
পদ্মাবতী
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
পদ্মাবতী নাটক
প্রথমাঙ্ক
বিন্ধ্যগিরি;—দেব-উপবন।
(ধনুর্ব্বাণ-হস্তে রাজা ইন্দ্রনীলের বেগে প্রবেশ।)
রাজা। (চতুর্দ্দিক্ অবলোকন করিয়া স্বগত) হরিণটা দেখ্তে দেখ্তে কোন্ দিকে গেল হে? কি আশ্চর্য্য! আমি কি নিদ্রায় আবৃত হয়ে স্বপ্ন দেখ্ছি? আর তাই বা কেমন করে বলি। এই ত ভগবান্ বিন্ধ্যাচল অচল হয়ে আমার সম্মুখে রয়েছেন। (চিন্তা করিয়া) এই পর্ব্বতময় প্রদেশে রথের গতির রোধ হয় বল্যে, আমি পদব্রজে হরিণটার অনুসরণ ক্লেশ স্বীকার কর্যে অবশেষে কি আমার এই ফল লাভ হলো যে আমি একলা একটা নির্জ্জন বনে এসে পড়লেম? মরুভূমিতে মরীচিকা বারিরূপে দর্শন দেয়; তা এ স্থলে কি সে মায়ামৃগ হয়ে আমাকে এত বৃথা দুঃখ দিলে! সে যা হৌক, এখন এখানে কিঞ্চিৎকাল বিশ্রাম কর্যে এ ক্লান্তি দূর করা আবশ্যক। (পরিক্রমণ করিয়া) আহা! স্থানটি কি রমণীয়! বোধ করি এ কোন যক্ষ কিম্বা গন্ধর্ব্বের উপবন হবে। প্রকৃতি, মানব জাতির লোচনানন্দের নিমিত্তে, এমন অপরূপ রূপ কোথাও ধারণ করেন না। আমি এই উৎসের নিকটে শিলাতলে বসি। এ যেন কলকল রবে আমাকে আহ্বান কচ্যে। (উপবেশন করিয়া সচকিতে) এ কি? এ উদ্যান যে সহসা অপূর্ব্ব সুগন্ধে পরিপূর্ণ হতে লাগলো? (আকাশে কোমল বাদ্য) আহা! কি মধুর ধ্বনি। কি—? (সহসা নিদ্রাবৃত হইয়া শিলাতলে পতন।)
(শচী এবং রতির প্রবেশ।)
শচী। সখি, সুরপতির কথা আর কেন জিজ্ঞাসা কর। তিনি দুষ্ট দৈত্যবংশ কিসে সমূলে ধ্বংস হবে এই ভাবনায় সদা সর্ব্বদাই ব্যস্ত থাকেন। তাঁর কি আর সুখভোগে মন আছে? রতিদেবি, তুমি কি ভাগ্যবতী। দেখ, তোমার মন্মথ তিলার্দ্ধের জন্মেও তোমার কাছ ছাড়া হন না। আহা! যেমন পারিজাত পুষ্পের আলিঙ্গন পাশে সৌরভমধু চিরকাল বাঁধা থাকে, তোমার মদনও তেমনি তোমার বশীভূত।
রতি। সখি, তা সত্য বটে। বিরহ-অনল যে কাকে বলে তা আমি প্রায় বিস্তৃত হয়েছি। (উভয়ের পরিক্রণ) কি আশ্চর্য্য! শচীদেবি, ঐ দেখ তোমার মালতী মলয়মারুতের আগমনে যেন বিরক্ত হয়ে তাকে নিকটে আস্তে ইঙ্গিতে নিষেধ কচ্যে।
শচী। কর্বে না কেন? দেখ, ইনি সমস্ত দিন ঐ নির্ম্মল সরোবরে নলিনীর সঙ্গে কেলি করে কেবল এই এখানে আস্চেন। এতে কি মালতীর অভিমান হয় না? আর আপনার গায়ের গন্ধেই ইনি আপনি ধরা পড়ছেন।
(মুরজা দেবীর প্রবেশ।)
কি গো, সখি মুরজা যে? এস, এস। আজ তোমার এত বিরস বদন কেন?
মুর। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) সখি, আমার দুঃখের কথা আর কাকে বল্বো?
রতি। কেন, কেন? কি হয়েছে?
মুর। প্রায় পনের বৎসর হলো পার্ব্বতী আমার কন্যা বিজয়াকে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ কত্যে অভিশাপ দেন; তা সেই অবধি তার আর কোন অনুসন্ধান পাই নাই।
শচী। সে কি? ভগবতী পৃথিবী না তাকে স্বগর্ভে ধারণ কত্যে স্বীকার পেয়েছিলেন?
মুর। হাঁ—পেয়েছিলেন আর ধরেও ছিলেন বটে। কিন্তু তার জন্ম হল্যে তাকে যে লালন পালনের জন্যে কার হাতে দিয়েছেন এ কথাটি তিনি কোনমতেই আমাকে বল্তে চান না। আমি আজ তাঁর পায়ে ধরে যে কত কেঁদেছি, তা আর কি বল্বো?
রতি। তা ভগবতী তোমাকে কি বল্লেন?
মুর। তিনি বললেন—“বৎসে, সময়ে তুমি আপনিই সকল জান্তে পারবে। এখন তুমি রোদন সম্বরণ কর্যে অলকায় যাও। তোমার বিজয়া পরম সুখে আছে।”
শচী। তবে, সখি, তোমার এ বিষয়ে চঞ্চল হওয়া কোনমতেই উচিত হয় না। আর বিবেচনা করে দেখ, পৃথিবীতে মানুষের জীবনলীলা জলবিম্বের মতন অতি শীঘ্রই শেষ হয়।
মুর। সখি, বিজয়ার বিরহে আমার মন থেকে থেকে যেন কেঁদে উঠে! হায়! জগদীশ্বর আমাদের অমর করেও দুঃখের অধীন কল্যেন্।
শচী। সখি, বিধাতার এ বিপুল সৃষ্টিতে এমন কোন্ ফুল আছে যে তাতে কীট প্রবেশ কত্যে না পারে?
(দূরে নারদের প্রবেশ।)
নার। (স্বগত) আমি মহর্ষি পুলস্তের আশ্রমে শূন্যপথ দিয়ে গমন কর্তেছিলেম। অকস্মাৎ এই দেব-উপবনে এই তিনটি দেবনারীকে দেখে ইচ্ছা হলো যে যেমন কর্যে পারি এদের মধ্যে কোন কলহ উপস্থিত করাই—এই জন্যেই আমি এই পর্ব্বত-সানুতে অবতীর্ণ হয়েছি। তা আমার এ মনস্কামনাটি কি সুযোগে সুসিদ্ধ করি? (চিন্তা করিয়া) হাঁ, হয়েছে। এই যে সুবর্ণ-পদ্মটি আমি মানস সরোবর থেকে অবচয়ন করে এনেছি, এর দ্বারাই আমার কার্য্য সফল হবে। (অগ্রসর হইয়া) আপনাদের কল্যাণ হউক!
সকলে। দেবর্ষি, আমরা সকলে আপনাকে অভিবাদন করি। (প্রণাম।)
শচী। (স্বগত) এ হতভাগা ত সর্ব্বত্রেই বিবাদের মূল, তা এ আবার কোত্থেকে এখানে এসে উপস্থিত হলো?—ও মা! আমি এ কি কচ্চি? ও যে অন্তর্যামী। ও আমার এ সকল মনের কথা টের পেলে কি আর রক্ষা আছে। (প্রকাশে) ভগবন্, আজ আমাদের কি শুভ দিন! আমরা আপনার শ্রীচরণ দর্শন করে চরিতার্থ হলেম। তবে আপনার কোথায় গমন হচ্যে?
নার। (স্বগত) এ দুষ্টা স্ত্রীটার কি কিছুমাত্র লজ্জা নাই। এ কি? এর যে উদরে বিষ, মুখে মধু। এ যে মাকালফল। বর্ণ দেখ্লে চক্ষুঃ শীতল হয়, কিন্তু ভিতরে—ভস্ম। তা আমার যে পর্য্যন্ত সাধ্য থাকে একে যথোচিত দণ্ড না দিয়ে এ স্থান হত্যে কোনমতেই প্রস্থান করা হবে না। (প্রকাশে) আপনাদের চন্দ্রানন দর্শন করায় আমি পরম সুখী হলেম। আমার কথা আর কেন জিজ্ঞাসা করেন? আমি এক ঘোরতর বিপদে পড়ে এই ত্রিভুবন পর্য্যটন করে বেড়াচ্চি।
রতি। বলেন কি?
নার। আর বলবো কি? কয়েক দিন হলো আমি কৈলাসপুরীতে হরগৌরী দর্শন কর্যে আপন আশ্রমে প্রত্যাগমন কচ্ছিলেম, এমন সময়ে দৈবমায়ায় তৃষ্ণাতুর হয়ে মানস সরোবরের নিকট উপস্থিত হলেম—
শচী। তার পর, মহাশয়?
নার। সরোবর-ভীরে উপস্থিত হয়ে দেখ্লেম যে তার সলিলে একটি কনকপদ্ম ফুটে রয়েছে।
রতি। দেবর্ষি, তার পর কি হলো?
নার। আমি পদ্মটির সৌন্দর্য্য দেখে তৃষ্ণা-পীড়া বিস্তৃত হয়ে অতি যত্ন করে তুললেম।
সকলে। তার পর। তার পর?
নার। তৎক্ষণাৎ আকাশমার্গে এই দৈববাণী হলো—“হে নারদ, এ ভগবতী পার্ব্বতীর পদ্ম; একে অবচয়ন করা তোমার উচিত কর্ম্ম হয় নাই । এক্ষণে এ ত্রিভুবন মধ্যে যে নারী সর্ব্বাপেক্ষা পরমসুন্দরী তাকে এ পুষ্প না দিলে তুমি গিরিজার ক্রোধানলে দগ্ধ হবে।” হায়! এ কি সামান্য বিপদ্!— শচী। (সহাস্য বদনে) ভগবন্, আপনি এ বিষয়ে আর উদ্বিগ্ন হবেন না। আপনি এ পদ্মটি আমাকেই প্রদান করুন না কেন?
মুর। কেন, তোমাকে প্রদান কর্বেন কেন? দেবর্ষি, আপনি এ পদ্মটি আমাকে দিউন্।
রতি। মুনিবর, আপনিই বিবেচনা করুন। এ দেবনির্ম্মিত কনকপদ্মের উপযুক্ত পাত্রী আমাপেক্ষা ত্রিভুবনে আর কে আছে?
নার। (স্বগত) এই ত আমার মনস্কামনা সিদ্ধ হলো। তা এ ঝড় আরম্ভের আগেই আমার এখান থেকে প্রস্থান করা শ্রেয়ঃ। (প্রকাশে) আপনাদের এ বিষয়ে আমাকে