নয়। অনন্ত নৃতত্ত্ববিদ্‌গণের কাছে এমন কোন্ জাতির নাম জানা নেই যারা বিশুদ্ধ রক্ত বহন করে। তার মানে, পৃথিবীর অন্যান্য জাতিরা যেমন মিশ্র জাতি, বাঙলীও তাই। বাঙালীর আবয়বিক নৃতাত্ত্বিক গঠনে যেসব জাতির রক্ত মিশ্রিত হয়েছে, তারা হচ্ছে অস্ট্রিক ভাষা-ভাষী বাঙলার আদিম, অধিবাসী, ও আগন্তুক দ্রাবিড় ভাষাভাষী ভূমধ্যসাগরীয় নরগোষ্ঠী ও আর্যভাষাভাষী আলপীয় (বা দিনারিক জাতিসমূহ। তবে অস্ট্রিক ভাষাভাষী বাঙলার আদিম অধিবাসী ও আলপীয় (বা দিনারিক) রক্তই প্রধান। এই শেষোক্ত জাতিই বাঙালীকে দিয়েছে তার প্রধান নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য- হ্রস্বকপাল (brachycephallic)। এখানেই উত্তর ভারতের দীর্ঘ-কপাল (dolichocephalic) জাতিসমূহ থেকে বাঙালীর পার্থক্য। (এ সম্বন্ধে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে ‘বাঙালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ অধ্যায়ে)।

বাঙালীর জীবনচর্যায় ‘অস্ট্রিক’ প্রভাব খুব বেশি। বাঙালির ভাষা ও সাংস্কৃতিক জীবন এর বহু নিদর্শন বহন করে। বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এ.সি. হ্যাডন তাঁর ‘রেসেস অভ্ ম্যান্’ বইয়ে বলেছেন যে ‘অস্ট্রিক’ ভাষাভাষীরা এক সময় পঞ্জাব থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের সুদূরে অবস্থিত ইস্টার দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বাঙলী জীবনে ‘অস্ট্রিক’ প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষিত হয় বাঙালীর লৌকিক জীবনে। সে জন্যই বাঙালীর লৌকিক জীবনের একটা পরিচয় আমি দিয়েছি বইখানার গোড়ার দিকে। বস্তুত ‘অস্ট্রিক’ জীবনচর্যার ওপরই গঠিত হয়েছে বাঙালীর জীবনচর্যার বনিয়াদ। সেই বনিয়াদের ওপর স্তরীভূত হয়েছে দ্রাবিড় ও আলপীয় উপাদান। তবে আলপীয়রা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল বলেই, এই তিনজাতির মহাসম্মিলনে যে জীবনচর্যা গড়ে উঠেছিল, তা আলপীয় ‘অসুরদের (পৃষ্ঠা ৪৪-৪৫ ও ৮১-৮২ দেখুন)। নাম অনুসারে অসুর জাতির জীবনচর্যা নামে পরিচিত হয়েছিল। আমাদের প্রাচীন সাহিত্য এটাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে। মহাভারতের আদিপর্ব অনুযায়ী অসুররাজ বলির পাঁচ পুত্রে নাম থেকে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুহ্ম রাজ্যের নামকরণ হয়েছে। ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ নামে এক প্রাচীন বৌদ্ধগ্রন্থেও বাঙলা দেশের ভাষাকে ‘অসুর’ জাতির ভাষা বলা হয়েছে। (অসুর নাম্‌ ভবেৎ বাচ গৌড্রপুন্ড্রোদ্ভব সদা’)। মাত্র আবয়বিক গঠন ও ভাষার দিক দিয়েই নয়, অসুরজাতি সমগ্র জীবনচর্যাটাই উত্তরভারতের “ নর্ডিক নরগোষ্ঠীভুক্ত বৈদিক আর্যগণের জীবনচর্যা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল। এই জীবনচর্যার পার্থক্যের জন্যই বৈদিক আর্যরা বাঙলাদেশের ‘অসুর’ জাতিভুক্ত লোকদের তির্যকদৃষ্টিতে দেখতেন। আর্যদের সঙ্গে অসুরদের বিরোধের এটাই ছিল কারণ। (লেখকের ‘ভারতের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ দ্রঃ)।

আর্যরা যখন পঞ্চনদের উপত্যকায় এসে বসতি স

**********