ওয়ারেন দাদার ধাঁধা বাক্স

ওয়ারেন দাদার ধাঁধা বাক্স

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

ওয়ারেন দাদার ধাঁধা বাক্স

Books Pointer Iconস্মরণজিৎ চক্রবর্তী
Books Pointer Icondetective

Posted byদীপাঞ্জন 02-Dec-2025

Change color

সূর্য ডুবে গিয়েছে কিছুক্ষণ আর তার যাই যাই আলোটাও বিশেষ পড়ে নেই আকাশে। পল বার্ড তার কাজ সেরে ফিরে আসছেন বাড়ি। পলের ঘোড়ায় টানা বোগি গাড়ি মূল রাস্তা থেকে বীক নিল মাঠের ভিতর দিয়ে লাল নুড়ির রাস্তায়। বর্ষার সময় এখন। তবে কয়েকদিন বৃষ্টি নেই কলকাতায়। জুলাই মাস শেষ হতে আরও ছ দিন বাকি। অফিসের কিছু হিসেব এই মাসের ভিতরেই জমা দিতে হবে উপরওয়ালার কাছে। না হলে মুশকিল আছে। পল তাই আজ একটু বেশিই চিস্তিত। অন্যদিন বাড়ি ফেরার সময় সন্ধের কলকাতা দেখতে ভাল লাগে ওঁর, কিন্তু আজ আর সেদিকে মন দিতে পারছেন না। তবু গাড়িটা জোরেই চালাচ্ছেন পল। রাস্তার লোকজনদের বিশ্বাস নেই। কে কোথায় ঘাপটি মেরে থাকে, বোঝা যায় না। টাকা পয়সা লুঠ করতে তো এদের হাত কাঁপে না। খানিকটা সেই কারণেই পল গাড়িটা জোরে চালাচ্ছেন।

দূর থেকে বিশাল বড় হেস্টিংস হাউসটা দেখা যাচ্ছে। পল ওখানেই সন্ত্রীক থাকেন। বাড়িটার সামনের রাস্তার দু দিকে বড় বড় গাছের ছায়ায় এই গোধূলি আরও রহস্যময়, আরও বিষণ্জ লাগছে। বোগির সামনে জ্বলা ল্যাম্পগুলো এই অন্ধকারে আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে পল ভাবলেন, আরও জোরে গাড়ি ছোটাবেন।

কিন্তু হাতের চাবুকটা তুলে ঘোড়াটাকে মারতে গিয়েও থমকে গেলেন তিনি। আরে সামনে ওটা কীসের আওয়াজ? আর একটা ঘোড়ার গাড়ি কি?

স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও, পলের মনে হল কিছু একটা যাচ্ছে। ফের চিন্তিত হয়ে গেলেন পল।

চারদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে আরও। তাই পল বেশ কিছুটা সামনে দিয়ে যাওয়া ঘোড়ার গাড়িটাকে দেখতে পেলেন না স্পষ্ট। কেমন যেন ধোয়াটে লাগল তাঁর। ভাবলেন, এমন সময় বাড়িতে কে এল? কারও তো আসার কথা ছিল না। তবে?

বোগির গতি বাড়ালেন পল। সামনের গাড়ির আওয়াজ্টা যেন স্পষ্ট হল আরও বাড়ি থেকে একশো গজ দূরের সেই গাড়ির পিছনের ধাতব প্যানেলে যেন নিজের বোগির ল্যাম্পগুলোর প্রতিবিশ্বও দেখতে পেলেন। পল সেদিকে চোখ রেখে গাড়ি ছোটালেন।

রাস্তাটা সামনে গিয়ে বীদিকে বেঁকে হেস্টিংস হাউসের পোর্টিকোর তলায় ঢুকে গিয়েছে। পল যেন দেখতে পেলেন সামনের গাড়িটাও পোর্টিকোর তলায় খটমট শব্দ তুলে ঢুকল। পলও নিজের বোগিটাকে ছুটিয়ে বাদিকে বাক নিলেন আর তারপরই থতমত খেয়ে ঘোড়ার লাগাম টেনে দাড়িয়ে পড়লেন হ্ঠাৎ।

এ কী পোর্টিকোর তলা তো শূন্য তা হলে সামনে যে ঘোড়ার গাড়িটা আসছিল। সেটা কোথায় গেল? না, পল তো ভুল দ্যাখেননি স্পষ্ট আওয়াজ শুনলেন সামনের গাড়ির পিছনের প্যানেলে নিজের বোগির আলোর বিস্ব দেখলেন এখন গাড়িটাই নেই পল প্রায় লাফ দিয়ে নামলেন গাড়ি থেকে।

কী হল ব্যাপারটা?

আর ঠিক তখনই শুনলেন তার স্ত্রীর গলার আওয়াজ, “পল, পল।” “কী হল?” পল দৌড়ে গেলেন সিঁড়ির দিকে।

মেরি বললেন, “তুমি এখানে? তবে ওটা কে ছিল?” “মানে? কে ছিল মানে? কোথায় ?” “ওই যে সাদা লাল ইউনিফর্ম পরা, মাথায় হ্যাট দেওয়া মানুষটা। আবছায়া পোশাকটা লাল সাদাই তো মনে হল। ওই যে গাড়ি থেকে নেমে খুব দ্রুত দোতলায় উঠে গেল।” “লাল সাদা ইউনিফর্ম? কী বলছ তুমি?” পল বিভ্রাস্ত হয়ে মেরির দিকে তাকালেন।

অল্প আলোয় মেরির ফরসা মুখটা কেমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।

মেরি বললেন, “হ্যা, হ্্যা। সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল মানুষটা। তারপর আমার ডাক শুনেই কেমন যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল নিমেষে। ব্যাপারটা কী বলো তো? মানুষ কখনও এমনভাবে মিলিয়ে যায়? এই ১৮৮৪ সালে এমনকি হতে পারে?” পল উপরের দিকে তাকালেন। তারপর পোর্টিকোর দিকেও তাকালেন একবার। অস্ফুটে বললেন, “তা হলে তা হলে কি যেটা শুনেছি, সেটা সত্যি” দকী শুন?” পল বললেন, “যাঁকে দেখেছ, সে ” “কে সে?” মেরি অস্থিরভাবে তাকালেন পলের দিকে।

পল রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললেন, “ভুত।” “কী? ভূত?

“হ্যা,” পল ঢোক গিলে বড় কিউবের মতো বড় বাড়ির ছায়া রঙের শরীরটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এর কথা অনেক শুনেছি। নিজের হারানো বাক্স খুঁজতে এসেছে। এ ভুত, ওয়ারেন হেস্টিংসের ভুত।”

একশো সাতাশ বছর পর

পুজোর পর কলকাতাটা কেমন যেন এলোমেলো আর উসক্োথখুসকেো হয়ে যায়। সকালের রোদেরও যেন কেমন একটা নেতিয়ে পড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। বাড়িতে বসে মহীর বিরক্ত লাগে খুব। ধুর, পুজো শেষ মানেই সেই একঘেয়ে পড়াশোনা আর রুটিনবীধা জীবন। সেই স্কুলে যাওয়া, তারপর বাড়ি ফিরে এসে পড়তে বসা। এই এখন যেমন। ইতিহাস খুলে ইউরোপে কয়েকশো বছর আগে কী হয়েছিল, সেসব মুখস্থ করতে হচ্ছে। বিচ্ছিরি সব।

আরে বাবা, পাশের পাড়ায় কী হচ্ছে আজকাল, তার খবর রাখে না কেউ আর কয়েকশো বছর আগের ইউরোপ কী হবে এসব পড়ে। রোমের সাম্রাজ্য।

কন্স্ট্যানস্টাইন, ধ্যাত, মহী চোখের মোটা চশমাটা ঠিক করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।

মহী থাকে দোতলায়। ওর দাদা রমের সঙ্গে ওকে রুম শেয়ার করতে হয়। এই ব্যাপারে মহীর কিছু করার নেই। রম এখন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে। ফার্স্ট ইয়ার। ওর বিষয় হল ইলেকট্রনিক্স। সকালবেলাটা বাড়িতে থাকে না বললেই হয়। ফলে সকালবেলার প্রায় পুরোটাই মহীর। মহী ভাবে ও কবে যে বড় হবে?

কবে যে এমন বস্তাপচা পড়ার থেকে রেহাই পাবে কিন্তু কিছুই হয় না। সেই ইতিহাস, সেই ভূগোল মহীর ঘরের জানালার নীচে, একতলায় ওদের বড় উঠোনটা দেখা যাচ্ছে।

সেখানে ওদের আ্যালসেশিয়ান পালোয়ান ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের বাড়িটা খুব বড়। একদম তিনতলা। রাসবিহারী মোড়ের কাছে এমন বড় বাড়ি আর নেই বললেই চলে। বড়রাস্তা থেকে একটা লেফ্ট টার্ন নিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট একটা রাস্তায় ঢুকে কিছুটা গেলেই ডানদিকে ওদের বিশাল বড় এই বাড়ি।

লোহার গেট দিয়ে ঢুকে গাড়ি বারান্দা। তার চারদিক ঘিরে বড় উঠোন। আর উঠোনের একপাশে বড় একটা বাগান। এই উঠোনটায় মাঝে মধ্যে ক্রিকেট খেলে মহী।

টেব্লের উপর রাখা ঘড়িটা দেখল ও। সাড়ে এগারোটা বাজে। প্রায় তিনঘণ্টা পড়ছে। আর না। এবার নীচে না গেলেই নয়। দামুদা আজ চালতার আচার বানাবে, ব্যাপারটা সত্যি না দামুদা গুল মারল, মহী নিজে গিয়ে দেখবে।

মহী নীচের বারান্দায় দীড়াতেই পালোয়ান এসে পা ঘেঁষে দীড়াল।

পালোয়ানের মাথায় হাত বোলাতে গিয়ে লক্ষ করল, কোনও কারণে পালোয়ান কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। প্রায় দৌড়ে নেমে গেল উঠোনে।

আর ঠিক সেসময় ওদের মেন গেটের কাছে একটা গাড়ির আওয়াজ শুনল মহী।

এমন সময় কে এল? মহীর বাবা অলোক ঘোষাল, আর কাকু অজয় ঘোষাল, সকলেই অফিসে। বাকিরা ইউনিভার্সিটিতে বাড়িতে মা ছাড়া আছে ঠাকুরদা আদিনাথ ঘোষাল, মোহন মিশ্র, হীরকদা আর কাজের লোকরা।

কাকিমা আর খুড়তুতো&nbs

**********