
স্যার রজার ডৌলারের মোতি
দীপাঞ্জন
বড় রাস্তা ছেড়ে পাশের আবছা গলিতে ঢুকল রজত। দ্রুত ইটছে ও। যে করেই হোক, তাড়াতাড়ি হস্টেলে পৌঁছতে হবে ওকে। ও যে কী ভুল করেছে ওই লোকটাকে ছড়া আর পলাশির কথাটা বলে, সেটা এখন বুঝতে পারছে।
না, টাকার বিনিময়ে ও ওই জিনিসটা লোকটার হাতে তুলে দিতে পারবে না।
কিছুতেই না।
রজত হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। কেউ কি আসছে পিছনে? ও পিছন ঘুরে দেখল একবার। না, কেউ তো নেই শুনশান গলি। মাথার উপর রাতের আকাশ। তাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তারারা। আর একটুখানি, তারপরেই হস্টেল। রজত বুকপকেটে দেখে নিল, সেই কাগজটা ঠিক আছে কিনা।
তারপর আরও জোরে পা চালাল। সামনে গলিটা ডানদিকে বীক নিয়েছে।
রজতের মনে হল, ও হয়তো বৃথাই ভয় পাচ্ছিল। লোকটাকে ও সংকেতের কাগজটা দিতে চায়নি মানে এই নয় যে, লোকটা ওর থেকে জোর করে ওটা নিয়ে নেবে। মনে মনে আবার সাহসটা ফিরে আসছে ওর।
সামনে গলিটা ফুরিয়ে আসছে। আবছা আলোয় বীকটা দেখতে পাচ্ছে রজত। ও ডানদিকে বাঁক নেবে এবার। তারপর আর একটু গেলেই ধাপ।
গলির বাঁকের মুখটায় ভৌতা শব্দে মাথার পিছনে কী একটা এসে লাগল রজতের। নিমেষে সারা পৃথিবী দুলে উঠল ওর চোখের সামনে। পাক খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল ও। গলিটা ছোট থেকে আরও ছোট হয়ে আসছে চোখের সামনে। যেন কেউ ধীরে ধীরে পরদা টেনে দিচ্ছে দৃশ্যের উপর। আর তার ভিতরেও, জ্ঞান হারাতে হারাতে রজত যেন দেখল, একজন এগিয়ে আসছে ওর দিকে। ঝুঁকে আসছে ওর সামনে। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে লম্বা রোগাটে লোকটাকে চিনতে পারল রজত। আবছা আলোয় লোকটার ধারালো হাসিটা চিনতে পারল। চোখ বুজে আসতে আসতে ও বুঝল, লোকটার হাতটা পৌঁছে গিয়েছে ওর জামার বুকপকেটে।
কয়েক মাস পর
এক থেকে নয়ের মধ্যে একটা সংখ্যা ধর তো মহী,” নতুন সিরিয়াস মুখ করে বলল।
“কেন? অঙ্ক করাবে নাকি? অঙ্ক আমার খুব বাজে লাগে,” মহী তেতো মুখে উত্তর দিল।
“আঃ, শুধু বাজে কথা, যা বলছি ধর।” মহী একটু চিন্তা করে বলল, “ধরলাম। ।
“গুড”, নতুন মাথা নাড়ল, “এবার এটাকে নয় দিয়ে গুণ কর।” “গুণ? আচ্ছা করলাম।” “যা উত্তর হল, সেটাকে নিজেদের মধ্যে যোগ করে দে। মানে উত্তর যদি চবিবিশ হয় তবে দুই আর চার যোগ কর। এমন আর কী, বুঝেছিস?” মহী ওর চশমা ঠেলে তুলে বলল, “আচ্ছা করলাম। কিন্তু তুমি এসব কী করছ বলো তো? আমি কোন সংখ্যা ধরেছি, সেটা বলে দেবে তো?” “না, আমি তোর মনের কথাটা জানব, বুঝলি? নে, এবার যা উত্তর হল,
তার থেকে পাঁচ বিয়োগ কর,” নতুন মহীর মুখের দিকে মনোযোগ দেওয়ার মতো করে তাকাল।
“দিলাম। এবার?” মহীও নতুনের চোখে চোখ রাখল।
“ওর করেসপন্ডিং যে ইংরেজি আ্যালফাবেট হয়, তাই দিয়ে একটা দেশের নাম ভাব। মানে বিয়োগের উত্তর ছয় হলে ইংরেজি অক্ষর হবে এফ। এফ দিয়ে ফ্রান্স। তেমন তোর যা এসেছে তাই দিয়ে একটা দেশের নাম ভাব।
ভেবেছিস?” নতুন জিজ্ঞেস করল।
“ইয়েস।” মহী মাথা নাড়ল।
“ওই দেশের নামের শেষ অক্ষরটা দিয়ে একটা প্রাণীর নাম আর প্রাণীর নামটার শেষ অক্ষর দিয়ে একটা ফলের নাম ভাব। বুঝলি?” মহী বলল, “ওকে, ভেবেছি।” লন টু রর রান জা ৮৮৮৮০৬৯ দে প্রাণী আর ফলের নাম ভেবেছিস।
তুনের দিকে, “পৃথিবীর এত দেশ, এত প্রাণী আর এত ফলের ভিতরে তুমি জানো আমি কী ভেবেছি?” “তুই ভেবেছিস, ডেনমার্ক, ক্যাঙ্গারু আর অরেঞ্জ। ঠিক কিনা?” নতুন হাসল।
কী বলবে একদম থ মেরে গেল মহী। সত্যি এগুলোই তো ভেবেছিল ও কী করে জানল নতুন?
মহী বলল, “তুমি জানলে কী করে?” নতুন হাসল, “শব্দ নিয়ে খেলতে আমার ছোট থেকেই ভাল লাগে।” মহী রমের দিকে তাকিয়ে বলল, “দা ভাই দেখলি। নতুনদা শুধু গবেষকই নয়, ম্যাজিশিয়ানও কিন্তু” রম হেসে বলল, “ঠিক আছে, তুই ম্যাজিক দ্যাখ। আমি ভিতরে যাচ্ছি।
দেখি, ছোট দাদু কী করছে।” মহী কিছু বলল না। ওর দাদাটি যে এমনই একটু একাচোরা, সেটা ও জানে। কলকাতায় থাকলেও রম এমনই হয়ে থাকে। সকলের চেয়ে আলাদা হয়ে বই মুখে বসে থাকে। এইবার এইচ এস দিয়েছে রম, আর মহী ক্লাস সেভেনে পড়ে। এখন সামার ভ্যাকেশন চলছে। ওরা দু জনে মায়ের সঙ্গে বেড়াতে এসেছে মামার বাড়ি পলাশিতে। অবশ্য শুধু বেড়াতেই নয়, বড় মামার ছেলের অন্নপ্রাশনও আছে, সেটাও এই সুযোগে সারা হয়ে যাবে।
মহী, রমের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ,তারপর নতুনকে বলল, “তুমি কিছু মনে কোরো না নতুনদা, আমার দাদাটা একটু অমন। তা এত অল্প বয়সে তুমি হঠাৎ ইতিহাসের মতো কঠিন ব্যাপার নিয়ে গবেষণা করছ কেন গো?” নতুন হাসল,“অল্প বয়স কোথায়? আমি চবিবিশ। আর সিরাজ উদ দৌলার সময় নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছে অনেকদিন ছিল আমার। এত অল্প সময় রাজত্ব করে কেউ অমন ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারে, ভাবা যায় আর তার উপর তোর বড় দাদু এত পণ্ডিত একজন মানুষ। ওঁর কাছ থেকে কত কিছু জানতেও পারছি।” মহী নতুনের পাশে ইাটতে ইটতে বাড়ির দিকে এগোল। বলল, “সে যাই বলো, হিষ্টি কিন্তু ভীষণ টাফ আর ভায়োলেন্ট। অত সাল, তারিখ, মারামারি,
কাটাকাটি। এসব বাচ্চাদের পড়ানো বন্ধ করে দেওয়া উচিত।” “কেন?” নতুন একটু অবাক হল।
“কারণ, আমার মতো দুধের শিশুদের কি এসব পড়ানো উচিত? কোন রাজা কতজনকে খুন করে সিংহাসনে চড়ল, কোন বাদশা কত রাজ্য লুঠ করল, কে শ য়ে শ য়ে বিয়ে করল, ছেলে বাবাকে মেরে রাজা হল, এমন সব হাজারটা খারাপ খারাপ কাজ। এই অশোকের কথাই ধরো না।” নতুন অবাক হল, “অশোক? কোন অশোক? সম্রাট অশোক? সে আবার কী করল?” মহী উত্তেজিত হল, “আর কোন অশোক আছে হিস্ট্রিতে? আমি তো আর আমাদের মালিদা অশোকের কথা বলছি না।” নতুন মাথা নাড়ল, “আহা, কী বলবি সেটা বল।” “দ্যাখো, কেমন লোক ভাইদের মেরে রাজা হল। তারপর কলিঙ্গের যুদ্ধে অত মানুষ মেরে দিল আর সে কি না মহামতি?” “আরে, সেই যুদ্ধের পরই তো তার ভয়াবহতায় তিনি চণ্ডাশোক থেকে ধর্মাশোক হন।” “ইইইঃ, খুব শখ, না?” মহী নতুনকে হাত ধরে দীড় করিয়ে দিল,
“অত লোক যে মেরে ফেলল সেটা সকলে ভুলে গেল? আর আমি হেডস্যারের ক্লাসে বোর হচ্ছিলাম বলে পাশে বসা খদ্ধিমানের সঙ্গে পেন ফাইট করছিলাম। তাতে স্যার কী মারলেন আমায় বাড়িতে চিঠি পর্যস্ত দিলেন। তারপরের দিন আমি একজন অস্ধকে রাস্তা পার করালাম। একটা ভিখিরিকে আমার টিফিন দিলাম। একটা কুকুরছানাকে গাড়ি চাপা পড়া থেকে বাঁচালাম। কিন্তু স্যার আমায় মাপ করলেন? আর অশোক? আমি যদি তাকে অনুসরণ করে হেডস্যারের বাড়ি আধলা ইট মারি, তবে? হ