
কবিতার শত্রু ও মিত্র
বুদ্ধদেব বসু
কবিতার শত্রু ও মিত্র : একটি খোলা চিঠি
অনেকদিন তোমাকে চিঠি লিখতে পারিনি। অনেকদিন— যদিও ইতিমধ্যে তোমার দু-খানা চিঠি পেয়েছি, অনেকবার পড়েছি, কৃতজ্ঞ বোধ করেছি আমার ভাগ্যের কাছে যেহেতু তুমি, ছেলেবেলা থেকে আমার বন্ধু, এককালে আমার সাহিত্যিক জীবনের নিত্যসঙ্গী— দূর দেশে ভিন্ন পরিবেশে বাস করেও, অন্য ভাষায় পরিবৃত হয়েও— কখনো রোম, কখনো ন্যুয়র্ক কখনো-বা নাইরোবির বিমানবন্দর থেকে এখনো আমাকে স্নেহের সঙ্গে স্মরণ করো। তুমি ভাবতে পারবে না তোমার চিঠিগুলি কত আনন্দ নিয়ে আসে আমার জন্য— ভিতরে যা আছে শুধু তা-ই নয়, বাইরের লেফাফাটাও— নিয়ে আসে সারি-সারি রঙিন ডাকটিকিটে দূর কোনো সমুদ্রের ঝাপট যেন, গাঢ় কালো কালিতে লেখা ঠিকানায় তোমার হস্তাক্ষরের প্রণয়স্পর্শ। আমি জানি তুমি সুচিন্তিতভাবে ঐ টিকিটগুলোকে বেছে নাও, আমার চোখের ও মনের ক্ষণিক প্রীতিসাধনের জন্য— চিঠি খোলার আগে থেকেই আমার সম্ভোগ শুরু হয়ে যায়। অথচ দ্যাখো, তোমার শেষ চিঠি পাবার পরেও তিন সপ্তাহ কেটে গেলো, এখনো আমি নীরব। রোজ ভাবি লিখবো, রোজ ভাবি আজ থাক। অবশেষে নিজেকে আজ বাধ্য করলাম আরম্ভ করে দিতে, কিন্তু শেষ করতে পারবো কিনা এখনো জানি না।
আসল কথা, গত চার মাস ধরে—না, প্রায় পাঁচ মাস ধরে— আমি কিছুই লিখছি না, একটি পঙক্তি নয়, একটি বাক্য নয়— মাঝে-মাঝে দু-চার লাইনের ‘কেজো’চিঠিপত্র ছাড়া কিছুই লিখিনি, পারছি না লিখতে, লেখার ইচ্ছেটাই যেন মরে যাচ্ছে আমার। অথচ আমার মনে হয় না আমি নিঃসাড় হয়ে গিয়েছি। এই পাঁচ মাসের মধ্যেও কখনো কোনো চিন্তা আমাকে নাড়া দিয়েছে, কোনো স্বাগতভাষণ ছন্দে বাঁধা পড়েছে হঠাৎ, কারো মুখে শোনা হালকা কোনো কথার মধ্যে চমক দিয়েছে ইঙ্গিতে কোনো কাহিনী— কিন্তু এই সব আকস্মিক উপহার থেকে স্পষ্ট কিছু গড়ে তোলার মতো উৎসাহ আমি নিজের মধ্যে সংগ্রহ করতে পারিনি। এমন নয় যে এ-রকম অবস্থা আগে আমি জানিনি কখনো, অনেকবার জেনেছি— অনেক বন্ধ্য ঋতু, ব্যর্থ দিন, ক্লান্তির ধূসরতা, যাকে বলা যায় আমারই মধ্যে লুকিয়ে-থাকা এক পাতাল, যাতে প্রবিষ্ট হয়েও আবার আমি বেরিয়ে আসতে পেরেছি (যেহেতু শেষ পর্যন্ত আমিই আমার কর্তা)— বহু কষ্টে, হয়তো কিছুটা দৈবের সাহায্যেও ঠিক বিজয়ীভাবে না-হোক, অন্ততপক্ষে সসম্মানে। এমনও নয় যে এটা আমার বয়ঃক্রমজনিত অবসাদ, কেননা ধীরে-ধীরে দেখছি বার্ধক্যও একেবারে দরিদ্র নয় (তুমিও তা বুঝে নিয়েছো সন্দেহ নেই?), অন্তত রিক্ততার কিছুটা ক্ষতিপূরণ তা নিয়ে আসে, আমাদের বিরত করে অপচয় থেকে, আলস্য থেকে, অতি সহজ ও চিন্তাহীন উচ্চারণ থেকে, শিক্ষা দেয় গর্বে ও বিনয়ে, স্বীকরণে ও অতিক্রমণে, হৃদয়ের অবশিষ্ট রত্নগুলির পরিচর্যায়। না, বার্ধক্য নয়, আমার নিজের কোনো অস্বাস্থ্য নয় (তা যদি জানতাম তবু কিছুটা সান্ত্বনা পাওয়া যেতো); যে-কারণে আমার চিন্তাগুলি এখন ছিন্নভিন্ন, যে-কারণে কাগজে কলম ছোঁওয়াতে আমি বার-বার থমকে যাচ্ছি, সেটা আমার অন্তর্ভূত কোনো ঘটনা নয়— এক অন্ধ ঐতিহাসিক শক্তি, দুর্বার এবং দুর্বোধ্য, যার উপর আমার বা তোমার কোনো হাত নেই, মনে হচ্ছে কারোরই কোনো হাত নেই— এবং যা, আমি যাকে আমার জগৎ বলে জানি, তার সুদূরতম পরপারে অবস্থিত হয়েও আমার ক্ষুদ্র নিভৃত অন্তঃপুরটিকে কোনো কুহকের মতো অনির্ণেয় করে তুলছে। তোমার কাছে স্বদেশীয় সংবাদপত্রাদি নিয়মিতভাবে পৌঁছয়, তাই ধরে নিচ্ছি স্থূল তথ্যগুলি তুমি জানো, যদিও তোমার সাম্প্রতিক চিঠিতে সে-বিষয়ে কোনো উল্লেখ করোনি। করোনি— সেটা আমার পক্ষে সুখের কথা; আমি পেলাম এমন দু-একটি সকালবেলাকে, যার বার্তা শুধু কলকাতার বিষাদ নয়, অন্য কোনো সুস্বাদু অনুভব— কোনো ভূদৃশ্য, কোনো দূরত্ব, কোনো রৌদ্রালোকে গুঞ্জনময় আকাশ (আমারই জানলার বাইরে, কিন্তু আমি আর দেখতে পাই না আজকাল)— সেই সঙ্গে আমার সাম্প্রতিক দু-একটি কাব্যকাহিনী বিষয়ে তোমার বুদ্ধিদীপ্ত হৃদয়গ্রাহী অনুমোদন। বিশ্বাস করো, তোমার ফুৎকারে আমার আগুন যেন হেসে উঠেছিলো আবার, নিজেকে মনে হয়েছিলো পুনরুজ্জীবিত, প্রায় কোনো নতুন চেষ্টার জন্য প্রস্তুত— কিন্তু হায়, তাও মুহূর্তের জন্য। কেননা তন্ময়ভাবে কিছু রচনা করতে হলে প্রথমেই চাই আস্থা— আস্থা নিজের উপর, অচেতনভাবে মানব-সংসারের উপরেও, মানুষের মনুষ্যত্ব ও সভ্যতার স্থায়িত্বের উপর— এক কথায়, আমরা যাকে অস্পষ্টভাবে ‘জীবন’বলি তার উপর। আমার চিত্ত অন্যদের পক্ষেও অধিগম্য, আমার চিন্তায় অন্যেরাও স্পষ্ট হতে পারে, আমার বেদনার অন্য বহু অংশীদার সম্ভব (বহু না-হোক, অল্প কয়েকজন; এ-মুহূর্তে না-হোক, ভবিষ্যতে), এই বিশ্বাস— বা যদি মোহ বলতে চাও তবে তা-ই—মনের মধ্যে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল না-হলে (অর্থাৎ, আমরা যে যা করছি তা করার যোগ্য এ-কথা স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে না-নিলে) মানুষের চেতনা ও কল্পনা কি চিরকাল অপ্রকাশিত থাকতো না? কিন্তু এ-মুহূর্তে আমার মনে সেই মৌলিক আস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ছে; আমি যেন বাস্তুভিটায় আর আশ্রয় পাচ্ছি না, নিজেকে অনবরত জিজ্ঞাসা করছি : কেন? কার জন্য? কী হয় এ-সব দিয়ে? তুমি আর আমি যা-কিছু জেনেছি মূল্যবান বলে, যা-কিছু মেনেছি একাধারে প্রিয় ও শ্রেয়, যা-কিছু জীবনকে অর্থ দেয় বলে আমরা ধারণা করেছি— অর্থ দেয়, ঋদ্ধ করে তোলে, দিগন্তের দিকে দরজা খুলে দেয়, আজ মনে হয় সে-সব কিছু নয়— শুধু এক অস্পষ্ট ও মোহময় বিহঙ্গধ্বনি, যা আমরা আধো ঘুমে আধো স্বপ্নে কোনো-এক নির্মল উষায় শুনেছিলাম। আজ যখন আমাদের চারদিকে দেখছি দেশে-দেশে, ভারতবর্ষে, বাংলা দেশে, আর বিশেষভাবে প্রত্যক্ষ এই কলকাতায়—দেখছি এত অন্যায় ও অবিচার, নৈরাশ্য ও নিষ্ঠুরতা, এত ব্যর্থ উন্মাদনা ও অপব্যয়িত উদ্যম, এত ধ্বংস ও সন্ত্রাস ও আর্তি— তখন আমার মনে প্রশ্ন : কী এসে যায় এ-সবে- রিলকের আর ইয়েটসের কবিতা, টোমাস মান্ আর মার্সেল প্রুস্ত-এর উপন্যাস, রুয়ো রেমব্রান্ট বতিচেল্লির চিত্রকলা, রঁদ্যার মূর্তি, কোণারক আর খাজুরাহো, আর আমাদের উদয়শঙ্কর ও রবিশঙ্করগণ, এমনকি আমাদের নিশ্বাসে-মেশা রবীন্দ্র-সংগীত— এই সৌন্দর্যের আভা, আনন্দের স্পর্শ, মুক্তির স্বাদ, এই উদ্ভাসিত অন্তর্লোক ও জ্যোতির্বিদ্ধ রহস্য—কী এসে যায় এ-সবে, কী করতে পারে এরা আমাদের জন্য, হতে পারে কোন মড়কে চিকিৎসক বা কোন সংকটে দিশারি? আমাদের মানতেই হবে, সে-রকম কিছুই পারে না এরা, আমাদের জরুরিতম সংসারজীবনের প্রধানতম চাহিদা মেটাবার এদের কোনো ক্ষমতা নেই। মানতেই হবে, আজকের এই বিশৃঙ্খল বাংলা দেশে এরা পারে না কাউকে কোনো সুপরামর্শ দিতে, কোনো দিক দিয়ে প্রবৃত্ত বা নিবৃত্ত করতে, যেখানে অসংখ্যের জীবন নিয়ে সংগ্রাম চলছে, সেখানে এরা একেবারেই অক্ষম। বরং উল্টো দিকে এদের কিছু প্রভাব দেখা যায় : মনের মধ্যে কল্পনা-মায়া বিস্তার করে এরা বাস্তব থেকে সরিয়ে আনে মানুষকে, সন্নিকট দায়িত্বগুলিকে ঝাপসা করে দেয়। তাহলে কি বলা যায় না এরা হয় নিষ্ফল, নয় নিন্দনীয়?