গোয়েন্দা বরদাচরণ

গোয়েন্দা বরদাচরণ

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

গোয়েন্দা বরদাচরণ

Books Pointer Iconশীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
Books Pointer Icondetective

Posted byকাব্য রচিত03-Nov-2025

Change color

গোয়েন্দা বরদাচরণ একটা লাউ চুরির কেস নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন। কে বা কারা পরশু দিন ন’পাড়ার মোক্ষদা দিদিমার ঘরের চাল থেকে একটি নধর লাউ চুরি করে নিয়ে গেছে। মোক্ষদা দিদিমার নাতি নাড়ুগোপাল বাইরে চাকরি করে, সে বড় লাউয়ের ডাল ভালবাসে। নাতির জন্য লাউটা খুব যত্নে রেখেছিল দিদিমা। আজকালের মধ্যে নাড়ুগোপালের আসার কথা। কিন্তু এর মধ্যেই পরশুদিন লাউটা চুরি গেছে। দিদিমা কেঁদে কেটে এসে পড়লেন বরদাচরণের কাছে, ‘ও বাবা বরদা, আমার লাউ উদ্ধার করে এনে দাও।’

সেই থেকে বরদাচরণের ঘুম নেই, খাওয়া নেই। সঙ্গে অ্যাসিস্ট্যান্ট আর কুকুর নিয়ে সারাদিন আতসকাচ হাতে করে মোক্ষদা দিদিমার সারা বাড়ি, ঘরের চাল, পাড়া-প্রতিবেশীদের আনাচে-কানাচে তন্নতন্ন করে ক্লু খুঁজেছেন। তারপর বাড়ি এসে সারাদিন বসে ভেবেছেন, কাগজ কলমে কী যেন লিখেছেন আর মাঝেমাঝে ‘হুঁ হুঁ বাবা! নাঃ, হচ্ছে না!’ গোছের কথা বলেছেন আপনমনে।

বরদাচরণের বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে। বাড়িতে বুড়ী মা আছেন আর আছে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাগ্নে চাক্কু, আর পোষা নেড়ী কুকুর ডঙ্কি। বরদাচরণ কিছু মোটাসোটা মানুষ, ডন-বৈঠক করা শরীর। ভাগ্নে চাক্কু রোগা হলেও জুডো.জানে। ডঙ্কি খুবই ভাল ঘেউ-ঘেউ করতে পারে।

বরদাচরণের বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে। বাড়িতে বুড়ী মা আছেন আর আছে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাগ্নে চাক্কু, আর পোষা নেড়ী কুকুর ডঙ্কি। বরদাচরণ কিছু মোটাসোটা মানুষ, ডন-বৈঠক করা শরীর। ভাগ্নে চাক্কু রোগা হলেও জুডো.জানে। ডঙ্কি খুবই ভাল ঘেউ-ঘেউ করতে পারে।

চাক্কু এসে বারবার খোঁজ করে যাচ্ছে, ‘মামা কিছু ভেবে পেলে?’

বরদা খুবই অন্যমনস্কভাবে বলেন, ‘বোঁটা দেখে তো মনে হয় লাউটা বেশ বড়সড়ই ছিল।’

‘তা ছিল ।’

‘লাউটা বোঁটা কেটে নেওয়া হয়নি, মুচড়ে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে।’

‘হুঁ ঠিক ধরেছ।’

টিনের চালের ওপর একটা বড় লাউকে মুচড়ে বোঁটা ছিঁড়ে নেওয়া হল, অথচ কোন শব্দ হয়নি। মোক্ষদা দিদিমার ছেঁড়া মুশারির মধ্যে প্রচুর মশা ঢুকে পড়েছিল বলে দিদিমার সে-রাতে ভাল ঘুম হয়নি, শব্দ হলে তাঁর টের পাওয়ার কথা।

চাক্কু চিন্তিতভাবে বলে, ‘সে ঠিক, তবে মোক্ষদা দিদিমা আবার কানে একটু খাটো কিনা।’

এই সময় বাইরে ডঙ্কি ঘেউ-ঘেউ করে উঠল, কে একজন চেঁচিয়ে বলল, ‘কুকুর সামলান!’

চাক্কু ছুটে বাইরে গেল। একটু বাদে একজন বেশ ভাল চেহারার লোক ঘরে ঢুকেই বললেন, ‘বরদাবাবু, একটা মার্ডার কেস।’

বরদাচরণ গম্ভীরভাবে তাঁকে বসতে বলে কেস ডায়েরির খাতাটা টেনে নিয়ে কলম বাগিয়ে বললেন, ‘ডিটেলস বলুন।’

‘আমার পোষা কাকাতুয়াটাকে আজ সকালে তার দাঁড় থেকে মৃত অবস্থায় ঝুলে থাকতে দেখা গেছে।’

বরদাচরণ ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘এটা যে অস্বাভাবিক মৃত্যু তা কী করে বুঝলেন?’

‘খুবই স্বাভাবিক।’ ভদ্রলোক উদভ্রান্ত মুখে বললেন, ‘পাখিটার প্রতি আমার প্রতিবেশী রামচন্দ্রের অনেকদিনের লোভ। সে প্রায়ই বলত, অম্বুজাক্ষ, তোমার কাকাতুয়াটা বড় চমৎকার হরির নাম করে হে! তখন থেকেই ওর মতলব আমার ভাল ঠেকেনি। আজ সকালে পাখিটাকে ঝুলতে দেখে আমি দাঁড়ে-রাখা জল আর পাখির খাবার পরীক্ষা করি। আমার মনে হচ্ছে, জলে বা খাবারে বিষ মেশানো আছে।’

বরদাচরণ ডায়েরি বন্ধ করে উঠলেন, পিস্তলটা ড্রয়ার থেকে বের করে পকেটে ভরলেন। আতসকাচ, দড়ি,ক্যামেরা, এবং কী ভেবে টেপ-রেকর্ডারটাও সঙ্গে নিলেন। চাক্কু এবং ডঙ্কিকেও তৈরি হতে বললেন। তারপর ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে বললেন, ‘অম্বুজাক্ষবাবু, কেসটা অত সরল নাও হতে পারে। রামচন্দ্রবাবুর যেমন মোটিভ থাকতে পারে, আবার কাকাতুয়াটা সুইসাইডও করতে পারে, কিংবা এর পেছনে হয়তো আরও অনেক গভীর চক্রান্ত হয়েছে।’

বেরোবার সময়ে বরদাচরণের মা ডেকে বললেন, ‘বরদা, দুটি পান্তাভাত খেয়ে যাবি না?’

কে শোনে কার কথা! বরদাচরণ বেরিয়ে পড়লেন।

অম্বুজাক্ষবাবুর বাড়িটা বেশ বড়। পিছনে একটা ঢাকা দরদালানে অনেকগুলো খাঁচা, আর দাঁড়ে বিস্তর পাখি চেঁচামেচি করছে।

বরদাচরণ কাকাতুয়ার দাঁড়টা ভাল করে দেখলেন। পাখিটা পায়ে বাঁধা শিকলি থেকে তখনও ঝুলছে। দাঁড়ের দু’দিকে দুটি বাটিতে জল আর কাবলি ছোলা। একটা ছোলা তুলে নিয়ে পিছনের উঠোনে ছুঁড়ে দিলেন বরদাচরণ, একটা কাক সঙ্গে সঙ্গে নেমে এসে সেটা খেয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ বরদাচরণ কাকটাকে লক্ষ্য করলেন। না, কাকটা মরল না। তার অর্থ, ছোলায় বিষ নেই। জল থেকে খানিকটা ড্রপারে তুলে নিয়ে বরদাচরণ এদিক ওদিক তাকিয়ে অম্বুজাক্ষবাবুদের পোষা কাবলি বেড়ালটাকে একটা কাঠের বাক্সের ওপর বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গিয়ে আচমকা চেপে ধরলেন সেটাকে। অম্বুজাক্ষ হাঁ-হাঁ করে এগিয়ে এসে বাধা দেওয়ার আগেই বরদাচরণ বেড়ালকে অদ্ভুত কৌশলে হাঁ করিয়ে ড্রপারের জল তার মুখগহ্বরে ফেলে দিলেন। বেড়ালটা বারকয় খুব আপত্তিকর শব্দ করল বটে, কিন্তু মরল না।

বরদাচরণ গম্ভীরভাবে বললেন, ‘হুঁ।’

ওদিকে অম্বুজাক্ষবাবু একটা হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশি থেকে কয়েকটা বড়ি খেয়ে আপনমনেই বললেন, ‘গায়ে হাতে বড় ব্যথা।’

ওদিকে চাক্কু ডঙ্কির বকলেস ধরে বাড়ির চারদিকে ঘুরে ঘুরে ক্লু খুঁজছিল। হঠাৎ সে দৌড়ে এসে বরদাচরণের কানে-কানে বলে গেল, ‘লাউয়ের খোসা! রামচন্দ্রবাবুর বাড়ির পিছন দিকে লাউয়ের খোসা পড়ে আছে, মামা।’

বরদাচরণ বিদ্যুৎবেগে উঠে পড়লেন।

বুড়ো মানুষ রামচন্দ্রবাবু ঘরে বসে রামায়ণ পড়ছিলেন। বরদাচরণকে দেখে যেন একটু চমকে উঠে বললেন, ‘আরে, আসুন আসুন বরদাবাবু! বিখ্যাত লোকদের দেখা পাওয়া এক মস্ত সৌভাগ্য।’

বরদাচরণ বসলেন। স্থির চোখে কিছুক্ষণ রামচন্দ্রবাবুকে স্টাডি করে দেখলেন তিনি।

রামচন্দ্রবাবু রামায়ণ বন্ধ করে বললেন, ‘ভাবছিলাম, আজই আপনার কাছে একবার যাব। আমার উঠোনের নারকোল গাছ থেকে কাল রাতে ছ’টা নারকোল কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। খুবই রহস্যময় ব্যাপার। বাইরে থেকে কারও পক্ষে উঠোনে আসা খুবই শক্ত। তবে—’

বলে রামচন্দ্রবাবু খুবই ইংগিতপূর্ণভাবে চুপ করে গেলেন।

বরদাচরণ ডায়েরিতে কেসটা লিখে নিতে-নিতে বললেন, ‘কিছু গোপন করবেন না রামচন্দ্রবাবু।’

রামচন্দ্রবাবু লাজুক হাসি হেসে বললেন, ‘না, গোপন করে লাভ নেই। আপনার চোখকে কি ফাঁকি দেওয়া সম্ভব! বলেই ফেলি।’ বলে গলাটা নিচু করে বললেন, ‘পাশের বাড়ির অম্বুজটা মহা নারকোল-খোর। দু’বেলা নারকোল খায়। বড়া করে খাচ্ছে, নাড়ু বানিয়ে খাচ্ছে, মুড়ি দিয়ে খাচ্ছে, অমন নারকোল খেতে কাউকে দেখিনি। প্রায় সময়েই আমাকে বলে, ‘রামচন্দ্রবাবু, আপনার গাছে বিস্তর নারকোল হয়েছে দেখছি! আমার সন্দেহ, কাল রাতে—’

‘হুঁ।’ বরদাচরণ খুবই গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু আগেই তিনি অম্বুজাক্ষবাবুকে গায়ের ব্যথার জন্য হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খেতে দেখেছেন। গায়ে ব্যথা তো হবেই। এই বয়সে যদি অত উঁচু নারকোল গাছে কেউ ওঠে তবে ব্যথা হওয়াই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু খুঁজেপেতেও অম্বুজাক্ষবাবুর বাড়িতে নারকোল বা নারকোলের ছোবড়া পাওয়া গেল না। এটাও রহস্যজনক। কারণ, নারকোল খাওয়া যার নেশা, তার বাড়িতে নারকোলের চিহ্নও খুঁজে&n

**********